| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সৌরভ হোসেন-এর ছোটগল্প ‘যে শহরে একদা বাঙালি ছিলেন’

Reporter
সৌরভ হোসেন / ৫৭৩ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০২৩

রাস্তা কিছুটা ফাঁকা হতেই পা বাড়াল কছিম। আর অমনি বাপের হাত ‘খপ’ করে ধরে মারল টান আবু। চোখ পাকিয়ে বলল, “মরবে নাকি?” লাঙল যেভাবে কাদাতে পুঁতে গিয়ে থ হয়ে যায় কছিমও তেমন থ বনে গেল। আবু মুখ ভেংচে বলল, “এটা শহর। নিয়ম মেনে রাস্তা পার হতে হয়। ওইখানে চলো। “আবু জেব্রা ক্রসিংটা দেখাল। একেবারে হুবুহু জেব্রার গায়ের দাগ। যেন রাস্তার ওপরে জেব্রার গায়ের চামড়া খসিয়ে পেতে রাখা আছে! চোখ ঢ্যাড়া করে দেখল কছিম। আবু বলল, “রাস্তা এই জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হতে হয়। এটাই শহরের নিয়ম।” বাপের কালে কলকাতা আসেনি কছিম। যদিও তার বাপের বাপ অর্থাৎ ঠাকুরদা কলকাতা এসেছিলেন বহুবার। কছিমের ঠাকুরদা ছাব্দার মিঞা ছিলেন কাশিমবাজারের মহাজনদের গাড়োয়ান। কাশিমবাজারের আড়ত থেকে পাট বোঝাই গরুর গাড়ি নিয়ে যেতেন কলকাতায়। তখন হাওড়াব্রিজ হয়নি। হাওড়াব্রিজ তৈরি হয়েছিল তার বাপ কাসেম মিঞার আমলে। একবার আসব আসব অবস্থা হয়েছিল কছিমের। পরে সেটাও বাতিল হয়ে যায়। সেবার তার পেটের ভেতরে মস্ত বড় একটা টিউমার হয়েছিল। পেটটা লাউয়ের মতো ফুলে থাকত। কছিম বলত, ‘পেটে পটল’। সে টিউমার পেকে গেছিল। বহরমপুর সদর হাসপাতাল কলকাতা রেফার করেছিল। সব ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেছিল। ধার-দেনা বিক্রিবাটাও হয়ে গেছিল। ডুবতলার ধানি জমিটা বন্ধক পড়েছিল। অনেক টাকার ব্যাপার। পরে অবশ্য সব ব্যবস্থাই বাতিল হয়। বহরমপুরের এক বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশনটা হয়ে যায়। অসুখ-বিসুখ ছাড়া কছিমদের মতো লাঙলে-কোদালে মানুষদের আবার কলকাতা শহরে কী কাজ? না কোর্ট-কাছারি না বাজার-ঘাট। পার্টির মিটিং-মিছিলে সাথ ধরলে অবশ্য কবেই কলকাতা দেখা হয়ে যেত। গাঁয়ের মুনসুর লাজেম কাদেররা কতবার ব্রিগেডে এসেছে! ইচ্ছে করলে কছিমও তাদের সঙ্গে আসতে পারত। গলা ফাটিয়ে কলকাতাকে বুঝিয়ে দিত তার উপস্থিতি। কিন্তু ‘দল করা’ তার ধাতে সয় না বলে কোনও দিন সে সীমনায় পা দেয়নি কছিম। অবশ্য আসার আরও একটা ফুরসত ছিল। কছিমের খুউব সখ, হাওড়াব্রিজ দেখার। সে নাকি স্বপ্নে দেখত, হাওড়াব্রিজের ওপর দিয়ে সে হেঁটে যাচ্ছে। আর আসমান থেকে আল্লাহর ফেরেশতারা লোলুপ দৃষ্টিতে বলছে, আমাদেরকেও হাঁটতে সঙ্গ নাও কছিম। খুটিহীন খাম্বাহীন তল ফাঁকা ব্রিজে আমাদেরও যে হাঁটার সাধ জাগে। আবুর মা কুলসুমও বিয়ের প্রথম প্রথম কতদিন বলেছে, চলো গো একদিন কলকাতা বেড়িয়ে আসি। ছেলেপিলে হতে লাগলে আর বাড়ির বাইরে পা ফেলার দোম পাব না। তখন ঘর আর উঠোনই দুনিয়া হয়ে যাবে। শুনেছি, কলকাতায় কত কিছু দেখার আছে! জাদুঘর হাওড়াব্রিজ ভিক্টোরিয়া! স্বামীর বাড়ি আর বাপের বাড়ি ছাড়া তো দুনিয়ার আর কিছু দেখলাম না! চোখের খিদে বলেও তো কিছু একটা থাকে, নাকি? আজ ধান লাগাতে হবে কাল পাট কাটতে হবে পরশু ভুঁই নিড়াতে হবে, এই করতে করতেই কছিমের দিন কাবার হয়ে গেছে। বউকে নিয়ে কলকাতা বেড়াতে যাওয়ার আর সময় হয়নি। কলকাতা তো গোটা একদিনের রাস্তা, সামান্য দেড় ঘণ্টার রাস্তা নবাবদের লালবাগ, তাইই কোনদিন নিয়ে যায়নি কছিম। আবু যখন পাঁচ মাসের পেটে তখন একরকম জোর করেই ভাসুরের বেটা-বিটিদের সাথে পিকনিক করতে গেছিল কুলসুম। হাজারদুয়ারির সামনে দাঁড়িয়ে ফটোও তুলেছিল। সেই ঘরকুনো মাঠকুনো কছিম বেটার সঙ্গে কলকাতা এসেছে। বাপের সখ মেটাতে চায় বেটা। দুই কুড়ি চোদ্দ বছর পুষে রাখা সখ এবার মিটতে চলেছে কছিমের। কছিম হাওড়াব্রিজ দেখবে! বেটার হাত ধরে হাওড়াব্রিজে হাঁটবে! সেজন্যে সে মনে মনে আল্লাহকে শুক্রিয়া জানিয়েছে। তার এই হাওড়াব্রিজ দেখা নিয়ে কুলসুমের কাছে কম খোঁটা শুনতে হয়নি! লোকে মক্কা-মদিনা যাওয়ার নিয়েত করে আর এ কাহানে লোক আবার হাওড়াব্রিজ দেখার সখ পুষে রাখে! এই হাওড়াব্রিজ কি ওকে পরকালে বেহেশতে নিয়ে যাবে?

