| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কেই বা মনে রেখেছে প্রথম বিধবা বিবাহের পথিকৃৎ শ্রীশ চন্দ্র বিদ্যারত্নকে : লিখছেন প্রলয় চক্রবর্তী

Reporter
প্রলয় চক্রবর্তী / ২৮২৫ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

১৮৫৬ সালের  ৭ ডিসেম্বর প্রথম বিধবা বিবাহ হয়েছিল। পাত্র শ্রীশ চন্দ্র বিদ্যারত্ন পাত্রী বর্ধমান জেলার পলাশডাঙার ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায় এর দশ বছরের বিধবা কন্যা কালীমতি। লেখা হলো নতুন ইতিহাস।

বিধবা বিবাহ আইন হল। সমাজ এ আইন মেনে নিতে রাজী না। ‘একের দুইবার বিবাহ দিলে’ অন্যের একবারও বিবাহের পাত্র মেলেনা—এ মতো কৌতুক আর শ্লেষে জেরবার বিদ্যাসাগরের কাছে বিধবার পুনর্বিবাহ দেওয়া ছিল ধর্মযুদ্ধের সামিল। এ কাজ তাঁকে করতেই হবে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখলেন, ‘মুখে বলা নয়, কাজে করা যাক’। সনাতনী সমাজের আপত্তি, বাধা, আক্রমন উপেক্ষা করে কে আসবে বিদ্যাসাগরের পাশে, কেইবা বিধবা নারীকে বিয়ে করতে রাজী হবে! সেই কাজ করতে এগিয়ে এলেন মুর্শিদাবাদে কর্মরত জজপন্ডিত শ্রীশ চন্দ্র বিদ্যারত্ন। বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ তখন শ্রীশ চন্দ্র ওই কলেজের ছাত্র। বিদ্যাসাগরের প্রিয় ছাত্র এগিয়ে এলেন গুরু দক্ষিনা দিতে। সে সময় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল যথেষ্ট বৈপ্লবিক কাজ।

শ্রীশ চন্দ্র জানতেন কি কঠিন সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন। তাঁর গ্রাম, তাঁর সমাজ যে এ বিয়ে মেনে নেবেনা তা তাঁর অজানা ছিলনা। তাও তিনি চললেন গ্রামের বাড়ীতে মায়ের আশীর্বাদ নিতে। নিস্তরঙ্গ গ্রাম জীবনে অভ্যস্ত মা সূর্যমনি ছেলের এই ম্লেচ্ছ কাজ মেনে নিতে রাজী হলেন না। বাড়ি— বার সর্বত্র দূর্নাম রটল। সনাতনীরা পেছনে লাগল। কুৎসিত ছড়া তৈরি হল তাঁর নামে। সমাজ, না সমাজ— এই ধন্ধে শ্রীশ চন্দ্র সাময়িক পিছু হটলেন।

আজও অবহেলিত পলাশডাঙায় বিধবা বিবাহের প্রথম কন্যার ভিটে

বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে ১৫ অগ্রহায়ণ। বিদ্যাসাগর নিজে শ্রীশ চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করেছেন। পাত্রী বর্ধমান জেলার পলাশডাঙার ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায় এর দশ বছরের বিধবা কন্যা কালীমতি। তাকে এনে রাখা হয়েছে শান্তিপুর। সঙ্গে আছেন মা লক্ষীমনি। এদিকে শ্রীশ চন্দ্র লোকনিন্দার ভয়ে বিয়ে করতে নাচার! বিদ্যাসাগর প্রমাদ গুনলেন। এখন কী হবে!

কলকাতায় এবং মফস্বলে জোর গুজব বিদ্যাসাগর এবার কাবু। বিধবা বিয়ে হচ্ছেনা। প্রভাকর সম্পাদক লিখলেন, ‘কোলে কাঁকে ছেলে ঝোলে, যে সকল রাঁড়ী/তাহারা সধবা হবে, পরে শাঁকা শাড়ী’। এমনকি ইংরেজ পরিচালিত ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা শ্রীশ চন্দ্রকে দুর্বল চিত্ত বলে ব্যঙ্গ করল। সনাতনপন্থীদের চাপে কালীমতির মা লক্ষীমনি মেয়ের উপর কলঙ্ক আরোপের দায়ে আদালতে মামলা ঠুকে দিলেন। সহবাস নয়, কেবল বিবাহের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে মামলা! দাবি উঠল শ্রীশ চন্দ্রের মত নরাধমের জজ পন্ডিতের চাকরি করার কোন নৈতিক অধিকার নেই। সে সময় জজ পন্ডিতরা ইংরেজ আদালতে হিন্দু আইনের ব্যাখ্যাকর্তার কাজ করতেন। কিছুদিন আগে যারা হিন্দুয়াণির কথা বলে শ্রীশ চন্দ্রের বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে ছিলেন, তারাই এখন হিন্দুত্বের দোহাই পেড়ে শ্রীশ চন্দ্র কে দূষলেন!

