| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অবতার বরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ লিখছেন প্রণবেশ চক্রবর্তী

Reporter
প্রণবেশ চক্রবর্তী / ৯৯৫ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৫ মার্চ, ২০২১

শ্রীরামকৃষ্ণের ভাগ্নে হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়। প্রায় সমবয়সী দু’জনেই। হৃদয়ের মা শ্রীরামকৃষ্ণের পিসতুতো বোন। চাকরি খুঁজতে বেরিয়ে হৃদয় এসে আশ্রয় পেয়েছিলেন এই মামার কাছে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে এবং তারপর সুদীর্ঘ তেইশ বছর শ্রীরামকৃষ্ণের একান্ত নিকটজন হিসেবে মামার সেবা করেছিলেন।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে তখন নিত্যই আনন্দসভা। শ্রীরামকৃষ্ণের দিব্য আকর্ষণে কত মানুষ আসছেন। কত মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ। এইসব দেখে-শুনে হৃদয়ের মনেও আধ্যাত্মিক শক্তিলাভের বাসনা ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হতে থাকে। একদিন রাত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের অলৌকিক যোগবিভূতির সাক্ষাৎ পরিচয়ও পেলেন তিনি।

রাত তখনও গভীর হয়নি। শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের যে ঘরটিতে থাকতেন, সেই ঘর থেকে বেরিয়ে উত্তরদিকে পঞ্চবটীর পথে চলেছেন। সঙ্গে ছায়ার মতোই চলেছেন নিত্য-সেবক হৃদয়। হাতে তাঁর গাড়ু ও গামছা—যদি মামার কোন প্রয়োজনে লাগে। শ্রীরামকৃষ্ণ যাচ্ছেন গঙ্গাতীরের নির্জনে পঞ্চবটীর নীচে স্থাপিত তাঁর ধ্যানের আসনে।

সেই অন্ধকারে গঙ্গাতীরের সমান্তরালেই শ্রীরামকৃষ্ণ এগিয়ে চলেছেন। আর সেই অন্ধকারে তাঁর দিকে তাকাতে তাকাতেই পিছনে হৃদয় এগিয়ে চলেছেন। হঠাৎ হৃদয়ের বিস্ময়-বিমূঢ় দৃষ্টির সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, এক দিব্য ঘটনা। হৃদয় চোখের সামনে দেখছেন যাঁকে—তিনি ঠিক তাঁর মামার মতোই—কিন্তু কোথায় মামার সেই স্থূল শরীর, কোথায় সেই রক্ত মাংসের দেহ ? এ তো সেই বাহ্যদেহ নয়, নয় পার্থিব কায়া? হৃদয় স্পষ্ট দেখছেন,—এ এক জ্যোতির্ময় দিব্যদেহ এগিয়ে চলেছে তাঁর অগ্রবর্তী হয়ে। আর সেই দেহ থেকে চারদিকে বিকীর্ণ হচ্ছে এক দিব্যরশ্মি। হৃদয় নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না, সংশয়াচ্ছন্ন মনে বারবার ভাবছেন, এ আমি কী দেখছি! তিনি দেখছেন, দিব্যলোকের মতন দৃশ্যমান তাঁর মামার দেহ শূন্যপথে এগিয়ে চলেছে। সেই আশ্চর্য জ্যোতিঃপুঞ্জ অবয়বের পা দুটি মাটি স্পর্শ করছে না।

একবার দু’বার নয়, হৃদয় বারবার লক্ষ করলেন ভাল করে। ভাবলেন, সবই কি চোখের ভুল? ভাল করে চোখ দুটি রগড়ে নিলেন তিনি। কিন্তু যতবার দেখেন, ততবারই তিনি দেখতে পান, শূন্যপথে চলমান যাঁকে দেখছেন, তিনি তার মামা নয়, এক জ্যোতিস্মান তনু। তিনি দু’চোখ ভরে শ্রীরামকৃষ্ণের অলৌকিক রূপ দেখতে থাকেন। এমন রূপ যে দেখতে পাবেন, তা-ও তো ভাবেননি কোনওদিন।

