ভারতবর্ষে ঘোড়ার ইতিহাস খুব পুরনো। তাই ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণকারীদের ইতিহাসও পুরনো। হরপ্পা সভ্যতায় ঘোড়াদের বিশেষ দেখা মেলে না। এই সভ্যতার শেষের দিকে ঘোড়ার কঙ্কালের যে উল্লেখ আছে, তা গাধারও হতে পারে বলে পরবর্তীকালের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
আর্যদের সঙ্গেই ঘোড়ার আগমন ঘটে ভারতে। বৈদিক সভ্যতায় (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৫০০ অব্দ) ঘোড়ার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ঋগ্বেদ তো বটেই, অথর্ববেদ ও যজুর্বেদেও ঘোড়ার বিশেষ ভূমিকার উল্লেখ আছে।
ঘোড়া থাকলে চাবুকের যেমন অভাব হয় না, তেমনি ঘোড়ার তত্ত্বাবধায়ক বা কুমারের অভাব হয়নি কোনও যুগে। কুমার বা অশ্ববারক যাই বলা হোক না কেন, তাদের বিশেষ দায়িত্ব থাকে ঘোড়াকে সুস্থসবল রাখার জন্যে।
তা, ঘোড়ার দেখাশোনা করার লোককে কুমার বলা হয় কেন? অশ্বিনীকুমারদ্বয় দেবতাদের চিকিৎসক। তারা যমজ ভাই। মুখটা অশ্বের মত, দেহটা নরের মত। অশ্বিনীকুমার থেকে সংক্ষিপ্ত হয়ে কুমার হতে পারে। আবার মহাভারতের বিরাটপর্বে যুধিষ্ঠিরকে চতুর্থ পাণ্ডব নকুল কথা দিয়েছিলেন, তিনি অশ্বপালক তথা অশ্বরক্ষকের ছদ্মবেশে কাটাবেন। কারণ অশ্বের দেখভাল ও চিকিৎসা করতে তাঁর ভালো লাগে। নকুলকে যুধিষ্ঠির পাণ্ডবদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন ও সুকুমারদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নকুল আবার অশ্বিনীকুমারের ঔরসে মাদ্রীর গর্ভে জন্মায়। তা থেকেও ‘কুমার’ আসতে পারে অশ্বের প্রতিপালকের নাম হিসেবে।
রাধাকান্ত দেব বিরচিত শব্দকল্পদ্রুম, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ, নগেন্দ্রনাথ বসুর বিশ্বকোষ ও উণাদিকোষে ‘কুমার’ শব্দের একটি প্রধান অর্থ দেওয়া হয়েছে, অশ্ববারক বা অশ্বপালক।

সূর্যদেবের সঙ্গে সংজ্ঞা বা শরণ্যের মিলনে উদ্ভূত যমজ দুই পুত্রসন্তান হলেন অশ্বিনীকুমারদ্বয়। অশ্বরূপে মিলিত হয়েছিলেন উভয়ে, সেইজন্যে অশ্বিনীকুমারদ্বয় হলেন অশ্বমুখ, তবে দেহটি নরের। ছাগলের তৃতীয় সন্তানের মত কাব্যে উপেক্ষিত আরেকজন পুত্রেরও জন্ম হয়েছিল এঁদের সঙ্গে। তাঁর নাম রেবন্ত। এই রেবন্ত প্রকৃত অর্থেই অশ্বরক্ষক।
অশ্বিনীকুমারদ্বয় বলে সর্বত্র যমজ ভ্রাতারা উল্লিখিত হলেও, তাঁদের একজনের নাম নাসত্য আর একজনের নাম দস্র।এঁরা দেববৈদ্য নামে পরিচিত।দেবতাদের এই চিকিৎসকদ্বয়ের উল্লেখ আছে ঋগবেদে ও মহাকাব্যগুলিতে।
অশ্বিনীকুমারদ্বয় দেববৈদ্য হলেও রেবন্ত কিন্তু ঘোড়ার রক্ষক ও অধিকারী। একটু ডিটেলসে যেতে হয় তাহলে, — রেবন্তের জন্মের উপাখ্যান বিষ্ণু পুরাণ এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণে বর্ণনা করা হয়েছে। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার কন্যা সংজ্ঞা ছিলেন সূর্যের পত্নী। তিনি সূর্যের অনুগ্রহ লাভে বঞ্চিত হয়ে নিজের প্রতিচ্ছায়া ছায়াকে সূর্যের কাছে রেখে বনে গিয়ে এক ঘোটকীর রূপ ধারণ করে কঠোর তপস্যায় রত হন। ছায়া যে সংজ্ঞা নন, সে কথা বুঝতে পেরে সূর্য সংজ্ঞাকে খুঁজতে বের হন এবং উত্তর কুরুতে তাঁর সাক্ষাৎ পান। তারপর তিনি ঘোড়ার ছদ্মবেশে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন এবং তাঁদের মিলনের ফলে যমজ অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং রেবন্তের জন্ম হয়। কূর্মপুরাণ এবং মৎস্যপুরাণে রেবন্তের মাতার নাম হলো রাত্রি, যিনি হলেন সূর্যের আরেক স্ত্রী। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্য একটি অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে, তিনি হলেন ছায়ার পুত্র।
দেবী ভাগবতেও একটি স্থানে ছোট করে রেবন্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একদা যখন রেবন্ত সাতটি মস্তকবিশিষ্ট ঘোড়া উচ্চৈঃশ্রবার উপর চড়ে বৈকুন্ঠে যাত্রা করেন, বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী ঘোড়াটিকে দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যান এবং বিষ্ণুর জিজ্ঞাসিত একটি প্রশ্নকে উপেক্ষা করেন। এই কারণে, লক্ষ্মী স্বামীর দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে ঘোটকীতে পরিণত হন। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী রেবন্তের বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি “বর্মপরিহিত, তরবারি, তূণীর, তির ও ধনুর্ধারী এক অশ্বারোহী। কালিকা পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ডান হাতে তরবারি ও বাঁ হাতে চাবুক নিয়ে সাদা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার। এই কারণে, তিনি হয়বাহন (অশ্বারোহী) নামেও অভিহিত হন। বরাহমিহিরে তাঁকে সপার্ষদ শিকারী পুরুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ভাস্কর্যে রেবন্তকে তাঁর অনুচর গুহ্যকদের সঙ্গে শিকাররত অবস্থায় দেখা যায়। ধনুক, তরবারি ইত্যাদি গ্রন্থে বর্ণিত অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও কোনও কোনও ভাস্কর্যে তাঁর হাতে মদ্যপাত্রও দেখা যায়। অনেক মূর্তিতেই দেখা যায়, রেবন্ত পায়ের গুল্ফ পর্যন্ত বুটজুতার মতো পাদুকা পরিধান করেছেন। এখানে উল্লেখ্য, সূর্য ছাড়া অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীদের সাধারণত নগ্নপদ মূর্তিই নির্মিত হয়ে থাকে। কোনও কোনও মূর্তিতে দেখা যায়, অশ্বারহী রেবন্তের সহচর একটি শিকারী কুকুর। রেবন্তের অনুচরদের হাতে বর্শা ও তরবারির মতো শিকারের নানান ধরনের অস্ত্র দেখা যায়। কয়েক জন অনুচর শঙ্খবাদনরত অবস্থায় রয়েছেন অথবা ঢাক-ঢোল বাজাচ্ছেন অথবা তাদের প্রভুর মাথায় ছাতা ধরে রয়েছেন।

রেবন্ত, যোদ্ধা ও অশ্বের রক্ষক, অরণ্যের বিপদে ত্রাণকর্তা ও শিকারীদের রক্ষাকর্তা হিসেবে পূজা করা হত। তাঁর পূজার সঙ্গে সূর্যোপাসক সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। শব্দকল্পদ্রুম গ্রন্থের বিবরণ থেকে জানা যায়, হিন্দু যোদ্ধারা আশ্বিন মাসে সূর্যপূজার পর রেবন্তের পূজা করতেন। চতুর্থ পাণ্ডব নকুলকে ঘোড়া-বিষয়ক অশ্বশাস্ত্রম্ গ্রন্থের রচয়িতা বলে মনে করা হয়। তিনি প্রেতাত্মাদের হাত থেকে ঘোড়াদের রক্ষা করার জন্য রেবন্ত পূজার বিধান দিয়েছিলেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, তাঁদের মানসপুত্র নকুল বা সহোদর রেবন্ত, — সকলেই কমবেশি ঘোড়ার সহিসের নাম কুমার হওয়ার পেছনে অবদান রেখেছে।
সহিস নামটি ফারসি, ইসলামি যুগে ভারতে আসে। তার অনেক আগে থেকেই সংস্কৃতজাত কুমার শব্দটি চলছে, ঘোড়ার তত্ত্বাবধায়ক ও রক্ষক হিসেবে।
কুমারটুলি, কুমারখালি ইত্যাদি অঞ্চলে ঘোড়ার সহিসদের বাস ছিল কিনা তা তলিয়ে দেখতে হবে। ক্ষেত্রসমীক্ষা দরকার আগে।