নতুন বছর শুরু। পিছুটান যতই থাকুক, একটা বয়সের পর অনেক কিছু অগ্রাহ্য করার অধিকারও মানুষের জন্মায়। তাই গত বছরের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব ফেলে রেখে অনায়াসে নিজেকে বলতে পারা যায় — ওঠো, চলো, পিছনের দিকে আর তাকিও না। অনেক দেওয়া নেওয়া তো হল, এবার শুধু নিজের দিকে তাকাও। মন কতটা পেলে সজীব তরতাজা থাকবে বাড়ির টবের গাছগুলোর মতন এটাও তো ভাবা দরকার। প্রতিদিন জল, সার না দিলে টবের গাছ নিস্তেজ হয়ে পড়ে, ফল ফুল দেয় না। গাছেরও মনমরা ভাব আসে, পাতা দেখলে অনুভব করা যায়। তেমনি নিস্তেজ মনের ছবি ফুটে ওঠে চোখে। গাছের মত মনের যত্ন আত্তি না করলে সে বিকল হয়। আর বিকল মন সতেজ হয় দক্ষিণী বাতাসে। আনমনাও হয় বৈকি।
দ্রাবিড়িয় সভ্যতা পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। একটির পর একটি রাজবংশ এখানে রাজত্ব করেছে। প্রধানতঃ চোল, চেরা, পান্ড্য। এর ফাঁকে ফাঁকে সাতবাহন, চালুক্য, পল্লব, কলভরাস, কদম্ব। দ্রাবিড় শব্দটির অর্থ তিনটি সাগর দ্বারা বেষ্টিত স্থলভাগ। মূলত বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণাঞ্চলে স্বতন্ত্রভাবে দক্ষিণ ভারতীয় সভ্যতা গড়ে ওঠে। অনেক ইওরোপীয় ঐতিহাসিক মনে করেন যে, দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় অধিবাসীগণ বহিরাগত এবং বিদেশ থেকেই তারা নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি দক্ষিণ ভারতে নিয়ে এসেছিল।

গোপালপুর বেলাভূমি
প্রাগৈতিহাসিক যুগে উত্তর ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের সম্পর্ক না থাকলেও মিশর, মেসোপটেমিয়া, প্যালেসটাইন প্রভৃতি দেশগুলোর সঙ্গে সমুদ্রপথে দক্ষিণ ভারতের যোগাযোগ ছিল। এই যোগাযোগ দ্রাবিড় সভ্যতাকে আরও বিকশিত করেছিল সন্দেহ নেই। খ্রীষ্টজন্মের ১২০০ বছর পূর্বে দক্ষিণ ভারতের মধ্য প্রাচ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। সিলভিন-লেভী যথার্থই বলেছেন যে খ্রীষ্টজন্মের বহু শতাব্দী পূর্বেই দক্ষিণ ভারতের বন্দরগুলির সঙ্গে প্রাচ্যদেশের সামুদ্রিক যোগাযোগ ছিল। অনেকের মতে আবার দ্রাবিড়গণ ভারতের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে গমন করেছিল। তামিলদের মধ্যেও এরূপ কাহিনী প্রচলিত আছে যে গুজরাত ও কাথিয়াবাড় থেকে বেরিয়ে এসে দ্রাবিড়গণ দক্ষিণ ভারতে বসতি স্থাপন করেছিল।
এত ইতিহাস এত বর্ণময়তা যার পরতে পরতে সেখানে যাবার জন্য নতুন করে কোন অজুহাতের প্রয়োজন পড়ে না। পড়াশোনা শেষ করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা দক্ষিণে পাড়ি জমায় চাকরির সন্ধানে। আবার রোগের জ্বালায় দক্ষিণে পাড়ি দেয় অনেক বাঙালি। শুধু বাঙালির জন্যই ওরা বাংলা বলতে না পারলেও বুঝতে শিখে গেছেন। দক্ষিণে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাবার জন্য ও মানুষ দলে দলে এখানে আসেন। এইবার চিকিৎসার ফাঁকে ফাঁকে চলে সুন্দর স্থানটি যতটুকু দেখে নেওয়া যেতে পারে তার পরীক্ষা।
উড়িষ্যা শেষ হচ্ছে মানেই দক্ষিণে প্রবেশ। এই ঠিক অন্ধ্রে ঢোকার মুখে রয়েছে ছবির মত গোপালপুর। এখানে যেতে গেলে ব্রহ্মপুরে নেমে গাড়ি নিয়ে যেতে হয়। ভীড়ভাট্টাহীন সোনালী বেলাভূমি একা পড়ে থাকে সূর্যকে মায়ায় জড়িয়ে। নীল সাগরের দামাল ঢেউ একটার পর একটা আছড়ে পড়ে বেলাভূমিতে। সীগাল পাখিগুলি চিৎকার করে ওড়াউড়ি করতে করতে বেলাভূমিকে একবার সূর্যের একবার সমুদ্রের খবর এনে দেয়। সুন্দরী বেলাভূমি আরাম করে এপাশ থেকে ওপাশে ফিরে সে বার্তা শোনে আর মুচকি হাসে। দুটি প্রবল পুরুষের হৃদয় উদ্বেলিত করতে কোন নারীর না ভাল লাগে!