এরপর ঘটল আরএক অদ্ভুত কাণ্ড। হৃদয়রাম হঠাৎই নিজের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। তিনি লক্ষ করে দেখলেন, এ-ও তো তাঁর অতি পরিচিত নিজের শরীর নয়, এ-ও যে এক দ্যুতিময় কায়া। কোনও দেব-অনুচর বুঝি দিব্যরূপ নিয়েছেন তারই অঙ্গে। এ-যেন অন্য হৃদয়রাম, এ-যেন এক নতুন দিব্যপুরুষ! এবার আনন্দে উল্লাসে তিনি চিৎকার করে মামাকে ডাকলেন, বললেন, ‘চলো চলো! আমরা আর স্থূল শরীর নই। আমাদের এখন দিব্যতনু। চলো, এবার দেশে গিয়ে জীবের উদ্ধার করি!’ হৃদয়ের চিৎকারে শ্রীরামকৃষ্ণ এগিয়ে এসে বললেন, ‘হৃদু চুপ কর। কী হয়েছে যে, এমন করছিস? এমন শুনলে লোকে ছুটে আসবে। সে-এক মহা হাঙ্গামা হবে। হৃদয় তখন আত্মহারা, ভাবের ঘোরে বলে চলেছেন, ‘তুমি যেমন রামকৃষ্ণ, আমিও তেমনি।’

শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর দিব্যজীবনে যাবতীয় যোগবিভূতি ও অলৌকিক শক্তিকে সতর্কভাবে ও সযত্নে আড়াল করে রেখেছিলেন। এক্ষেত্রেও তাই করলেন। পরনের কাপড় ভাল করে বাঁধলেন কোমরে। হৃদয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর তাঁর বুকে ছোঁয়ালেন নিজের হাত। বুকে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘থাক শালা জড় হয়ে।’ হৃদয় আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘কেন মামা আমায় জড় করে দিলে?’ শেষ পর্যন্ত হৃদয় শান্ত হলেন।

কথায় বলে ‘বহতা নদী আর রমতা সাধু।’ তোতাপুরী ছিলেন সেরকমেই একজন রমতা সাধু—পরবর্তীকালে ‘নাঙ্গা বাবা’ যা ‘পাঞ্জাবী বাবা’ নামেও যিনি ওড়িশা অঞ্চলে পরিচিত হন। অদ্বৈত ব্রহ্মবাদী সাধক তিনি—যোগসিদ্ধ মহাতপস্বী। পশ্চিমাঞ্চল পরিক্রমা শেষ করে তিনি এসেছেন দক্ষিণেশ্বরে, যাবেন গঙ্গাসাগরে। তাঁর মনে বাসনা, দক্ষিণেশ্বরে তিনদিন থাকবেন। সময়টা ১৮৬১ সালের শেষভাগ, বা ১৮৬২ সালের প্রথম ভাগ। শ্রীরামকৃষ্ণের বয়স তখন বড়জোর পঁচিশ থেকে ছাব্বিশ। আর তোতাপুরীর (দশসমী সম্প্রদায়ের ‘পুরী’ সম্প্রদায়ভুক্ত) বয়স ষাট থেকে সত্তরের মধ্যে। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রায় একশ বছর পরে—১৯৬১ সালের ১৪ আগস্ট তিনি পুরীর সাধনপীঠ গীর্জরিবন্ত টিলায় দেহত্যাগ করেন। বিশাল দেহী তোতাপুরীর জীবন-রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি।

আমরা শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে দেখি, শ্রীরামকৃষ্ণ একাধিকবার তোতাপুরীকে ‘নেংটা’ নামে উল্লেখ করেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রথম তোতাপুরীকে দর্শন করেন দিব্য-আবেশে, বা অলৌকিক শক্তির সাহায্যে তিনি তখন মা ভবতারিণীর পূজা করছিলেন মন্দিরে বসে—অর্থাৎ পূর্বদিকে মুখ করে বসেছিলেন তিনি, আর পুণ্যসলিলা গঙ্গা ছিল পশ্চিমে, অর্থাৎ তাঁর পিছন দিকে। পূজার আসনে বসে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হল অলৌকিক জ্যোতির্ময় পথে। সেই তূরীয় অবস্থায়, তিনি ভাবনেত্রে দেখলেন, একজন প্রবীণ বয়সী জটাজুটধারী সাধু গঙ্গায় স্নান করছেন। এই সাধুর সর্বাঙ্গ বিভাময়—পরনে কৌপীন মাত্রও নেই, সম্পূর্ণ উলঙ্গ।