কুঁজো হয়ে হাঁটছে কছিম। শরীরের ওপর বয়সের ভার যতটা পড়েছে তার চেয়ে বেশি ভার পড়েছে কাজের। কোলকুঁজো হয়ে কাজ করতে করতে কিছুটা কোমর পড়ে গেছে তার। কম খাটনি খাটে না কছিম। সূর্য ওঠা ডোবা দুইই মাঠে হয়ে যায়। দিনে বাড়িতে তার ছায়া পড়ে না বললেই চলে। জলখাবার তো অবশ্যই এমনকি বিড়ি ধরানের উকলি (লুদা)র আগুনটাও মাঠে গিয়ে দিয়ে আসতে হয় কুলসুমকে আর না হয় আবুকে। তার এই কোমর পড়া নিয়ে মশকরা করে কছিম। বলে, মাটির কাছে থেকে থেকে মাথাটা মাটির দিকে ঝুঁকে গেছে। হাজারহোক শরীরটা তো মাটি দিয়েই গড়া? কুলসুম তখন ঠেস মেরে বলে, আসলে মাটি তোমাকে টানছে। শরীরকে দোম না দিলে শরীর এভাবে অল্প দিনেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। কথাটা বলার পর, কুলসুমের মন ভারি হয়ে ওঠে। সে তখন বলে, তোমার হায়াতের ওপর যেন কারও বদ দোয়া না পড়ে! আঁচলে দোয়া পড়ে সে আঁচল রাস্তায় পেতে দেয়।

একটা ফ্লাইওভারের তলায় সেঁধিয়ে গেল। এবার শক্ত করে বেটার হাত ধরেছে কছিম। বেটা বলে দিয়েছে, হাত ফসকালেই হারিয়ে যাবে! কেমন একটা জানফাপড়ানে ঘুটঘুটে জায়গা। প্রথমে নাকো নাকো করছিল কছিম। ফ্লাইওভারের তলা দিয়ে রাস্তা! যদি ফ্লাইওভারটা ভেঙে পড়ে! সে ভেঙে পড়াও তো টিভিতে দেখেছে কছিম। আবু বাপের সে আপত্তি কান করেনি। কন্ঠ গরম করে বলেছে, “তোমাকে অত ভাবতে হবে না। তুমি শুধু আমার হাত শক্ত করে ধরে থাকো তাহলেই হবে।” বেটার কথার ওপরে আর কথা বলেনি কছিম। কলকাতা শহর। কত কিসিমের লোক! কত ফাংড়ির রাস্তা। কছিম শুনেছে, মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাকে কেটে তার শরীরের কলকব্জা বিক্রি করে দেয়! সেসব কিডনি লিভারের মোটা টাকা দাম। কথাগুলো যত তার মাথায় চিনচিন করছে, বেটার হাতটাকে তত শক্ত করে ধরছে কছিম। মাংস ছিঁড়ে গেলেও হাত ছাড়বে না। কছিম এদিক ওদিক বিস্ময়ের চোখ ঘুলিয়ে দেখছে। মনে মনে বলছে, দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে মানুষগুলো কি আর দোকান দেওয়ার জায়গা পায়নি! এই ব্রিজের তলায় পসরা সাজিয়েছে! এত সব মাল কে কেনে? কছিমের মনে পড়ে যাচ্ছে ঠাট্টা করে বলা কথাটা, ‘সিঁড়ির তলায় বিড়ির দোকান’। একবার ফিক করে হাসল কছিম। আবু চোখ টেরিয়ে বলল, “হাসছে কেন? মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?”

