“পরদিন বেলা এগার-বারটার মধ্যে জাহাজ রেঙ্গুনে পৌঁছিবে ; কিন্তু ভোর না হইতেই সমস্ত লোকের মুখেচোখে একটা ভয় ও চাঞ্চল্যের চিহ্ন দেখা দিল। চারিদিক হইতে একটা অস্ফুট শব্দ কানে আসিতে লাগিল, কেরেন্টিন্- কেরেন্টিন্।” শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে আমরা শ্রীকান্ত’র বয়ানে ‘কোয়রান্টিন’ কথাটির সাথে পরিচিত হই। রেঙ্গুনগামী জাহাজে শ্রীকান্ত। সবে ভোর হয়েছে। জাহাজ রেঙ্গুনে ঢুকবে কয়েকঘন্টার মধ্যেই। কাজের ধান্দায় কাবুল থেকে রামেশ্বরম, যেন ভারত উপমহাদেশটাই চলেছে বার্মা। দেশে কাজ নেই, বার্মায় আছে — এই অলীক স্বপ্নে বিভোর মানুষ চলেছে সেখানে। এদের বেশীরভাগই মিস্ত্রি গোছের। জাহাজের ডাক্তারবাবুর কথায় শ্রীকান্ত’র মত ভদ্রলোক কজনই বা!
প্লেগের ভয় তখন সর্বত্র। বার্মাতেও কড়াকড়ি প্রচুর। সরকার অত্যন্ত সাবধানী। প্লেগের সংক্রমণ নিয়ে কেউ যেন বার্মার মাটি স্পর্শ করতে না পারে। আর কেনা জানে পরিযায়ী শ্রমিকদের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় দ্রুত! খোঁজ নিয়ে শ্রীকান্ত জানতে পারল জাহাজ থেকে নামার পর শহরে ঢোকা যাবেনা। আগে সবাইকে কোয়রান্টিন কেন্দ্রে যেতে হবে। সেখানে দশদিন থাকার পর যদি দেখা যায় জাহাজ থেকে নামা যাত্রী প্লেগের বাহক নন তবেই তার শহরে প্রবেশের অনুমতি মিলবে। এই দুর্ভোগ থেকে বাঁচা সম্ভব যদি কারোর ‘আত্মীয় শহরে থাকে এবং সে পোর্ট হেলথ্ অফিসারের নিকট থেকে কোন কৌশলে ছাড়পত্র যোগাড় করতে পারে’। এমত ছাড়পত্র মিস্ত্রি গোছের লোক পাবে কি করে!
এই ছাড়পত্র মেলে ভদ্রলোক যাত্রীদের। কারণ ‘কেরেন্টিন্’ কারাবাসের আইন কুলিদের জন্য। জাহাজের বেশীরভাগ যাত্রীই ওই গোত্রের। কারণ এরা বেশীরভাগই দশ টাকার ডেক-যাত্রী। ডেকের যাত্রীদের কুলির বেশি মর্যাদা দেওয়ার রেওয়াজ ছিলনা। শ্রীকান্তও ডেকের, দশ টাকার যাত্রী; তার জন্যও বরাদ্দ কোয়রান্টিন কেন্দ্র। শ্রীকান্ত’র বরাত ভাল, জাহাজের ডাক্তার বাবু লোক মারফত জানিয়ে দিয়েছেন তাকে ওই নরকে যেতে হবেনা। ভদ্রলোক হওয়ার সুবিধে শ্রীকান্ত বার্মা জীবনে বারেবারে যেমন প্রত্যক্ষ করেছে, এই সুবিধে তাকে তেমন বিড়ম্বনাতেও ফেলেছে।