১২ নম্বর সুকেশ্ বা সুকিয়া স্ট্রিটে রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বাড়ি। এই বাড়িতেই প্রথম বিধবা বিবাহ হয়েছিল।

সবই লক্ষ্য করছিলেন শ্রীশ চন্দ্র। তিনি লক্ষীমনির সঙ্গে দেখা করে বিয়ের দিন ঠিক করলেন। এরপর লক্ষীমনির স্বহস্তে লেখা বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র নিয়ে সোজা হাজির বিদ্যাসাগরের কাছে। লক্ষীমনি দেব্যাঃ, এই নামে বিয়ের আমন্ত্রণ পত্রে লেখা ছিল, ‘২৩ অগ্রহায়ণ আমার বিধবা কন্যার শুভ বিবাহ হইবেক’।

২৩ অগ্রহায়ণ, ইংরেজি ৭ ডিসেম্বর, ১৮৫৬ আধুনিক বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ওইদিন সন্ধ্যেবেলায় রামগোপাল ঘোষের বাড়ি থেকে বরবেশে শ্রীশ চন্দ্র এলেন ১২ নম্বর সুকেশ্ বা সুকিয়া স্ট্রিটে রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বাড়িতে। এখানেই পাত্রী সম্প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বরযাত্রী হয়ে এলেন রামগোপাল নিজে, বন্ধু হরচন্দ্র ঘোষ, শম্ভুনাথ পন্ডিত, দ্বারকানাথ মিত্র, জয়নারায়ণ তর্ক পঞ্চানন, ভরতচন্দ্র শিরোমণি, প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ, তারানাথ তর্কবাচস্পতি, প্যারিচাঁদ মিত্র, কালিপ্রসন্ন সিংহ, রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ, রাজা দিগম্বর মিত্র। বিয়ের কোন অনুষ্ঠানই বাদ গেলনা। মন্ত্রপাঠ, কন্যা সম্প্রদান, উলুধ্বনি, দ্বারষষ্ঠী, স্ত্রী আচার, ঝাঁটা প্রনাম, নাক মোলা, কান মোলা সবই হল। এরপর ভুরিভোজ। বিদ্যাসাগর একাই দশহাজার টাকা খরচ করলেন। বিরুদ্ধবাদীরা ঝামেলা পাকাতে পারে বলে যথেষ্ট পুলিশ মোতায়েন ছিল বরের যাতায়াতের পথে। কলকাতায় সেদিন ও পরের কদিন খবর একটাই — ধর্মনাশী বিদ্যেসাগর ও তাঁর শিষ্য শ্রীশ চন্দ্র।

এমন সাহসী, পথনির্দেশক কাজ করলেন শ্রীশ চন্দ্র যা তখন কেউ স্বপ্নেও ভাবতে চাইতেন না। ছলের কলের অভাব নেই প্রবাদ যে কতটা তার প্রমান মিলল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। শ্রীশ চন্দ্র নাকি আরো বড় কোন প্রাপ্তির লোভে এই বিয়ে করেছেন! এই প্রাপ্তি অন্যের ক্ষেত্রেও ছিল, তারা এলনা কেন সে প্রশ্ন কিন্তু উঠলনা!

শ্রীশ চন্দ্র এক বিস্মৃতপুরুষ। বিদ্যাসাগরের জীবনীকাররা শ্রীশ চন্দ্রের জন্য তিন চার লাইনের বেশী বরাদ্দ করেননি! অথচ বাংলার নারীমুক্তি আন্দোলনে অনুঘটকের কাজ করেছিলেন তিনি। বিদ্যাসাগরকে চরম লাঞ্চনা, বিদ্রুপ থেকে রক্ষা করেছিলেন শ্রীশ চন্দ্র। বিধবা বিবাহ করে তিনি শোরগোল তুলেছিলেন বদ্ধ জলাশয়ের মত বাঙালি সমাজে। তাঁকে কেন্দ্র করে বাঙালি সমাজ উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। অথচ আজ তিনি বিস্মৃত। তাঁর জন্মস্থানেও কেউ তাঁকে মনে রাখেনি। তাঁর পৈতৃক ভিটেতেই তিনি আজ অপাংক্তেয়।

