বাবা অনিয়মিত গাড়ি চালক। ডাক পড়লে কাজ আছে, না হলে পুরো বসা। মাসিক আয় পাঁচ হাজারের মত। মা গৃহবধূ, পুরোপুরি কর্মক্ষম নন। এমন রোজগারে কষ্টেসৃষ্টে চলা সংসারের মেয়ে উচ্চ-মাধ্যমিকে প্রায় ৮৫% নম্বর পেলে কোন বাবা, মা না খুশী হন! অর্পিতা ব্যানার্জি সেই কাজটাই করে দেখিয়েছে। প্রাইভেট টিউশন না নিয়ে কেবল স্কুলের স্যার ম্যাডামদের সাহায্য নিয়ে ও অসম্ভব কে সম্ভব করেছে। ওর স্কুল দমদম শ্রী অরবিন্দ বিদ্যামন্দির। প্রধান শিক্ষকের ঘরে দাঁড়িয়ে অর্পিতা বলছিল, আমি সাইকোলজি নিয়ে ভবিষ্যতে পড়বো স্যার। আমাকে আশীর্বাদ করুন। সাইকোলজি ? প্রধান শিক্ষক অসীম নন্দকে অবাক করে দিয়ে ও বলল, হ্যাঁ স্যার, আমি যে পরিবেশে থাকি সেখানে কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, বড় হওয়ার ইচ্ছেটাই যেন কম। কেন এমন স্যার, জানতেই হবে আমাকে। অর্পিতারা এক নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে পথ চলে, এ জীবন গতানুগতিক নয়; একটু অন্যরকম তো বটেই। প্রধান শিক্ষক অসীম বাবুও মনে করেন, সত্যিই তো আমাদের সময়ে এমন ভিন্ন চিন্তা করতেই তো আমরা পারতাম না। অর্পিতা নিজেকে নয়, ওর চারপাশ নিয়ে ভাবছে। এই তো আমাদের পরম পাওয়া।
২০২২ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার মেধাতালিকার প্রথম ১০টি স্থানে রয়েছে ২৭২ জন ছাত্র-ছাত্রী। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি স্থানে রয়েছেন ২৫ জন। শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠক করে একথা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। তবে এই ২৭২ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে অনকটাই আমাদের গ্রামবাংলার ছেলে-মেয়েরা রয়েছে।
ওর হাতে উচ্চ-মাধ্যমিকের মার্কশীট। ৮৪ শতাংশ নম্বর পেয়েছে সানন্দা ঘোষ। মার্কশীটটা চোখের উপরে রেখেও কেমন এক বিহ্বল চেয়ে থাকা। কিসে কত নম্বর পেলাম, কেউ বলে দিবি রে? প্রধান শিক্ষক অসীম কুমার নন্দ, শিক্ষক হিমাদ্রি শেখর মুখার্জি, শিক্ষিকা শ্রাবণী ব্যানার্জির চোখে তখন জল। দমদম শ্রী অরবিন্দ বিদ্যামন্দির থেকে এবছর উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সানন্দার এক চোখের দৃষ্টি নেই, অন্য চোখের দৃষ্টিশক্তি পঞ্চাশ শতাংশ মাত্র। এমন প্রতীবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই ওর পথ চলা। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় সানন্দার চোখের দৃষ্টি কমে আসতে থাকে। রেটিনা ডিটেচমেন্টের কারনে দু-চোখেই দৃষ্টি কমতে থেকে। বাবা বারাসতের এক কারখানার সামান্য কর্মচারী। মাসিক আয় সাত হাজারেরও কম। উন্নত চিকিৎসার কোন সুযোগই পায়নি সানন্দা। নাগেরবাজারের লক্ষীনগরের বাসিন্দা সানন্দারা। মা ঘরের কাজ করেন। সেই থেকে শুরু সানন্দার জীবনের অসম এক লড়াই। একসময় সবকিছু যার দৃষ্টিতে পরিষ্কার ছিল, এখন আর তা নয়। তাই হাতে মার্কশীট নিয়ে ওর জিজ্ঞাসা, বলে দিবি রে কিসে কত পেলাম। প্রধান শিক্ষক অসীম কুমার নন্দ বলেন, আমরা যতটা পেরেছি ওর পাশে থেকেছি। সানন্দা আমাদের অবাক করেছে। ওর ভবিষ্যৎ জীবনে পড়াশোনার প্রয়োজনে স্কুল ওর পাশে থাকবে।