এই দিব্যদর্শনের পরই দক্ষিণেশ্বরের অতিথি শালায় তাঁর প্রথম দেখা হল এই সাধুর সঙ্গে। তখনও তাঁর নাম জানেন না তিনি। সেই নাম জানতে পারলেন আরও পরে। সেদিন তোতাপুরী শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কেয়া বাচ্ছা, কুছ সাধন করে গা?’

শ্রীরামকৃষ্ণ সরল চিত্তে উত্তর দিলেন, ‘তা এখনই আমি কিছু বলতে পারছি না। আগে মা-র (মা ভবতারিণী) কাছে তাঁর মতামত নিতে হবে। তারপর বলব।’

মহাযোগী এই উত্তর শুনে বিস্মিত হন। তাই জানতে চান, ‘মা-কে জিজ্ঞাসা?’—কে তোমার মা? শ্রীরামকৃষ্ণ সরল বালকের মতোই মন্দিরে গিয়ে প্রবেশ করলেন তাঁর মায়ের কাছে। মা তাঁকে সম্মতি দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিলেন, এই সাধকের নাম তোতাপুরী। মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের সম্মতির কথা জানালেন যোগীকে এবং এ-কথাও জানিয়ে দিলেন, মা-র আদেশ পেয়েছি, আমি তোমার কাছে সাধনা করব। আরও জানিয়ে দিলেন, তাঁর নাম যে তোতাপুরী—এটা মা-ই বলে দিয়েছেন।

সবকিছু দেখে শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তোতাপুরী—তাঁর নাম এই তরুণ-সাধক জানলেন কীভাবে? তোতাপুরী বললেন, ‘আমি তিনদিন এখানে থাকব। তারপর অন্যতীর্থে চলে যাব।’ এই তোতাপুরীর কাছেই গোপনে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন গদাধর—তিনি গর্ভধারিণী মায়ের মনে কোন কষ্ট দিতে চান না, তাই। রামকৃষ্ণ-অনুসারী রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা ‘পুরী’ সম্প্রদায়ভুক্ত।

তোতাপুরীর কাছেই একটানা তিনদিন নির্বিকল্প সমাধিতে ডুবে রইলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বিনা সাধনায় ও প্রস্তুতিতে এমন নির্বিকল্প সমাধি! বুদ্ধিতে এর বিচার অসাধ্য। এই ‘নেংটা’ সাধু তিনদিনের জন্য দক্ষিণেশ্বরে এসেছিলেন, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের আকর্ষণে রয়ে গেলেন অনেক বেশিদিন। তবে সমস্যা দেখা দিল অন্য কারণে। শ্রীরামকৃষ্ণ যে শ্যামা মা-কে মা বলতেন, শক্তি সাধনায় বিশ্বাসী ছিলেন—তোতাপুরী এসব মেনে নিতে পারতেন না। তাঁর মতে, এসবই ভ্রান্তি। অদ্বৈত বেদান্তী তোতাপুরী মা কালীকে মানতেন না, শক্তি সাধনায় বিশ্বাসী ছিলেন না—তাঁর কাছে সবই ছিল ‘মায়া’।

শেষ পর্যন্ত নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী ঘোর বৈদান্তিক তোতাপুরীকে মাতৃলীলা বা মাতৃমহিমা দেখালেন  শ্রীরামকৃষ্ণ—যা কিনা শেষ বিচারে ছিল তাঁর নিজেরই যোগ-বিভূতি।

দক্ষিণেশ্বরে থাকতে থাকতেই একদিন তোতাপুরী দারুণ পীড়িত হয়ে পড়লেন। পাঞ্জাবী শরীর ছিল তাঁর। এখানকার জল বোধহয় তাঁর সহ্য হয়নি—দেখা দিল ভয়ঙ্কর রক্ত আমাশয়। কোন কিছুতেই রোগের উপশম হয় না। একটানা রোগে ভুগতে ভুগতে তাঁর শরীর জীর্ণ হয়ে গেল, পেরে ব্যথা হয়ে উঠল অসহ্য। যন্ত্রণা এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে, তিনি শেষ পর্যন্ত ঠিক করে ফেললেন, এই শরীর আর রাখবেন না, গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন। ওদিকে শ্রীরামকৃষ্ণ কিন্তু তোতাপুরীর মনোভাব ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন।