উত্তর চব্বিশ পরগণার গোবরডাঙ্গার খাঁটুরা গ্রামের চন্ডীতলায় ১৮৩১ সালে শ্রীশ চন্দ্রের জন্ম হয়। তৎকালীন যুগের বিশিষ্ট কথক রামধন তর্কবাগীশ এর কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন শ্রীশ চন্দ্র। মা সূর্যমনি দেবী। দাদার নাম ছিল গনেশ চন্দ্র। সুখময়ী ছিল বোনের নাম। কথক রামধন ছিলেন সে যুগের তুলনায় অনেক অগ্রসর। খাঁটুরার পন্ডিত ভগবান বিদ্যালঙ্কার এর টোলে ব্যাকরণ ও সাহিত্য পাঠ শেষ করে শ্রীশ চন্দ্র কলকাতায় আসেন। কলকাতায় তাঁদের নিজস্ব বাসস্থান ছিল।

তিনি সংস্কৃত কলেজের ছাত্র শ্রেণিতে ভর্তি হন। মেধাবী ছাত্র শ্রীশ চন্দ্র বিদ্যাসাগরের চোখে পড়েন। বিদ্যাসাগর তখন কলেজের অধ্যক্ষ। সে সময় কলেজের অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন, ভরতচন্দ্র শিরোমণি, প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ, তারানাথ তর্কবাচস্পতি প্রমুখ যশস্বী অধ্যাপকরা। এঁদের সাহচর্যে ও শিক্ষায় শ্রীশ চন্দ্র কলেজের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। বিদ্যাসাগরের ভাই দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন ছিলেন শ্রীশ চন্দ্রের সহপাঠী বন্ধু। বৃত্তি পরীক্ষায় শ্রীশ চন্দ্র সর্বোচ্চ ফল করলে বিদ্যাসাগর তাঁকে নিজে হাতে পুরষ্কার তুলে দেন। কলেজে পড়ার সময় থেকেই বিদ্যাসাগরের সমাজ হিতৈষণা ব্রত শ্রীশ চন্দ্রকে প্রভাবিত করেছিল। কলেজে পড়াকালীন সংস্কারমুক্ত প্রগতিশীল যুবকে পরিনত হন তিনি।

কৃতী ছাত্র ছিলেন শ্রীশ চন্দ্র। তাই শিক্ষা শেষ করে সংস্কৃত কলেজেই তিনি ‘প্রথম সেক্রেটারি’-র দায়িত্ব পান এবং অচিরেই সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এই সময়েই তিনি বিদ্যাসাগরে সাহচর্য পান। শিক্ষক বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠেন যুবক শ্রীশ চন্দ্রের সহকর্মী, বন্ধুস্থানীয় অগ্রজ। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও দেশীয় শিক্ষার টানাপোড়েনে এ সময় বাংলায় দুটি বুদ্ধিজীবি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এরা পাশ্চাত্যবাদী হিউম্যানিস্ট ও ক্লাসিকাল হিউম্যানিস্ট নামে পরিচিত ছিলেন। শেষোক্ত দলের সেনাপতি ছিলেন বিদ্যাসাগর। এই গোষ্ঠীর অন্যতম মুখ ছিলেন শ্রীশ চন্দ্র। যে কোনও সংস্কারকেই এরা দেখতেন দেশের জল মাটি বাতাস এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। কোন উগ্রতাই আখেরে ফল দেয়না, তা বুঝতেন নিজেদের অবস্থান থেকেই।

বিদ্যাসাগরের বাদুড়বাগানের বাড়ি

বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের ঘোর সমর্থক ছিলেন শ্রীশ চন্দ্র। সনাতনধর্মীরা প্রবল বাধা দিলেও বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়ে যায়। বস্তুত এর পরই শ্রীশ চন্দ্র বাঙালি সমাজের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। আইন পাশ হওয়ার কয়েকমাসের মধ্যে বিদ্যাসাগর এমন কোন মুক্তমনা যুবক খুঁজে পেলেন না যিনি বিধবা বিবাহ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। নব্য বঙ্গীয়রা এক্ষেত্রে তাঁকে বেশ খানিকটা হতাশই করেছিল। অবশ্য দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় এর আগে রেজিস্ট্রি বিবাহ করে শোরগোল তুলেছিলেন।

সংস্কৃত কলেজের চাকরি ছেড়ে এই সময় শ্রীশ চন্দ্র জজ পন্ডিতের চাকরি নিয়ে মুর্শিদাবাদে। কলকাতা থেকে অনেকদূরের পথ মুর্শিদাবাদ। সুবে বাংলার রাজধানীতে বসে শ্রীশ চন্দ্র লক্ষ্য করছিলেন সব কিছুই। বিদ্যাসাগরের অনুরোধ গেল তাঁর কাছে, বিধবা বিবাহ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। শ্রীশ চন্দ্র কোনকালেই বাক্যবাগীশ ছিলেন না। কথায় নয় কাজে করে দেখাতে হবে। একবাক্যে তিনি বিদ্যাসাগরের প্রস্তাবে রাজী হয়ে যান।

