দক্ষিণে প্রবেশের শুরু মানে বিশাখাপত্তনমে ইঞ্জিন সামনে থেকে ঘুরে পিছনে যাবে আর ট্রেন বিপরীতমুখী হয়ে চলতে শুরু করবে। তার মানে আপনি এইবার দক্ষিণে ঢুকে পড়েছেন। বিশাখাপত্তনমের কিছু পরেই ট্রেন ঝমঝম করে গোদাবরী নদী ব্রীজ পেরোবে। বিরাট আয়তন নিয়ে গোদাবরী বয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে অবশ্য চড়া পড়েছে। তবু সে অনেক গল্প অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে বয়ে চলেছে।
টুনি (Tuni) একটি ছোট্ট স্টেশন। টুনির পর থেকে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। টুনি একটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন আর সুন্দর স্টেশন। স্টেশনের মাঝে অজস্র হলুদ ফুলের গাছ। স্টেশনের পরেই আদিগন্ত সবুজ ক্ষেত। কোথাও সদ্য চষা হয়েছে তো কোথাও মাঠে ধান তুলে নেওয়ার পরে গাছের গোড়া পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেকারণে গোটা মাঠ কালো হয়ে আছে।
ধান জমির পরেই শুরু নারকেল ক্ষেত। কি সুন্দর জ্যামিতিক নক্সায় কি সাযুজ্যে যে গাছের সারি সাজানো যায় তা এখানের ক্ষেত দেখলে বোঝা যায়। আন্নাভরম স্টেশনের পর নারকেল গাছের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। জমিতে জলের ধারে ধারে অজস্র সাদা বক তপস্বী হয়ে বসে আছে। সবথেকে যেটা চোখে পড়ে এখন, আর ভীষণভাবে মন খারাপে আক্রান্ত করে যে, বাংলা শেষ হলে এখন সবুজের দেখা মেলে, মন শান্ত হয়, চোখের আরাম মেলে। আর মনে মনে গুমরে ওঠে একটা কথা, বাংলা আর কত রুক্ষ হবে!

রাতের ট্রেন জার্নি সবসময়ই ভ্রমণপিপাসুর কাছে কাঙ্খিত। রাতের ট্রেন মানে অচেনা আলোয়, অচেনা অনেক জনস্রোতের ভীড়ে নিজেকে আবিষ্কার করে চলা। ভাবুক উড়নচন্ডী মানুষ রাতের জার্নিতে নিজের সঙ্গে পরিচিত হতে হতে এগিয়ে চলেন। এবারে আমাদের সহযাত্রী হলেন মিস্টার যোশুয়া আ্যন্ড ফ্যামিলি। স্বামী স্ত্রী দুই সন্তান, প্রত্যেকেরই উচ্চতা ছফুটের কাছাকাছি। ওনারা তামিল। কলকাতায় থাকেন কর্মসূত্রে — কিছুদিনের ছুটিতে দেশে ফিরছেন। বাংলা ঝরঝরে বলতে পারেন। ছেলেমেয়ে দুটি তামিল আ্যকসেন্টে ইংরাজিতে কথা বলে আর প্রচুর হাসে। নির্মল, নির্ভেজাল হাসি।
দুদিনের পর চেন্নাই এগমোর স্টেশন থেকে আবার সাড়ে তিনঘন্টার ট্রেন জার্নি করে পুদুচ্চেরি। সেই পন্ডিচেরী যার সঠিক নামের উচ্চারণ যে পুদুচ্চেরি যেটা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পে ক্যাবলা টেনিদার সঙ্গে আমাদের শিখিয়েছে। পরিষ্কার ছিমছাম পুদুচ্চেরি স্টেশনে নেমে আগে সামনের একটি ঝকঝকে রেস্টুরেন্টে খেয়ে নেওয়া গেল। কারণ আমাদের ঘর অরবিন্দ আশ্রমের পার্ক গেস্ট হাউসে। সেখানে খাবার পাওয়া যাবে না। সুতরাং পেটের দিকটি শান্ত করে গেস্ট হাউসে এন্ট্রি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। গেস্ট হাউসটি সমুদ্রের ধারে না বলে একেবারে সমুদ্রের ওপরে বলা যায়।

