ভারতকে বিশ্বসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করাতে যাঁদের কৃতিত্ব অমলীন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম চৈতন্যদেব। তৎকালীন হিন্দু ধর্মকে কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে, বৃহৎ অর্থে বাঙালি তথা ভারতবাসীর মানসিকতার মধ্যে নবজাগরণ এনেছিলেন চৈতন্যদেব। আপনি কি দেখতে চান চৈতন্যদেবের জীবনের সঙ্গে যুক্ত এমন কিছু জায়গা যেখানে ইতিহাস আজও কথা বলে? আপনি কি স্পর্শ করতে চান সেই মাটি যেখানে আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে শ্রী গৌরাঙ্গ বা নিমাই ১৫১০ সালে মাঘ মাসে কেশর ভারতীর কাছে সন্ন্যাস নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম গ্রহণ করেন? বেশি নয়, হাতে দু-দিন সময় নিয়ে বেড়িয়ে আসুন পূর্ব বর্ধমানে কাটোয়ার উদ্দেশ্যে। হাওড়া স্টেশন থেকে কাটোয়া লোকালে চাপতে পারেন। ব্যান্ডেল-অম্বিকা কালনা-নবদ্বীপধাম হয়ে নেমে পড়ুন কাটোয়া জংশনে। হাওড়া থেকে দূরত্ব ১৮৮ কিলোমিটার। ট্রেনে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা। শিয়ালদহ থেকেও ৪ ঘন্টার দূরত্ব অতিক্রম করে ট্রেনে পৌঁছতে পারেন কাটোয়ায়।

বর্ধমান জেলার এক প্রাচীন নগর কাটোয়া। অজয়, ভাগীরথী ও শিবাই নদীর সংগমে অতীতের কণ্টক-দ্বীপ আজকে কাটোয়া নামে পরিচিত হয়েছে। অলি-গলিতে প্রাচীন নিদর্শন ছড়িয়ে থাকলেও প্রচার না থাকায় মানুষের চেনা পরিচিত ভ্রমণের জায়গার তকমা জোটেনি কাটোয়ার। বাংলার নবাব আলিবর্দি খানের আমলে নাগপুরে মারাঠা রাজা প্রথম রঘুজি ভোঁসলের মারাঠা সৈন্যরা ১৭৪২ সালে উদ্ধারণপুরের কাছে গঙ্গা পার হয়ে অকস্মাৎ হামলা করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত এখানে মারাঠা দস্যুদের পরাজয় ঘটেছিল। পরবর্তি সময় ১৭৬৩ সালে নবাব মির কাশিমের সঙ্গে ইংরেজ বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছিল এই কাটোয়ায়।

কাটোয়ার একটি উল্লেখযোগ্য জায়গা গৌরাঙ্গবাড়ি। স্টেশনে নেমে টোটোয় চেপে কাছাড়ি রোড (অপর নাম স্টেশন রোড) পার হয়ে মহাপ্রভু পাড়ার বাজারের ওপর দিয়ে সরু গলিপথের আলো-আঁধারি টপকে পৌঁছে যাওয়া যায় গৌরাঙ্গবাড়িতে। ২৪ বছর বয়সে পৌষ সংক্রান্তির রাতে নিমাই গৃহত্যাগ করে কাটোয়ায় পৌঁছান ভোরবেলা, তারপর গঙ্গাতীরে কেশব ভারতী সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় এবং তার কাছে দীক্ষা ও সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এইখানে। গৌরাঙ্গবাড়ির সিংহদুয়ার পার করে বাম দিকে দেখতে পাওয়া যাবে একটি অশ্বত্থ গাছ, এই গাছের তলায় নিমাই মধু পরামাণিকের কাছে মস্তকমুণ্ডন করেছিলেন ও তারপর গঙ্গায় স্নান করে দীক্ষা নিয়েছিলেন। এর পাশেই আছে নিমাই যে স্থানে ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু’ নাম গ্রহণ করেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক স্থল। এছাড়াও এখানে আছে কেশব ভারতীর সমাধি ও গুরু-শিষ্যের পায়ের ছাপযুক্ত পাথর।
১৪৬০ সালে কেশব ভারতী সাধনার উদ্দেশ্যে ‘ভজন স্থলী’ বা আশ্রম গড়ে তোলেন কাটোয়ায়। তার আগে কাটোয়ার এই অংশে কোনও বসতি ছিল না। নির্জন বন, জঙ্গলঘেরা নদীর তীরে কেশব ভারতী আশ্রম স্থাপন করেন। পরবর্তি সময় গঙ্গা সরে গেলেও মহাপ্রভু পাড়ার গৌরাঙ্গবাড়ি বৈষ্ণবতীর্থে পরিণত হয়। বর্তমানে কেশব ভারতীর আশ্রম সংলগ্ন জায়গাতেই কাটোয়া শহর গড়ে উঠেছে।তাঁর স্মৃতিবিজরিত ‘ভারতীর গোড়ে’ নামের পুকুরটি আজও আছে। কেশব ভারতীর মৃত্যুর পর এখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। এর পাশেই বিশাল নাটমন্দিরের সামনে আছে নিতাই-গৌরাঙ্গ-জগন্নাথের বিগ্রহ। এগুলি কাঠের তৈরি। শোনা যায় ৫০০ বছরের ইতিহাসে এই নিয়ে তৃতীয়বার মূর্তিগুলি নির্মাণ করা হয়েছে। চৈতন্যের সন্ন্যাসবেশ দেখে যাতে গৌরভক্তদের মনে কষ্ট না হয় তাই শ্রীখণ্ডের নরহরি সরকার তিনটি ‘রসরাজ-মহাভাব’-এর বিগ্রহ তৈরি করিয়েছিলেন। প্রতিবছর ঝুলনযাত্রা, দোলপূর্ণিমা, জন্মাষ্টমী তিথিতে ও পয়লা মাঘ থেকে পর পর তিন দিন মহাপ্রভুর সন্ন্যাস গ্রহণ উপলক্ষ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয় এখানে।

সামনেই আছে গঙ্গা-অজয়ের সংগমস্থল। পড়ন্ত বিকালে গঙ্গা-অজয়ের সংগমস্থলে দাঁড়িয়ে নীল আকাশে সূর্যর নানা রঙের খেলা দেখার সুযোগ ভ্রমণপিপাসু মনকে নাড়া দেবেই। নদীর ওপারে নদীয়া জেলা। নৌকা চাপার সুযোগ আছে। গোধূলিকে স্পর্শ করা যায় এখানে। নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে জীবনের অনেক জটিল অঙ্কের সমাধানও হয়তো খুঁজে পাবেন, বা পেলেও পেতে পারেন ‘খ্যাপার পরশপাথর’। ঘুরে আসুন একবার কাটোয়ায়।