তিনি জানতেন এই কাজ কতটা কঠিন। কিন্তু বিদ্যাসাগর বলেছেন যে! শ্রীশ চন্দ্র গেলেন খাঁটুরায় গ্রামের বাড়িতে মায়ের আশীর্বাদ নিতে। মা রাজি নন। সমাজ তো নয়ই! এদিকে কথা দিয়েছেন। বিয়ের তোরজোর চলছে কলকাতায়। বিয়ের দিন পর্যন্ত ধার্য হয়ে গেছে। নানা কথা উঠছে চারপাশে। বিরুদ্ধবাদীরা বসে নেই। শ্রীশ চন্দ্র বিয়ে করবেন না বলে গুজব উঠল। কাগজে শুরু হল নানা গল্প-কথা। মেয়ের মা গেলেন আদালতে, বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে মামলা করতে। এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা। বিধবার বিয়ে হল। শ্রীশ চন্দ্র ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। কথায় নয়, কাজে। বিদ্যাসাগরের মান রাখলেন শ্রীশ চন্দ্র। পরে দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ‘সুরধনী’ কাব্যে শ্রীশ চন্দ্র সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘সাহিত্য সবিতা শ্রীশ সুমিষ্ট পাঠক/বিধবা সধবা করা পথ প্রদর্শক’।

বিদ্যাসাগরের অনুরোধে তৎকালীন বাংলার ছোটলাট হ্যালিডে সাহেব বিধবা বিবাহের পুরস্কার স্বরূপ শ্রীশ চন্দ্রকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ করেন। তিনি বনগাঁর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হলেন। তখনকার সমাজ শ্রীশ চন্দ্রকে পরিত্যাগ করলেও কালীমতিকে নিয়ে তিনি সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন।কিন্তু বিধি বাম। কালীমতি পড়লেন কঠিন অসুখে। কোন চিকিৎসাই তাকে সুস্থ করতে পারলনা। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই কালীমতি কোন সন্তান না রেখে মারা গেলেন। রেখে গেলেন বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী উদাহরণ।

পত্নী বিয়োগে কিছুটা মুষড়ে পড়েন শ্রীশ চন্দ্র। সমাজের চাপ ছিল। এদিকে বিধবা বিবাহ তেমন কোন সাড়া ফেললো না। অথচ এই বিয়ের জন্য কত নিন্দা এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

বন্ধুরা অনেক দূরের মানুষ, বিদ্যাসাগর নানান কাজে ব্যস্ত। কিছুটা আপস করে সমাজে ফিরলেন শ্রীশ চন্দ্র। প্রায়শ্চিত্ত করে পুনরায় সমাজভূক্ত হলেন। এই কাজ তিনি করেছিলেন অনুতপ্ত হয়ে নয়, সমাজে দাঁড়াবার মত স্থান করে নিতে। এমন সঙ্কট সময়েও তিনি বিদ্যসাগরের অনুরোধে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ভার্সেলিন শহরে টাকা পাঠান।

১৮৭০ সালে ‘গোবরডাঙ্গা’ পৌরসভা হলে তিনি এর প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। গোবরডাঙ্গা, খাঁটুরা ছিল বসিরহাট মহকুমার সাথে যুক্ত। বসিরহাট যাওয়া আসার অসুবিধা, কষ্ট ও অর্থ খরচের জন্য তাঁর চেষ্টায় বারাসতে মহকুমা স্থাপিত হয় এবং গোবরডাঙ্গা তার সাথে যুক্ত হয়। গোবরডাঙ্গায় রেলপথ স্থাপনেও শ্রীশ চন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। অনুমানিক ১৩০০ বঙ্গাব্দে শ্রীশ চন্দ্রের মৃত্যু হয়। শেষ জীবনে মায়ের নামে এক শিবমন্দির বানান তিনি। এখনও সেই স্মৃতি চিহ্ন বহন করছে শ্রীশ চন্দ্রের লেখা কথা, ‘সূর্যমণিরগ্রজনুঃ রামধন গেহিনী/শ্রীশজননীশ যুগমত্র সমতিষ্ঠিপৎ’। শোনা যায় শ্লোক রচনা করে তিনি বিদ্যাসাগরের কাছে পাঠিয়েছিলেন সংশোধনের জন্য। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘শ্রীশের রচনা আর দেখিতে হইবে না’।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev