প্রাকৃতিক দুর্যোগের আভাস আগেই টের পায় প্রাণিজগৎ ঠিক একইভাবে রাজনৈতিক হাল, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ব্যবসাবাণিজ্যের গতি প্রকৃতির পূর্বাভাসও সবার আগে টের পায় শেয়ার বাজার। গত কয়েকদিন ধরে সেই শেয়ার বাজারে নাগাড়ে নেমে চলেছে ধ্বস। জানা যাচ্ছে, গত কয়েকদিনে শেয়ারের প্রধান সূচক সেনসেক্স নেমেছে ২২০০ পয়েন্ট। এর ফলে লগ্নিকারীদের খোয়াতে হয়েছে প্রায় কুড়ি লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। মাত্র কয়েকদিন আগে একদিনেই সেনসেক্স পড়েছিল ১০৬২.২২ পয়েন্ট। সেই দিন লগ্নিকারীদের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ কোটি টাকা। এই অবস্থায় বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলি বেচে দিতে বাধ্য হয় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার। শেয়ার বাজারের এই পতন দেখে বাজার বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ বলছেন, চার-পাঁচ দফা ভোটের পর শাসকদলের ফিরে আসার সম্ভবনা যথেষ্ট কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমনটা হলে তো কেন্দ্রে দুর্বল সরকার তৈরি হতে পারে, অথবা কেন্দ্রে বদল ঘটবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা শেয়ার বাজারে প্রভাব ফেলে। কারণ, বাজার সবসময়ই চায় স্থায়ী এবং শক্তিশালী সরকার। তা না হলেই বাজারের অবস্থা হয় টালমাটাল। ফলাফল বেড়নোর আগে পর্যন্ত এই অবস্থা পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না শেয়ার বিশেষজ্ঞরা।
কারণ, শেষমেশ কোন দল সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে লগ্নিকারীদের একটা কৌতূহল থাকেই। এখন লগ্নিকারীরা সংশয় এবং দ্বিধাগ্রস্ত। তাই দেরি না করে, ঝুঁকি না নিয়ে হাতের শেয়ার তাড়াতাড়ি বিক্রি করে কম মুনাফা হলেও সেটুকুই ফায়দা হিসাবে ঘরে তুলে নিচ্ছেন। চূড়ান্ত ফলাফল বেড়নোর পর নতুন সরকার গঠন হলে তখন অবস্থা বুঝে তারা নতুন করে লগ্নির সিদ্ধান্ত নেবেন। একথা বলছেন বাজার বিশেষঙ্গরা, তারা জানাচ্ছেন, এই কারণেই বাজার টালমাটাল। তাছাড়া বিভিন্ন দেশেই শেয়ার সূচক দুর্বল হয়েছিল, সব মিলিয়ে সেনসেক্স পড়ে যায় প্রায় ৭১৬ পয়েন্ট। প্রসঙ্গত, যারা লোকসভা নির্বাচনে ৪০০ আসনের বেশি দখলের হুঙ্কার ছেড়েছিল তারাই কয়েক দফা ভোট মিটতেই হুঙ্কার তো দুরের কথা জেতার জন্য অশনি সঙ্কেত দেখতে শুরু করলো। ভোট পড়ার শতাংশ বেশ খানিকটা কমে যাওয়ায়, সাধারণ মানুষের ভোট নিয়ে উৎসাহে ভাটা পড়ায়, শাসক দলের মুখে গভীর উদ্বেগের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যে কারণে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি বুকের ছাতিওয়ালা মোদীজি তাঁর সরকারের দশ বছরের গুণকীর্তন ছেড়ে হিন্দুদের মধ্যে সংখ্যালঘু বিদ্বেষ উস্কে দিতে ভোট প্রচার শুরু করেন। তিনি মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করে মিথ্যা ভাষণ দিতে আরম্ভ করেন, দেশে হিন্দু জনসংখ্যা ১৯৫০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে কমেছে, অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যা বিশাল বেড়েছে। বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে হিন্দু সম্পদ বেচে মুসলমানদের মধ্যে বিলি করে দেবে এমন বিকৃত প্রচারও চালাচ্ছেন। বলছেন, ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’। কিন্তু তা স্বত্বেও ভোট কেন্দ্রে ভোটার হাজির হচ্ছে কম। সমীক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার বিজেপির আসন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমনকী সরকার গড়ার সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা নাও পেতে পারে।
ইতিমধ্যে ছ’দফা ভোট হয়ে গিয়েছে। প্রথম থেকেই লক্ষ্য করা গিয়েছিল ভোটের হার প্রতি পর্বেই কমেছে। ভোটের হার মানেই যে মোদী সরকারের ওপর থেকে ভোটারদের আস্থা কম তা পুরোপুরি না হলেও প্রবণতার একটা বিরাট প্রভাব কিন্তু পড়েছে শেয়ার বাজারে। অন্যদিকে শেয়ার বাজারে লগ্নিকারীদের কাছে ভোটের হার কম পড়াটাও প্রতিফলিত হচ্ছে দ্যোতক হিসেবে। লগ্নিকারীদের মনোভাবে এই ধারণাই প্রবল হয়ে উঠেছে যে মোদী কোনোভাবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। এমনকি আদৌ ক্ষমতায় ফিরতে পারবে কিনা সেটাও এখন তাদের প্রশ্ন। এই অবস্থায় পরবর্তী সরকার ঠিক কতটা লগ্নিবান্ধব হবে তা নিয়েও প্রশ্ন পাশাপাশি সংশয়- সব মিলিয়ে লগ্নিকারিরা দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছেন। অতএব এখন আর তারা নতুন করে লগ্নিতে রাজি হচ্ছেন না।
ইতিমধ্যে মিথ্যা ভাষণে পটু মোদীজি আচমকাই বলে বসেছেন রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস তাঁরই অতি ঘনিষ্ট কর্পোরেট বন্ধু আদানি-আম্বানিদের কাছ থেকে বিরাট অঙ্কের কালো টাকা পেয়েছে। প্রশ্ন, কতগুলি ট্রাক বোঝাই কালো টাকা আদানি-আম্বানিদের কাছ থেকে পৌঁছেছে। যার মুখে প্রকাশ্যে কখনো আদানি-আম্বানিদের নাম শোনা যায় নি তিনি হঠাৎ কোন ঘটনায় একথা বললেন? আর কালো টাকা পৌঁছে যাওয়ার কথাই যখন তিনি বললেন তাহলে ইডি-সিবিআই পাঠালেন না কেনো? উত্তর অবশ্য মেলেনি। মিলবেও না। কিন্তু তার পরের দিনই শেয়ার বাজারে ঘটে বিরাট পতন। দেশের সবচেয়ে ধনকুবের এবং পরমপ্রিয় দুই বন্ধুর বিরুদ্ধে মোদীজির এমন অভিযোগে বিস্ময় এবং উদ্বেগ ছড়ায়, ভোট চলাকালীন আদানি-আদবানিকে এই ভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নিয়ে কেউই কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। তবে ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে যতটা না জল্পনা উসকেছে অনেক বেশি বিভ্রান্তি তৈরি করেছে শেয়ার বাজারে মোদী মিত্র লগ্নীকারীদের মধ্যে। প্রশ্ন, মোদীর পরম মিত্র লগ্নীকারিরাও কি তবে মোদীর ওপর ভরসা হারিয়ে রাখতে বিকল্প খুজছে? বোঝা যাচ্ছে বিশ্বস্ত বন্ধু ও ঘনিষ্ট শিল্পপতিদের সঙ্গে মোদীর সম্পর্কে চিড় ধরেছে?