দক্ষিণ এশিয়ায় আজও দাঁড়িয়ে থাকা সর্বপ্রাচীন কাঠামো কিন্তু বৌদ্ধদের তৈরি। এরকম আরও প্রায় জানা-অজানা তথ্য ব্যবহার করে তৈরি করব আজকের বক্তব্য বয়ানের খসড়া।
সারনাথের পাহাড়ে সেদিনের হরিনবাগান ইসিপত্তনে আজ থেকে ২৫ শত বছর আগে যখন অষ্টমার্গের বৌদ্ধিক উপলব্ধি উতসারিত করছেন, গৌতম বুদ্ধ তখন মাত্র ৩৫। ইসিপত্তন মহা-রেশম পথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। বিশ্ব ইতিহাসে দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে গৌতমের উপলব্ধি বিশ্বজোড়া মানুষকে শান্তি, প্রজ্ঞা, পবিত্রতা এবং আত্মোপলব্ধি খুঁজতে প্রণোদিত করবে। মাথায় রাখতে হবে তিনি আগামী ৪৫ বছর ধরে সারনাথকে কেন্দ্র করে খুব বেশি হলে ৩০০ কিমি পরিধি বৃত্তের মধ্যেই ধ্যানযোগে পাওয়া উপলব্ধিগুলো জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। তাহলে তার বাণী, শিল্প, দর্শন এবং জীবনযাত্রা কীভাবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল? বৌদ্ধ শিল্পকলা বলতে আজ যা বুঝি, তার উতপত্তি কী বুদ্ধের প্রয়াণের পরেই ঘটেছিল? নাকী তার জীবিতকালেই।

ইতিহাস স্বীকার করে না, বুদ্ধ স্বয়ং শিল্পকলায় খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চান নি। আনন্দ কুমারস্বামী ১৯১৮-য় বুদ্ধিস্ট প্রিমিটিভ প্রবন্ধে বলছেন বুদ্ধের প্রয়াণের পর বৌদ্ধপন্থ, তাঁর দর্শন অনুসরণ করে শিল্পকলাকে বৌদ্ধ দর্শনের মধ্যে অঙ্গীভূত করতে চায় নি; সে বিষয়ে খুবই বৌদ্ধরা কঠোর অবস্থান নিয়েছে – The arts were looked upon as physical luxuries and loveliness a snare (চারুকলাকে শারীরিক বিলাসিতা হিসেবে এবং সৌন্দর্যকে ফাঁদ হিসেবে দেখা হয়েছিল)। দশধম্মসূত্ত উদ্ধৃত করে কুমারস্বামী বলছেন, Beauty is nothing to me, neither the beauty of the body nor that that comes of dress (আমার কাছে সৌন্দর্য অপ্রয়োজনীয়, শরীরের সৌন্দর্যও অপ্রয়োজনীয়, পোশাকের সৌন্দর্যও তাই)। সাঁচির স্তুপে এই দর্শনের প্রকাশ দেখি কারুকাজ ছাড়া সাধারণদর্শনের রেলিং-এ। সামগ্রিক স্তপ সজ্জার সাধারণত্ব এই দর্শনের পরিচয়বাহী। তবে সাঁচিতে কিছু অসাধারণ শিল্পকলার অস্তিত্ব লক্ষ্য না করে পারি না, কারুকার্যময় ইটের ওপর ঝুঁকেপড়া আবেদনময়ী যক্ষিণী বা স্তপের ঢোকার সূক্ষ্মকাজের তোরণ ইত্যাদি – কিন্তু সে সব কাজ সীমিত আকারের। আমরা বলতে পারি, সাঁচি আদতে বৌদ্ধমঠের সাধারণত্বের সঙ্গে পৌত্তলিক দর্শনের মিশ্রণ। কুমারস্বামী লিখছেন In the omission of the figure of the Buddha the Early Buddhist art is truly Buddhist: For the rest, it is an art about Buddhism, rather than Buddhist art (প্রথম যুগের বৌদ্ধ শিল্পকল্পায় বুদ্ধ মূর্তির অনুপস্থিতি আদতে বৌদ্ধ দর্শনের অনুসারী; তার পরে যা হয়েছে সেগুলি বৌদ্ধ শিল্প নয় হয়েছে বৌদ্ধপন্থভিত্তিক শিল্পকলা)।

বৌদ্ধ শিল্পকলা বিকশিত হতে শুরু করে গান্ধারে, ২য় খ্রিঃপূঃতে। কুশানদের নিয়ন্ত্রণে রেশমপথ বাণিজ্যের পথ ধরে বিকশিত হয় মহাযানপন্থ — ভারতবর্ষ ছাড়াও মহাযানপন্থ ছড়িয়ে পড়ে চিন, জাপান, কোরিয়ায়। কুশানেরা রাজনীতির সঙ্গে শিল্পকলার মেলবন্ধন ঘটায়। কুশানেরা গ্রিসিয়, পারসিক, চৈনিক, ভারতীয় শিল্পকে মিলিয়ে মিশিয়ে গড়ে তুলল গান্ধার শিল্পকলা। কুমারস্বামী লিখছেন, two worlds of spiritual purity and sensuous delight need not, and perhaps ultimately cannot, be divided (আধ্যাত্মিক শুদ্ধি এবং আবেদনময় তুরীআনন্দ — এই দুই বিশ্বকে সম্ভবত আলাদা করা যায় না)।
মাথায় রাখতে হবে কুশান নামে কোনও জাতি ছিল না, চিনে আজকে যাদের গানশু যাযাবর নামে চিনি, তারাই পরবর্তীকালে কুশান নামে পরিচিতি লাভ করেছে; তারা কোনও কারনে বাধ্য হয় চিন থেকে বেরিয়ে, রেশমপথ ধরে আজকের আফগানিস্তান, উত্তর ব্যাক্ট্রিয়াতে আসতে। সে সময় আলেকজান্ডারের উত্তরাধিকারী প্রথম ডিমেট্রিয়াস ভারতবর্ষজয়ের চিহ্ন হিসেবে মাথায় হাতির মুখোশ পরে রাজত্ব করতেন। কুশানরাজ কুজুল কদফিস প্রথম ব্যাক্ট্রিয়া দখল করে ইন্দো-গ্রিসিয় রাজত্ব অধিকারে নেন। ক্রেগ বেঞ্জামিন এম্পায়ার্স অব এনসিয়েন্ট ইউরেশিয়ায় লিখছেন এই প্রথম কোনও একটা ঘটনা, কুশান রাজত্ব তৈরির বর্ণনা একসঙ্গে তিনটে দেশের ইতিহাসে — পূর্ব (চিনা) আর পশ্চিমি (গ্রিসিয়) ঐতিহাসিকেরা লিপিবদ্ধ করলেন।

রিচার্ড ল্যানয় The Speaking Tree : A Study of Indian Culture and Society-তে লিখছেন বুদ্ধের রাজধানী কপিলাবস্তু মোটেই দেশ বিচ্ছিন্ন, ব্যবসা বিচ্ছিন্ন, পাহাড়বদ্ধ রাষ্ট্র ছিল না বরং সে উত্তরাপথে যুক্ত ছিল The Uttarapatha, linked the rich iron and copper deposits of the eastern Ganges region with the civilization of western Asia, bringing wealth to the merchants of Kapilavastu (কপিলাবস্তুর বণিকেরা উত্তরাপথ (উত্তরভারতের) পূর্ব গাঙ্গেয় অঞ্চলের সমৃদ্ধ লোহা ও তামার আকরিককে পশ্চিম এশিয়ার সভ্যতায় পাঠিয়ে নিজেদের সম্পদশালী করেছে)। মাথায় রাখতে হবে বুদ্ধ যখন আবির্ভূত হচ্ছেন, তখন চিনে তাও দার্শনিক, লাও জু এবং গ্রিসে হেরাক্লিটাসও আবির্ভূত হচ্ছেন।

বিশ্বজুড়ে রেশমপথের বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়ছে। আকাইমিডিয়রা গ্রিসে আক্রমন করে আলেকজান্ডারের এশিয়া আসার স্পৃহা বাড়িয়ে দিচ্ছেন এবং আলেকজান্ডারের এশিয়া আক্রমণের পরে ভারতে বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্য তৈরি করছেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। চন্দ্রগুপ্তের নাতি অশোকের হাত ধরে বিশ্ববৌদ্ধপন্থে রূপান্তরিত হতে শুরু করল। অশোক ছেলে, আর মেয়েকে নানান দেশে পাঠালেও তিনিও যথেষ্ট ছিলেন না বৌদ্ধপন্থের বিশ্বের সমুখে পৌঁছনোয়। কুশানদের হাত ধরে বৌদ্ধপন্থের বিশ্বপরিচিতি তৈরি হয়। কুশানেরা নিজেদের যুথ কৃষ্টি চরিত্র লুকিয়ে ফেলে চারটে মহান সভ্যতার মৌলিক রেণুগুলি নিজেদের দর্শনে মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরি করল গান্ধার শিল্প। কুশান রাজত্বের বিখ্যাত রাজা ছিলেন, কুজুল কদফিসের নাতি কণিষ্ক। তিনিই প্রথম বুদ্ধেকে মানবাকারে ছাঁচে ঢাললেন — ঠিক যেমন করে বাংলায় মুঘল আমলে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ঘটে পটে প্রায় নিরাকার দেনপুজোকে মূর্তিতে রূপান্তরিত করেন।

একদিকে আফগানিস্তানের গান্ধার অন্যদিকে পূর্ব অঞ্চলের মথুরা। এই দুই কেন্দ্র থেকে বৌদ্ধ শিল্পকলা রেশম পথ ধরে শ্রীলঙ্কা থেকে জাপান থেকে কোরিয়া হয়ে ভিয়েতনাম পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। তাদের হাত ধরে তৈরি হল স্তুপের কৃষ্টি। কণিষ্কের সময়ে বিপুল আকারে বৌদ্ধপন্থভিত্তিক বইএর অনুবাদ শুরু হল। ৫ এবং ৭ শতকে ভারতবর্ষে তীর্থ করতে এবং জ্ঞান আহরণ করতে আসা দুই চৈনিক শ্রমণ ফাহিয়েন এবং হিউ-এন-সাং ভারতজুড়ে কয়েক হাজার স্তুপের কথা বলেছেন। কুশান যুগে শুরু হল বিশ্বজুড়ে বুদ্ধমূর্তি তৈরির আন্দোলন।

সুইস শিল্পী, পণ্ডিত, জ্ঞানী এলিস বোনার বারানসীতে ১৯৩০-এর দশক থেকে ১৯৮১-তে মৃত্যু পর্যন্ত তার জীবন অতিবাহিত করেছেন। তিনি বলছেন বুদ্ধের মূর্তিগুলো শৈল্পিক সৌন্দর্যের জন্যে তৈরি হয় নি, বরং তৈরি হয়েছিল শিল্পীর ধ্যান আর আত্মিক জ্ঞানের মিলিত সঙ্গমে। শিল্পী যখন পদ্মাসনে বসা বুদ্ধের ছবি আঁকেন বা মূর্তি তৈরি করেন, সেটি নান্দনিকতায় অপূর্বরূপ লাবন্যে ভরপুর, কিন্তু তার মূল আবেদন ধ্যানে। এই আবেদনটি কিন্তু কুশানযুগেই উদ্ভুত হয়েছে।
Darun.
ভীষন প্রয়োজনীয়