“দুনিয়ার কিত্তি কত!” বলল কছিম। আবু আর কিছু বলল না। ভিড় ঠেলে চলতে লাগল। আবু যতই চেষ্টা করছে দ্রুত হাঁটার ততই পিছন থেকে বাঁধা আসছে। বুড়ো বাপ তার পায়ে পা মেলাতে পারছে না। কলকাতায় এই এক আজব হাঁটা। যে যত দ্রুত হাঁটবে সে তত কম বাঁধা পাবে। ধীরে হাঁটলেই সে এমন পিছনে পড়ে যাবে আর সামনের লোকের নাগাল পাবে না। কিন্তু অত দ্রুত হাঁটা তো কুঁজো কছিমের পক্ষে হাঁটা সম্ভব নয়? তারপরে শুধু হাঁটা বললেই তো আর হাঁটা নয়? হাঁটতে হাঁটতে শহর দেখতে হচ্ছে। মানুষ গাড়ি বাড়ি আরও কত কিছু! মাঝে মাঝে চোখের দৃষ্টি থেকে আকাশ উধাও হয়ে যাচ্ছে। তখন আকাশ ছেয়ে থাকছে বড় বড় বিল্ডিং। কছিম শুনেছিল, বড় বড় শহরে এত উঁচু বিল্ডিং থাকে আকাশ ভেদ করে যায়। সেসবও পরিমাপ করছে কছিমের ছানি পড়া চোখ। সে চোখ আরও ঘুলিয়ে যাচ্ছে। আর মনে মনে আসমানের আল্লাহকে শুকরিয়া দিচ্ছে, খোদা তোমার সৃষ্টি কত চমৎকার! বিল্ডিঙের মাথায় রাস্তার ডিভাইডারে দেওয়ালে পাঁচিলে যেসব ছবি লেখাজোঁখা আছে সেসব চোখ ফুঁড়ে দেখছে কছিম। শব্দ ভেঙে পড়া নয়, লেখা আর ছবির রূপ বাহার আর রঙের স্বাদ নিচ্ছে কছিম। তাও ইংরেজি আর হিন্দি লেখা সব। বাংলা হলে দাঁত ভেঙে জিভ ভেঙে তাও দু এক লাইন পড়তে পারত। কছিম যুক্তাক্ষরহীন বাংলা শব্দ কিছুটা পড়তে পারে। নাম সহি শেখার সময় ‘স্বাক্ষরতা মিশন’-এ সেসব কিছুটা শিখেছিল ইসমাইল মাস্টারের কাছে। সেই শেষ সেই শুরু। তবে কছিম ঠাহর করতে পারে, কোনটা বাংলা কোনটা ইংরেজি আর কোনটা হিন্দি লেখা। মানুষগুলোর কথাবার্তাও মন পেতে শুনছে কছিম। কী সব বকবক করছে। আগাপাশতলা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ট্রেন থেকে নামার পরেই তার দুনিয়া পাল্টে গেছে। না বুঝছে ভাষা না চিনতে পারছে পথঘাট। হোডিং-ব্যানার ফ্লেক্স-পোস্টারেও যে ভাষা জ্বলজ্বল করছে সেখানেও কছিম অন্ধ। চোখ থাকতেও অন্ধ। চেনা বলতে গেলে কিছু ছবি। নেতা-মন্ত্রী আর সিনেমার নায়ক-নায়েকাদের ছবি। তবে হালের গুলো নন। একটু পুরোনো। একটু সেকেলে। আর একটা জিনিস তার খুব চেনা মনে হল। সেটা হল আযান। ফ্লাইওভারের পাশে যে মসজিদটা আছে আযানটা সেখান থেকে ভেসে এল। আসরের আযান। ব্যাপারটা তার মুছা হাজির মতন হল। মুছা হাজি আরব দেশে হজ্ব করতে গিয়ে শুধু নাকি এই আযানটাই বাংলায় শুনেছিল! বাকি সব আরবি! মুছার কথা শুনে সে কি হাসি! সবাই তাকে ঠাট্টা করত, হজ্ব করা কালিন মাথা নাড়া করার সময় চুলের সাথে সাথে বুদ্ধিগুলোও চলে গেছিল। কছিম অবশ্য মাথা নাড়া করেনি। তবে তার মাথায় একটা মস্ত বড় টাক আছে। সেটা তার বাপ-ঠাকুরদার অবদান। যে কটা চুল উলুথুলু হয়ে আছে সেগুলোও উঠব উঠব করছে। যেন মাথায় রসুনের শিকড় গজিয়েছে। কিম্বা জাগ হওয়া পাট ছাড়ানোর ঝাঁপানে লেগে থাকা ক্যাজোরি(জট বাঁধা) বাঁধা ফেঁসো। কোনদিন চিরুনি পড়ে কোনদিন পড়ে না। তবে নিয়ম করে গায়ে সরষের তেল পড়ে। পিঠ-হাত-পা সে ঘানির তেলে জবজব করে। সে তেল এক-আধদিন মাথায়ও দেয় কছিম। ফেঁসো চুল চুকচুকে হয়।