তারাতারিণী কালীমায়ের মন্দির।
গোপালপুর বেলাভূমিকে ছেড়ে ভিতরে ঢুকলে অনেক মন্দির স্থাপত্য মন কাড়বে। তবে কোন মন্দিরই বিশালত্বে মহান নয়। ছোট ছোট মন্দির অসাধারণ না হয়ে ও আপন করে নেবে। আছে ছোটখাটো পাহাড়। রোপওয়ে। রোপওয়ের মাথায় তারাতারিণী কালীমায়ের মন্দির। ছোট্ট কিন্তু সুন্দর। আছে লাইটহাউস।
এবারে গোপালপুরের মোহ কাটিয়ে ঢুকে পড়া যাক অন্ধ্রের বিশাখাপত্তনমে। পাহাড় সমুদ্রে নিজেকে সাজিয়ে সে বসে আছে। একটির পর একটি মন মাতানো বীচের সমাহার এই বিশাখাপত্তনমে। প্রতিটি বীচ রূপে মাধুর্যে আলাদা। রামকৃষ্ণ বীচের সৌন্দর্য আর ঋষিকোন্ডা বীচের সৌন্দর্য একেবারে আলাদা। আবার ভিমলিপত্তনম বীচ আরো অন্যরকম। রামকৃষ্ণ মিশনের কারণে মনে হয় রামকৃষ্ণ বীচের নামকরণ হয়েছে। বীচের ধারে রয়েছে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের আদলে একটি মন্দির। এছাড়া সাবমেরিন, মছলিঘর, চিড়িয়াখানা, কৈলাসগিরি, টোটলাকোন্ডা, সীমহাচলম মন্দির এখানে দ্রষ্টব্য। এছাড়া পাশাপাশি তিনটি পাহাড়ে কনকদুর্গা মন্দির, মসজিদ ও গির্জা বিশাখাপত্তনমকে অন্য জায়গার থেকে স্বতন্ত্র করেছে।

ভিমলিপত্তনম বীচ
এখান থেকে আরাকুভ্যালির ট্রেনের জার্নি অত্যন্ত মনোরম। বোরা কেভস এখানে দর্শনীয় স্থান। ব্রডগেজ ট্রেন লাইনের সর্বোচ্চ (সমুদ্র পৃষ্ঠা থেকে ৯০০ মিটারের ও বেশি উঁচু) স্টেশন হল আরাকু। উপতক্যাটি অত্যন্ত সুন্দর। গোস্তানি নদীর উৎসস্থল অনন্তগিরি পাহাড়। চুনাপাথরের ওপর দিয়ে এই নদীর বয়ে যাওয়ার জন্য স্ট্যালাকটাইট ও স্ট্যালাগমাইটের আকৃতি পরিবর্তিত হয়ে বিভিন্ন মূর্তির রূপ ধারণ করেছে। যেমন শিব পার্বতী, মা ও শিশু, গাভী, কুমীর, মানব মস্তিষ্ক, বসে থাকা মানুষের মূর্তি।
দক্ষিণ ভারতের যত ট্রেন সব এই বিশাখাপত্তনমে এসে ইঞ্জিন উল্টোদিকে লাগে এবং ট্রেন বিপরীত দিকে চলতে শুরু করে। এটাই দক্ষিণে ঢোকার নিয়ম।

গোস্তানি নদীর উৎসস্থল অনন্তগিরি পাহাড়
কৃষ্ণা ও তুঙ্গভদ্রা নদীর দক্ষিণাঞ্চল সাধারণত দক্ষিণ ভারত নামে পরিচিত। মৌর্যযুগের পূর্বেই আর্যাবর্তের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বৈদিক যুগের শেষভাগে আর্যগণ বিন্ধ্য পর্বত অতিক্রম করে দক্ষিণ ভারতে প্রবেশ করতে থাকে। কিংবদন্তি অনুসারে আর্য ঋষি অগস্ত্য তাঁর স্ত্রী, শিষ্যবর্গ ও বহু কৃষক নিয়ে সর্বপ্রথম বিন্ধ্য পর্বত অতিক্রম করে দক্ষিণ ভারতে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এ থেকেই অগস্ত্য যাত্রা মিথের সৃষ্টি। তিনি দক্ষিণে এসে আর ফিরে যাননি। রামায়ণে দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে যবদ্বীপ (জাভা) ও সুমাত্রার উল্লেখ পাই। মহাভারতে সুদূর দক্ষিণের পান্ড্য রাজ্যের উল্লেখ আছে। গ্রীক লেখকদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে অতি প্রাচীন কাল থেকেই পান্ড্য দেশের সঙ্গে আর্যাবর্তের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। [ক্রমশ]
ঝরঝরে বর্ণনা।
পরবর্তী কিস্তিগুলোর জন্য অপেক্ষা রইল
অনেক ধন্যবাদ
ঝরঝরে বর্ণনা।
পরবর্তী কিস্তিগুলোর জন্য অপেক্ষা রইল
খুব ভালো লেখা ।
আর একটু বিশদে এই বিষয়ে লিখবেন । তাতে আমাদের আরো আনন্দ হবে ।
অবশ্যই চেষ্টা করবো। অনেক ধন্যবাদ ????
খুব খুব ভালো লেগেছে আর বাকি টা
ভাল লাগল। আরো দক্ষিনের প্রতীক্ষায় আছি।
সঙ্গে থাকুন। ধন্যবাদ
খুব তথ্যসমৃদ্ধ এবং ভাবসমৃদ্ধ লেখা। বই আকারে কোনোদিন প্রকাশ হবে , এই আশা রাখি। লেখনী অপ্রতিরোধ্য। শুভ কামনা নিরন্তর।
খুব ভালো লাগলো। আরও পড়ব।
অনেক শুভেচ্ছা