নেড়ে শব্দটির উৎসে যেতে হলে, আমাদের ‘নাড়া’ শব্দটির অর্থ জানতে হবে প্রথমে। নাড়া-র প্রচলিত ব্যবহার আমরা সকলেই জানি, তবে অপ্রচলিত অর্থ অনেকেই জানেন না।
সংসদ বাংলা অভিধানে ‘নাড়া’ শব্দটির অর্থ,- বি. ধান কাটার পর ধানগাছের যে অপ্রয়োজনীয় অংশ জমির মধ্যে থেকে যায়, ধানের গোড়া; খড়-বিচালি।
[বাং. তু. সং. নাল]।
নাড়াবুনে বিণ. বি. ১ নাড়া অর্থাৎ খড়ের বনের লোক; চাষা; ২ (আল.) মূর্খ, অজ্ঞ, অরসিক।
নাড়ামাঠ বি. যে মাঠে ধান কেটে নেবার পর কেবল নাড়া প়ড়ে আছে (‘পোড়ো-জমি-খড় নাড়া মাঠের ফাটল’: জীবনানন্দ দাশ)। ছিল যত নাড়াবুনে হল সব কীর্ত্তুনে/কাস্তে ভেঙে গড়ায় করতাল। — যত সব অরসিক, তারাই কর্তৃত্ব বা প্রাধান্য পেয়েছে।
নাড়া নিয়ে আরও অনেক প্রবাদ আছে। যথা,
‘ধারায় নাড়া টানে, গোদে সাতপুরুষ টানে।’
‘নাড়ার বিবি খাটে যায়, ফিরে ফিরে নাড়ার পানে চায়’।
‘নাড়াবনে কেত্তন’।
‘অতিদীঘলী হয় রাঁড়ী, নির্ধন হয় নাড়ামুড়ী’।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালাভাষার অভিধান-এ নাড়ার অর্থ আছে, কর্তিত ধান্যগাছের ভূমিলগ্ন অংশ; ধান কাটার পর ক্ষেত্রে ধান গাছের গোড়ার যে অংশ অবশিষ্ট থাকে; খড়।
খনার বচনে আছে, ‘মাঘে নাড়া, ফাল্গুনে ফাঁড়া’।
কৃত্তিবাসী রামায়ণে আছে, “গজমুখী ঘর সে ছাউনী সব নাড়া’।”
এই নাড়া শব্দটি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
স্থাননামেও নাড়া আছে। মেদিনীপুরের নাড়াজোল রাজপরিবারের কথা সকলেই জানে। যে জলাভূমিতে ধানকাটা জমির নাড়া পড়ে আছে, তাই নাড়াজোল। কাঁকিনাড়া-র নাড়াও নাড়া থেকে আসতে পারে।
আমাদের দোল উৎসবের আগের দিন যে নেড়াপোড়া অনুষ্ঠান হয়, তা আসলে নাড়াপোড়া। খড়বিচালির কুশপুত্তলিকা তৈরি করে তাতে আগুন দেওয়া হয়। হোলিকাদহন হল এর আসল নাম।
এই নাড়া নিয়ে যারা ব্যস্ত থাকে তারা ‘নেড়ে কৃষক’। তাদের কাজ হল লাঙল দিয়ে জমি চষে ধানের গোড়াগুলোকে একজায়গায় জড়ো করে রাখা। তারপর সেগুলো শুকনো হয় গেলে জ্বালানি হিসেবে সেগুলি ব্যবহার করা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত নাড়া মাঠের মধ্যেই আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ‘মুখে নুড়ো জ্বেলে দেওয়া’ বাগধারাটির সঙ্গেও নাড়া শব্দটির যোগ আছে। মাঠে নাড়া জ্বালানো অবশ্য খুবই নিন্দনীয় কাজ। পরিবেশদূষণের চূড়ান্ত হয় এতে। হরিয়ানা-পাঞ্জাবের চাষীদের নাড়াজ্বালার জের হিসেবে খোদ দিল্লিতে পরিবেশ দূষণ হয়। যদিও সবক্ষেত্রে ধানগাছের গোড়া নয়, গমের গোড়া জ্বালানোও হয়। সেই দূষণ যে কী ভয়ঙ্কর রকমের, তা সংবাদপত্রের পাতায় আমরা দেখেছি।
খড় (বা নাড়া) দিয়ে ঘর ছাউনির কাজ যারা করত, তাদেরও বলা হত ‘নেড়ে মজুর’। প্রবাদে আছে, ‘খাটে মজুর কাটে নাড়া, তার মেগের নথনাড়া’। দাশরথি রায়ের পাঁচালিতে আছে, — ‘খাটি তো মজুর, কাটি তো নাড়া’। গ্রামেগঞ্জে এরকম বহু শ্রমিকের দেখা মিলবে।
মুর্শিদাবাদের বহু লোক বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে খড় দিয়ে ঘরছাওয়ার এই কাজ করত। তারা মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক। খড় দিয় ঘরছাউনির কাজ কমে গেলে তারা ক্রমেক্রমে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করে। ‘নেড়ে’ কথাটির সঙ্গে তাদের এই পেশার যোগসূত্র থাকতেই পারে।
ঐতিহাসিক নীহারঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙালীর ইতিহাস’ গবেষণা গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ‘নেড়ে’ শব্দটি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। নেড়া মাথার বৌদ্ধরা যখন দলে দলে ইসলাম গ্রহন করল তখন ব্রাহ্মণরা উপহাস করে তাদের নেড়ে বা লেড়ে বলে ডাকা শুরু করে। ঘটনাটি শঙ্করাচার্যর সময়ের। বৌদ্ধ বাংলায় তখন ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থান হচ্ছে।
আবার অনেকের মনে বদ্ধমূল ধারণা আছে, হিন্দুদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে পালযুগে মুণ্ডিতমস্তক (ন্যাড়া) বৌদ্ধরা দলে দলে মুসলিমধর্ম গ্রহণ করে। তাই এই ধর্মান্তরিত বাঙালি মুসলমানদের নেড়ে মুসলমান বলে অভিহিত করা হয়। যদিও পাঠান, মুঘল, তুর্কি, সৈয়দ বংশীয় মুসলমানদের ‘নেড়ে’ বলা হয় না।
অনেকে বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের বিশেষ একটি প্রত্যঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে মনে করেন।
আসলে পুরোটাই গোড়ায় গলদ। ধান গাছের পরিত্যক্ত বা অকর্তিত গোড়া বা খড়বিচালি তথা নাড়া-ই যে ‘নেড়ে’ শব্দটির মূলে, সেটা কোনও মতেই অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের দিগগজ ভাষাবিদরা এদিকটা ভেবে দেখলেন না কেন, সেটাই আশ্চর্য।