কয়েক হাজার বছর ধরে গুপ্তচরেরা এই পৃথিবীতে তাদের কাজ কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। গুপ্তচর বৃত্তিরও বয়স কম করে কয়েক হাজার বছর তো হবেই। গুপ্তচরেবং সেই বৃত্তি সংক্রান্ত প্রথম বই পিং ফা বা আর্ট অব ওয়ার। বইটি চিন দেশে প্রথম লেখা হয়েছিল ৪৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। সুদূর প্রাচীনকালে গুপ্তচরেরা কাজ করেছিল গির্জার জন্যে, ব্যবসায়ীদের জন্যে। জানা যায় গ্রিক বীর অ্যালেকজান্ডার এমনকি জুলিয়াস সিজারের রাজত্বেও গুপ্তচরের ভূমিকা ছিল।
আধুনিক যুগে গুপ্তচর বললেই প্রথমে ড্যানিয়েল ডিফোর নাম চলে আসে। রবিনসন ক্রুসোর লেখকও ছিলেন গুপ্তচর। শুধু তিনি কেন; একসময় মহিলা গুপ্তচরেরা তো দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছে। কনফেডারেটদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন রোজ গ্রিনহাউ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিলেন মাতা হারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সোভিয়েত এবং মার্কিন ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলার সময়ে গুপ্তচরেরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট, তার ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞান, গুপ্তচর নিয়োগ, তাদের জানা অজানা ঘটনাকে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কয়েকজন লেখক আখ্যানের মোড়কে বেঁধে ফেললেন। যে প্যাকেজে যৌনতা, হিংসা, খুন অর্থাৎ মানুষের নিষিদ্ধ আকর্ষণের বিষয় এমনকি ইতিহাসের ষড়যন্ত্রমূলক ধারাবিবরনীও জায়গা করে নেয় ফিকশন-নন ফিকশনের মিশ্রণে। স্পাই থ্রিলার নামের এই সাহিত্য প্যাকেজটি বিশ শতকের গোড়াতে পাঠক জনমনে বেশ সাড়া ফেলে।
উনিশ শতকের শুরুর দিককার স্পাই নভেল বা থ্রিলারের বিষয়বস্তু ছিল নৈরাজ্যবাদী কিংবা সন্ত্রাসবাদি কর্মকাণ্ড অথবা পর্নোগ্রাফি কিংবা বদ্ধ দরজার ভেতরে অনৈতিক চর্চার গল্প। শুরু হয়েছিল জেমস ফেনিমোর কুপারের দ্য স্পাই: আ টেল অব দ্য নিউট্রাল গ্রাউন্ড থেকে। তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। কিন্তু এটাই প্রথম স্পাই থ্রিলার। উনিশ শতকের শুরুর কয়েক দশক স্পাই থ্রিলার ছিল ব্রিটিশ লেখকদের মনোপলি।
নোবেলজয়ী রুডইয়ার্ড কিপলিং দ্য জাঙ্গল বুক এবং ক্যাপ্টেনস কারেজিয়াস প্রকাশিত হওয়ার পর লেখেন কিম। ১৯০১-এ প্রকাশিত কিম থ্রিলার ফিকশনের একটি মডেল হয়ে ওঠে। প্রায় কিপলিংয়ের মতোই তবে একটু ভিন্নভাবে এর্সকাইন শিল্ডার লেখেন দ্য রিডল অব দ্য স্যান্ডস। প্রথমবারের মতো গুপ্তচরবৃত্তিকে কেন্দ্র কর আধুনিক স্পাই থ্রিলার ট্র্যাজেডি দ্য সিক্রেট এজেন্ট রচনা করেছিলেন জোসেফ কনরাড। তিনি একটা নতুন ফর্ম উদ্ভাবন করেন।

সাংবাদিক কিথ চেস্টারটন খ্যাত গোয়েন্দা উপন্যাসের জন্যই। কিন্তু তাঁর দ্য ম্যান হু ওয়াজ থার্সডে: আ নাইটমেয়ার উপন্যাসে তিনি গুপ্তচরদের ধোঁকা দেয়া ও ডাবল এজেন্টকে দেখান। তখন দুনিয়ায় এ রকম ঘটনা পরিচিত ছিল না। দ্য থার্টি নাইন স্টেপস, গ্রিন ম্যান্টেল, মি. স্ট্যান্ডফাস্ট, দ্য থ্রি হস্টেজ-এর লেখক জন বুকান প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন, তথ্য দপ্তরের পরিচালক ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতাই বুকানকে স্পাই থ্রিলার লিখতে সাহায্য করে। শত্রুর গুপ্তচর নেটওয়ার্কে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ, স্পাই এজেন্টদের তত্পরতা প্রথম তার কাহিনীতে দেখা যায়।
বুকানের উত্তরসূরি ছিলেন এরিক অ্যাম্বলার, গ্রাহাম গ্রিন ও জন লা কারে। এরা স্পাইকে তৈরি করেন জটিল মনস্তত্ত্বের চরিত্র। উল্লেখ্য; গ্রাহাম গ্রিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল দ্য স্পাই’জ বিসাইড বুকস। লিজা অব ল্যামবেথ উপন্যাসের সাফল্যে সমারসেট মম চিকিৎসা ছেড়ে পুরোদস্তুর লেখক হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি রেড ক্রসের অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে কাজ নেন। তার সঙ্গে এক ব্রিটিশ সেনা কর্তা ক্যাপ্টেন জন ওয়ালিঞ্জারের সাক্ষাৎ হয়। তার থেকেই মম স্পাইদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে গুপ্তচর হিসেবে জেনেভা থেকে রুশ বিপ্লবের সময় পেট্রোগার্ডে এসে শেষ করেন কাজ। এই প্রত্যক্ষ জ্ঞান থেকে লেখেন অ্যাশেনডেন অর দ্য ব্রিটিশ এজেন্ট।

আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলা ঠাণ্ডা যুদ্ধ গুপ্তচর এবং ওই পেশা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। ওই সময় ও পরবর্তীতে বিভিন্ন সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তা, সিআইএ এজেন্ট ও স্পাই কর্মীরা আত্মজীবনীর ছদ্মবেশে অসংখ্য স্পাই থ্রিলার লেখেন। উল্লেখযোগ্য নাম ইয়ান ফ্লেমিং, লেন ডেইটন, জন লা ক্যারে। যখন প্রত্যক্ষ যুদ্ধ নেই, আছে জটিল রাজনীতি। একে অন্যকে বিপদে ফেলার প্রযুক্তিগত কৌশল। ওই সময় গুপ্তচররা হয়ে ওঠেন রোমান্টিক হিরো। আর কাহিনি রোমান্টিক অ্যাডভেঞ্চারের চেহারা পেতে থাকে। তবে দুর্দান্ত লোকেশন, যৌনতা আর নানা অ্যাডভেঞ্চারে জেমস বন্ডই হয়ে ওঠেন সেরা।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর গোয়েন্দা ইয়ান ফ্লেমিংয়ের মৃত্যুর পর কেটে গেছে অর্ধশতক কিন্তু জেমস বন্ড বা 007-এর জনপ্রিয়তা কমেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনা বা ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় আরেক ধরনের থ্রিলারের আগমন ঘটে। উল্লেখ্য অ্যালিস্টার ম্যাকলিনের দ্য গানস অব নাভারন, জ্যাক হিগিনসের দ্য ইগল হ্যাজ ল্যান্ডেড, কেন ফলেটের আই অব দ্য নিডল ইত্যাদি। স্পাই থ্রিলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস থেকে ছেঁকে তোলা ফিকশন হলেও সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধ, গুপ্তচরবৃত্তি, যৌনতা, নারী এবং হিংসা ছাড়া সেটা ঠিক জমে না। কারন এই সবকিছুই স্পাই থ্রিলারের বাস্তবতা।