মেইন রোডে উঠল দুজন। বাপ কছিমকে হন্যে হয়ে কিছু একটা খুঁজতে দেখে আবু জিজ্ঞেস করল, “কী খুঁজছ?”

“যা খুঁজছি তা তো পাচ্ছি নে!” চোখগুলো আকাশচুম্বী বহুতলটার দিকে পুঁতে রেখে বলল কছিম। আবু বলল, “বাড়ির জানালা? ওসব শহরের বাড়িতে থাকে না। সব কাঁচ। আর এসি।”

হাওয়া কোন দিক দিয়ে ঢোকে? জানালা খোঁজার ব্যাপার হলে কছিম নির্ঘাত এই প্রশ্নটাই করত। কিন্তু তার মাথায় তো সেসব ঘুরছে না। জানালাগুলো খোলা-বন্ধ হয় না শুধুই শো? হাওয়া লাগে না তো ঘরের ভেতরে গাছ লাগানো আছে না নেই? মেঘগুলো বিল্ডিঙের ওপর দিয়ে যায় না ভেতর দিয়ে যায়? অত উঁচু ঘরগুলো সূর্যের তাপ সহ্য করতে পারে? পাখিগুলো ওড়ার সময় বাঁধা নিশ্চয় পায়? আসলে ওগুলো মানুষের ঘর না পাখির বাসা? এসব কিছু কছিম এখন খুঁজছে না। তবে সে কিছু একটা খুঁজছে। কছিম বলল, “না না ওসব কিছু নয়।”

“তাহলে?” ভ্রূ কপালে তুলল আবু। কছিম বলল, “খুঁজে পেলেই বুলচি।” লোকটার মাথা এবার গেছে। শেষে না হাওড়াব্রিজে না নিয়ে গিয়ে মেন্টাল হসপিটালে নিয়ে যেতে হয়! মনে মনে বিড়বিড় করল আবু। বাপের ওপর সে খচে লাল। বুড়ো আবড় বাপকে হাওড়াব্রিজ দেখাতে নিয়ে আসার ঠ্যালা সে ঠারেঠারে বুঝছে। একটা সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে নামতে লাগল আবু। কছিম বেটার হাত টেনে ধরল। বলল, “কুথায় যাচ্চিস!”