দুদিনের ট্রেন জার্নির ক্লান্তি এক লহমায় কেটে গেল বারান্দা দিয়ে আসা সমুদ্রের ঢেউয়ের আনাগোনায়। দূরে দূরে নৌকো ভেসে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কালো পাথরে সাদা ঢেউয়ের ফেনা। এখানের রেস্টুরেন্টের নাম Study, সত্যিই স্টাডি করার উপযুক্ত স্থান এতটাই নিরিবিলি এবং সুন্দর। পুরোটাই সেল্ফ সার্ভিস। লাঞ্চ বা ডিনার না পাওয়া গেলেও চা কফি স্ন্যাক্স ইত্যাদি একটা সময়ের মধ্যে পাওয়া যায়। রেস্টুরেন্টটি একেবারে সমুদ্রের বালির উপর। বিদেশ থেকে আগত ভ্রমণপিপাসুর থাকার পছন্দের স্থান এই পার্ক গেস্ট হাউস। ফ্রান্স, জার্মান থেকে আগত অনেক মানুষের দেখা মিলল এখানে। অল্পস্বল্প
আলাপও হল।
গেস্ট হাউসের প্রতি ঘরে ঋষি অরবিন্দ এবং মাদারের ছবি রাখা। বারান্দা দিয়ে সমুদ্রের হাওয়া যেন বলতে চাইছে — তুমি যেস্থানে এসেছো, যাঁর কাছে এসেছ, তাঁকে এতটুকু হলেও বোঝবার চেষ্টায় রত হও। বাংলার দুরন্ত বিপ্লবী কেন এতদূরে এসে এই নির্মোহ জীবন বেছে নিলেন-সেটি বোঝো।
গেস্ট হাউসের প্রতি বিল্ডিং এর আলাদা নাম আছে যেমন Jyoti, Grace, Blessing ইত্যাদি। আবার প্রতি রুমের নাম হল Truth, Power, Adoration, Compassion, Care, Bliss, Balance, Delight ইত্যাদি। প্রত্যেক বিল্ডিং এর প্রত্যেক wing এ ভিন্ন ভিন্ন রৈখিক নক্শা আঁকা আছে। যা দিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য প্রতিভাত হচ্ছে। আর আছে ছোট ছোট ফ্রেমে আটকানো শ্রীমা এবং অরবিন্দের নানান অনুভব ও বাণী।
“A step and all is sky and God”
“The light is nearer to us than we think and at any time it’s hour may come.”
“There is a meaning in each curve and line.”
“Pain is in the hand of nature sculpturing men to greatness.”
— Sri Aurobindo.

“The happiness you give makes you more happy than the happiness you receive.”
“Remain firm through the darkness, the light is there and will conquer.”
“Each new dawn brings the possibility of a new progress.”
— The Mother.
যেন প্রত্যেকটি মুহূর্তে সাধারণ মানুষকে তার কল্যাণকর নিজের মুখটিই আয়না রেখে দেখতে বলা হচ্ছে। মনে করিয়ে দেওয়া যে তোমার মধ্যেই এতগুণ রয়েছে, যেগুলি তুমি নিরন্তর কাজ আর প্রাত্যহিক লোভের হাতছানিতে ভুলে রয়েছো। সেগুলোর পরিচর্যা করো।

গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে সামনে সাগরের ঢেউ শুধু ভাঙছে আর ভাঙছে। মসৃণ বীচরোড (Goubert Avenue) ধরে নির্ভাবনায় হেঁটে চলা মানুষের। কোন গাড়ি এই রাস্তায় আপনাকে বিরক্ত করবে না পুরীর মতন। একদিকে বড় বড় পুরোনো বিল্ডিং। কোনটা তে ইতালিয়ান আইসক্রিম, কোনটাতে উদিপীর ইরানী চা, কোথাও আঞ্চলিক হস্তশিল্পের দোকান। কোথাও কোন টানাটানি নেই। দেখুন, কিনতে পারলে কিনুন, নাহলে বেরিয়ে আবার সমুদ্রকে পাশে রেখে হাঁটুন। বীচরোডে যেটি চোখে পড়ে সেটি অনেক স্কুল ছাত্র ছাত্রীদের যোগাসন। তার জন্য একটা স্টেজ ও করা হয়েছে। ভাষা ঠিকমতো বোঝা না গেলেও এটা বোঝা যায় যে এখানে স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ অন্যরকম ভাবনা চিন্তা করা হয়। বীচরোডের ওপরে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি আর উল্টোদিকে পুরোনো লাইটহাউস।