এই যেমন এখন। জাহাজ জেটিতে ঢোকার আগে, কোয়রেন্টিন কেন্দ্রের কাছাকাছি একটি স্টীমার এসে জাহাজের গায়ে ভিড়ল। এই স্টীমারে চাপিয়ে কুলির দলকে নিয়ে যাওয়া হবে। সবাই বাঁধাছাদা করে হুড়মুড়িয়ে চলেছে স্টিমারের দিকে । শ্রীকান্তর তাড়া নেই। সে ডেক-যাত্রী হলেও ডাক্তারের কৃপায় ভদ্রলোক যাত্রী। কিন্তু বিধি বাম। অভয়া সামনে। “অভয়া প্রবল বেগে মাথা নাড়িয়া কহিল, না সে হবে না। আমাকে ছেড়ে আপনি কিছুতে যেতে পারবেন না”। কলকাতা থেকে আসার সময় পিয়ারি বাঈ শ্রীকান্তকে একই কথা বলেছিল। পিয়ারি শ্রীকান্তর বাল্য প্রেম। সে বাঁধা পার করে আরেক বাঁধায় শ্রীকান্ত! এবার অভয়া! একলা মেয়েমানুষকে আলাভোলা রোহিনী দাদার হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবেনা। সুতরাং চল মন পর নিকেতনে।
স্টীমার থেকে নেমে কোয়রান্টিন কেন্দ্র নয়। হেঁটে যেতে হবে অনেকটা পথ। ঘাটে নেমে যাত্রীদের লটবহর বহন করার কোন ব্যবস্থা নেই। কুলির জীবনযাত্রার সাজসরঞ্জাম এমন হতে পারেনা যা তারা ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে যেতে পারবে না ! মাথার উপর গলিত সূর্যের তাপ, পায়ের নীচে উত্তপ্ত বালুকারাশি; সারি সারি মানুষ চলেছে গন্তব্যে। জ্বর, পেটের অসুখ, চরম ক্লান্তি তে অভয়ার পাড়াতুতো অভিভাবক রোহিনী দাদা অচল। অভয়া মহিলা। বোঁচকা বুঁচকি সামলে দুই নিঃসম্পর্কীয় মানুষ নিয়ে শ্রীকান্ত। সেই সময় শ্রীকান্ত’র মন বলছে এত বড় গাধা সে! কিন্তু অভয়ার হাসি সব ভুলিয়ে দিল। মালপত্র সেখানেই রেখে রোহিনী দাদাকে পিঠে নিয়ে শ্রীকান্ত চলল ‘কেরেন্টিনের’ উদ্দেশ্যে। অভয়া কি এক আশ্চর্য দক্ষতায় আর সব সামলে নিল সে কথা ভিন্ন। একদিন কোয়রান্টিন এর মেয়াদ শেষ হল, শ্রীকান্তদের শহরে ঢোকার ছাড়পত্র মিলল।
বার্মার মোহিনী মায়া আছে। সেখানে গেলে ফেরেনা কেউ। গাড়িতে ওঠবার সময়ও পিয়ারি বলেছিল, “নাই গেলে অতদূরে? থাক গে, যেও না!” শ্রীকান্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে চিঠি দেবে, খবর দেবে। তারপর, “দিন পাঁচ ছয় পরে একদিন ভোরবেলায় একটা লোহার তোরঙ্গ এবং একটা পাতলা বিছানামাত্র অবলম্বন করিয়া কলিকাতার কয়লাঘাটে আসিয়া উপস্থিত হইলাম”। রাস্তায় শ্রীকান্তের চোখে পড়েছে লাল, কালো, পাঁশুটে, গেরুয়া একপাল বাছুর যেন বাঁধা আছে, চালান যাবে। কাছ থেকে তার ঠাহর হল চালান যাবে মানুষ, বাছুর নয়। কে নেই জাহাজঘাটায়, সব আছে। কাবুলের উত্তর থেকে কুমারিকার শেষ পর্যন্ত কয়লাঘাটায় প্রতিনিধি পাঠাতে কারোর ভুল হয়নি। সবাই চলেছে বার্মা, সেখানে কাজ আছে, অর্থ আছে, আর আছে স্বাধীনচেতা নারী, মোহিনী মায়া!