“মেট্রোয়।” আবু বলল। “মানে পাতাল রেল!” চোখ কপালে তুলল কছিম। আবু ঘাড় হেলিয়ে বলল, “হ্যাঁ।” পাতাল রেলের কথা শুনে ভেতরে নাচন শুরু হয়ে গেছে কছিমের। কছিম জানে, বড় বড় শহরে একই রাস্তায় তিনটে রাস্তা। একটা পাতালে একটা জমিনে আরেকটা জমিনের ওপরে, যেটা হল ফ্লাইওভার। পাতালসিঁড়ি দিয়ে বেটার হাত ধরে নামতে নামতে ছুকছুক করে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল কছিম। মাঝেমাঝেই বেখেয়াল হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটায় বিরক্ত হয়ে উঠছে আবু। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতেই ‘হুউস’ করে একটা মেট্রো চলে গেল! কছিমের চোখে তখন অপার বিস্ময়। পরক্ষণেই আরেকটা মেট্রো এসে দাঁড়াতেই কছিমের ভেতরে তুর্কি নাচন শুরু হয়ে গেল। সে জীবনে প্রথম পাতাল রেলে চড়বে! খুশি আর বাগ মানছে না। আবু বাপটাকে শক্ত করে ধরে মেট্রোয় উঠল। মেট্রোর ভেতরেও এক অন্য দুনিয়া। সে দুনিয়া উপভোগ করার বদলে কছিম হারিয়ে যাওয়া সেই জিনিসটাকে খুঁজতে লাগল। এই মানুষের ঠোঁটে কান পাতে তো মানুষের চোখের ভাষা ঠাহর করার চেষ্টা করে। কথা কান দিয়ে গিলে। মেট্রোর দেওয়ালের লেখাগুলোয় ধেড়িয়ে তাকায়। উসখুস উসখুস করে। আবুকে কিছু একটা বলার জন্যে নিশপিশও করে। কিন্তু বেটার মেজাজ দেখে মুখ ফুটে বলতে পারে না। আবু এমনিতেই বাপের ওপর চটে আছে। তারপর বাপের আজব কথা শুনে সে মাথাটা না বিগড়ে যায়! তবে মেট্রোটা চলতে দেরি হওয়ায় কছিম জিজ্ঞেস করল, “কখন চলতে শুরু করবে রে?” কছিমের কথা শুনে আশেপাশের লোকগুলো ঠোঁট টিপে হাসলেন। কেউ কেউ আবার চোখ ফেড়ে কছিমকে জরিপ করলেন। তারপর নিজেদের মধ্যে বিদ্রূপ চোখাচোখি করলেন। আবু এবার গলা খেঁকালো না। চোখও গরম করল না। সে ঠাহর করল, বাপের অজ্ঞতা। ফিসফিস করে বলল, “ট্রেন চলছে। আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে নেমে যাব।” ট্রেন চলছে! কই, কিচ্ছু বুঝতে তো পারছি নে? গা-হাত-পা তো নড়বে নাকি? কছিম ভুলেই গেছে মেট্রোটা চলার সময় একটা হাল্কা ঝাঁকুনি দিয়েছিল। দাঁড়িয়ে থাকলে সে ঝাঁকুনি টের পেত। উঠেই সিট পেয়ে গেছে বলে অতটা বুঝতে পারেনি কছিম। আরেকটা জিনিসও অবাক লাগছে কছিমের। মেট্রোর ভেতরের ঘোষণা। এই একবার বলছেন, ‘আগলা স্টেশন কবি সুভাষ’ একবার বলছেন ‘উত্তম কুমার আ রা হা হে’ তো পরের বার ঘোষণা দিচ্ছেন ‘আগলা কবি নজরুল আয়ে গি’! কবি সুভাষের নাম না শুনলেও উত্তম কুমার আর কবি নজরুলকে চেনে কছিম। কিন্তু তাঁরা তো কবেই মরে ভূত হয়ে গেছেন! তাহলে এই মেট্রোয় কী করে উঠবেন! তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে কছিমের। তার মনে খটকা বাঁধছে, এ কোন জায়গায় এলাম! সব কিছুই ভূতের কারবার মনে হচ্ছে! ফিসফিস করে কথাটা বলেই ফেলল আবুকে, “হা রে আবু, উত্তম কুমার কবি নজরুল এঁরা তো কবেই মরে গেলচেন, তাহলে এখানে আবার কী করে আসচেন?” আবু এবার মুখ ভেংচাল। দাঁত কচমচ করে বলল, “চুপ করো। অত বকতে হয় না।” কিন্তু কছিম চুপ করল না। চোখ বড় বড় করে বলল, “কিন্তুক মরা মানুষ কী করে উঠে আসবে?” রাগে আবু গজগজ করছে। মন বলছে, আবাং বাপটাকে কলকাতায় এনে কেন যে পাপ করতে গেলাম! কোনও কিছুর ছিরি থাকবে না। চোখ টাটিয়ে আবু বলল, “এগুলো সব স্টেশনের নাম। ওঁদের স্মরণে নাম রাখা হয়েছে।” “ওহঃ ব্যাপারডা এবার বুঝনু। যেমন মানুষের নামে রাস্তার নাম থয় তেমন ইস্টিশানের নাম।” ঠোঁটে একটা স্বস্থির হাসি কছিমের। সাউন্ড বক্সে যেই শুনল, ‘আগলা স্টেশন ময়দান আ রা হা হে’ অমনি আবু বলল, “আব্বা ওঠো। নামতে হবে।” ধড়ফড় করে উঠল কছিম। কব্জার মতো করে বেটার হাত চেপে ধরল। তার ভয়, যদি হাত ফসকে নামতে না পারি তাহলে হারিয়ে যাব! আর একবার এই শহরে হারিয়ে গেলে আর বাড়ি ফেরা যাবে না এ জনমে। বেটার হাত ধরে নামল ঠিক কছিম। কিন্তু ফ্যাঁকড়াটা বাঁধল ওপরে ওঠার সিঁড়িতে এসে। কোনমতেই চলন্ত সিঁড়িতে উঠবে না কছিম। সে রীতিমত আঁতকে উঠছে। চোখ-মুখ কেমন করে বলছে, “আমি এতে চড়তে পারব না। মাথা ঘুরে পড়ে যাব। ফাঁকে পা ঢুকে যাবে।” আবু বেচক্করে পড়ল। গেঁয়ো বাপকে নিয়ে তার বেইজ্জত না হয়ে যায়! আবু যতই বলছে, “ভয় নেই। আমি তো আছি”, ততই হেলে উঠছে কছিম। কোনমতেই পা তুলছে না সিঁড়িতে। তার কপালে ছোপ ছোপ ঘাম। চোখগুলো কেমন ঘুল ঘুল করছে। কিন্তু উঠতে তো হবেই। আগে তাও তো পায়ে ওঠা সিঁড়ি থাকত। এখন সেটাও নেই। উঠতে হলে এই চলন্ত সিঁড়ি দিয়েই উঠতে হবে। আবু ঠান্ডা মাথায় কছিমকে বোঝাল। কছিম বুঝল না বুঝল আবু তাকে বগলে সেঁধিয়ে ধরে উঠে পড়ল সিঁড়িতে। বেটার কাঁধে ভর দিয়ে উঠতে লাগল কছিম। সে দৃশ্য দেখে খিলখিল করে হাসল অনেকেই। কেউ কেউ টিটকেনিও কাটল। আবার কেউ সহানুভূতিও দেখাল। কেউ একজন বলল, “এ পুত্র বেহেশত যায়ে গি। এ হি তো হে বাপ-বেটা কা সহি রিলেশন?” বেহেশত যাবে না দোযখ যাবে সেটা পরকালের ব্যাপার আপাতত ইহকালে হাওড়াব্রিজ যেতে হবে। বাপের সে সখ মেটাতে না পারলে বেটার যে মরেও সুখ নেই সেটা বুঝেছে আবু।

সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে যেই আকাশ দেখতে পেল কছিম অমনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বুকে একটা স্বস্থির শ্বাস নিয়ে বলল, “বাপ রে বাঁচনু! কীসের গলিতে যে ঢুকে গেছুনু!”

“কেন, কলকাতা দেখবে দেখো?” ঠেস মারল আবু। “এটা কলকাতা?” আজব প্রশ্ন করল কছিম। আবু রেগে বলল, “না, লন্ডন।”

“লন্ডন না লন্ঠন তা জানি নে, তবে কলকাতা মনে হচ্চে না।” বেটাকে আরও খচানে কথা বলল কছিম। বাপের আচরণে এমনিতেই বিরক্ত আবু। এবার না দুম করে দু চারটে খারাপ কথা বলে দেয়! বাপের এসব ট্যাঁরা-বাঁকা কথা শুনলে গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে আবুর। আবু খ্যাঁক করে উঠল, “তো কী মনে হচ্ছে? বেহেশত না দোযখ?”

“বেহেশত তো নয়ই। তবে দুজখের কিছু কিছু আছে।” যেই বলল কছিম আর যায় কোথায়। আবুর মটকা গরম হয়ে উঠল। আবু গলা বাজিয়ে বলল, “তো তুমি বলতে চায়ছ, আমি তোমাকে দোজখে নিয়ে এসেছি?”

“সে কথা আবার কখন বুলনু আমি? তুই খামোখা দোষ নিচ্ছিস ঘাড়ে।” কছিম এবার বাপ হয়ে উঠল। কুঁজো পিঠ কিছুটা সোজা করে আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য তখন মধ্য গগনে। এই প্রথম সূর্য দেখল কছিম। মাথার খাড়াখাড়ি কোনও বিল্ডিং নেই বলেই সূর্যটা দেখতে পেল। একটু এদিক ওদিক কাত হলেই হয় কোনও বিল্ডিঙে নয় কোনও ফ্লাইওভারে ঢাকা পড়ে থাকে সূর্যটা। দুপুরের সে ঝলমলে রোদ গায়ে পড়তেই ফুরফুরে হয়ে উঠল কছিম। যেন সে আবারও মানুষের দুনিয়ায় ফিরে এল। তার মনে পড়ে গেল, মজ্জমপুর গ্রামের কথা। বিলডাঙ্গার মাঠের বটগাছটার কথা। সেখানেও নিশ্চয় সূর্যটা বটগাছের মগডালে চড়ে আছে? তার মনে পড়ে গেল, কুলসুমের কথা। আবুর মা নিশ্চয় এই রোদে সেদ্ধ ধান শুকোচ্ছে উঠোনে? কছিম ভাবে, একটা সূর্য কত মানুষের কত হিত করে যায়! আল্লাহ মানুষের খিদমতের জন্যে কত কি না বানিয়েছেন! ভাবতে ভাবতে বিড়ির নেশা চেপে বসল কছিমের। এই উড়ুক্কু মনটাও তাই? একটু খেয়ালি হলেই নেশাটা চেপে ধরে। কিন্তু এই প্রকাশ্য শহরে বিড়ি ফুঁকা! পুলিশে ধরে সঙ্গে সঙ্গে জরিমানা করে দেবে। গারদেও ঢুকিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ভেতরটা বড্ড খুই খুই করছে। নেশাটা কটমট করে কাটছে। কোনও আড়াল-আবডাল পেলেও ফুঁক ফুঁক করে দু টান মেরে দেওয়া যাবে। ইচ্ছেটা চাওর দিয়ে উঠছে কছিমের। সাহস করে কথাটা আবুকে বলেই ফেলল কছিম, “আবু, এখেনে কুথাও বিড়ির দু এক টান দ্যাওয়া যাবে না?” এবার চোখ গোলা হয়ে উঠল আবুর। মানুষটা এতক্ষণ হাড়-মাংস চিবিয়ে খাচ্ছিল এবার গারদে ঢুকিয়ে ছাড়বে। মনে মনে বিড়বিড় করল আবু। কিন্তু আবু জানে, বাপের বিড়ির নেশা উঠলে থাকতে পারে না। এত বলেও এই বদ নেশাটা ছাড়াতে পারেনি। ডাক্তারকে দিয়ে বলিয়ে কাজ না হওয়ায় মসজিদের ইমামকে দিয়ে নিষেধ করিয়েও ফল মেলেনি। ঘাড় কাত লোকের ঘাড় কাত’ই থেকেছে। সেসব না হয় গাঁ-গেরাম। কিন্তু এ যে প্রকাশ্য রাজপথ? পুলিশ ঘোরাঘুরি করছে। লুকিয়েছুপিয়েও খাওয়া যাবে না। ‘খপ’ করে কলার ধরে বলবে, ‘ফেল পাঁচশ টাকা জরিমানা।’

