আজ শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় সোমবার। শ্রাবণ মাসকে দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনার জন্য অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে ভগবান শিবের অসংখ্য মন্দির রয়েছে। মন্দিরগুলিতে সাধারণত শিবলিঙ্গে শিবের পূজা করা হয়।
শিবলিঙ্গ হল পরমেশ্বর শিবের নির্গুণ ব্রহ্ম সত্বার একটি প্রতীকচিহ্ন (Symbol)। ধ্যানমগ্ন শিবকে এই প্রতীকের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। লক্ষ করলে দেখা যায় কিছু না কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রত্যেক মন্দিরেরই আছে।
আজ বলবো এমন একটি মন্দিরের কথা যেটি দিনের মধ্যে অন্তত দুইবার সাগরের জলে ডুবে যায়। স্থানীয় লোকেদের কাছে এটি ‘গায়েব মন্দির’ নামে পরিচিত। ১৫০ বছরের এই পুরোনো মন্দিরটি তীর থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে আরব সাগর এবং ক্যাম্বে উপসাগরের মাঝখানে অনন্যভাবে অবস্থিত। মন্দিরটির অদ্ভুত অবস্থানের জন্য এটিকে ভারতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম।

মন্দিরটি গুজরাটের ভরোচ জেলায় অবস্থিত। ভদোদরা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। মন্দিরের আরাধ্য দেবতা স্তম্ভেশ্বর মহাদেব। সমুদ্রের তটে অবস্থিত হওয়ায় এখানে সমুদ্রদেবতা প্রতিদিন মন্দিরে ভগবান স্তম্ভেশ্বরের জলাভিষেক করে থাকেন। সমুদ্রে নিয়মিত জোয়ার ভাটার সময় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। জোয়ারের সময় সমুদ্র জলমগ্ন হয়ে গেলে, মন্দিরে সঙ্গে সঙ্গে শিবলিঙ্গও জলের তলায় চলে যায়। তট থেকে তখন মনে হয় মন্দিরটি গায়েব হয়ে গিয়েছে। এই সময় মন্দিরের কাছে কেউ পৌঁছাতে পারেন না।
আবার ভাটার সময় যখন সমুদ্রের জল যখন দূরে সরে যায়, তখন মন্দির ও শিবলিঙ্গের দর্শন মেলে।এই কারণেই দিনের মধ্যে দুবার সকাল ও সন্ধ্যায় মন্দির সমুদ্রে গায়েব হয়ে যায়। এই ঘটনা অতীতকাল থেকেই ঘটে আসছে।
অতীতে একমাত্র নদী ও মন্দির পরিক্রমাকারী সাধু সন্ন্যাসী ও কিছু গ্রামবাসী এই মন্দিরের কথা জানতেন। বিগত দেড়শ বছর আগে কিছু লোকজন জানাজানি করতে এই ঘটনা সর্বসম্মুখে আসে। মন্দিরের এই অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হতে দেশ-বিদেশ থেকেও বহু দর্শনার্থী এখানে ছুটে আসেন।
মন্দির দর্শন করার জন্য পুরো একদিন সময় হাতে রাখতে হয়। মন্দিরে পৌঁছতে পরচা লাগে তবে পরচা সংগ্রহ করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। কাছেই মন্দির কমিটির কার্যালয় থেকে এটি পাওয়া যায়। এখানে সমুদ্রের জোয়ার ভাটার সময় উল্লেখ করা থাকে, যাতে ভক্ত দর্শনার্থীদের কোনো রকম অসুবিধায় পড়তে না হয়।
এই তীর্থের কথা মহাশিব পুরাণের রুদ্রসংহিতার দ্বিতীয় ভাগের একাদশ অধ্যায়ে পাওয়া যায়। পুরান বলে — তারকাসুর কঠিন তপস্যা করে শিবকে প্রসন্ন করলেন। শিব প্রসন্ন হয়ে প্রকট হলেন এবং বর প্রার্থনা করতে বললেন। তারকাসুর শিবের কাছে অমরত্বের বর প্রার্থনা করলেন কিন্তু শিব বলেন চিরকাল বেঁচে থাকার অধিকার তিনি কাউকেই দিতে পারেন না অতএব ‘অন্য কিছু চাও’। কিন্তু তারকাসুর অমরত্বের জন্য নাছোড়বান্দা।