একদিন রাত্রে আত্মবিসর্জনের সঙ্কল্প নিয়ে তোতাপুরী গিয়ে নামলেন ভরা গঙ্গার জলে। তিনি তখন দৃঢ়সঙ্কল্প—তাই ধীরে ধীরে এগিয়ে চললেন গভীর জলের দিকে কিন্তু যতই তিনি গভীর জলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, ততই তিনি দেখতে পাচ্ছেন, জল যেন কিছুতেই হাঁটুর উপর আর উঠছে না। যতই মাঝ গঙ্গার দিকে এগিয়ে যান, ততই তিনি একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে থাকেন। ডুব যে দেবেন সেই জলটুকুও তিনি পেলেন না এত বড় গঙ্গায়। একান্ত নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন তিনি।

গঙ্গায় এক অজ্ঞাত রহস্যময় কারণে আত্মবিসর্জন করতে পারলেন না তোতাপুরী, এদিকে তাঁর পেটের অসহ্য যন্ত্রণা বাড়তেই থাকে। চোখের সামনে নিষ্কৃতির অন্য কোনও উপায় না দেখে তিনি তাঁর শিষ্যকে স্মরণ করলেন। এলেন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে, মিনতি করে বললেন, ‘আমাকে বলে দাও, এই যন্ত্রণা থেকে কীভাবে মুক্তি পাব।’

শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ‘শ্যামা মা-কে প্রণাম করে তাঁর কাছে নিরাময় হবার প্রার্থনা করো, তাহলেই হবে।’

তোতাপুরী বুঝলেন, এতদিন তিনি শক্তিকে উপেক্ষা করে ভ্রান্তির জালে জড়িয়ে ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণই তাঁকে সেই ভ্রান্তি থেকে মুক্ত করলেন। তিনি তখনি গেলেন মা ভবতারিণীর মন্দিরে। হাত-জোড় করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন দেবীকে। তারপর যখন মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন, তখনই তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর পেটের যন্ত্রণা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। একটু পরেই বুঝলেন, সেই ভয়ঙ্কর ব্যাধিটা আর নেই। সেদিন থেকেই তাঁর বিশ্বাস হল শক্তিতে, লাভ করলেন পূর্ণজ্ঞান। শ্রীরামকৃষ্ণের অলৌকিক মহিমাই ফিরিয়ে দিল তোতাপুরীর লুপ্ত চেতনা।

এখানে আরেকজন মহাসাধকের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা যেতে পারে—যার জীবনের এক সঙ্কটময় লগ্নে ঘটেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের বিদেহী সত্তার সূক্ষ্ম শরীরী উপস্থিতি। শ্রীঅরবিন্দ সাত বছর বয়সে ১৮৭৯ সালে বিলেতে যান এবং শ্রীরামকৃষ্ণের যখন মহাসমাধি হয়, সেই ১৮৮৬ সালে তিনি লন্ডনেই ছিলেন। সাক্ষাৎভাবে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে কখনও দেখেননি। লন্ডন থেকে তিনি ভারতে ফিরে আসেন ১৮৯৩ সালে এবং তারও ঠিক পনেরো বছর বাদে, অর্থাৎ, শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের প্রায় দুই যুগ পরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন পান।

ঘটনাটা আমরা জানতে পারি চন্দননগরের বিখ্যাত ‘প্রবর্তক সংঘের’ প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী মতিলাল রায়ের বয়ানে। শ্রীঅরবিন্দ চন্দননগরে ছিলেন এই মতিলাল রায়ের তত্ত্বাবধানে। মতিলাল রায় শ্রীঅরবিন্দের মুখে যে-সব বিবরণ শুনেছেন, সে-সবই লিখে রেখেছেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক জীবনসঙ্গিনী গ্রন্থে। মতিলাল লিখেছেন, ‘গ্রে স্ট্রি হইতে পুলিস কর্তৃক ধৃত হইয়া (বোমা মামলায়) একখানি ঠিকা গাড়ি করিয়া তাঁহাকে (শ্রীঅরবিন্দকে) যখন লালবাজার পুলিস কোর্ট আনা হইতেছিল, সেই সময় তাঁহার সম্মুখে ঠাকুর রামকৃষ্ণ সারাক্ষণ বসিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা ও ভরসা দিয়াছিলেন—তাঁহার মুখে এসকল কথাও শুনিয়াছি।’ স্মরণ করা যেতে পারে, শ্রীঅরবিন্দ দেশে ফেরার পর তাঁর স্বদেশ-বাসের গোড়া থেকেই ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ-অনুরাগী, যিনি ‘ভারতের প্রাণপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ’ প্রবন্ধে—লিখেছেন, ‘পাঁচশত বিগত বৎসরের মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের মতো দ্বিতীয় এক পুরুষ পৃথিবীতে আবির্ভূত হননি।’ সেই শ্রীরামকৃষ্ণই এক গভীর সঙ্কটের সময় (মানিকতলা বোমার মামলা) শ্রীঅরবিন্দের সামনে সূক্ষ্মদেহে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীঅরবিন্দকে আশ্বাস ও ভরসা দিতে।

আরেকটা ঘটনার কথা বলি—হয়ত শ্রীরামকৃষ্ণ মহাজীবনে সংঘটিত এরকম আরও অনেক ঘটনার কথাই বলা যায়। কিন্তু সংক্ষিপ্ত পরিসরে সব ঘটনার কথা বলা সম্ভব নয়।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী রানী রাসমণি তখনও বেঁচে আছেন। অর্থাৎ ঘটনাটা ১৮৬১ সালের আগেকার। রানী রাসমণির জামাতা মথুরমোহন বিশ্বাস ১৮৫৭ থেকে ১৮৭১ সাল (তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত) শ্রীরামকৃষ্ণের সেবায় আত্মনিযুক্ত ছিলেন। মথুরবাবুর এই সেবা প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ একবার বলেছিলেন, ‘মথুর যে চৌদ্দ বছর সেবা করে, তা’ কি অমনি করে, তা’ কি অমনি করে ? মা ভবতারিণী তাকে (নিজের শরীর দেখিয়ে) ভিতর দিয়ে নানা প্রকার অদ্ভূত সব দেখিয়ে দিলেন, সে জন্যেই সে এত সেবা করেছিল? একথা থেকেই বোঝা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন যোগ-বিভূতি দেখেই মথুরবাবু এই দরিদ্র ব্রাহ্মণের প্রতি এতটা ভক্তিনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন।

এখানে একটা দিনের কথা উল্লেখ করি। শ্রীরামকৃষ্ণ সেদিন দক্ষিণেশ্বর মন্দির-প্রাঙ্গণে ঘুরতে বেরিয়েছেন। সঙ্গে আছেন মথুরবাবু। চলতে চলতে বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ যেখানে থাকেন, সেখানে তিনি সদাই থাকেন বক্তার ভূমিকায়, অন্যরা শ্রোতার ভূমিকায়। এক্ষেত্রেও তাই।

শ্রীরামকৃষ্ণ মায়ের মহিমা কীর্তন করতে করতে একটা জবা ফুলের গাছ দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর সেই জবা গাছটির দিকে তাকিয়ে মথুরবাবুকে বলতে থাকেন, এই যে জবা গাছ তোমার সামনে, এর মধ্যে কত কারিগরি দেখ। ফুল, পাতা থেকে গুঁড়ি পর্যন্ত কী বিস্ময়করভাবে গড়ে উঠেছে। কত রকমের রঙ তাদের। অথচ প্রত্যেকটি আলাদা। আবার দেখ, এই গাছটিতে লাল জবা ফুটে আছে। কিন্তু মায়ের কি লীলা। তিনি তো ইচ্ছামযী! ইচ্ছা করলেই এই লাল জবার গাছে সাদা ফুলও ফোটাতে পারেন।

এতক্ষণ মথুরবাবু একমনে শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শুনছিলেন। এবার মৃদু প্রতিবাদ করলেন, বললেন,—‘তা কী করে সম্ভব? লাল জবার গাছে সাদা জবা ফুটবে কেমন করে?’

প্রসন্ন হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, —হ্যাঁ গো, মায়ের মহিমায় কোন কিছুই অসম্ভব নয়। তিনি ইচ্ছাময়ী, ইচ্ছা করলে তিনি সবই করতে পারেন। সমস্ত সৃষ্টি যে তাঁরই হাতে।

সেই সময় মহারানী ভিক্টোরিয়ার আমল। সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, এদেশের রানী এখন ভিক্টোরিয়া, তিনি কত আইন করেছেন। আবার আজ যে আইন আছে, কাল ইচ্ছা করলে তিনি তা বদলাতেও পারেন। সে-জায়গায় নতুন আইনও করতে পারেন। এখানেও ঠিক সেরকমই। ইচ্ছাময়ী মা কালীর যা ইচ্ছা, তাই সম্ভব।

মথুর সম্ভবত শ্রীরামকৃষ্ণের এই যুক্তিও মানতে পারলেন না। তিনি বললেন, এ তো দেখছি অদ্ভুত কথা! প্রকৃতির নিয়ম তো চিরদিন একইরকম জানি। তবে আপনার কথা সত্য বলে মানতে পারি, যদি এই লালজবা গাছে সাদা ফুল ফোটে।

সেদিন এই প্রসঙ্গটা নিয়ে আর বিশেষ কথাবার্তা হল না।

ঠিক তারপরের দিনও যথারীতি শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির চত্বরে এসেছেন। সঙ্গে রয়েছেন ‘সেজোবাবু’ মথুর মোহন। অন্যান্য দিনের মতোই শ্রীরামকৃষ্ণ বেশ কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ালেন। তারপর এসে দাঁড়ালেন সেই জবা গাছার সামনে। সেই গাছার ডালে ডালে লাল জবা ফুটে আছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—ওই গাছেরই এক বৃন্তে বিরাজ করছে লাল জবার পাশেই এক সাদা জবা। সেদিকে তাকিয়ে বিস্ময়ের ভান করে লীলাময় শ্রীরামকৃষ্ণ বলে উঠলেন—একি, এক বোঁটাায় লাল সাদা দু’রকম জবাই ফুটে রয়েছে।

শ্রীরামকৃষ্ণের এই বিস্ময়সূচক মন্তব্য শুনে মথুরবাবু তাকালেন ওই জবা গাছার দিকে, তারপর সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করে তিনিও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি মনে মনে বুঝলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ-লীলায় সব অসম্ভবই সম্ভব হতে পারে।

যেমন একদিন সম্ভব হয়েছিল শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যেই শিব ও শক্তির রূপ-দর্শন। সেদিন দক্ষিণেশ্বর কুঠিবাড়িতে বসে ছিলেন মথুরবাবু। আর ওই কুঠিবাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণে শ্রীরামকৃষ্ণের কক্ষ-সন্নিহিত এক বারান্দা—যেটি পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত। কুঠিবাড়িতে বসে ওই বারান্দার দিকে চোখ পড়ল মথুরবাবুর। তিনি দেখলেন, ওই বারান্দায় শ্রীরামকৃষ্ণ আপন ভাবে বিভোর হয়ে এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছেন আর আসছেন। হঠাৎ তিনি স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ যখন পশ্চিমদিকে যাচ্ছেন, তখন তাঁর মধ্যে শিবমূর্তি প্রকাশিত, আবার যখন পূর্বদিকে যাচ্ছেন তখন তার মধ্যে প্রকাশিত কালীমূর্তি। একই দেহে দুই রূপ! এও কি সম্ভব? মথুর ভাবলেন, তারই বুঝি দৃষ্টি বিভ্রম ঘটেছে। কিন্তু চোখ রগড়ে তিনি যতবার দেখছেন, ততবারই সেই একরূপ। এবার তিনি রামকৃষ্ণ-লীলায় অভিভূত হয়ে ছুটে গিয়ে লুটিয়ে পড়লেন লীলাময়ের পদতলে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev