রবিবারের বেলা দশটার কাটোয়া লোকালেও ভীড়ে ভীড়াক্কার। মেয়েদের কামরায় ঢোকার মুখে যথারীতি কিছুজন অনর্থক দাঁড়িয়ে আছে। গালাগালি খেয়েও বাজারউলিরা তাদের গোলঝুড়ি নিয়ে নির্বিকার ভাবে বসে দরজার সামনে।
শ্রীমতীকে ঠেলেঠুলে, প্রায় পাঁজাকোলে করে ট্রেনে ওঠালো শ্যামলী আর শ্রাবণী।
— একটু জায়গা করে দাও গো। ও বেচারি বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারবে না। অনেকটা দূর যেতে হবে আমাদের। সেই নবদ্বীপধাম।
একটু ইতস্তত করে অনেকেই শ্রীমতীর ভাঙাচোরা দাঁড়ানোর দিকে তাকাল। বসার জায়গাও করে দিল। জায়গা পেয়ে শ্রীমতীর নড়বড়ে পাদুটো একটু স্বস্তি পেল। সে মনে মনে একটু হাসল। পঙ্গু হওয়ার এই সুবিধে তার। ছোটোবেলা থেকে এই তাৎক্ষণিক অনুকম্পা পেতে আর নিতে অভ্যস্ত শ্রীমতী।
গোটা কামরায় গলায় কন্ঠি, নাকে রসকলি আঁকা গৃহী বোষ্টুমীদের ভীড়। কারো কারোর হাতের থলির জপমালায় হরি আবর্তিত হয়েই যাচ্ছেন। সবার সঙ্গেই দুটো তিনটে মেজো আর ছোটো সাইজের ব্যাগ।
শ্রীমতী আলাপী। সহযাত্রীদের সঙ্গে ভাব জমাতে তার বিশেষ দেরী হয়না। শ্রীমতীর মত প্রায় সবার গন্তব্য নবদ্বীপধাম। চাঁচর আর দোলপূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে নামসংকীর্তন, পরিক্রমা, গঙ্গাস্নানের পুণ্য লাভ করবে।
নবদ্বীপধামের হাওয়ায় নাকি সবসময় মিশেই থাকে উৎসবের রোশনাই, নাম সংকীর্তনের আনন্দ। মঠের ত্রিবিক্রম মহারাজ একবার বলেছিলেন, —
“নবদ্বীপ হল উৎসবের দেশ। এক উৎসব শেষের কুঞ্জভঙ্গের বেদনা মিলিয়ে যায় নতুন উৎসবের অধিবাসে”।
তবে থেকেই শ্রীমতীর মন উচাটন। কবে পৌঁছব চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলাভূমিতে। তার পক্ষে সহজ তো ছিলনা কিছুই! গোটা জীবনটাই তো এই পঙ্গু শরীরে গিরিলঙ্ঘন করতে করতেই কেটে গেল! গুরুভগ্নী শ্যামলী আর শ্রাবণী তাকে খুব ভালোবাসে। নাহলে কেই বা সাহস করে এমন মানুষকে পথে বা’র করে!
অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল শ্রীমতী। শ্যামলীর ডাকে চমক ভাঙল,
— দিদি, জানলার ধারে বসবে?
জানলার পাশ দিয়ে তখন ছুটে চলেছে সবুজ মাঠ, পুকুর, গেরস্থের বাড়ি, ঝোপঝাড়। কতদিন পর শ্রীমতী ট্রেনে চাপল মনেই পড়ে না! ফুলে ফুলে ভরা শিমুল গাছগুলো যেন আকাশের কাছে পৌঁছে সিঁদুরখেলা খেলছে। প্রতিদিন কত ফুল আর রঙ নিয়ে কারবার তার তবু শিমুলের এই টকটকে লাল রঙ বড় প্রিয় শ্রীমতীর।
একদিন এই লালরঙা সিঁদুরে নিজেইতো নিজের সিঁথি রাঙিয়েছিল সে। গুরুমহারাজ প্রসাদী সিঁদুরের প্যাকেট গোবিন্দর পায়ে ছোঁওয়ালেন। তারপর বললেন “মা, নিজের কপালে এবার এটা পরে নাও।” তারপর থেকে একদিনও গোবিন্দর নামে সিঁথিতে সিঁদুর ছোঁয়াতে ভুল হয়নি শ্রীমতীর। প্রতিদিন স্নান সেরে সে মুখের সামনে কাঠের হাত-আয়নাখানি রাখে। হাতের তালুতে জল দিয়ে প্রথমে গোপীচন্দন গুলে নেয়। তারপর যত্ন করে নাকে, কপালে রসকলি আঁকে। কপালের রসকলির মাঝে একটি ছোট্ট একটি সিঁদুরের টিপ দেয়। প্রতিদিনের এই সামান্য প্রসাধনে শ্রীমতীর সুন্দর মুখ আয়নায় ঝলমল করে ওঠে। শ্রীমতী নিজেই নিজেকে দেখে মুগ্ধ হয়ে মুচকি হাসে।
সামনের সীটে বসা অল্পবয়সী বৌটি ততক্ষণে স্টীলের কৌটো খুলে নিমকি বার করে বলল, নাও দিদি।
এক মুঠো নিমকি কৌটো থেকে নিয়ে খেতে খেতে শ্রীমতী বলল, “বাহ্ বেশ মচমচে স্বাদ হয়েছে। তুমি বানিয়েছ বুঝি।”
বৌটি ঘাড় নাড়ল। শ্রীমতীও ব্যাগ থেকে বার করল গোপালকে ভোগ দেওয়া সুজির নাড়ু। অনুদিদিই তাকে হাতে ধরে এসব কিছু শিখিয়েছিল। মায়ের মত সেই তো মানুষ করেছিল শ্রীমতীকে। শেষ অবধি আগলে রেখেছিল অনুদিদি আর বড় জামাই দাদা। পায়ের খুঁত নিয়ে জন্মানো মেয়েকে মা জন্ম থেকেই অপচ্ছেদ্দা করেছে। ভালোবাসেনি একদিনের তরেও। এতদিন পরেও সে অভিমানে চোখে জল আসে শ্রীমতীর।
সামনে পিন্টু নামের দামাল ছেলেটার হাতে একটা নাড়ু তুলে দেয়। অনেকক্ষণ ধরে ছেলেটা মা’কে বিরক্ত করছিল। শ্রীমতী তার হাতে নাড়ু তুলে দিতেই সে একগাল হাসল শ্রীমতীর দিকে চেয়ে। — আহারে বোধকরি ক্ষিদে পেয়েছিল ছেলেটার! পিন্টুর চুল ঘেঁটে দিয়ে একটু আদর করল শ্রীমতী।
শ্রাবণী বলল,
— কি ভালো হয়েছে গো নাড়ুটা! তোমার হাতে যাদু আছে গো শ্রীমতী দিদি।
— সত্যি কি ভালো হয়েছে নাড়ুটা! মিষ্টি একদম ঠিকঠাক। না কম, না বেশি। মুখে যেন মিলিয়ে গেল। আপনি নিশ্চয়ই খুব ভালো রান্না করেন!
পিন্টুর মা বলল।
— শুধু কি রান্না! দিদির হাতে বানানো ফুলের গয়না দেখলে তুমি অবাক হয়ে যাবে! এই দ্যাখো না দ্যাখো! মোবাইল খুলে ছবি দেখায় শ্রাবণী।
— আহ্ কি যে করিস না তুই! চুপ কর। শ্রীমতী লজ্জা পেল একটু।
— গৌর নিতাইয়ের এইসব হাতের, গলার, মাথার গয়না সব আপনি বানিয়েছেন?
