থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার
এক.
কাল রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। ঘুমের ট্যাবলেট খেলেন। কাজ হল না খুব একটা। কাকভোরেই ভেঙে গেল ঘুম। পাশে স্ত্রী ঘুমোচ্ছেন। তাঁকে ডাকলেন না। কি লাভ মিছিমিছি বিব্রত করার! ছোট কিচেনে ঢুকে নিজেই কফি করলেন। কফি তাঁর প্রিয়। ব্ল্যাক কফি। আর সিগারেট। ছাড়তে পারেন না কিছুতেই। কফি নিয়ে এসে বসলেন তক্তপোষের পাশের চেয়ারে। তাকালেন ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে। তিরিশ বছর আগের সে লাবণ্য নেই। থাকার কথাও নয়। জরা তার নিষ্ঠুর থাবা বসাবেই।
কফি শেষ করে ঘরের মধ্যেই পায়চারি করতে লাগলেন। দু-কামরার ছোট সরকারি আবাসন। এক তলায় থাকেন তিনি। জানালার ধারে এসে দাঁড়ালেন। তখনও কলকাতা জেগে ওঠে নি। রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া কম। এই রকম কাকভোরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে ভালো লাগত। কিন্তু উপায় নেই। এখন তিনি সেলিব্রিটি। এখন তিনি ভিভিআইপি। একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তার উপর টেররিস্টদের টার্গেট। তাই কড়া নিরাপত্তা। অন্য কোন নিরাপদ, আরামপ্রদ আবাস তিনি অনায়াসে পেতে পারেন। কিন্তু যাবেন না। তাঁর জেদ। জেদ কেন? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেন। তারপর কি ভেবে হেসে ফেলেন।
এবার একটা সিগারেট ধরাতেই হবে। ধরালেন। কফির পরে সিগারেটে টান দিতে বেশ আরাম লাগছে। তাঁর অফিস ঘরে সিগারেট খাওয়া নিষেধ। এই ‘নিষেধ’ শব্দটা তাঁর মাথায় হাতুড়ির ঘা দিতে লাগল। মাথা গরম হয়ে উঠল। সংসদীয় ব্যবস্থার নিষেধ। দলের নিষেধ। কমরেডদের নিষেধ। এটা করা যাবে না। ওটা করা যাবে না। কেন? কেন? তিনি কি তবে বন্দি? অদৃশ্য সে বন্ধন। অদৃশ্য কিন্তু অমোঘ। কোন মূল্য নেই স্বাধীন ইচ্ছার।
অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কখন যে তাঁর স্ত্রীর ঘুম ভেঙেছে, বুঝতে পারেন নি। স্ত্রী বললেন, কখন উঠেছ? স্ত্রীর কথা শুনে চমক ভাঙল তাঁর। তাকালেন স্ত্রীর দিকে। কাঁচা-পাকা চুল। কোঁচকানো চামড়া। শান্ত চোখের দৃষ্টি। অথচ এই নারী প্রেমিকা ছিল একদিন। চোখে ছিল বিদ্যুৎ। শরীরের স্পর্শে শিহরণ জাগত। তাঁর মনে পড়ে গেল জীবনানন্দের কথা। সৌন্দর্যের ভেতরে থাকে কঙ্কাল। সময় থাবা বসায় সৌন্দর্যে। তখন বেরিয়ে আসে কঙ্কাল। জীবন তো এই পরিবর্তনের স্রোত। পরিবর্তন… পরিবর্তন … পরিবর্তন …
আবার গরম হয়ে উঠল মাথা। কয়েক মাস ধরে কেউ বা কারা এই শব্দটাকে ঘোরাচ্ছে জনপদে। পরিবর্তন চাই। কিসের পরিবর্তন, কেন পরিবর্তন সেসব খোলসা করে বলা হচ্ছে না। কিন্তু শব্দদুটো ঘুরছে। ঢেউ তুলছে। মানুষের মনের অন্ধকার কুঠুরিতে ধাক্কা মারছে। এ কথা তাঁকে বলেছিলেন তাঁর এক বন্ধু। একান্ত আলাপে বলেছিলেন। সতর্ক করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোদের ফাঁক ও ফাঁকির সূত্রে শব্দদুটো মানুষের মনে ঢেউ তুলছে।
সে কথা বলেছিলেন তিনি দলকে। আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু ড্যামেজ কন্ট্রোল তো সাত তাড়াতড়ি করা যায় না। তাই অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স নীতি অবলম্বন করা হল। তাতে ফল হল খারাপ।
— কি গো, কি বকছ বিড়বিড় করে!
