“আমি শুনেছি সেদিন তুমি / সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল / দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছ”….
১..ওয়াটার লু’এর সবুজ প্রান্তরে নেপোলিয়নের ক্লান্ত দেহটা যখন আস্তে আস্তে লুটিয়ে পড়ল,তখন বেলজিয়ামের নীল আকাশ বেয়ে ঝড়ে পড়ছে বিরামহীন বৃষ্টি।আকাশভেদী চিৎকারে শোনা যাচ্ছে ইংরেজদের বিজয়ধ্বনি।নিষ্ঠুর উল্লাসে তারা মত্ত।লুটিয়ে পড়া নেপোলিয়ন নির্বাক চিত্তের এক অসহায় দর্শক। বিশ্বজয় কিংবা ইংরেজদের উপর প্রতিশোধের উভয় ব্যার্থতাকে তখন আপন করে নিয়েছেন তিনি ঠিক যেরকম পম্পাইয়ের মূর্তির কাছে ২৩ টা ছুরির ক্ষত নিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল জুলিয়াস সিজার। বেলজিয়ামের ওই সবুজ গালিচাতে সেদিনই অশ্রুদিয়ে লেখা হয়ে গিয়েছিল এক ঐতিহাসিক নির্মম নীতিকথা-” Real Heroes Are Tragic Ones”।
২..কাম অন ডেল,গিভ হিম আ বাউন্সার”– নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর কেটে গেছে ১৯৭ টা বছর।আর তখনই রক্তকরবীর নিষ্ঠুর হাসি হাসতে হাসতে বিষাক্ত শ্লেষটা শেষমেশ বেরিয়ে এল কলকাতা নাইট রাইডার্সের এক কর্মকর্তার মুখ দিয়ে।আই পি এল অকশনে আনসোল্ড থাকার পর দীর্ঘদিনের অনভ্যাস কাটিয়ে পুনে ওয়ারিয়র্সের হয়ে তখন সবে তৃতীয় ইনিংস শুরু করেছেন সৌরভ গাঙ্গুলি।একটা ম্যাচে প্রতিপক্ষ তখন ডেল স্টেইনের হায়দ্রাবাদ।পাহাড় কেটে বানানো সুব্রত রায় স্টেডিয়াম থেকে কয়েকশ’ কিলোমিটার দূরের ইডেনের টিভি স্ক্রীনে চোখ রেখেছে তখন কলকাতার কিছু কর্মকর্তা।উদ্দেশ্য -সৌরভের উইকেট। ম্যাচ শেষে সৌরভ যখন বেরিয়ে আসছেন তখন তার নামের পাশে ডেল স্টেইনের বাউন্সার সামলে ম্যাচ জেতানো অপরাজিত ইনিংস।

“Being challenged in life is inevitable, being defeated is optional”—Roger Crawford. আর ইনি সৌরভ গাঙ্গুলি যাঁর প্রথম অপশন চ্যালেঞ্জ, দ্বিতীয় অপশন জয়।
৩..আগ্রাসী সৌরভকে কিছুতেই আটকাতে না পেরে গ্রেগ চ্যাপেল শুরু করলেন মিথ্যাপ্রচার।এক সাংবাদিককে বললেন, ম্যাচে নাকি সৌরভ ১৭ বার যুবরাজকে সিঙ্গলস দিতে অস্বীকার করেছেন। অবশ্যই মিথ্যাচার। চ্যাপেলকে একবার মোক্ষম জবাব দিয়ে সৌরভ বলেছিলেন—”তুমিও ৪৯ টেস্টে ২১ টি জিতেছো, আমিও তাই। তফাত শুধু তোমার ছিল লিলি-টমসন, আমার শ্রীনাথ-জাহির।
“People get mad when you treat them like they treat you”
৪..সদ্য ওয়ানডে সিরিজে ১-৫ হারে বিধ্বস্ত হয়ে দ্রাবিড় চ্যাপেল যখন ওয়ান্ডারার্স ড্রেসিংরুমে একটি টেস্ট ম্যাচের হার বাঁচানো নিয়ে ব্যস্ত,তখন নিজের কামব্যাক সিরিজের চাপ সামলে একমাত্র সৌরভই বলতে পেরেছিলেন—”Let’s make a game plan to win the test” আপনারা রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে জঙ্গলে দেখেছেন, চ্যাপেল ওয়ান্ডারার্সের ড্রেসিংরুমে দেখেছিল, পার্থক্য এটাই।
৫..লর্ডসে তাঁর জামা খোলা নিয়ে বিতর্ক বাধে, তখন জিওফ্রে বয়কট এর সাথে তাঁর একটা উত্তপ্ত কথপোকথন ঘটে—
Boycott :-Flying jersey in the air at the Mecca of cricket,Oh You Naughty boy.