— একদিন না। প্রতিদিন আমাদের মঠের বিগ্রহরা শ্রীমতীদিদির ফুলের গয়নায় সেজে ওঠেন। ফুল আর পাতা সেলাই করে পায়ের নুপূর থেকে মাথার মুকুট অবধি সব গয়না তৈরি করে দিদি। এইধরনের ফুলের গয়না আর কেউ বানাতে পারে না। তাইতো দিদির ডাক পড়েছে নবদ্বীপে। আমাদের মঠের বড় মহারাজ ডেকে পাঠিয়েছেন।
পিন্টুর মা বিস্ময়ে ছবিগুলো বারবার দেখে। শ্রীমতীর পায়ের দিকেও তাকায়। তার করুণার দৃষ্টি পড়ে ফেলতে পারে শ্রীমতী।
ছোটোবেলা থেকে করুণা, তাচ্ছিল্য, সহানুভূতিই তো পেয়ে এসেছে শ্রীমতী। সত্যিকারের ভালোবাসা কজনের কাছে পেয়েছে! অনুদিদি না থাকলে এই কৃষ্ণাশ্রিত জীবন, ফুল গাঁথার কাজ কিছুই যে হত না। বড়জামাইদাদা চলে যাবার পর অনুদিদির উথালপাথাল অবস্থা। গৌড়ীয় মঠে কৃষ্ণনামে দীক্ষিত হল দিদি। আদরের ছোটোবোন শ্রীমতীকেও দীক্ষা নেওয়ালো। গুরুমহারাজ স্বয়ং নীলমাধবের বিগ্রহের সঙ্গে শ্রীমতীর বিয়ে দিলেন।
— গোবিন্দর চরণে মনপ্রাণ অর্পণ কর মা। এবার থেকে উনিই তোমার সব। তোমার শীতের ওঢ়নী, গিরিষের বা। বরিষের ছত্র আর দরিয়ার না।
গুনগুন করে গাইলেন চন্ডীদাসের পদ, —
— “বঁধু কি আর বলিব আমি। / জীবনে মরণে জনমে জনমে / প্রাণনাথ হইও তুমি।”
শ্রীমতীর তখন কাঁচা বয়স। মনপ্রাণ কি আর নীরব নিথর মূর্তিকে সহজে দেওয়া যায়! মঠে যেতে যেতে, প্রতিদিন নাম সংকীর্তন, ভাগবত পাঠ শুনতে শুনতে ধীরে ধীরে মন কৃষ্ণের প্রতি সমর্পিত হল।
মঠে তখন এক বৃদ্ধ ছিলেন বামন মহারাজ। তাঁর কাছেই শেখা এই ফুলের গয়না বানানো।
— শিখে নাও গো শ্রীমতী, অনুপমা। নাহলে আমার পরে এই কাজ আর কেউ জানবে না। রাধামাধব, গৌর-নিতাইকে বাজারের কেনা মালায় সাজতে হবে।
যত্ন করে বামন মহারাজ তাঁর দুই শিষ্যাকে শেখালেন কেমন করে কাঁঠালপাতা কেটে তাকে গয়নার আকার দিতে হয়। তাতে নানা রঙের ফুল সাজিয়ে, সেলাই করে বানাতে হয় ঠাকুরের অলঙ্কার।
তারপর থেকে অনুপমা আর শ্রীমতীর নিত্যসেবা হয়ে উঠল ফুলগাঁথা। রাশি রাশি ফুল-পাতার রঙে, সুগন্ধে অনুদিদির ছোটো একফালি বারান্দা যেন নন্দনকানন হয়ে সেজে উঠত। সাজিতে সেসব পুষ্পালঙ্কার সাজিয়ে, মঠে পাঠিয়ে তবে সংসারের অন্যকাজ। গুরুমহারাজ ঠাট্টা করে দুই বোনকে বড় মালিনী ছোটো মালিনী বলে ডাকতেন।
ফুলের বাগানেই যেন বসেছিল শ্রীমতী। হঠাৎ চমক ভাঙল চেনা সুর আর কথার ছোঁয়ায়।
“শুনো সুন্দর শ্যাম ব্রজবিহারী
হৃদি-মন্দিরে রাখি তোমারে হেরি।।
গুরুগঞ্জন চন্দন অঙ্গভূষা
রাধাকান্ত নিতান্ত তব ভরসা”
কে গায় এ পদ! এই পদাবলী তো মঠে একজনেই গাইতেন। স্বয়ং মহাপ্রভুর মতই তিনি গৌরবরণ, সুন্দর। তাঁর কিন্নরকণ্ঠে যেন ভক্তির বিগলিত ধারা। শ্রী খোল আর মন্দিরার সঙ্গে কৃষ্ণদাস মহারাজের কীর্তনে ভক্তমন্ডলীর চোখে জলের বাঁধ মানত না। গাইতে গাইতে মহারাজ নিজেও যে কাঁদতেন!
ট্রেনের কামরায় বড় দরদ দিয়ে এ গান গাইছে একতারা হাতে বাউলটি। কামরার সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছে। শ্রীমতী ফিরে গেছে তার যৌবনের দিনে। মঠের নবীন সন্ন্যাসী কৃষ্ণদাস মহারাজের রূপেগুণে মোহিত হয়ে গেছিল শ্রীমতী। মনে মনে তাঁকে কামনা করত আবার মনে মনেই সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত। শ্রীকৃষ্ণের দয়িতা যে সে। অন্যখানে মন দেবার তো উপায় নেই। তরুণ কৃষ্ণদাসও নিশ্চিত বুঝেছিলেন শ্রীমতীর মনের চাঞ্চল্য। দন্ডিধারী, মুন্ডিতমস্তক সন্ন্যাসী তিনি। এই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যায়না। শ্রীমতীর চোখের আড়াল হলেন তিনি। তড়িঘড়ি চলে গেলেন অন্য মঠে। আর কখনো তাঁর দর্শন পাওয়া যায় নি। এখন শ্রীমতীর মনে হয় উনি ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। তাইতো সে অনুরাগের মালাচন্দন আজ কৃষ্ণের পায়ে সমর্পণ করতে পারে।
আজ প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় দাঁড়িয়ে শ্রীমতী সব ছেড়ে চলেছে শ্রীকৃষ্ণের চরণতলের আশ্রয়ে। অনুদিদি চলে যাবার পর তার আর কোনো পিছুটান নেই। শ্রীমতী ঠিক করেছে আর ফিরবে না নবদ্বীপধাম থেকে। কেয়ূরে-কঙ্কনে, মুকুটে -নুপূরে, পাঁচ ফুলের বৈজয়ন্তীমালায় নিত্য সাজাবে তার আরাধ্যকে। মঠের এককোণে তাঁর এতটুকু স্থান কি হবে না? দুবেলা দুমুঠো প্রসাদ কি আর জুটবে না? বাউলটি মিঠে সুরে তখনো গেয়ে চলেছে, —
“সম শৈল কুলমান দূর করি
তবে চরণে শরণাগত এক কিশোরী।।
আমি কুরূপিণী গুণহীনী গোপনারী
তুমি জগজনরঞ্জন বংশীধারী।।
গোবিন্দদাস কহে শুন শ্যামরায়
তুয়া বিনে মোর মনে আন নাহি আয়।”
ট্রেন তখন ধীরে ধীরে নবদ্বীপধামে ঢুকছে।
আহা কি অপূর্ব
????????♥️????????
একাত্ম হলাম। বড় ভাল লাগল।
ভালোবাসা জেনো
অপূর্ব অন্য ধরনের গল্প। ভালো লাগলো।
অপার শ্রদ্ধা ????