অকালে চলে গেল ছেলেটা। মাত্র তেতাল্লিশে। আমাদের মতো শ্মশানের ডাক শোনার লোকেদের যদি দেওয়ার ক্ষমতা থাকত, কিছুটা বয়েস দিয়ে দিতাম ছেলেটাকে। আহা, বাঁচুক আর একটু। আমরা তো অনেকদিন ভোগ করলাম বসুন্ধরা, এবার ওদের পালা।
কারণ ওর দেওয়ার কিছু ছিল। শিল্পী ছিল সে, সহিষ্ণু ছিল, অকারণ গাম্ভীর্যের মুখোশ সরিয়ে হাসতে জানত ছেলেটা। মানুষের কাছ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেয় নি স্টারডামের অহমিকা। ছিল একটা মতাদর্শ। কিন্তু সেটা অন্ধ ছিল না উগ্রতায়। শুধু বলার উচ্ছলতা নয়, ধৈর্য ছিল শোনারও। সহৃদয় হৃদয় সংবাদ।
মৃতদেহ এল তার। পক্ষ-বিপক্ষের লোকেদের ভিড়। সেখানে ছোঁয়া লাগল ভোটবাবাজির। গণতন্ত্র রক্ষার শপথ যে সকলেরই। তাই একে অপরকে অগণতান্ত্রিক কটুক্তি। তর্ক বিতর্ক। উচ্চকিত কণ্ঠস্বর। এর মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর গাম্ভীর্য।
এমনিতে জনাকীর্ণ শহরে মৃত্যু তার সব গাম্ভীর্য, সব রহস্য, সব বেদনা হারিয়ে বসেছে। এক মৃত্যুর দর্পণে হাজির হয় না আমাদের নিজেদের মৃত্যু।
কথা উঠেছে মৃত্যুটা ঘটনা না দুর্ঘটনা। সেখানেও নানা মুনির নানা মত। কত ছবি। সকলের হাতে স্মার্ট ফোন। ফটো ফটো। কখনও ইউটিউবে, কখনও ফেসবুকে। দৃশ্যপট থেকে যারা আছে দূরে, তারা তো ঘাবড়ে ঘোড়া। কাকে মানবে! কোনটা বিশ্বাস করবে। বিচারের কথা বলছে অনেকে। কে যেন বলেছিলেন যে আমাদের বিচারব্যবস্থা আইনজীবীদের স্বর্গ?
উত্তেজনার আগুন স্তিমিত হবে অবশেযে।
ছেলেটা ছাই হয়ে মিলিয়ে যাবে।
আমরা অন্য কথা বলব। অন্য কিছু নিয়ে মাতব বিতর্কে। উত্তেজনার আগুন পোহাব অন্য কিছুতে। অস্বাভাবিক নয়। ফিকে হতে থাকবে ছেলেটার মৃত্যুর রঙ। জমবে ধুলো তানপুরাটার তারগুলোয়। নিস্পৃহভাবে স্মৃতিচারণ করবে কেউ কেউ।
কিন্তু ছেলেটার ছেলেটা? যে সবে শৈশবের সিঁড়ি থেকে কৈশোরে গেল, তার বুকের ভেতরে তৈরি হবে যে শূন্যতা, তার উপর প্রলেপ দিতে পারবে না কেউ।
আর ছেলেটার মা? তার বুকের ভেতরে জ্বলবে অনির্বাণ রাবণের চিতা। দুনিয়ার কোন শান্তিবারি নেভাতে পারবে না সে চিতার আগুন। আমি জানি। আমি দেখেছি আমার ঠাকুরমাকে।
হায় রে! মানুষ যদি তার আত্মীয় বা বন্ধুজনের মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে নিজের মৃত্যুর দৃশ্য দেখতে পেত, তাহলে পৃথিবীতে বিবাদ-বিসম্বাদ মিলিয়ে যেত অনেকটা।
আপনার লেখা ছোটবেলা থেকেই এমন একটা টান অনুভব করি,যা আজও আমার মনকে নাড়া দেয়।সেই ক্লাস নাইন থেকে এখন 55 পেরিয়ে ও ঔৎসুক থাকি কোন বিষয়ে আপনার মতামত জানার জন্য। আমি গর্বিত ছাত্র হিসাবে আপনার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। ভাল থাকবেন স্যার।
যাক , তোর একটা মন্তব্য পাওয়া গেল । ছাত্র হলেও এখন তুই আমাদের অভিভাবক ।