“মেঘে পানি হবে মনে হয় রে।” ফট করে বলল কছিম। ‘পানি! এই ধবধবে ফর্সা আকাশে পানি!’ বাপের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল আবু। বাপটা এবার ভুল বকতে শুরু করেছে। আবু জানে, মাথায় বিড়ির নেশা চেপে বসলে কছিম ভুল বকে। পাগলের মতো লম্ফঝম্ফও শুরু করে দেয়। যেভাবেই হোক বাপটাকে একটা বিড়ি টানাতে হবে। গলিগুঁজি কিম্বা বাথরুম-টয়লেট খুঁজতে লাগল আবু। কলকাতা শহরে কোথাও চিড়িয়াখানা জাদুঘর ভিক্টোরিয়া খুঁজব তা না তো বিড়ি খাওয়ার গলিগুঁজি খুঁজতে হচ্ছে! কপাল করে একটা বাপ পেয়েছিলাম বটে। মনে মনে বিড়বিড় করল আবু। যাইহোক অনেক খোঁজাখুঁজির পরে ছাতিমগাছটার আড়ালে একটা ঘিঞ্জি টয়লেট দেখতে পেল আবু। বাপ কছিমকে বলল, “ওখানে ঢুকে খেয়ে নাও।” কটমট করে আরও বলল আবু, “অন্য কিছু করার থাকলেও করে নিও। পেটমেট ঝেরে পরিষ্কার করে নিও।” বেটার ইঙ্গিতটা বুঝতে পাড়ল কছিম। কোনও শব্দ করল না। গডগড করে টয়লেটটার আড়ালে ঢুকে গেল। আবু দেখল, কিছুক্ষণ পরেই টয়লেটের ফাঁকফোকর দিয়ে বিড়ির ধোঁয়া বের হচ্ছে। ধোঁয়া দেখে তার ডিহির মাঠের বাঁশরার ধোঁয়ার কথাটা মনে পড়ে গেল। তখন রমজান মাস। গ্রামের সবাই রোজা উপবাসে আছে। হঠাৎ বাঁশরার ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে! কীসের ধোঁয়া! কীসের ধোঁয়া! সবার চোখে কৌতূহল। শেষে ভেতরে ঢুকে দেখা গেল তার বাপ কছিম রোজা থাকা অবস্থাতেও লুকিয়ে লুকিয়ে বিড়ি ফুঁকছে! সে নিয়ে কি কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি!

বাপ কছিমের বিড়ি খাওয়া শেষ হলে হাওড়া যাওয়ার বাসে চাপল আবু। ওরে ভিড়! ঠেললে ঠেলা যায় না। কোনমতে একটা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ সিট ফাঁকা পেয়ে বাপ কছিমকে বসিয়ে দিয়ে পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল আবু। কছিম চোখ ঘুরিয়ে বাসের মানুষগুলোকে এমনভাবে দেখতে থাকল যেন সে জীবনে কখনও মানুষ দেখেনি! আসলে যতটা মানুষ দেখছে কছিম তার চেয়ে বেশি শুনছে তাদের কথাবার্তা। কেউ বাংলা বলছে না! সবাই হিন্দিতে কথা বলছে! এটা কোথাকার বাস! কলকাতার না দিল্লির? বাসের কন্ডাক্টর লোকটাও ‘ভাড়া দে দো’ ‘ভাড়া দে দো’ করে বকছেন! খালাসি লোকটাও ‘উঠিয়ে’ ‘নামিয়ে’ করে গলা ফাটাচ্ছেন! এবার যতটা দেখা যাচ্ছে বাসের গায়ের লেখাগুলোতে চোখ বোলাতে লাগল কছিম। সব ইংরেজি! বাংলার ‘ব’ও নেই! ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক কাত হয়ে ওদিক কাত হয়ে চারপাশ দেখতে থাকায় আবু বাপ কছিমকে চোখ পাকিয়ে বলল, “কী দেখছ অমন করে?” বেটা খিটখিটে হয়ে উঠেছে দেখেও কছিম মশকরা করল, “তুই আমাকে দিল্লি বেড়াতে নিয়ে এলি!” বাপ কছিমের কথা শুনে আবুর ভেতরটা জ্বলে গেল। চোখ কটমট করে আবু বলল, “ক্যানে, এখানে লালকেল্লা কুতুব মিনার দেখতে পেলে নাকি?”

