‘যত মত তত পথ’-এর স্রষ্টা শ্রীরামকৃষ্ণ আজও মানুষের কাছে জীবিত। প্রতি বছর দুর্গা পুজোয় সূক্ষ্মদেহে অবতীর্ণ হন ভাগ্নে হৃদের বাড়িতে। কামারপুকুরের পাশ্ববর্তী সিহড় গ্ৰামে তাই প্রতি বছর দুর্গা পুজোয় শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদ পেতে ছুটে আসেন অসংখ্য ভক্ত। হুগলি ছাড়াও বাঁকুড়া, বর্ধমান, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে ভিড় জমান সিহড় গ্ৰামের দুর্গা পুজোয়। ঠাকুর রামকৃষ্ণর ভাগ্নে হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায় ১৮৬৮ সালে তাঁর সিহড় গ্রামের বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন। সেই পুজোয় ঠাকুর রামকৃষ্ণ সূক্ষ্মদেহে উপস্থিত ছিলেন। ঠাকুর নিজ মুখে তাঁর ভাবশরীরে উপস্থিত থাকার কথা জানিয়েছিলেন। প্রথম তিন বছর প্রতিমা এনে পুজোর আরাধনা করেন হৃদয়। রামকৃষ্ণের কথামতো পরম্পরা মেনে তারপর মন্দিরে দেবীদুর্গার পটচিত্রে পুজো হয়। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, ঠাকুর সূক্ষ্মদেহে এই পুজোয় এখনও উপস্থিত থাকেন।

ঠাকুর ও তার ভাগ্নে এই ঘরটিতে কাটিয়েছেন অনেকটা সময়
শ্রীরামকৃষ্ণের ৫১ বছরের নরলীলায় হৃদয়রাম ১৮৫৫ থেকে ১৮৮১ সাল অর্থাৎ প্রায় ২৬ বছর ছিলেন মামার সর্বক্ষণের সঙ্গী। সেদিক থেকে তিনি ছিলেন এক দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী। তাই ঠাকুরের কাছে হৃদয়রাম কখনো হৃদে, আবার কখনও বা হৃদু। ঠাকুর রামকৃষ্ণের সাধন-জীবনে হৃদয় ছিলেন তাঁর মামার প্রধান সেবক ও সহায়ক। হৃদয়রাম প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজো করার সিদ্ধান্ত নেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সেই পুজোর সম্মতিও দিয়েছিলেন। যদিও সেই পুজোয় যাওয়া নিয়ে ঠাকুর রামকৃষ্ণ উভয় সঙ্কটে পড়েছিলেন। রানি রাসমণির জামাতা মথুরবাবু শ্রীরামকৃষ্ণকে জানবাজারের পুজো ছেড়ে কোথাও যেতে দিতে রাজি ছিলেন না। তিনি অবশ্য হৃদয়রামের দুর্গাপুজোয় আর্থিক সহায়তা করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। হতাশ ভাগ্নেকে শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘তুই শুধু শুধু দুঃখ করছিস কেন? আমি প্রতিদিনই তোর পুজোয় উপস্থিত থাকব। তবে স্থূল দেহে নয়, সূক্ষ্ম শরীরে। যখনই সূক্ষ্ম শরীরে আমি তোর পুজা দেখতে যাব, তখন আমাকে আর কেউ দেখতে পাবে না, কিন্তু তুই স্পষ্টই দেখতে পাবি’। সেইসঙ্গে পুজো সংক্রান্ত ব্যাপারে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, তুই অপর একজন ব্রাহ্মণকে তন্ত্রধারক রেখে নিজে আপনার ভাবে পুজো করিস এবং একেবারে উপবাস না করে মধ্যাহ্নে দুধ, গঙ্গাজল ও মিছরির শরবত পান করিস। এইভাবে পুজো করলে মা জগদম্বা তোর পুজো নিশ্চয়ই গ্রহণ করবেন।
হৃদয়রাম মামার নির্দেশ ও উপদেশ মতো পুজোর আয়োজন করেন। ষষ্ঠীর দিন দেবীর বোধন, অধিবাসাদি সম্পন্ন হয়। সপ্তমীর রাত্রে দেবীদুর্গাকে আরতি করার সময় তিনি বিস্ময়ে শ্রীরামকৃষ্ণকে সূক্ষ্ম শরীরে দেবী প্রতিমার পাশে ভাবাবিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। পরবর্তীকালে হৃদয়রাম বলতেন দুর্গাপুজোর অবশিষ্ট প্রতিদিনই ওই একই সময়ে এবং সন্ধি পুজোকালে তিনি দেবী প্রতিমার পাশে তাঁর মামাকে জ্যোতির্ময় শরীরে দেখতে পেতেন। বিজয়া দশমীর কিছুকাল পরেই হৃদয়রাম দক্ষিণেশ্বরে ফেরেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে সূক্ষ্মদেহে দেখার কথা বলেন। ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন, আরতি ও সন্ধিপুজোর সময় তোর পুজো দেখবার জন্য বাস্তবিকই প্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠত এবং তারই ফলে আমার ভাব হয়ে গিয়েছিল। তখনই আমি অনুভব করতাম, যেন জ্যোতির্ময় শরীরে তোর চণ্ডীমণ্ডপে উপস্থিত হয়েছি। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হৃদয়রামকে ভাবাবিষ্ট হয়ে বলেছিলেন, পরপর তিন বছর পুজো করার জন্য। ঠাকুরের নির্দেশ মেনেই তিনবছর প্রতিমা পুজো হয়। পরবর্তীকালে পটচিত্রে দেবী দুর্গার পুজো শুরু হয়। হৃদয়রামের নাতি নবতিপর বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, আমার দাদুর সেই পুজো এখনও প্রথা ও রীতি মেনে হয়ে চলেছে। ঠাকুরের নির্দেশমতো তিনবারের পর প্রতিমা পুজো আর হয়নি। পটচিত্রে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু হয়। ১৮৯৯ সালে প্রায় ৫৯ বছর বয়সে দাদু সিহড় গ্রামে পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পরেও ঠাকুরের নির্দেশিত নিয়মনীতি মেনেই পুজোর সব আচার পালন করা হয়।

সিহড়ে ঠাকুর ও হৃদের দুর্গা মন্ডপ
প্রসঙ্গত, বিশ্বনাথবাবুর ছেলে দেবদুলাল মুখোপাধ্যায় বলেন, যে মাটির বাড়িতে ঠাকুর এসে থাকতেন সেই বাড়ি আজও আছে। বাঁকুড়া জেলার কোতলপুর ব্লকের জয়রামবাটি সংলগ্ন ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই পুজোয় দূরদূরান্ত থেকে রামকৃষ্ণ ভক্তরা আসেন। স্থানীয় গ্রামবাসী নয়ন চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমরা বিশ্বাস করি সূক্ষ্ম দেহে ঠাকুর এই পুজোয় এখনও উপস্থিত থাকেন। সেই পুজো আজও চলে আসছে। এবারেও তার কোনও খামতি নেই। আচারপ্রথা মেনে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো পরিবারের সদস্যরা ও ভক্তরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। সেইসঙ্গে ঠাকুর রামকৃষ্ণর সূক্ষ্মদেহে অবতীর্ণ হওয়ার অনুভূতিটুকু পেতে আকুল আবেদনে খামতি থাকবে না।