দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষি শুধু বাণিজ্য নয়, কৃষি অর্থে পরম্পরা রক্ষা, কৃষ্টি সাধন এবং দেশের সর্ববৃহৎ কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রও বটে। আজ আধুনিকেরা ন্যানো টেকনোলজি নিয়ে গর্ব অনুভব করলেও দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষি ন্যানো ইকনমি তৈরি করেছিল এবং তার ভিত্তিই ছিল কৃষি আর খাদ্যের ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলাপমেন্ট একশন। ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে মানব সম্পদ অবাঞ্ছিত। বাজারবাদ মানুষকে শুধু ভোক্তা বা ক্রেতা হিসেবে দেখাতে চায়। ফলে সমাজে তীব্র ক্ষত তৈরি হয়। তাই আধুনিক সমাজে জীবন্ত মানুষের থেকে মৃতদেহ অনেক আকর্ষণের। বাজার আর রাষ্ট্রের মেলবন্ধনে মানুষ ব্যতিব্যস্ত, বিব্রত। এখন সময় হয়েছে আত্মসমীক্ষার।

বিকেন্দ্রিভূত অর্থনীতি নিয়ে আলাপ আলোচনা খুব তাড়াতাড়ি শুরু করা দরকার। তাহলে সম্ভাবনাময় পরম্পরার কৃষি ও খাদ্যের ইন্টিগ্রটেড ব্যবস্থা নতুন করে ফিরে আসতে পারে। এটা ফিরিয়ে আনা জরুরি কারন এই দাবিটা শুধু সময়োপযোগিই নয়, এটা যুগধর্মও বটে। দক্ষিণ এশিয়ায় বিপুল বৈচিত্রের কৃষি-জলবায়ু এলাকাই আমাদের খাদ্য কৃষ্টির বৈচিত্রের প্রাণ। মানুষ এই বৈচিত্র নির্ভর করে নিজের মত করে খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য গ্রহণের ধারণা তৈরি করেছিল। আমাদের মূল সমস্যা খাদ্য উৎপাদন বা সঞ্চয় নয়, যাদের কাছে খাদ্য পৌঁছয় না, তাদের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া। প্রয়োজন মানুষের দৈহিক, মানসিক, পরমার্থিক এবং আর্থিক সম্পন্ন বিকাশ। এটা একমাত্র সম্ভব বিকেন্দ্রিভূত পরম্পরার কৃষির মাধ্যমে। যে যেরকমই শ্রম দিক না কেন সে যেন তার প্রয়োজনীয় খাদ্য পাবার গ্যারান্টি পায়।

দেশিয় এবং বিষমুক্ত নিরাপদ কৃষিতে অপচয় প্রায় হয় না বললেই চলে। ফলে আলাদা করে পরিবেশ-বান্ধব প্রকল্প নেওয়া দরকার হয় না। কৃষি থেকে কৃষ্টি শব্দের উদ্ভব। ফলে জীবনের প্রয়োজনের সব কিছুই কৃষি থেকেই পাওয়া সম্ভব। এই কৃষ্টিতে আগাছা, কীটনাশক, জিন প্রযুক্তির বীজ, তেলে চলা বিশাল বিশাল কৃষিযন্ত্র এ সবই এই দেশিয় বৈচিত্রপূর্ণ কৃষিতে অপ্রয়োজনীয়, বাহুল্য শুধু নয় কৃষির স্বতঃস্ফূর্ততাকে মনন হীন যান্ত্রিকতা ধ্বংস করছে। স্বনির্ভর কৃষি এখন কৃষিযন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছে। তাই আমাদের বেশ কিছু প্রকল্প নিতে হবে —
১। দেশিয় বীজের নতুন করে ব্যবহার, প্রচার এবং সংরক্ষণ
২। প্রাকৃতিক কৃষির বিপুল প্রসার প্রচার আর রক্ষা
৩। গরু নির্ভর দেশিয় কৃষির পুনঃপ্রবর্তন, যাতে কৃষি জমির পুষ্টি, খাদ্য এবং সমৃদ্ধির চূড়ান্ততা নিশ্চিত করা যায়
৪। খাদ্য বৈচিত্র্যকে জোরদার করা
৫। খাদ্যাভ্যাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
৬। মাঝারি আর প্রান্তিক কৃষকের ফসল আর জমির মালিকানা নিশ্চিত করা
৭। কৃষি এবং খাদ্য উৎপাদনে কর্মের সুযোগ নতুন করে তৈরি করে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
৮। কৃষি আর খাদ্য উৎপাদনকে যতদূর সম্ভব ক্ষমতার প্রভাব থেকে দূরে রাখা
৯। বাজারে অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যতটা পারা যায় নিরুৎসাহ করা
১০। পরম্পরার কৃষিতে কার্বন ক্রেডিটের সুযোগ নেওয়া
১১। বিকেন্দ্রিভূত অর্থনীতিকে গ্রামে জোরদার করা

১২। গ্রাম নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি করা। এখান থেকে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, এবং বাজার জাত করাকে উৎসাহ দেওয়া।
১৩। খাদ্য উৎপাদনে খাদ্যে নতুন মূল্যমান যুক্ত করে গ্রামের আরও বেশি কর্ম নিশ্চয় করা
১৪। গ্রামের বাস্তুতন্ত্রের বিকেন্দ্রিভূততা নিশ্চিত করা, তাকে আইনি নিরাপত্তা দেওয়া
১৫। কৃষিজমির সংরক্ষণ এবং জমির পুষ্টি আর ওষধিগুণ নিশ্চয় করা
১৬। জলাভূমির সংরক্ষণ এবং তাতে জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদের অধিকার নিশ্চয় করা
১৭। বনাঞ্চল সংরক্ষণ করে প্রাণবৈচিত্র নিশ্চয়তা করা
১৮। খাল, ডোবা, পুকুর, বিল ইত্যাদি জলাশয়ের অস্তিত্ব নিশ্চয় করে তাতে দেশিয় প্রজাতির জলচর থাকার অধিকার নিশ্চয় করা
১৯। কৃষকের আত্মসম্মান এবং স্বাবলম্বন নিশ্চয় করা
২০। পরম্পরার কৃষককে উৎপাদন প্রক্রিয়া ধরে রাখার জন্যে তাকে আইনি রক্ষা কবচ দেওয়া

২১। পরম্পরার খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে ইনস্পেক্টর রাজ এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে পরীক্ষা ইত্যাদির অনাবশ্যক জটিলতা থেকে মুক্ত করা
২২। পারম্পরিক কৃষির জন্যে আলাদা ত্রিস্তরীয় শিক্ষা ব্যবস্থা এবং গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করা
২৩। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকস্তর পর্যন্ত পরম্পরার কৃষি আর স্বাস্থ্য অন্তর্ভূক্ত করা
২৪। শহরের প্রতিটি পৌর এলাকায় নিরাপদ খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র তৈরি করে উৎপাদন ব্যয়ের ৫০% বেশি যাতে কৃষক পায় সেটা নিশ্চয় করা
২৫। পঞ্চায়েতে কম করে ১০ একর জমিতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করে প্রতি ফসল চক্রে ৫% দাম বৃদ্ধি নিশ্চয় করা
২৬। পরম্পরার বীজ গবেষণা এবং বীজ ব্যাঙ্ক নির্মাণ করা
২৭। বছরে দু-বার বিধানসভা এবং কেন্দ্রিয় সংসদে কৃষির জন্যে আলাদা অধিবেশন নিশ্চিত করা
২৮। পরম্পরা কৃষির আলাদা বাজেট বরাদ্দ করা
২৯। রাজ্য এবং কেন্দ্রিয় প্রশাসনের সর্বস্তরে নিরাপদ কৃষি এবং খাদ্যর জন্যে আলাদা মন্ত্রক এবং দপ্তর তৈরি করা।