স্ত্রীর কথায় ঘোর ভাঙল মুখ্যমন্ত্রীর। বললেন, না, ও কিছু নয়। আসলে কাল রাতে ঘুম হল না ঠিকমতো। ট্যাবলেটেও কাজ হল না।
কেন যে ঘুম হল না, সে কথা তাঁর স্ত্রী জানেন। উদ্বেগ। আজ বিধানসভার কয়েকটি উপনির্বাচনের ফল প্রকাশিত হবে। ফল যে খারাপ হবে, সেটা জানা কথা। কিন্তু কতটা খারাপ হবে, সে জন্যই উদ্বেগ। স্ত্রী বললেন, দশটার মধ্যে তোমরা অন্তত তিনটে পাবে।
তিনটে! তাহলে মুখরক্ষা হয়। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে বললেন, আহা তাই যেন হয়। ফুলচন্দন পড়ুক তার মুখে। এ কথা বলে আবার তাকালেন স্ত্রীর দিকে। সৌন্দর্যের উন্মাদনা নেই আর, কিন্তু মমতার স্নিগ্ধতা আছে। প্রেমিকার মূর্তি মিলিয়ে গেছে, মাতৃমূর্তি দেখা দিয়েছে।
স্ত্রী বললেন, ডাক্তার আসার সময় হল যে!
ঠিক কথা। সাড়ে সাতটায় আসবেন ডাক্তার। রুটিন চেক-আপ। তারপর আসবেন ব্যক্তিগত সচিব। সারাদিনের শিডিউলের খসড়া তৈরি হবে। নাঃ, আর সময় নেই। দ্রুত স্নানটা সেরে ফেলতে হবে। বাথরুমে ঢুকলেন। মনের ভেতরে একটা ছবি ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। দশের মধ্যে তিন? তাই যেন হয়। তাই যে অনেক। অনেক ফাঁক-ফাঁকি। পরিবর্তনের স্রোত।
ঠিক পৌনে দশটায় সরকারি আবাসন থেকে বেরোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কনভয় ছুটে চলল। কালো কাচে ঢাকা গাড়ির ভেতরে বসে তিনি মেক-আপ শুরু করলেন। মনের মেক-আপ। মনের উদ্বেগকে চেপে রাখতে হবে। মুখে একটা ঔদাসীন্যের ভাব ফুটিয়ে তুলতে হবে। মুখের ওপর পরে নিতে হবে একটা মুখোশ।
মহাকরণের ভি আই পি গেটের সামনে এসে থামল কনভয়। শশব্যস্ত হয়ে উঠল প্রহরীরা। গাম্ভীর্য বজায় রেখে লিফটে উঠে তিনি ঢুকলেন নিজের কক্ষে। ভোট গণনা শুরু হয়ে গেছে। আপ্ত সহায়ক বললেন, টিভি চালিয়ে দেব কি?
তিনি নিষেধ করলেন।
তাঁর টেবিলের উপর কয়েকটা ফাইল। জামবনির ফাইলটা উপরেই আছে। জামবনিতে একটা রাসায়নিক শিল্পস্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দিন কয়েক বাদে আসবে জাপানের প্রতিনিধিদল। শিল্পায়নের এ চেষ্টাও ভণ্ডুল হবে না তো! এখানে অবশ্য কৃষি জমি দখলের প্রশ্ন নেই। কিন্তু পরিবেশদূষণ নিয়ে হইহই হতে পারে। কৃষিজমি দখল না করে, পরিবেশদূষণ না ঘটিয়ে শিল্পস্থাপন কি সম্ভব! তিনি ভাবতে থাকেন।
এর আগে জোর করে কৃষিজমি দখল করে শিল্পস্থাপন করতে গিয়ে অনেক অনর্থ ডেকে এনেছেন। এর ফলে গ্রামের গরিব চাষিরা সরে গিয়েছিলেন তাঁদের কাছ থেকে। অথচ এঁরাই ছিলেন তাঁদের ভোটব্যাঙ্ক। তাঁর ঘাড়েই দোষটা চাপে। তিনি তাঁর মনের অন্ধকার ঘরটা হাতড়াতে থাকেন।
শিল্পায়নের জন্য তাঁর নিজের কি অতিরিক্ত আগ্রহ ছিল? ছিল তো। কেন ছিল? দেশের উন্নতি? তা বটে। কিন্তু পথিকৃতের সম্মানলাভের ব্যাপারটাও যে ছিল। তাঁর মনে পড়ে গেল তাঁর আগের মুখ্যমন্ত্রীর কথা। তিনিও বলতেন শিল্পায়নের কথা। বিনিয়োগকারীর সন্ধানে যেতেন বিদেশে। আসতেন কেউ কেউ। মউ সই হত। তারপর চাপা পড়ে যেত। কেন হত এ রকম? সব দোষ কি আগের মুখ্যমন্ত্রীর? তা তো নয়। পার্টির রাজ্য সম্পাদক ছড়ি ঘোরাতেন। বুর্জোয়া শিল্পের জন্য এত কান্না কেন? এখন নতুন রাজ্য সম্পাদক। তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে মদত দেন। কেন্দ্রীয় কমিটি বা পলিটব্যুরোকে সামাল দেন। তাই তো মুখ্যমন্ত্রী চিনা প্রেসিডেন্টের মতো বলতে পারেন টাকার কোন রঙ নেই। তাই তো মার্কিন কনসাল জেনারেলের সঙ্গে আলোচনার পর উইকিলিকসের কেবলে লেখা হয় : ওয়েস্টবেঙ্গল কমিউনিস্ট লিডার এক্সপ্রেসেস প্রো-ক্যাপিটালিস্ট পলিসি।
এটা ভাবার পর তিনি একটু থমকালেন। আগে কেমন ছিলেন তিনি? আগে কট্টর ছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদকে বাপ-বাপান্ত না করে জলগ্রহণ করতেন না। এখন পরিবর্তিত হয়েছেন। পরিবর্তন জীবনের ধর্ম। জীবনের ধর্ম পরিবর্তন? তাহলে তো তাঁকে এবং তাঁদেরকেও চলে যেতে হবে। তিনি কি তাঁর প্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো বলতে পারবেন : ‘যেতে পারি / যে কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি / কিন্তু কেন যাবো?’ কবিতায় যা বলা যায়, বাস্তবে কি তা তেমন করে বলা যায়?
অর্থমন্ত্রী এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। বললেন, খবর শুনেছ?
তাঁর দিকে তাকালেন মুখ্যমন্ত্রী। চমকের ধাক্কা বুকের ভেতরে। তবু সে চমককে চেপে রাখতে হবে। প্রাণান্তকর প্রয়াস। নিস্পৃহভাবে বলার চেষ্টা করলেন, কি হয়েছে?
অর্থমন্ত্রী আর চেপে রাখতে পারলেন না উত্তেজনা। উত্তেজনা আর ভয়। ভয় আর উদ্বেগ। বলতে গিয়ে বিকৃত হয়ে গেল তাঁর কণ্ঠস্বর। বললেন, নাঃ, আর কোন আশা নেই। বেলা সাড়ে বারোটা পর্যন্ত যা খবর, আমরা — আমরা সব কটাতেই হারছি।
মুখ্যমন্ত্রীর বুকের ভেতরে ইলেকট্রিক শক। সামলে নিয়ে ব্যাপারটাকে যেন লঘু করার জন্য সুকান্ত আওড়াতে লাগলেন :
বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ম করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।
মূঢ় শত্রুকে হানো স্রোত রুখে, তন্দ্রাকে করো ছিন্ন,
একাগ্র দেশে শত্রুরা এসে হয়ে যাক নিশ্চিহ্ন।
ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছেন অর্থমন্ত্রী। এই টালমাটাল সময়েও কবিতা! মানুষটা প্রকৃতিস্থ আছেন তো! মুখ্যমন্ত্রী পেপারওয়েটটা ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, এটা তো উপনির্বাচন। বিধানসভা নির্বাচনের আরও দেড় বছর বাকি। এর মধ্যে হাওয়াটাকে ঘুরিয়ে দিতে হবে।
বিমূঢ় অর্থমন্ত্রী চলে গেলেন। রিমোট কন্ট্রোল হাতে তুলে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ততক্ষণে সমস্ত ফলাফল প্রকাশিত। উন্মাদ জনতা আনন্দে নৃত্য করছে। মাত্র কয়েক বছর আগে এই জনতাই তাঁদের জয়ে নৃত্য করেছিল। মাত্র তিন বছর। এর মধ্যেই পরিবর্তন! শেক্সপীয়ার রোমান মবের কথা বলেছিলেন। এরাই কি সেই রোমান মব?
ঘরে ঢুকলেন একজন সচিব। জানতে চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রেস মিট করবেন কি না! মুখ্যমন্ত্রী বললেন, বাই নো মিনস।
কিন্তু প্রেস তো ছিনে জোঁক। আজকের এমন পরাজয়, মুখ্যমন্ত্রীর বাইট তো তাঁরা চাইবেন। কিন্তু কি বলবেন তিনি! একটা বিদায় বিদায় সুর ভেসে বেড়াচ্ছে যেন। একটা সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন তিনি। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন তাঁর কক্ষটির দিকে। আটটা বছর কেটে গেল। এর মধ্যে এই কক্ষটার উপর একটা মায়া জন্মেছে। তিনি হয়তো ভাবতে শুরু করেছিলেন এই কক্ষে পরিবর্তনের স্রোত প্রবেশ করতে পারবে না। তখনই মনে পড়ে গেল ‘শেষের কবিতা’র সেই শেষ কবিতার কথা : কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলেন। তিনটে দশ। এক্ষুণি বেরোতে হবে। আজ চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন। ভালো লাগছে না। তবু যেতে হবে। বন্দি তিনি। ‘রক্তকরবী’র মকররাজের মতো অদৃশ্য জালের আড়ালে তিনি বন্দি।

দুই.
কনভয় ছুটে চলেছে মুখ্যমন্ত্রীর।
জ্বর হলে যেমন মুখে বিস্বাদ লাগে, তেমনি তাঁর মনটা ভরে উঠেছে বিস্বাদে। ভালো লাগছে না কিছু। ভালো না লাগলেও তাঁকে তাঁর কাজ করে যেতে হবে। মেইনটেইন করতে হবে শিডিউল। সাধারণ মানুষ নন তিনি। বিপর্যয় ঘটলে মন খারাপ করে বসে থাকবার উপায় নেই। এই তো একটু আগে দলের রাজ্য সম্পাদক তাঁকে ফোন করে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। বাইরের ঠাটবাট ঠিক রাখতে হবে। মনে ব্যথা ধরা যেন না পড়ে মুখের রেখায়।
কনভয় ছুটে চলেছে। কালো কাচ লাগানো গাড়ির ভেতর বসে আছেন তিনি। বাইরের কেউ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু তিনি দেখছেন। মহানগরীর ব্যস্ত মানুষ চলেছে রাস্তায়। এদের দুঃখ আছে, সমস্যা আছে, কিন্তু স্বাধীনতাও আছে। আর আছে ব্যক্তিগত জীবন।। মুখ্যমন্ত্রীর পরিবার আছে। স্ত্রী ও সন্তান আছে। কিন্তু তাঁর কোন ব্যক্তিগত জীবন নেই। তাঁর ভাবনা-চিন্তা, তাঁর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় দলের দ্বারা। ব্যক্তি দলের ঊর্ধ্বে নন। কথাটা ইদানীং ধাক্কা দেয় তাঁকে। ব্যক্তি কিছুই নয় তবে? একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। পরমুহূর্তে তিনি সচেতন হয়ে ওঠেন। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পায় নি তো কেউ? পাবে কি করে? গাড়িতে তিনি একা।
সাইরেন বাজিয়ে ছুটে যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়।
গত আট বছর ধরে ছুটছে সেই কনভয়। আর কতদিন ছুটবে? তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ একটু আগে টিভির পর্দায় দেখা কিছু ছবি। উপনির্বাচনের ফল বেরোল। বিরোধীরা একশোয় একশো। পরিবর্তনের ঢেউ বছর খানেক ধরে আছড়াচ্ছে। ড্যামেজ কন্ট্রোল অসম্ভব। পরিবর্তনের স্রোতে ভাসতেই হবে। তিনি ইস্তফা দিতে চেয়েছিলেন। রাজি হয় নি দল। এতে খারাপ বার্তা যাবে মানুষের কাছে। দলের সিদ্ধান্ধ। ব্যক্তিকে মেনে নিতে হবে। ব্যক্তি তুচ্ছ।
মুখ্যমন্ত্রীর মনের ভেতরের মনটি বলল, এত সহজে ক্ষমতা ত্যাগ করতে পারবে কি? চমকে উঠলেন তিনি। অর্থের লোভ নেই তাঁর। বিলাসী জীবন-যাপনের প্রতিও মোহ নেই। কিন্তু ক্ষমতার লোভ? এই যে কনভয়, এই যে জয়ধ্বনি, কৃপাপ্রার্থীদের এই যে স্তাবকতা, জ্ঞানীগুণীদের এই যে অনুগ্রহভিক্ষা, ফ্ল্যাশবাল্বের ঝলক, সংবাদ মাধ্যমের হুড়োহুড়ি — এসবের রোমাঞ্চ নেই? আছে, আছে; সে রোমাঞ্চ যে অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে। এর নাম কি বুর্জোয়া পার্লামেন্টের মোহ? লেনিন যেমন বলেছিলেন?
আজ চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন। তাঁর কনভয় থামবে সেখানে গিয়ে। নন্দন, তাঁর প্রিয় নন্দন। একেই ভিত্তি করে তিনি দেশে শিল্পকলার বিস্তার ঘটাতে চেয়েছেন। বুর্জোয়া শিবিরে ছিলেন এমন অনেকে তাঁর পাশে এসেছেন। কিন্তু এঁরা শেষ পর্যন্ত থাকবেন তো! কে যেন বুদ্ধিজীবীদের পেণ্ডুলামের সঙ্গে তুলনা করেছেন? অথবা ওয়েদার কক?
নন্দনের কাছে এসে দেখলেন চারিদিকে সশস্ত্র পুলিশ। বাইরে পুলিশের সাঁজোয়া গাড়ি। ভেতরেও পুলিশ ও সাদা পোশাকের সিআইডি। বিশাল লনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাঁর দলের লোকজন। নানা জেলা থেকে এসেছেন। এঁরা শিল্প বোঝেন না, কিন্তু দলের অনুগত সৈনিক। এঁরা এখানে কেন?
তখনই মনে পড়ে গেল। এ তো তাঁরই নির্দেশ। চারদিকে পরিবর্তনের স্রোত। কবি-শিল্পীদের মধ্যেও বিভাজন। তাই দর্শকের সংখ্যা কম হতে পারে। তাই তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন দলের লোকজন যেন জায়গাটা পূর্ণ করে রাখেন। এতে দুই কাজ হবে। বিক্ষোভের আশঙ্কা থাকবে না। আবার বিদেশি অতিথিরা জনসমাগমও দেখতে পাবেন।
গাড়ি থেকে নামলেন তিনি।
তাঁকে অভ্যর্থনা করতে এগিয়ে এলেন সেই কেন্দ্রের অধিকর্তা।
— আসুন, আসুন। আমরা তৈরি।
অধিকর্তাটি সুপুরুষ। তাকিয়ে দেখার মতো চেহেরা। ছয় ফিটের মতো লম্বা। ফর্সা। মেদহীন। ভরাট মুখে চোখদুটো অবশ্য বেমানান। ছোট ছোট। এই চোখ দেখলে শিকারি বিড়ালের উপমা মনে আসে। এঁর দুর্ব্যবহার ও দুরভিসন্ধির কথা কিছু কিছু শুনেছেন তিনি। কিন্তু কিছু বলা যায় না। খুবই অনুগত। মাত্রাতিরিক্ত অনুগত্য। কখনও কখনও বিরক্তি লাগে, অথচ বলতে পারেন না।
— কোন বিক্ষোব-টিক্ষোভ? জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী।
— না স্যার। তার কোন চান্স নেই। প্র্হরী দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে চারদিক। মাছিও গলতে পারবে না।
প্রহরী মানে পুলিশ। শেষ পর্যন্ত ভরসা করতে হচ্ছে পুলিশের ওপর। উপায় নেই। সেই পুলিশের মধ্যেও ভাঙন ধরেছে। নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়? স্বরাষ্ট্রদপ্তর হাতে থাকায় সে কথা ভালোই বুঝতে পারেন। এই হল স্রোতের টান। আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে্ছেন আমন্ত্রিত শিল্পী ও শিল্পরসিকরা। কাকে কাকে আমন্ত্রণ করা হবে, তা নিয়ে প্রচুর ভাবনা-চিন্তা করা হয়েছে। উদ্বোধনী মঞ্চে বসে মুখ্যমন্ত্রী আমন্ত্রিতদের দেখতে লাগলেন। তাঁদের মুখে মনের ভাষা ফুটেছে কি না, বুঝতে চেষ্টা করলেন। পারলেন না বুঝতে। তাঁরাও কি তাঁর মতো মুখোশ এঁটেছেন মুখে?
হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল রেমন্টের কথা। কানাডার তথ্যচিত্র পরিচালক। আজ তাঁর ‘আ প্রমিস টু দ্য ডেড’ দেখানো হবে। এ ছবি দেখতেই হবে। উদ্বোধনের পরে দেখলেন সে ছবি। দেখতে দেখতে বারে বারে চমকে উঠলেন। এ ছবি চিলির কুখ্যাত পিনোচেতকে কেন্দ্র করে। সেই পিনোচেত যিনি নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন সালভাদোর আলেন্দেকে। এ সেই পিনোচেত যাঁর জন্য ভগ্নদেহে মৃত্যুবরণ করতে হয় কবি পাবলো নেরুদাকে। সেই পিনোচেত মারা গিয়েছেন। কিছু মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে শোকাশ্রু বিসর্জন করছেন। তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন অ্যারিয়েল ডার্ফম্যান। চিলির বিখ্যাত লেখক। পিনোচেতের স্বৈরাচার যাঁকে অশেষ যন্ত্রণা দিয়েছে। নিজের শিল্পমাধ্যমে যিনি তার প্রতিবাদ করে এসেছেন। শান্তভাবে শোকার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ালেন ডার্ফম্যান। মৃদুকণ্ঠে বললেন, প্রিয়জন হারিয়ে আপনারা শোকার্ত। খুব স্বাভাবিক। সালভাদোর আলেন্দে ছিলেন আমার সেই রকম প্রিয়জন। তাঁকে যেদিন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, আমারও সেদিন এই রকম কষ্ট হয়েছিল।
তথ্যচিত্রটির ভেতরকার বাণীটির কথা ভেবে চমকে উঠলেন তিনি। কমিউনিজম ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণু হতে শেখায়। তাঁর দল কি সেইরকম সহিষ্ণু? সংখ্যালঘু বিরোধীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন তাঁর দল? তিনিই তো বলেছিলেন : আমরা ২৩৫ ওরা ৩০। এই ‘আমরা-ওরা’র পথিকৃৎ তো তিনিই।
মাথা ঝিমঝিম করছে মুখ্যমন্ত্রীর। আবার সব বিস্বাদ লাগছে। তাঁকে উঠতে দেখে দৌড়ে এলেন অধিকর্তা। বললেন, স্যার, আপনার জন্য সবাই অপেক্ষা করছেন।
অন্যমনস্কভাবে তিনি বললেন, অপেক্ষা? কিসের অপেক্ষা?
— আপনি তো বলেছিলেন অনুষ্ঠানের শেষে চা-চক্রের আয়োজন করতে। আপনার জন্য ব্ল্যাক কফি আছে।
মুখ্যমন্ত্রী বললেন, দুঃখিত। আমি থাকতে পারছি না।
প্রেসের লোক ছেঁকে ধরার আগেই তিনি গাড়িতে উঠে পড়লেন।
কনভয় আবার ছুটে চলল।
তিন.
রাত দশটা কুড়ি।
অনুষ্ঠান থেকে ফিরে মুখ্যমন্ত্রী জামা-কাপড় না ছেড়ে সোফায় বসে আছেন। এই অস্বাভাবিকতা দেখেও কিছু বললেন না তাঁর স্ত্রী। বরং আজ নিয়ম ভঙ্গ করে এক কাপ কফি নিয়ে এলেন স্বামীর জন্য। নিজেও নিয়েছেন এক কাপ। কিন্তু কোন কথা বলেন নি। অপেক্ষা করে আছেন তাঁর স্বামী কখন কথা বলেন।
কফি শেষ হলে একটা সিগারেট ধরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আকাদেমিতে ‘রক্তকরবী’ দেখার কথা মনে আছে তোমার?
স্ত্রী বলেন, মনে থাকবে না আবার? দারুণ বৃষ্টি সেদিন। বাড়িতে কিছু না বলে চলে এসেছিলাম। ফেরার পর খুব বকুনি শুনতে হয়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রেম তখন –
তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে স্ত্রী বলেন, ঘণী্ভূত হয়েছে। আমরা বহু নাটক-সিনেমা দেখেছি এভাবে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তারপর তুমি মন্ত্রী হলে। আমাদের ঘোরাফেরা কমতে লাগল। একেবারে বন্ধ হয়ে গেল তুমি মুখ্যমন্ত্রী হতে।
মুখ্যমন্ত্রীও দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কেমন ভাবের ঘোরে তিনি বলে যেতে লাগলেন, মকররাজ… জালের আড়ালে মকররাজ… অদৃশ্য বন্ধনে বন্দি মকররাজ… তাঁর যন্ত্রগুলো আর তাঁকে মানছে না…
স্ত্রী বুঝলেন তাঁর স্বামী এসব কথা শোনাচ্ছেন নিজেকেই। তাই তিনি নিঃশব্দে উঠে গেলেন। এ সময়ে একটু একা থাকা দরকার। তাঁরও মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যায়। তাঁর স্বামী নিস্পৃহ নন, তাঁকে ভালোবাসেন, তবু দুজনের মধ্যে একটা ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
প্রায়ান্ধকার কক্ষে বসে আছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই মুহুর্তে তাঁকে দেখলে মনে হবে প্রতিকারহীন পরাভবে মুষড়ে পড়া এক অসহায় মানুষ। তাঁর চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে অজস্র ছায়ামূর্তি। শব্দহীন ভাষায় অভিযোগ করছে তারা। কেউ বলছে : নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ তুমি। কেউ বলছে : তুমি আত্মপ্রতারক। কেউ আবার বলছে : তোমার ঔদ্ধত্য আর অসহিষ্ণুতা সীমা ছাড়িয়ে গেল যে।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর স্ত্রী এলেন স্বামীর কাছে। পরম মমতায় তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে স্ত্রী বললেন, এবার খাবার বাড়ি!
স্ত্রীর হাত ধরে তাঁকে পাশে বসালেন মুখ্যমন্ত্রী। হাতের মধ্যে হাত ধরা থাকল। সেই আবছা আলোয় স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে লাগলেন :
সব পাখি ঘরে আসে, সব নদী, ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার, বনলতা সেন।
এই গল্পের পটভূমি ২০০৯, যেদিন বিধানসভা উপনির্বাচনের ফল বেরোল, সেই দিনের গল্প। গল্পটিতে আমি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি বুদ্ধদেবের অন্তর্দ্বন্দ্ব, তাঁর নিঃসঙ্গতা, তাঁর নিরুচ্চার দীর্ঘশ্বাস। ২০২৪ এর আগস্টে চলে গেলেন তিনি। তাঁকে নিয়ে লেখা গল্পটি সংশোধন, সংযোজন করে পরিবেশন করছি জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় মশায়ের ‘পেজ ফোর’ পত্রিকায়।
Asadharon lekha Dada!!!pranam neben!!!
খুব সুন্দর সাবলীল লেখনী।