শ্রীমা সারদাদেবী তথাকথিত ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী ছিলেন না কিন্তু তাঁর বিচারধারা, জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন কী ভাবে নারীর সার্বিক উন্নতি ও ব্যক্তিজীবন সুন্দর করা সম্ভব। আজ থেকে প্রায় একশো সত্তর বছর আগে সারদামণি মুখোপাধ্যায় জয়রামবাটীর মতো গ্রামে অতি সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যুক্তিহীন বিশ্বাস ও গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন যুগে শিক্ষার নুন্যতম আলোটুকু পর্যন্ত গায়ে না লাগিয়ে শ্রীশ্রীমা হয়ে উঠেছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের আধুনিক নারী জাতির প্রধান আদর্শ এবং পথপ্রদর্শক।
মা বলতেন— যে রীতি বা বিধান মনকে ছোট করে, গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে, তা কখনো ধর্ম হতে পারে না।
মায়ের গার্হস্থ্যজীবনের সূত্রপাত কৈশোর থেকে স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছ থেকে। ঠাকুরের মতো মাও বলতেন—কাজই লক্ষ্মী। নারীপুরুষ সবাই যদি স্ব-স্ব কাজে ব্যস্ত থাকে তবে একটি পরিবার সচল ও শান্তিপূর্ণ থাকে। পরিবারের সদস্যরা ত্যাগস্বীকার করে একে অপরের পরিপূরক ও সহায়ক হতে পারে। সাংসারিক নানান ঝড়-ঝাপটায় কিভাবে স্বামী-স্ত্রী এবং সংসারের প্রতিটি সদস্যকে কর্তব্যে অনড় থেকে সংসারের সৌষ্ঠব ও সৌন্দর্য বজায় রেখে চলতে হয়, সে কৌশল শিখিয়েছিলেন শ্রীশ্রীমা।
শ্রীশ্রীমায়ের কোন প্রথাগত শিক্ষালাভের সুযোগ হয়নি, ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী লক্ষ্মীর কাছে কিছু কিছু পড়তে শিখেছিলেন। কিন্তু স্ত্রীশিক্ষা ও নারীপ্রগতির বিষয়ে সর্বদাই উদার, উদ্যোগী ও আধুনিক ছিলেন। তিনি চাইতেন মেয়েরা লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হোক। স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে তাঁর পূর্ন সমর্থন ছিলো কারণ তিনি বলতেন শিক্ষার মধ্যেই অন্তর্নিহিত সমস্ত সমস্যার সমাধানের পথ। তিনি সানন্দে ভগিনী নিবেদিতার বালিকা বিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেছিলেন। ভাইঝি রাধুকেও বিয়ের পর উদ্বোধনের কাছে একটি স্কুলে ভর্তি করেন। নিবেদিতার কর্মশক্তি, উৎসাহ ও নব নব প্রয়াসের ভূয়সী প্রশংসা করতেন। নিবেদিতার স্কুলে লেখাপড়া ছাড়াও হাতের কাজ শেখানো হতো।
সেকালে মেয়েরা কেউ কেউ বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি পেত তাদের বাড়ি থেকে। কিন্তু মেমের স্কুল বলে স্নান করে বা গঙ্গা জলে শুদ্ধ হয়ে তবে বাড়ির ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিলত। মায়ের কাছে ছুঁতমার্গ এর বিচার ছিলো না। ইংরেজ-ভারতীয় সকলেই মায়ের সন্তান।
মা সারদা জীবনের সর্বাঙ্গীন উন্নতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। দেহকে কষ্ট দিয়ে বিধবাদের নিরম্বু উপবাস বা হবিষণ্ণ গ্রহণ করা অপছন্দ ছিলো মায়ের। মা বলতেন— যান্ত্রিকভাবে পালিত কোন বিধিনিষেধ আরোপ করে সংযম রক্ষা করা যায় না। ওটি হোল সম্পূর্ণ মনের ব্যাপার। মা ব্রহ্মচারীদের যেমন পাড় দেওয়া কাপড় পরতে বলতেন, তেমনি নিজে বৈধব্যের পরও সরু লালপেড়ে শাড়ি এবং সোনার বালা পরতেন। যা সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে সত্যি ছিলো বৈপ্লবিক। এক অভাবনীয় আধুনিকতা বটে।
শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, উপযুক্ত ক্ষেত্রে মেয়েদের ব্রহ্মচর্য ও সন্ন্যাস গ্রহণ, শাস্ত্রপাঠ ও পূজার্চনারপূর্ন অধিকার আছে বলে শ্রীশ্রীমা স্বীকার করেন। তাই বিভিন্ন আশ্রমে ঠাকুরের পূজার্চনার দায়িত্ব তিনি মেয়েদেরই দিয়েছিলেন। বিবাহিত হয়েও মা ছিলেন আজীবন ব্রহ্মচারিণী; আবার ব্রহ্মচারিণী হয়েও গৃহিণী।
মহীশূরের নারায়ণ আয়েঙ্গারের কন্যা ব্রহ্মচারিণী হতে চাইলে মা স্বামী সারদানন্দকে এই মর্মে চিঠি লেখেন যে, মেয়েদেরও এই অধিকার আছে। গৌরী-মার আশ্রমের ব্রহ্মচারিণীরা ও নিবেদিতা স্কুলের ত্যাগী মেয়েরা মায়ের প্রিয় ছিলেন। গৌরী -মা বা নিবেদিতার বিদ্যাবুদ্ধি, বাগ্মিতা ও তেজস্বীতার ভূয়সী প্রশংসা করতেন এবং মেয়েদেরকে তাঁদের আদর্শ নিয়েই বড়ো হওয়ার কথা বলতেন।
শ্রীশ্রীমা অসংযত জীবন এবং বহুসন্তানের বিরোধী ছিলেন। এব্যাপারে তিনি পাশ্চাত্যের রীতি অনুসারে অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী সীমিত সন্তানের কথা বলতেন।
একটি ঘটনা বলি। একটি মেয়ে বিপথগামীনি হয়েছে, আত্মীয়স্বজন পরিত্যক্তা হয়ে সে মায়ের কাছে সঙ্কোচে এসে দাঁড়ালো। তাকে দেখে সমবেত ভক্তরা খুব বিরক্ত হলেন কিন্তু মা পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মেয়েটির দু-চোখে অশ্রুধারা বয়ে চললো… এমন স্নেহ, এমন দরদ সে যে কখনও পায়নি!
সঙ্গিনী গোলাপ-মা একদিন মাকে সতর্ক করে বললেন, ‘মা, তুমি মেয়েটিকে তোমার কাছে আসতে দিও না। তুমি নিজে ওকে বলতে না পার, আমি বলে দিচ্ছি। আমার কাছে আসবে। ও তো আমার মেয়ে’।
শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘে বহুমানিতা ছিলো বলরামবাবুর স্ত্রীর। রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে তাঁদের পরিবারের অবদানের শেষ নেই। মার সাথেও তাঁর ও তাঁর পরিবারের গভীর অন্তরঙ্গতার সম্পর্ক। মেয়েটির আসা নিয়ে বলরামবাবুর স্ত্রীরও আপত্তি ছিলো। কিন্তু এতো আপত্তি শুনেও মা খুব শান্তভাবে অথচ দৃঢ়কন্ঠে বললেন, ‘সে যদি না আসতে চায়, আসবে না। কেউ যদি না আসে না আসুক। ও কিন্তু আমার কাছে আসবে। সকলের সবাই আছে, ওর আমি ছাড়া জগতে আর কেউ নেই। ওকে নিয়েই আমি থাকব। যদি তাতে কেউ এখানে না আসে তাহলেও ওকে কিন্তু আমি আসতে বারণ করতে পারব না’।
মায়ের উত্তরে সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। মেয়েটির আসাও আর বন্ধ হলো না, মেয়ে ভক্তদের সকলকে মার দৃঢ়তার কাছে নতিস্বীকার করতে হলো। মায়ের আধ্যাত্মিক মহিমার মতো উদার মুক্ত মানসিকতা তাঁকে বিশেষ পর্যায়ে উপনীত করেছে। কেবল ভক্তের ভাবালুতায় নয়, ‘সতেরও মা, অসতেরও’ সকলের অনুভবে তিনি মা।
নিজের জন্মস্থান জয়রামবাটী যাওয়ার পথে কোয়ালপাড়া ও আশেপাশের গ্রামের মেয়েদের শিক্ষা প্রদানের জন্য মা উৎসাহিত করতেন। তাঁরই উৎসাহে গৌরী-মা র সারদেশ্বরী আশ্রমে একটি বুদ্ধিদীপ্ত সপ্রতিভ বালিকার ইংরেজী শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। মা বুঝছিলেন, আধুনিক সমাজের সঙ্গে পা ফেলে চলতে ও নেতৃত্ব দিতে ইংরেজী শেখা প্রয়োজন।
আজকের নারীর সমানাধিকারের জন্য আন্দোলন, অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, শিক্ষার জন্য অধিকার—এসবকিছুর যুক্তির জন্য রয়েছে শ্রীশ্রীমায়ের যুক্তিনিষ্ঠ বিচারবুদ্ধি, উদার বাণী, প্রতিবাদী কর্মপদ্ধতি এবং মুক্ত আধুনিক চিন্তাধারা।
প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং, নররূপধরাং জনতাপহরাং ।
শরণাগতসেবকতোষকরীং, প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্ ।।
অর্থাৎ— আদ্যাপ্রকৃতিস্বরূপা যিনি নরদেহে অবতীর্ণা হইয়াছেন, যিনি, লোকদুঃখহারিণী অভয়া বরদা এবং শরণাগত সেবকের সন্তোষবিধায়িনী, সেই সর্বারাধ্যা জগজ্জননীকে প্রণাম করি। আজ শ্রীশ্রী সারদা মায়ের ১৬৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রার্থনা করি সকলের মঙ্গলের ও দ্রুত শঙ্কামুক্ত হোক অতিমারী-অধ্যুষিত বিশ্ব।
তথ্যঋণ : উদ্বোধন শারদীয়া সংখ্যা, শতরূপে সারদা গ্রন্থ।।
খুব ভালো লাগলো।
অসংখ্য ধন্যবাদ????
Asadharan laglo lekha ta…apni khub olpo kthae sob kichuI bujea dilen..Sarada maa e bisoe likte gele ses hobe na. Kintu apni ei lekha te maa e obodan bisoe khub sundor kore likhechen
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
Apnar lekhoni asadharon
থ্যাঙ্ক ইউ ❤️