এই জনসমুদ্র অপেক্ষায় জাহাজের, ডেকের কোনে কোনমতো ঘাড় গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিতে। এই সময় চোদ্দ পনেরশো লোক হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল সার বেঁধে! শ্রীকান্ত জিজ্ঞেস করে জানতে পারে ‘ডগ্ দরি হোগা’। সে কি বস্তু। শ্রীকান্ত সে বর্ননাও দিয়েছেন।
উনিশ শতকের শেষ দশক চিহ্নিত হয়ে আছে কালান্তক প্লেগ এর জন্য। মহারাষ্ট্র থেকে শুরু হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে যার এর সংক্রমন। কলকাতা ছিল এর অন্যতম কেন্দ্র। তাই কলকাতা থেকে কোথাও যাওয়া ও আসার উপর ছিল নানা বিধিনিষেধ। জাহাজ তো নানা কিসিমের মানুষে ভর্তি। আর বন্দরে বন্দরে রয়েছে অজানা সংক্রমণের ভয়। তাই ডাক্তারি পরীক্ষার এত কড়াকড়ি। বর্মায় তখনো প্লেগ যায়নি। তাই বার্মাগামী যাত্রীদের রোগ— তল্লাসির এত ঘটা। শ্রীকান্ত’র বর্ননায়, “প্লেগ রোগে দেহের স্থান বিশেষ স্ফীত হইয়া ওঠে। ডাক্তারসাহেব যেরূপ অবলীলাক্রমে ও নির্বিকার চিত্তে সেই সকল সন্দেহমূলক স্থানে হস্ত প্রবেশ করাইয়া স্ফীতি অনুভব করিতে লাগিলেন, তাহাতে কাঠের পুতুলেরও আপত্তি হইবার কথা।” কিন্তু পদানত ভারতবাসী, পরাধীন জাতি ডাক্তারের হাত মুচড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ডাক্তারের হাতে নিজেকে উলঙ্গ করতে বাধ্য যে! তাদের পাশ করতে হবে, কাজের খোঁজে যেতে হবে বার্মা মুলুক।
শ্রীকান্ত শরৎচন্দ্রের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস কিনা তা নিয়ে কথা চললেও একথা ঠিক তাঁর বাউন্ডুলে জীবনের সঙ্গে শ্রীকান্তের মিল প্রচুর। শরৎচন্দ্র নিজেও কাজের খোঁজে বার্মা গেছিলেন। বেশ কিছুদিন তিনি সেখানে চাকরিও করেন। ১৯০৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি বার্মা যান। সেখানে রেলের অডিট অফিসে কিছুদিন কাজ করেন। এখানকার কাজ চলে গেলে কিছুদিন বেকার থাকেন। এরপর পাবলিক ওয়ার্কস একাউন্ট অফিসে চাকরি পান। ১৯১৬ সালে দেশে ফেরা পর্যন্ত এই চাকরিতেই বহাল ছিলেন। শ্রীকান্ত উপন্যাসে প্লেগের হাত থেকে বাঁচার জন্য নানা পন্থা পদ্ধতির যে বর্ননা শরৎচন্দ্র দিয়েছেন তা যে তাঁর প্রত্যক্ষ দর্শনের বাইরে নয় তা বোঝা যায়।
উপন্যাসে খোদ বার্মাতে প্লেগ রোগের ভয়াবহতার বর্ননা আছে। শ্রীকান্ত এর বাইরে নয়। শ্রীকান্ত’র বর্ননায়, “হায় রে! তাহাকে সমুদ্রপারে ঠেকাইয়া রাখিবার লক্ষ— কোটি যন্ত্র-তন্ত্র, কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুরতম সতর্কতা — সমস্তই একমুহূর্তে একেবারে ধূলিসাৎ হইয়া গেল।” শ্রীকান্ত নিজেও এর প্রকোপে পড়তে পড়তে অভয়ার সেবায় রোগমুক্ত হয়। বার্মাতেই শরৎচন্দ্রের প্রথমা স্ত্রী প্লেগে মারা যান। শরৎচন্দ্র নিজেও তাঁর বার্মা জীবনে প্লেগ রোগের ভয়াবহতা দেখেছিলেন। তাই শ্রীকান্তের কেরেন্টিন দেখা ও এর ভয়াবহতা শরৎচন্দ্রের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন কিছু ছিলনা।