অবশেষে তারকাসুর একটু বুদ্ধি খাটিয়ে চালাকি করে শিবকে বললেন, শিব পুত্র কার্তিকেয় ছাড়া ত্রিভুবনের আর কেউই তাকে বধ করতে পারবেন না। শুধু তাই নয় তাকে বধ করতে হলে কার্তিকেয়র বয়স হতে হবে মাত্র ৬ দিন।
শিব একটু মুচকি হেসে বললেন — তথাস্তু।
বর পেয়েই তারকাসুরের আনন্দের শেষ নেই। শুরু করলেন ভয়ংকর অত্যাচার। চারিদিকের মানুষজন, দেবতা মুনি ঋষি সকলেই আতঙ্কিত হয়ে হাহাকার রব তুললো। পরিত্রাণের পথ পেতে দেবতা মুনি ঋষি সকলেই শিবের শরণাপন্ন হলেন।

শিবের শক্তিতে শ্বেত পর্বতের কুণ্ড থেকে ছটি মাথা, চারটি চোখ ও বারটি হাত নিয়ে জন্ম নিলেন শিবপুত্র কার্তিকেয়। মাত্র ৬ দিন বয়সেই কার্তিকেয় তারকাসুরকে বধ করেছিলেন।
কার্তিকেয় কেউ যখন জানতে পারলেন তারকাসুর ভগবান শিবের ভক্ত তখন তার হৃদয় অপরাধবোধে ভরে উঠলো। তখন ভগবান বিষ্ণু কার্তিকেয়কে পরামর্শ দিলেন তারকাসুরের বধ্যস্থলে শিবালয় নির্মাণ করে শিবলিঙ্গের পূজার্চনা করতে। তাকে সাহায্য করার জন্য দেবতারাও এগিয়ে এলেন।সকলে মিলে ‘মহিসাগর সঙ্গম’ তীর্থে বিশ্বনন্দক স্তম্ভ স্থাপন করলেন, যেটি স্তম্ভেশ্বর তীর্থ নামে পরিচিত হয়। ভক্তদের বিশ্বাস কার্তিককেও দ্বারা স্থাপিত এই মন্দিরের শিবলিঙ্গ দর্শন মাত্রই সকলের সব কষ্ট দূর হয়ে যায় ও মনস্কামনা পূরণ হয়ে থাকে।

ভগবান শিব হলেন প্রাচীন শহর স্থানেশ্বরের প্রধান দেবতা, যা এখন কুরুক্ষেত্র নামে পরিচিত। কথিত আছে, পাণ্ডবদের সাথে ভগবান কৃষ্ণ এখানে শিবের পূজা করেছিলেন এবং মহাভারতের মহান যুদ্ধে তাদের আসন্ন বিজয়ের জন্য তাঁর আশীর্বাদ পেয়েছিলেন।এই পবিত্র স্থান পরিদর্শন ছাড়া কুরুক্ষেত্রের তীর্থযাত্রা অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়।
বর্তমান মন্দিরের কাঠামোটি মারাঠা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সদাশিবরাও ভাউ ভট্ট তৈরী করেছেন বলে জানা হয়। সম্ভবত পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের আগে কুঞ্জপুরায় আহমেদ শাহ আবদালির বিরুদ্ধে তাঁর বিজয়ের স্মরণে তিনি এটি নির্মাণ করেছিলেন।
মন্দিরের শিবশিলঙ্গটি উচ্চতায় ৪ ফুট, ব্যাস দুই ফুট। শিবলিঙ্গের আভা পীতযুক্ত। শিবলিঙ্গে নিত্য পূজাঅর্চনা ছাড়াও শিবরাত্রি ও প্রতি অমাবস্যায় তটেতে মেলা বসে। তখন সারারাত ধরে শিবের চার প্রহর আরাধনা হয়।
শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় সোমবার পুজোর শুভ মুহূর্ত শুরু হবে সন্ধ ৭টা ২৩ মিনিট থেকে রাত ৯টা ২৪ মিনিট পর্যন্ত। এছাড়া নিশীথ কাল মুহূর্তে থাকবে রাত্রি ১১.৫৩ থেকে ১২ : ৪১ অবধি। মহাদেবের দর্শনে ভক্তের সকল সংশয় নিমিষে দূর হয়। এটিই প্রভুর অঘোষিত বরদান।
নমঃ শিবায় শান্তায় কারুণাত্রায় হেতবে।
নিবেদিতামি চাত্মানং ত্বং গত্বিং পরমেশ্বর॥
কি অদ্ভুত না!
মনে হচ্ছে এক্ষুনি গিয়ে দেখে আসি।
একদম তাই। এমনই মাহাত্ম্য এই শিব মন্দিরের
বাহ্ খুব সুন্দর ও অজানা অনেক কিছু জানতে পারলাম ???? হর হর মহদেব ????