দামোদর, রূপনারায়ণ ও মুণ্ডেশ্বরী নদীতে ঘেরা খানকুল অঞ্চলের নতিবপুর গ্রাম। সেখানকার বসু পরিবারের গৃহ দেবতা শ্রী শ্রী দামোদর জীউ আজও কিংবদন্তি।
বাঙালির সভ্যতা ও সংস্কৃতির রূপ হল প্রাচীন মন্দির ও অন্যান্য দেবস্থান। হুগলী জেলায় ৪৭৮টি ছোট-বড়-মাঝারি ধরণের প্রাচীন মন্দির রয়েছে। এই সব মন্দিরের মাধ্যমে হুগলি জেলার গ্রাম-গঞ্জের প্রকৃতি সহজেই বোঝা যায়। প্রাচীন মন্দির গুলির প্রধান উপকরন—সাধারন ইট, তবে কিছু প্রাচীন মন্দির পোড়া মাটির দ্বারাও নির্মিত। হুগলিতে বিভিন্ন প্রকারের প্রাচীন মন্দির দেখতে পাওয়া যায়—চালা মন্দির, রত্ন মন্দির এবং বাংলা মন্দির। চালা মন্দির আবার দুই শ্রেণির—চার-চালা এবং আট-চালা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুই-চালা বিশিষ্ট মন্দির দেখা যায়। এছাড়া রয়েছে বাংলা মন্দির। এর প্রকার ভেদও দুইরকম—এক বাংলা এবং জোড় বাংলা।
শোনা যায়, কয়েক শত বছর আগে বর্ধমানের মহারাজা হুগলি জেলার খানাকুল অঞ্চলের নতিবপুর গ্রামের বসু-পরিবারের পূর্ব-পুরুষকে তিনশত বিঘা (মতান্তরে সাড়ে চারশত) জমি দান করেছিলেন। মোট ১৯টি পঞ্চায়েত নিয়ে খানাকুল এলাকা। তাকে ঘিরে রয়েছে দামোদর, রূপনারায়ণ ও মুণ্ডেশ্বরী নদী এবং বেশ কিছু শাখা নদী। গ্রামটির অবস্থান দামোদর ও মুণ্ডেশ্বরী নদী দিয়ে ঘেরা একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। এই জমিদারি কোনো ব্যক্তির নামে দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছিল বসু-পরিবারের গৃহদেবতা শ্রী শ্রী দামোদর জীউর নামে। শর্ত ছিল বসুরা জমিদারির সেবায়েত হবেন ও দামোদর জীউর নামে জমিদারির রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। ভরণপোষণের জন্য তাঁদের জমিজায়গা দেওয়া হবে। কিন্তু জমিদারির কোনো অংশ তাঁরা বিক্রয় করতে পারবেন না।
দামোদর শব্দের অর্থ কি? ‘শ্রীমদ্ভাগবতমের দশম স্কন্ধে বর্ণিত লীলাতে শ্রীকৃষ্ণ মাখনের ভাণ্ড ভেঙ্গে মা যশোদাকে ক্রোধান্বিত করেছিলেন। তারপর তিনি ক্রোধিত মা যশোদাকে তার দিকে ধেয়ে আসতে দেখে পলায়ন করতে লাগলেন। অনেক প্রচেষ্টার পর মা যশোদা কৃষ্ণকে ধরতে সমর্থ হলেন এবং একটি উদুখলের সাথে তাকে দড়ি দিয়ে বাঁধার চেষ্টা করলেন। কিন্তু অলৌকিকভাবে প্রতিবার ২ ইঞ্চি করে দড়ি কম পড়লো। তিনি বার বার দড়ি যোগ করলেন এবং পুনরায় বাঁধার চেষ্টা করলেন কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিবারই ২ ইঞ্চি করে দড়ি কম পড়লো। অবশেষে শিশু কৃষ্ণ মা যশোদার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সন্তুষ্ট হয়ে দড়িতে বাঁধা পড়লেন। এরপর থেকে শ্রীকৃষ্ণের একটি নাম হল দামোদর’।
এরপর দীর্ঘদিন কেটে গেছে। বসু-পরিবারের অনেকেই কর্মসূত্রে ভারতের বিভিন্ন স্থানে এবং ভারতের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্তমান বঙ্গ সংস্কৃতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব প্রয়াত শংকরীপ্রসাদ বসু এই পরিবারের সুসন্তান। আর এক কৃতি সন্তান বিশ্বনাথ বসু হাওড়া শ্রীরামকৃষ্ণ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। আঞ্চলিক সূত্রে জানা গেছে, নতিবপুরের বসু-পরিবারের দামোদর মন্দির স্থানীয় মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাসের এক শক্তি-পীঠ। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় (শেষ সংস্কার হয়েছিল ৩৫ বছর আগে) ও অঞ্চলটি বন্যা-প্রবণ হওয়ায় এই মন্দির ধীরে ধীরে ভগ্নপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দেব-মাহাত্ম্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয় না। সেটা সম্পূর্ণভাবে মানব-মনের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার বিকাশের মধ্য দিয়েই পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। তাই বসু-পরিবারের এক প্রবীণ সদস্য প্রদীপ বসুর একান্ত ইচ্ছায় ও পরবর্তী প্রজন্মের সদর্থক আনুকূল্যে নতিবপুরের বসু-পরিবারের শ্রী শ্রী দামোদর জীউর মন্দির নবকলেবরে উপস্থিত। আগামী ১৪ মার্চ, ২০২১, রবিবার, এই মন্দিরের শুভ উদ্বোধন।
নতিবপুরের বসু পরিবারের দামোদর জিউর জমিদারির একটি অংশে দামোদর মন্দির, দুর্গা মন্দির, আটচালা আর কিছু ভগ্নপ্রায় অংশ দেখা যায়। ভগ্ন অংশের মধ্যে হাতিশালা, পাকশালা, পুকুর, দীঘি, বহু বিঘা জমি সবই আছে। শোনা যায় আজ থেকে ৪০ বছর আগেও বেনারস থেকে হাতি নিয়ে সাধুরা আসতেন দামোদরের পূজা করতে। দুর্গা পূজা ছাড়াও নতিবপুরের বসু পরিবারের দামোদর মন্দিরে বছরে কৃষ্ণের চারটি পূজা ধুমধাম সহকারে হয়— বসন্ত উৎসব, রাস উৎসব, গুরু পূর্ণিমা, বুদ্ধ পূর্ণিমা।
এছাড়াও শ্রী শ্রী দামোদর জিউ বছরে কয়েকবার ঢাক ঢোল কাঁসর ঘণ্টা সহযোগে নতিবপুর গ্রাম পরিদর্শনে যান। আবার সন্ধার মধ্যে গৃহে ফিরে আসেন। আশ পাশের সম্পন্ন গৃহেও তিনি বিশেষ বিশেষ পূজার দিনেও অতিথি হয়ে যান যথাযোগ্য মর্যাদায়। দামোদর জিউর জমিদারির অন্তর্গত অন্য যে কোনো পূজার পূর্বে দামোদরের পূজা হয়। একমাত্র মন্দির সংস্কার ছাড়া তিনি দুর্গা পূজার সময় তিন দিন রাত্রিবাস করেন বসু পরিবারের দুর্গা দালানে— সপ্তমী, অষ্টমী আর নবমী তিথিতে। দুর্গা পূজার ছাগ বলির সময়ে দামোদর জিউর সিংহাসন চাদর দিয়ে ঘেরা থাকে। দিনে দুবার দামোদর জিউর ভোগ দেওয়া হয়— সকাল আর সন্ধাবেলায়। সন্ধায় ভোগ দেবার পর আরতি হয় ও তারপর শয়ান দেওয়া হয়। দামোদর মন্দিরের পিছনেই আছে দামোদর পুকুর, যায় মাটি দিয়ে দুর্গা প্রতিমা তৈরি হয়। বসু পরিবারের দুর্গা ভাসানো হয় সদর পুকুরে দশমী তিথিতে। পরিবারের বহু সদস্য ওই সময় গ্রামের বাড়িতে থাকেন বা যাতায়াত করেন। দামোদর মন্দিরের সংস্কার ও গঠন শুরু হয়েছে ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর থেকে। এই দীর্ঘ সময় শ্রী শ্রী দামোদর জিউর অবস্থান ও বাসস্থান ছিল দুর্গা মন্দির। রবিবার, ১৪ মার্চ শ্রী শ্রী দামোদর জিউ ঢাক ঢোল বাজিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে তার নতুন বাসস্থানে যাবেন। তারপর অনুষ্ঠিত হবে যথাবিহিত পূজা হোম। সেদিন শ্রী শ্রী দামোদরের জমিদারির অন্তর্গত মানুষ ও মন্দির সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত সবার ভোগ প্রসাদ পাবার নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন বসু পরিবারের সদস্য-সদস্যারা।
বসু পরিবারের তরফে পেজফোর নিউজকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনারা খুব যত্ন সহকারে দামোদর জিউ মন্দির ও বসু পরিবারের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। শঙ্খ বসু, হাওড়া।
বহু তথ্য পূর্ন এই প্রতিবেদনে খানাকুলের প্রসিদ্ধ বসু পরিবার ও তাদের গৃহদেবতা শ্রী শ্রী দামোদর জিউ সম্বন্ধে অবগত হয়ে খুব ভালো লাগলো।
তথ্য পূর্ন খানাকুলের প্রসিদ্ধ বসু পরিবার ও তাদের গৃহদেবতা শ্রী শ্রী দামোদর জিউ সম্বন্ধে জানতে পেরে খুব ভালো লাগলো।