“ও বাদলকাকা এবার পুকুরে জাল ফেললে না ক্যানে গো? ঝাপানের মেলা যে শুরু হয় হয়। পুকুরে মাছগুলো কেমন খলখল করে। রুপুলি রুপুলি ঝিলিক যে কি চোখ টানে, তা মন জানে গো, মন জানে। শুধু ওদের খেলতে দেখলেই ধরবার জন্যে ছটফটিয়ে মরি গো কাকা। তা তুমি এবার জাল ফেললে না ক্যানে গো?”
শ্রাবণের ধারা বিরামহীন। পায়ে চলা সরু পথ সবুজ মাঠের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে পুকুরপার হয়ে কলমীর দলের লকলকে ডগাকে পাশ কাটিয়ে উঁচু নদীর ধার বেয়ে চলেছে তো চলেছেই। এ পথের যেন আদি নেই, অন্ত নেই। আবার এই পথ গিয়ে যেখানে উঁচু নদীর পার বেয়ে নীচু গরানের পানে নামল, চরণ যেখানে কোনো বাধা না মেনে তরতর করে শুধু নদীর প্রবাহিত তরঙ্গের পানে ধায়, ঠিক সেখানে সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে।
পেছন ফিরে দেখলে ধূসর সন্ধ্যা নেমেছে এপারে ওপারে। আকাশের চারদিকে ঘন মেঘের দল ভারী পায়ে এগিয়ে আসছে নদীর পানে। যেন এখনই নদীর জলে নিজের সবটুকু মিশিয়ে দিয়ে সে আপনহারা হয়ে বাঁচবে। এত জলের ভার সে আর সইতে পারছে না। “জল যে মেঘের ধন সম্পত্তি গো! তাও জানো না? তুমি কেমন বোকা মেয়ে গো?” বাদলকাকা পরাণ খুলে হাসে হা হা করে। যে মেয়েটা এতক্ষণ পুকুর, মাছ, জাল নিয়ে কলকল করছিল, সেও এখন চুপ। নয়ন তার আকাশ পানে।
“ওগো পায়ে চলার পথ, অনেক কালের অনেক কথাকে তোমার ধূলিবন্ধনে বেঁধে নীরব করে রেখো না। আমি তোমার ধুলোয় কান পেতে আছি, আমাকে কানে কানে বলো।” পথ হয়ত বা কবির কানে কানে কিছু বলে। কিন্তু এই শ্রাবণের ভরা টলটলে রূপ নিয়ে যে মেয়ে পুকুর নদী আর আকাশ পানে চেয়ে থাকে, সে কি কিছু শুনতে পায়? এমন মেঘলা শ্রাবণ সন্ধ্যায় মেঘ যে একটু পরেই ফতুর হবে নির্দ্বিধায় সে কথা কি বাতাসের কান বেয়ে, বাদলকাকার পাশ ঘুরে আসবে মেয়ের কাছে?
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে বলে। কবি লেখেন তাই যে সে ধরা দেয়। তাই তো এ কথা সত্য হল। তেমনি মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে। কিন্তু এ মেয়ে যে বাঁধা পড়তেই আসে নি। সে এসেছে আগল খুলে বাতাসের ঘূর্ণিপাকে উড়ে যাওয়া পাতার সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিতে। ও যে তার বড় বড় দুটি কালো চোখ বৃষ্টি ভেজা পাখির ডানায় মিলিয়ে দিতে চায়।
মেঘ জমে ভীড় করে এলে তাই কথারা থাকে চুপটি করে। যেন কথা বললেই মেঘের দল এসে বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে ওর ঠোঁটে রাখবে আঙুল, আর বলবে ‘এখন আমি গান গাই, তুমি চুপ করে শোনো। কথা বললে আমার ছন্দ যাবে হারিয়ে। আমার ধন যে আমার বুকের ভিতরে উথাল পাথাল করে শুধু নদীকে গল্প শোনাবে বলে, তা কি তুমি মিছে করে দিতে চাও?’ না এ কোন কবির কথা নয়। এ শ্রাবণী মেঘের কথা, এক আকাশ ভালোবাসার কথা। যে জানে সে জানে, যে বোঝে সে নিজেকে ফাঁকা করে একটু অবকাশ খোঁজে ওই মেঘের ভিতরে।
আজ মেঘলা দিনের সন্ধ্যায় সেই ভিতরের কথাটা কেবলই বন্ধ দরজার শিকল নাড়ছে। এ শুধু কবির কথা নয় গো। এ ওই বাদলকাকার কথা। এ ওই দুরন্ত মেয়ের কথা। ওই যে ছেলেটি যাচ্ছে আলপথে বাঁশি বাজিয়ে, এ যে তারও কথা। শ্রাবণের মেঘ বলে ভিতরে বাহিরে আজ বেড়া ডিঙিয়ে যাওয়ার মহোৎসব। সে মেঘ ডাক দেয় মাঠে, ঘাটে, পথে, প্রান্তরে, আলপথে, নদীর বুকে তো বটেই। আজ তার সমস্তটুকু ঝরিয়ে রিক্ত হওয়ার দিন, আবার পূর্ণ হবারও। ও তোমরা বুঝবে না কেজো মানুষের দল। ও বোঝে বাদলকাকা। ও বোঝে ওই দস্যি মেয়েটি। যাকে তার বাপ হেসে বলে “পাগলি”।
বাদল যখন দস্যি মেয়েকে শুধোয়, “জাল ফেলে মাছ ধরলে তুমি আনন্দ পাও সোনামা? তাইলে ধরব। তোমার বাড়ি দিয়ে আসব।” মেয়ে অমনি তার বৃষ্টির দিনে ডানা ভেজা কালো দুটি চোখ মেলে বলে ওঠে, “না গো কাকা, তুমি অমনি অমনি জাল ফেলবে পুকুরে। রুপুলি রুপুলি মাছ বাদুলে দিনে খলখল করে লাফ দেবে। কালো আকাশের নীচে কালো জলে রুপুলি মাছ যে বড় সুন্দর গো কাকা। তুমি অমনি অমনি আবার তাদের জলে ফেলে দেবে একটি একটি করে।”
অন্য কেউ পাগলি মেয়ের এ কথা শুনে তাকে সত্যিই পাগল বলত। কিন্তু বাদল বলল না। ও যে নিজেও জানে শ্রাবণে এরকম হয়। হতে থাকে। যা বলার নয়, যা চাওয়ার নয়, মন ঠিক সেটাই চেয়ে থাকে। আবার যা দেওয়ার নয়, যতটা দেওয়ার নয়, ততটাই দিয়ে ফেলে ফাঁকা অন্তর আবার নিজে নিজেই পরিপূর্ণ হয়ে বসে থাকে, যেন শ্রাবণের ভরা বাদল মেঘ।
গুরুগুরু ধ্বনি ওঠে আকাশ জুড়ে। একটা রূপালী রেখা এ কোণ থেকে ও কোণ পর্যন্ত এঁকে যায় না বলা কথা। দস্যি মেয়ে শান্ত হয়ে চুপ করে বসে। তাকে আকাশ গান শোনায়। বলে, “আমার অশ্রুও আজ চঞ্চল হয়েছে, দেখতে কি পাও নি? আমার বক্ষ আজ শ্যামল হল তোমার ঐ শ্যামল হৃদয়টির মতো।” হ্যাঁ গো হ্যাঁ, এ সবই কবির কথা। নাহলে ওই দস্যি মুকখু মেয়ের সাধ্য কি শ্রাবণের আকাশকে ধরে!!