“তা পাইনি। তবে যা খুঁজছি তাও তো পাচ্ছি নে!” কেমন হেঁয়ালি করে কথাটা বলল কছিম। এই লোকটার সাথে বকাও যা দেওয়ালের সাথে বকাও তাই, বলে চুপ মেরে গেল আবু। দুপুরের মহানগর দেখতে লাগল সে। এই শহর তার কাছে একটু একটু করে চেনা হয়ে উঠছে। এক জীবনে কি এক শহর চেনা যায়? হদ্দিনই তো বদলে বদলে যাচ্ছে শহরের রূপ-রঙ। কাঁধ-পিঠ হাত-পা। কত বাহারি হচ্ছে পথঘাট অলিগলি। বদলে যাচ্ছে মানুষও। মানুষের ভাষা মানুষের আদব-কায়দা। শাসনের ছড়ি যেমন বদলাচ্ছে তেমনি বদলাচ্ছে তার চরিত্র। তার মেজাজ। বাপটা কিছুটা চুপ হওয়ায় আবু কিছুটা খেয়ালি হয়ে উঠল। চলন্ত বাসে উঠলেই এসব উড়নচণ্ডি ভাবনাগুলো কোথা থেকে উড়ে আসে মাথায়। গগনচুম্বি হালফিলের হোটেলটা পেরোতেই হাওড়া ব্রিজের মাথাটা দেখা গেল। হুট করে সেদিকে চোখ পড়ল আবুর। সেটা দেখিয়ে আবু বাপ কছিমকে বলল, “ওই দেখো আব্বা, হাওড়াব্রিজ।“ কছিম চোখ ফেড়ে দেখল সে রড লোহার কারুকার্য করা মাথাটা। কিন্তু মাথা দেখে আর কী বুঝব? দেখতে হবে তলা। খুঁটি খাম্বাহীন তলা। যে হলহলে তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে আবহমানকালের পুতপবিত্র গঙ্গা। যে নদী তাদের মজ্জমপুর গাঁ ছুঁয়ে আসছে। যে নদীর একটা অংশ তাদের ভূতপূর্ব চাচাতো ভাই আলিমুদ্দিদের ওপার বাংলার নবাবগঞ্জ দিয়ে বয়ে গেছে। যে নদীর ভাসানে দুই দেশেই বন্যা হয়। নদীর পেটে দুই দেশের মানুষেরই ভিটে যায়। সে নদীর ওপরে সেই আশ্চর্য ব্রিজ। যার তলায় কোনও থাম-খুঁটি নেই! অথচ কত গাড়ি-ঘোড়া চলছে! কত মানুষ হেঁটে যাচ্ছে! আনন্দ টগবগ করছে কছিমের। কত বছরের পুষে রাখা ইচ্ছে এবার বাস্তব হবে! নিশ্চয় বেটা আবুর পিঠে হাত রেখে কছিম বলবে, ‘বাপ, তুই যে আমাকে ইহকালের বেহেশত দেখালি রে।’ বাসটা থামতেই ঠেলেঠুলে নামল আবু আর কছিম। এত ভিড় আরেকটু হলে কছিম ছিঁড়েছুড়ে যেত। স্টপিজটা পেরিয়ে তারা যখন ব্রিজের গোড়ায় এল তখন আচমকা কছিম প্রশ্নটা করে বসল, “এটা যে হাওড়াব্রিজ সেটা তো বুঝনু, কিন্তুক এতক্ষণ তুই আমাকে কুন জায়গায় নিয়ে গেলছিলি বাপ?”

“কেন, কলকাতায়?” বলল আবু। “তাইলে বাংলা কই?” আজব প্রশ্নটা করল কছিম। “বাংলা কই মানে!” ভ্রূ কুচকালো আবু। কছিম গড়গড় করে বলল, “কলকাতা তো বাংলার রাজধানী। কিন্তু বাংলা কই এখানে? শুধুই তো ইংরিজি আর হিন্দি! আমি তো কত খুঁজনু কুত্থাও একটা বাংলা পেলাম না!” সারা শরীরে একটা কাঁপুনি অনুভব করল আবু। যেন হাওড়াব্রিজটা মজ্জমপুরের আবাং আবোড় চাষা কছিম মিঞার কথায় হলহল হিলহিল করে কাঁপছে!

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev