১২৬৬ সালে এক অদ্ভুত পরিণয় ঘটেছিল। ছয় বছরের বালিকার সঙ্গে চব্বিশ বছরের যুবকের বিবাহ। বর্তমান সময়ে বসে যে বিবাহের কথা ভাবা অন্যায়। কিন্তু সেযুগে এতে কোনো অন্যায় ছিলনা। বরং এটাই ছিল স্বাভাবিক। আবার এই বিয়েও পাত্র নিজে পাত্রী পছন্দ করে করছেন। আবার ছয় বছরের পাত্রীও তাঁর হবু স্বামীকে আঙুল দিয়ে নির্বাচিত করেছিলেন।
বিয়ের সাতবছর পর মেয়ে আসেন তাঁর শ্বশুরবাড়ি। এরও পাঁচ বছর পর মেয়েটি প্রথম দক্ষিণেশ্বরে আসেন। নহবতে মেয়ে থাকতেন। এত ভোরে উঠে মেয়ে তাঁর সমস্ত প্রাত্যহিক কাজ সেরে ফেলতেন। যাতে সমস্ত দিন তাঁকে বাইরে বের হতে না হয়। দক্ষিণেশ্বরে জনসমাগম তখন ও যথেষ্ট হতো, এছাড়া মন্দিরের কর্মচারী, অতিথি ও কম ছিলনা। কিন্তু কেউ মেয়ের মুখ দেখতে পেত না।
স্বামী তাঁর সর্বদা ভাবে বিভোর। মেয়ে তাঁর স্বামী সেবার মধ্যেই পরিতৃপ্ত। কোনো অভাব অভিযোগ নেই। সকল কিছুর মধ্যেই তিনি আনন্দিতা।
বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েটির অবস্থা দেখলে নির্যাতিতা, নিপীড়িতা মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি সদা আনন্দিতা। আবার তাঁকে পরাধীন মনে করাও যায়না। তিনি সেই ছবছর বয়সেই নিজের স্বামী নিজে নির্বাচন করেছেন। একবার পায়ে হেঁটে স্বামীর কাছে আসছেন। পথে দল থেকে বিচ্ছিন্না হয়ে একাকী চলতে লাগলেন। বিপন্না হয়ে কান্নাকাটি কিচ্ছু করলেন না। কাউকে না খুঁজে পেয়ে চলা থামালেন না। চলতে লাগলেন একা।
পথ আটকে সামনে দাঁড়াল ভীষণ আকৃতির এক দস্যু। মেয়ে বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে তাৎক্ষণিক বুদ্ধির পরিচয় রাখলেন। সেই ভয়ানক ব্যক্তিকে সরাসরি তিনি পিতৃসম্বোধনে বললেন “বাবা, আমি পথ হারিয়েছি। তোমার জামাই দক্ষিণেশ্বরে থাকেন। সেইখানে যাচ্ছি।” একই সঙ্গে সরলতা, অসম সাহসিকতা ও সাংঘাতিক বুদ্ধির দ্বারা বিপদ থেকে উদ্ধার পেলেন শুধু নয়, ওই দস্যু চিরদিনের জন্যে মেয়েটির দাসানুদাস হয়ে রইল।
ওই যে একটি কথা “তোমার জামাই” এর দ্বারাই একটি ডাকাতমনকে তিনি আপন করে নিলেন। বিপদে পড়ে ও স্থির বুদ্ধির দ্বারা কার্যসিদ্ধি। এর জন্য লেখাপড়া শেখার দরকার পড়ে না। এর জন্যে শহুরে হবার ও প্রয়োজন নেই। সরলতার ভেতরে গভীর বুদ্ধিমত্তা থাকার কোন বিরোধ নেই। সরল মানেই ব্যক্তিত্বহীন, তাও নয়। অতি সরলা গ্রাম্য একাকী একটি মেয়ে ভীষণ বিপদেও নিজেকে স্থির রেখে বিপদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। আর এটা তিনি পেরেছিলেন ঠাকুরের কাছে আসার আগেই। সুতরাং ঠাকুর তাঁকে তৈরি করে নিয়েছিলেন এটাও যেমন ঠিক, তেমনি গ্রাম্য মেয়েটি নিজের শক্তিতে পুরো বিশ্বাস রাখতেন এটাও ঠিক।
বিবাহ তো হল। অথচ স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন নেই। আবার স্বামী সেবায় কোন ত্রুটিও নেই তাঁর। ঠাকুর তাঁকে ডেকে পাঠাননি, তিনি প্রাণের টানে নিজেই এসেছেন তাঁর পরম প্রিয়র কাছে। স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছেন নহবতে কাটানো জীবন। ছোট্ট ঘরে হাঁড়িকুড়ি, জিওল মাছ মাথার ওপর টাঙানো, তাতে চলতে ফিরতে মাথা ঠুকে যায় অবিরত। কপাল ফুলে ওঠে। তবু ‘উঃ’ টুকু বেরোয়নি মুখ দিয়ে। ভোর হবার আগেই দৈনন্দিন জীবনের কাজ সেরে ফেলা। সারাদিন আর কেউ তাঁকে দেখতে পেতেন না।
দেহস্পর্শটুকু নেই। শুধু আত্মার মিলন। দুজন দুজনার প্রকৃত অর্থে বন্ধু। ইনি ওঁকে যতটা বোঝেন, উনিও ঠিক ততটাই এনাকে বোঝেন। সাজতে ভালবাসেন বলে তাঁর জন্য ডায়মন্ড কাটা বালা, তাবিজ, প্রকান্ড নথ এল। কে দিলেন? না, যাঁর নিজের অঙ্গের ধুতির খোঁজ থাকেনা সেই তিনি। স্ত্রীর মাথা ধরলে ঠাকুর অস্থির হতেন। অথচ সম্পর্কে দেহের কোন স্থান নেই। শুধু মনের মিলন।
ঠাকুর স্ত্রীকে পূজা করেছিলেন। এ পূজা আত্মার পূজা। এ পূজা মাতৃত্বের পূজা, দেবীত্বের পূজা। উপনিষদ্কার ঋষি যাজ্ঞবল্ক মৈত্রেয়ী সংবাদে বলেছেন “পতির ভিতর আত্মস্বরূপ শ্রীভগবান রয়েছেন বলেই — স্ত্রীর পতিকে প্রিয় বোধ হয়, স্ত্রীর ভিতরও ভগবান আছেন বলে পতির মন স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে।” (বৃহদারণ্যকোপনিষদ-৫ম ব্রাহ্মণ)।
শ্রীসারদা যখন দক্ষিণেশ্বরে আসেন তখন বয়স মাত্র উনিশ। একবার ভাগ্নে হৃদয় মজা করে মামীকে বলেন, “সবাই তো ঠাকুর কে বাবা বলে ডাকে, তুমি তাঁকে “বাবা” বলে ডাকতে পারো? ” অত্যন্ত গেঁয়ো রসিকতা, সন্দেহ নেই। কিন্তু অসম্ভব ব্যক্তিত্বময়ী মা হৃদয়রামকে চুপ করিয়ে দিলেন একটি কথায়।
“উনি বাবা কি বলছো হৃদু? উনি আমার বাবা মা সবকিছু।” আবার আরেক সময় এক ভক্তের উত্তরে বলেছেন,” আমি তাঁকে সন্তানভাবে দেখি।” সেভাবে দেখলে সত্যিই তো একটি সম্পর্কের ভিতরে অনেক সম্পর্ক লুকিয়ে থাকে। আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
ঠাকুরের অসুখ। সারদা তখন শ্রীমায় পরিণত। রাত থাকতে উঠে স্নান সেরে তিনতলার ছাদের চাতালে পথ্যাদি তৈরি করছেন। ঠাকুরের সমস্ত শিষ্যেরা তখন মায়ের সন্তান। তাদের খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব সামলে মা শুতে যেতেন এগারোটা নাগাদ। বড়জোর ঘন্টা তিনেক শুতেন। কিন্তু কোনদিন তাঁর কর্তব্য থেকে বিচলিত হননি। বিরক্ত তো নয়ই।
“কারো দোষ দেখবে না, দোষ দেখবে নিজের।” “কেউ তোমার পর নয় মা, সব তোমার আপন।” এই তাঁর অন্তরের কথা।
শরৎ হোক বা আমজাদ সকলকে সন্তান রূপে টেনে আপন করার ক্ষমতা তৈরি করা যায়না। ওটা থাকে। যাঁর থাকে তাঁর থাকে। তিনি তাই তখনকার সময়ে বিদেশিনী কন্যাদের নিজ বুকে স্থান দিতে পেরেছিলেন।
আবার আপাত শান্ত মা রেগে উঠে এক পাগলের জিভ টেনে ধরে প্রহার করতে পিছপা হননা। আবার নীচুজাতের পাত কুড়িয়ে ফেলে আসতেও তিনি কুন্ঠিত হননা শতেক কথার মাঝেও।
আবার স্বামীজী মঠ বিক্রির কথা বললে ওই গ্রাম্য মহিলা বলে ওঠেন, “মঠ তো তোমার নয় বাবা… বিক্রি করার অধিকার তোমার নেই।” মায়ের কথায় স্বামীজী শান্ত হয়ে যান।
আবার মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমে ঠাকুরের পুজো বন্ধ করতে বলায় দুজন মহারাজ মনে মনে ক্ষুব্ধ হন স্বামীজীর ওপর। তাঁরা মায়ের কাছে চিঠি লেখেন। মা সেখানে মূর্তিপুজো না করতেই বলে দেন। বলেন যে ঠাকুরের শিষ্য মানেই অদ্বৈতবাদী। সব সংশয় এক লহমায় মিটে যায়।
ক্রমে ১৮৮৬ সালের ১লা জানুয়ারী এসে গেল। শরীর অনেকটা সুস্থ বোধ করায় ঠাকুর বেড়াচ্ছেন কাশীপুর বাগানে। ছুটির দিন। বহু ভক্ত সমাগম। হঠাৎ গিরিশ চন্দ্রের স্তুতিতে ঠাকুর সমাধিস্থ হলেন। তা দেখে ভক্তরা উল্লাসে জয়ধ্বনি দিতে লাগল। কেউ পদধূলি মাথায় নিল। ঠাকুর ভাবাবেশে বললেন, “তোমাদের সকলের চৈতন্য হোক।” যার যা মনস্কামনা ছিল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাকে তাই দিলেন কল্পতরু হয়ে। মা সারদা সেদিন ও কিন্তু বাইরে বের হননি। তিনি তখন ও ঠাকুরের আরোগ্য কামনায় রত। শুধু এই সময় কালে একবার বলেছিলেন, “দেহ ধারণে যা কষ্ট! আর না, আর না — আর যেন আসতে না হয়।… একদিন রাত্রে একটা শব্দ পেয়ে চমকে উঠলাম। যেমন অনেকগুলো হাঁড়ি সাজানো থাকলে তার উপর ঘা মেরে যদি কেউ ভেঙে দেয়, সেই রকম শব্দ। জেগে উঠে হঠাৎ মনে এমন ভাব এল, এ জগতে কে কার স্বামী? এ সংসারে কে কার? কার জন্যে আমি প্রাণ হত্যা করতে বসেছি? একেবারে সব মায়া কাটিয়ে বৈরাগ্য এনে দিল। “এই বৈরাগ্যই কি চৈতন্য? জানি না। তবে কল্পতরু যে শুধু ঠাকুর নন এটুকু বুঝতে পারি। একটি সাধারণ গ্রাম্য মেয়ে ক্রমে ক্রমে নিজের মধ্যে দিয়ে যে মাতৃমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছেন, তাঁর কাছে চাইলে সব পাওয়া যায়। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তো অনেক উচ্চস্তরের। মা আমাদের বড় কাছের, বড় আপন। তাই কলা মূলো থেকে বিবেক বৈরাগ্য যা খুশি মায়ের কাছে আজ চাওয়া যায়।
অসাধারণ।মায়ের কথা এত সরল সহজ অথচ গভীর অর্থ সহ বোঝানো হয়েছে যে মন ছুঁয়ে যায়।।।জয় মা❤️????❤️
অনেক ধন্যবাদ ও শুভ কামনা