Sourav :-One of your boys also took off his Jersey at Mumbai
Boycott :- But Lords is Mecca of Cricket
Sourav :- Lords is Your Mecca, Wankhede is Ours

১, ২, ৩, ৪, ৫ নম্বর ঘটনাগুলো কেনো বললাম তা পড়ে বলছি। শুধু এটুকু জানুন, নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর আরেকবার গোটা বিশ্ব শুনেছিল আরেক নেপোলিয়নের কুচকাওয়াজ। এক বেহালাবাসী বাঙালী মুকুট না পড়েই রাজা হয়ে বসেছিল একটা কালিমালিপ্ত সিংহাসনে। সে কখনও রাবেন্দ্রিক শিড়দাঁড়ায় দন্ডায়মান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে স্টিভ ওয়া-নাসের হোসেনের সামনে—
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির”।
আবার সে কখনও নজরুলগীতির সুর ধরে চলা এক বেহালাধারী “বিদ্রোহী”—
“মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস! / বল বীর, আমি চিরউন্নত শির”।
একটা ক্রান্তি। একটা বাঙালী শিরদাঁড়া যেটা স্বপ্ন দেখিয়েছিল একশো কোটির ভারতবাসীকে। একটা বিপ্লব। গোটা বিশ্ব চাক্ষুষ করল ক্রিকেটের নেপোলিয়নের পদধ্বনি। জোহানের্সবার্গের প্রতিটা দেবদারু উন্নত চিত্তে আহ্বান জানালো বিশ্বের সাহসীতম বীরকে—”স্বাগতম স্বাগতম স্বাগতম।” সেনাপতি এক বেহালাবাসী। সৈন্যরা ফরাসী নয়, নীল বর্মের জাহির-যুবি-ভাজ্জি-কাইফ। তবুও কোথাও যেন ইতিহাসের এক অদৃশ্য সূত্রে মিলে গিয়েছিল ওয়াটার লু আর জোহানের্সবার্গ। মিলে গিয়েছিল বেলজিয়াম আর দক্ষিণ আফ্রিকার বৃষ্টি। আর মিলে গিয়েছিল নেপোলিয়নের লুটিয়ে পড়া দেহ আর সৌরভের আস্তে আস্তে ডাগআউটে ফিরে যাওয়ার করুণ মুখটা। ইংরেজ-লঙ্কাদ্বীপ-কিউইস সংহারের পর সেবার পালা ছিল একটা শেষ যুদ্ধের যা প্রতিষ্ঠা করবে বেহালাবাসী নেপোলিয়নকে বিশ্বসিংহাসনের সম্রাটরূপে। জাহির-বীরু-যুবির তাজা রক্তে তখন স্বাধীনতার উন্মাসিক চাহিদা। স্বাধীনতা? কিসের স্বাধীনতা? উত্তরটা আপনাদের জানা। ডোপিং কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত একটা দলের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের হাতছানি, আন্ডারডগ একটা জাতির বিশ্বজয়ের হুঙ্কার দেওয়া। এগুলো কি স্বাধীনতা নয়? কিন্তু ওয়াটার লুর প্রান্তরে রক্ত দিয়ে যে নির্মম সত্যটা লেখা হয়েছিল, গোটা বিশ্ব তা প্রত্যক্ষ করল আরো একবার। জোহানের্সবার্গের সবুজ গালিচাতে হাসতে হাসতে সেদিন পরাজয় বরণ করেছিল সৌরভীয় বহ্নিশিখা। ইতিহাস যে বহুকাল আগেই ললাট লিখে গেছে -নেপোলিয়ানদের হারতে হবে শেষ যুদ্ধটা। তাই হেরেছিল একজন সৌরভ গাঙ্গুলী। কিন্তু জিতেছিল কে? রিকি পন্টিং? নাহ্, সেদিন মানুষ নেপোলিয়ন হেরেছিল, জিতেছিল চরিত্র নেপোলিয়নটা। জিতেছিল সাহস। জিতেছিল লবি-রাজনীতিহীন একটা স্পিরিচুয়াল ভারতনগরী গড়বার প্রকল্পটা। জিতেছিল একটা রোগা ছিপছিপে শরীরের স্টিভ-নাসের-ফ্লেমিং-ইনজিদের আকাশে একটুকরো নীলঘুড়িকে লাটাইয়ের সুতো ছেড়ে উড়িয়ে যাবার স্পর্ধাটা।

নেপোলিয়ন কারা? নিঃশব্দের হাহাকার শুনে যারা বিন্দু বিন্দু জলকন্যার সঞ্চয়ীশিখা জাগিয়ে তোলে নীল সিন্ধুর দিগন্ত বিস্তৃত করে তারাই নেপোলিয়ন, যারা আন্ডারডগ জাতির পতাকা এভারেস্টের চেয়েও উঁচু করে গাঁথার স্বপ্ন দেখায় তারাই নেপোলিয়ন, যারা শেষ যুদ্ধে হেরে গিয়েও জিতিয়ে যায় সাহসটাকে তারাই নেপোলিয়ন।
“কাম অন ডেল”-এর রক্তকরবীর শ্লেষকে নিসঙ্কোচে সংহারঔরস, ওয়ান্ডারার্সের ড্রেসিংরুমে হারের মুখেও জিততে চাওয়ার অক্লান্ত খিদে আর বয়কট-গ্রেগদের চোখে চোখ রেখে উত্তর দেওয়ার শিরদাঁড়াটা যতবার পুঞ্জীভূত হয়েছে; ইতিহাস ততবার এক একজন নেপোলিয়ানের নাম লিখে গেছে….বারবার..অক্লান্তভাবে।
নীলজাতির “নীলদিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগলো”র আগেই যে রবিঠাকুর লিখে রেখেছেন— বসন্তে “সৌরভের” শিখা জাগল; ইতিহাস তা অস্বীকার করবে কিভাবে? স্পর্ধার আকাশে হার-জিত তো নিমিত্ত মাত্র। সৌরভের ওড়ানো নীল তিলককাটা ঘুড়িটা আজ নীলসভ্যতা হয়ে উড়ছে আকাশে। কিন্তু জানবেন, সেই ঘুড়ির সুতোতে মাঞ্জা দেবার জন্য আজও ডাক পড়ে একজন সৌরভ গাঙ্গুলির।
ইতিহাস আজও অপেক্ষা করে আছে, কখন তিমিরঘন দেশ থেকে স্বপ্ন দেখাতে উঠে আসবে আরও আরও নেপোলিয়নরা। কারণ নেপোলিয়ন যতবার শেষ যুদ্ধে হারবেন, ততবারই যে তৈরী হবে এক একটা নতুন সভ্যতা। নেপোলিয়নরা স্থায়ী সিংহাসন পায়না। কিন্তু সিংহাসন যেটার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তৈরী করে যায় সেই রাজত্বটাকে।
নেপোলিয়নরা যেদিন চলে যাবে সেদিন ইতিহাসের বইটা থাকবে….থাকবেনা শুধু ইতিহাসটা…