দেশের সংবিধান রচনা সম্পূর্ণ হওয়ার পর প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার যে নিশ্চিত হয়েছিল তা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে। এবং তখন দেশের প্রাথমিক প্রশাসনিক যে কার্যাবলী তার মধ্যে অন্যতম ছিল গোটা দেশের ভোটারদের একটি সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করা। উল্লেখ্য আম্বেদকর দেশের নাগরিকদের ভোটাধিকার নিয়ে স্পষ্ট ভাষাতে বলেছিলেন, কোনো অফিসারের খামখেয়ালিপনার জন্য কোনো নাম বাদ না পড়ে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি চালু হওয়া সেই সংবিধান চলতি বছর তার ৭৫ বছর পূর্ণ করেছে আর একই বছর ভোটার তালিকাযর বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ, বিহারে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী অভিযানে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম। প্রসঙ্গত, এ দেশের সংবিধান অনুসারে ভোটার তালিকা প্রস্তুত এবং রক্ষণাবেক্ষণ করে নির্বাচন কমিশন। ভোটারের মৃত্যু, নতুন ভোটারের নাম সংযোজন এমন নানা কারণে ভোটার তালিকাগুলি ক্রমাগত হাল নাগাদ বা আপডেট করা হয়। যদিও সাধারণভাবে কোনো নাম বাদ দেওয়া বা নতুন নাম যুক্ত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার দায়িত্ব নাগরিকের নিজের। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে নাগরিকের বিরূপ ধারণা ও অভিঙ্গতা হওয়ার কারণে এই কাজের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর বর্তায়। কিন্তু দেশের নির্বাচনী ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে দীর্ঘ সময় এবং সতর্কতামূলক কার্যপ্রণালীকে অতি সামান্য সময়ের শেষ করতে হবে। স্বভাবতই সেই কাজ কতখানি নিবিড়ভাবে পরিচালিত হবে সে প্রশ্ন গোড়া থেকেই ছিল।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বিষয়টি সংক্ষেপে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন। সেই আইনের ২১ ধারা ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। লোকসভা বা রাজ্যের বিধানসভার প্রতিটি সাধারণ নির্বাচন বা যেকোনো নির্বাচনী এলাকার উপনির্বাচনের আগে একটি সংক্ষিপ্ত সংশোধন করা হয়। নির্বাচন কমিশন ২৪ জুন, ২০২৫ তার আদেশে উল্লেখ করে যে দ্রুত নগরায়ণ এবং অভিবাসনের কারণে গত ২০ বছরে ভোটার তালিকায় ব্যাপকভাবে সংযোজন এবং বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভোটার তালিকায় দ্বিগুণ নাম থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে। তাই নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে বাধ্য যে শুধুমাত্র নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন গোটা দেশের জন্য একটি বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০০৩ সালে বিহারে শেষবার এসআইআর হয়েছিল। কিন্তু বিহারে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনে ৬৫ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তার মানে দেখা যাচ্ছে সত্তর বছর আগে আম্বেদকর যে আশঙ্কা করেছিলেন সেটি সত্য হল। পাশাপাশি আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করা গেল যে আজকের ভারত থেকে কাদের নাম বাদ গেল। তারা যে মূলত মুসলমান সেটি স্পষ্ট করেই বোঝা গেল, তার সঙ্গে বাদ পড়েছে বিভিন্ন প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষ এবং সব ধর্মের মহিলা।
আরও একটি বিষয় এই আলোচনায় সবাভাবিক ভাবেই এসে পড়ে যে কীভাবে নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্য নির্বাচিত হলেন। প্রসঙ্গত, অনুপ বারানওয়াল (Anoop Baranwal) মামলা, ২০২৩ ২ মার্চ; সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায়ে বলেন, সংসদে নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং দেশের প্রধান বিচারপতি নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্য নির্বাচন করবেন। এই কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, যাতে সংবিধান মেনে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, পূর্ণ স্বচ্ছতা যাতে বজায় থাকে। এবং যাতে কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে, পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং সুষ্ঠুভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চের সেই রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিজেপি সরকার ২০২৩ সালের অগস্ট মাসেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে ও বাইরে বিরোধিতায় কর্ণপাত না করে যে নতুন আইন প্রণয়ন করে তাতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও সরকারের মন্ত্রীসভার একজন অর্থাৎ এই তিনিজন মিলে, প্রধান বিচারপতি নয়, নির্বাচন কমিশনের তিন কমিশনারকে নির্বাচিত করবেন। এবং হলও তাই। কমিশন যাই হোক, প্রশ্ন হল সেই কমিশন কি এমন কোনও প্রক্রিয়াকরণ চালাতে পারে যাতে লক্ষ লক্ষ নাগরিকের ভোটাধিকার নিমেষে ভন্ডুল করে দেওয়া যায়? না সংবিধান বা জন প্রতিনিধিত্বমূলক আইনের লক্ষ্য কোনোদিনই এমনটা ছিল না, আজও নেই। কিন্তু এই কমিশন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এবং বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বিরাট সংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ভারতীয় গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের উপর নির্মম আঘাত করছে। ভোটাধিকার হরণ মানেই অসমের ধাঁচে ডি-ভোটার ক্যাটাগরি তৈরি করা যাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সক্রিয়তায় বাতিল ভোটারদের বিদেশি পঞ্জীভুক্ত আইনের আওতাভূক্ত করে এদেশ থেকে গণহারে খেদাও প্রকল্পএর আওতায় ফেলে দেওয়া। দেশের প্রধানমন্ত্রী সহ তার পাত্র মিত্র এবং দল তো দিবারাত্র অনুপ্রবেশ যে কত ক্ষতিকারক তার স্বরচিত ব্যাখ্যা দিয়েই চলেছে।
প্রসঙ্গত, জন প্রতিনিধিত্বমূলক আইনের কোথাও কি বলা আছে যে পাঁচ বা দশ কিংবা কত বছর পর পর রাজ্য জুড়ে বিধানসভা নির্বাচনের আগেই ভোটার তালিকার ‘বিশেষ সংশোধন’ কর্মসূচি পালন করতেই হবে তা নাহলে নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে করা যাবে না। বরং বলা আছে রাজ্য বা দেশ জুড়ে যদি সাধারণ নিয়মের অন্তর্ভুক্ত সংশোধনী না হয়, তাহলেও নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে হবে। তাহলে ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বিষয়টি ঠিক কী অর্থ বা মাত্রা তৈরি করছে? ১৯৫০ সালের জন প্রতিনিধিত্ব আইনের ধারা ২১-এর যে তিনটি উপধারা আছে তার তিন নম্বর উপধারাতে শুধুমাত্র ‘বিশেষ সংশোধনী’ করার কথা বলা আছে। কোথাও ‘intensive’ বা নিবিড় কথাটির উল্লেখ নেই। বরং উপধারাতে স্পষ্ট বলা আছে, বিশেষ সংশোধনী শুধুমাত্র একটি কেন্দ্রে বা সেই কেন্দ্রের অংশে হতে পারে, সমগ্র রাজ্যে নয়। তার মানে নির্বাচন কমিশন জেনে বুঝে সংবিধান বিকৃত করছে। বিশেষ উদ্দেশ্য বা সবার্থেই করছে। এবং সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত পথেই করছে বিজেপির এজেন্ডা পূরণের কারণে।