Basilica of the Sacred Heart of Jesusটি পন্ডিচেরীর দক্ষিণ বুলেভার্ডে অবস্থিত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭ ই ডিসেম্বর ১৯০৭ সালে। ১৮ মিটার (৫৯ ফিট) উঁচু এই গির্জাটিতে একসঙ্গে ২০০০ মানুষ প্রার্থনা করতে পারেন। যিশুর পবিত্র হৃদয়ের এই ব্যাসিলিকা হল গথিক পুনরুজ্জীবন স্থাপত্যের একটি প্রাচ্য নমুনা। এটিতে বিরল কাচের প্যানেলে খ্রীষ্ট ও ক্যাথলিক চার্চের সাধুদের জীবনের ঘটনা চিত্রিত আছে। এটি রাত্রি আটটার মধ্যে যেকোন সময় দেখে নেওয়া যেতে পারে।
এছাড়া আরও একটি ফরাসি ক্যাথলিক চার্চ ফ্রেঞ্চ কলোনির মধ্যে অবস্থিত রয়েছে। বীচ রোডের কাছে Dumas street এ অবস্থিত এই ‘OUR LADY OF ANGELS’ চার্চটি ১৭৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর স্থাপত্য অতি মনোরম।

পার্ক গেস্ট হাউসের সামনেই সমুদ্র তীরে রয়েছে MARQUISE DUPLEIX এর মূর্তি। এটি ১৮৭০ সালে স্থাপিত হয়েছে। উনি ছিলেন রবার্ট ক্লাইভের সমসাময়িক। এবং প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৪ই জানুয়ারি ১৭৪২ থেকে ১৫ই অক্টোবর ১৭৫৪ পর্যন্ত ফ্রেঞ্চ ইন্ডিয়ার গভর্নর-জেনারেল ছিলেন। পন্ডিচেরীর সৈকতে বসে থাকলে চোখে পড়ে মাঝ সমুদ্রের মধ্যে অনেক কালো কালো পাথরের মতো। স্থানীয় বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারা যায় যে, ওটা ছিল পুরোনো ফরাসি বন্দর। ডুপ্লে ওখানেই এসে নেমেছিলেন। এখন কালের গর্ভে বিলীয়মান, শুধু কিছু অংশ এখনও মনে করিয়ে দেয় একসময়ের প্রভাব প্রতিপত্তিকে।
পার্ক গেস্ট হাউসের মধ্যে ভীষণ সুন্দর একটা বাগান রয়েছে। মধ্যে একটা ছোট্ট জলাশয়, তার ওপরে সাঁকো, জলাশয়ে লিলি ফুল ফুটে আছে। সারা বাগান নরম ঘাসে ঢাকা। যারা বাগানে বসে বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তারা অনেকেই বাগানের সামনে নিজের জুতো খুলে রেখে খালি পায়ে ঘাসে পা রাখেন, সেটা লক্ষ করেছি। গেস্ট হাউসে যেহেতু বিদেশী পর্যটক বেশি তাই বাগানেও তাঁদের বেশি দেখা যায়। একজন ফরাসি মহিলা ওই বাগানে সকাল থেকে সন্ধের আগে পর্যন্ত নীরবে বাগানের কাজ করে যান। কেউ কথা বললে একটু হেসে আবার কাজে ডুবে যান। বাগানের আগাছা নিজের হাতে তুলে বাগানের পিছন দিকে সেগুলি রেখে আসা, সার দেওয়া, গাছের গোড়ায় খুঁচিয়ে দেওয়া সব তিনি তপস্বীর মত করে যান। দুপুরে শুধু খাবার খেতে যাবার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করেন। পুরোটাই স্বেচ্ছায় করছেন। কেউ ওনাকে বলেননি। “Work done in the true spirit is meditation” মাদারের এই উক্তির জীবন্ত প্রতিমা ওই ফরাসি মহিলা।

বীচরোডের সমান্তরালে আরও চারটি রাস্তা ও তার দু পাশের বাড়িগুলি নিয়ে গড়ে উঠেছে ফ্রেঞ্চ কলোনি। ফ্রেঞ্চ কলোনির শুরুতেই একটি তিনতলা সাদা বাড়িতে তিনটি আঁকা চোখ টেনে নিয়ে যায়। উপরে আইফেল টাওয়ার, মাঝে প্যারিসের ট্যাক্সি আর সব নীচে পন্ডিচেরীর ফেমাস অটো। যেন ফ্রান্সের সঙ্গে পন্ডিচেরীর আত্মিক যোগ বুঝিয়ে দেয়। [ক্রমশ]