বসন্ত মানে সুর ফিরে পাওয়া কোকিলের কুহু, বসন্ত মানেই দোল আবিরে ভেসে যাওয়া রঙের খেলা, বসন্ত মানে বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণের হোলি খেলা বা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভের জয়ের প্রতীক হোলিকা দহন, বসন্ত মানেই বাঙালির ইতিহাসে শ্রীকৃষ্ণ, ভগবান বিষ্ণু আর চৈতন্যদেব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়।
আর এই বসন্তের প্রধান উৎসব হোলি এবং দোল। উৎসবের আয়োজন ও পালনের আঙ্গিক এক হলেও, বুৎপত্তিগত দিক থেকে এ দুটি আসলে আলাদা উৎসব।
আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তি রাধা রানীকে ‘অফিসিয়ালি’ প্রেম নিবেদন করেছিলেন ‘ফাগে’ (গুড়ো রঙ) রাঙিয়ে দিয়ে। বৃন্দাবন লীলায় ব্রজবাসীগন তাদের পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানীকে পেয়ে সীমাহীন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তাঁদের চরণযুগল আবির ঢেলে রঞ্জিত করে দিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন। উৎসবের প্রাণকেন্দ্র ‘নবীন শ্যামের পাশে নবীনা কিশোরী’কে দোলায় বসিয়ে আতপতন্ডুল, ফল, আবির কুমকুমে পুজো করেন।

বৃন্দাবন বাসীরা প্রেমানন্দে রাধা কৃষ্ণকে দোলনায় দোল দিয়েছিল বলে এই উৎসবটিকে “দোল উৎসব”ও বলা হয়।
বোঝাই যাচ্ছে দোল উৎসবে রংয়ের ভূমিকা প্রধান। এখানে লাল ও সবুজ প্রধান রং — লাল রক্ত যৌবন আর সবুজ বাসন্তিক পাতার বর্ণপ্রতীক। এরাই তো তারুণ্য, এরাই উত্তাপ। ফাল্গুনী বসন্তে ফগগু ফাগের সঙ্গে মিতালি পাতায় উড়ে চলা, ভেসে চলা, বাঁধ-না-মানা মনের অভিসার। আসলে এই ফাগ্ হলো পুষ্পরেণু। তাই এই উৎসবের আরেক নাম ফাগোয়া।
বিজয়গুপ্ত তাঁর পদ্মপুরাণে লিখেছেন, “শঙ্খ বদলে দিব সুবর্ণের চুড়ি/ সিঁদুর বদলে দিব ফাউগের গুঁড়ি”। এই মধু উৎসবে কোন এক সময় বঙ্গের বালবিধবারা শাখার বদলে সোনার চুরি এবং সিঁদুর বঞ্চিত বলে ফাগেরগুঁড়ি ব্যবহার করতেন। মদনকে এড়িয়ে চলাতো দুঃসাধ্যই।

অন্য এক কাহিনী বলে, এক অসুরের অত্যাচারে এলাকার মানুষ যখন অতিষ্ঠ তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণর হাতে মৃত্যু ঘটে সেই দুরাত্মার। তার মৃত্যুতে শ্রীকৃষ্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে আনন্দে বিশ্রামে দুলতে থাকেন দোলায়।
আবার স্কন্ধ পুরাণ অনুসারে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে রাজর্ষি ইন্দ্রদুম্ন দোল উৎসব সর্বপ্রথম চালু করেন।
ইতিহাস বলে দোলের সঙ্গে ঠাকুর দেবতার কোন সম্পর্ক নেই। বসন্তের আগমনে মনের খুশিতে ঝুলনে ঝুলতেন মানুষজন। মনের খুশি আর প্রাণের আনন্দে মায়েরা ঝোলাতেন কোলের শিশুকে। সেভাবেই কিন্তু পরবর্তী যুগের সাহিত্যে জুড়ে গিয়েছিলেন মা যশোদার নাম, আরো পরে ঝোলানো হয়েছিল কৃষ্ণকে এবং কৃষ্ণের পরেই রাধাকে।
দোলায় বসনো ব্যাপারটা বেশ পুরনো। দোল কথাটি সংস্কৃত দোলি বা দূল থেকে এসেছে। ‘তমাল শাখে ঝোলা ঝুলে ঝুলনে’ … ফাগুন উৎসবে তাই রাধাকৃষ্ণকে দোলায় ঝুলতে দেখা যায়। উত্তর ভারতে যেটি হোলি নামে পরিচিত বঙ্গ দেশে তার পরিচিত নাম দোল। শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত মথুরা ও রাধার জন্মস্থান হিসেবে জগদ্বিখ্যাত বরষণায় ১৬ দিন ধরে এই দোল উৎসব পালিত হয়।

এই দিনই আবার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি। নবদ্বীপ, মায়াপুর, কৃষ্ণনগরে এই তিথি উপলক্ষে বিশেষ পুজোআর্চার আয়োজন করা হয়। যে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রাধারানী এবং বৃন্দাবনবাসীদের সঙ্গে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠলেন, সেই ফাল্গুনী তিথিতেই আবার তিনি গৌরাঙ্গ রূপ ধারণ করে পুনরায় অবির্ভূত হয়ে কৃষ্ণনাম প্রচারের মধ্যে দিয়ে উদ্ধার করলেন জগৎবাসীকে।
এই দোলকে ঘিরে আরেক অনুষ্ঠানের নাম ‘আগুন উৎসব’ যার অন্য নাম ‘চাঁচর।’ কেউ বলে ‘ন্যাড়াপোড়া’ কেউ বলে ‘বুড়ির ঘর পোড়ানো’। এই অনুষ্ঠানটি দোলের ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় হয়। বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে আগুনে পোড়ানো হয় শুকনো খড়, খেজুর বা নারকেল পাতা কিংবা বাঁশের চাঁচরে বানানো মন্দিরাকৃতির ঘর বা নর-মূর্তি। ওড়িশায় যাকে বলে মেনটাপোরেই, দক্ষিণ ভারতে যার নাম কামদহনম। আসলে এটি যে পুরনো বছরের ক্লেদকে, জীর্ণতাকে পুড়িয়ে ফেলার উৎসব, সে ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।
অন্যদিকে হোলি সাধারণত দোলের পরের দিন পালিত হয়। এই উৎসবের নেপথ্যে রয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ ও প্রহ্লাদ। বিষ্ণু বিদ্বেষী হিরণ্যকশিপু তার বিষ্ণু ভক্ত পুত্র প্রহ্লাদকে বধ করার জন্য নিজের বোন হোলিকাকে নিযুক্ত করেছিলেন। হোলিকা প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারতে গিয়ে সেই আগুনে নিজেই পুড়ে মারা যান এবং বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ সুরক্ষিত থাকে। তারপর থেকেই এই অসুরীয় শক্তির পরাজয় ও শুভ শক্তির জয়কে উদযাপন করতে পালিত হয় হোলি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হোলিকা প্রহ্লাদের মতন প্রভু ভক্তকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছিল তবু আজও হাজার হাজার বছর ধরে তাকে কিসের জন্য আমরা পূজা করি?

হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে বসার জন্য যখন প্রস্তুত যখন হচ্ছিলেন, সেদিন নগরের প্রতিটি গৃহে প্রহ্লাদকে রক্ষা করার জন্য অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে অগ্নিদেবের নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেন নগরবাসী। অগ্নিদেব নগরবাসীর প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয় তাদের ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন, হোলিকাকে পুড়িয়ে শেষ করলেন আর অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রহ্লাদ নরশ্রেষ্ঠ রুপে পরিগণিত হলেন। প্রহ্লাদের জীবন রক্ষার জন্য প্রার্থনা রুপে যে অগ্নি পূজা নগরের প্রতিটি গৃহে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কালক্রমে তার সার্বজনীন পূজোর রূপ নিল। তাই পাড়ায় পাড়ায় এই হোলিকার পুজো শুরু হল। এই দৃষ্টিভঙ্গির বিচার করলে হোলিকার পূজা হল অসৎ বৃত্তির নাশ এবং সৎবৃত্তির রক্ষার জন্য হৃদয়ের শুভকামনার বিকাশ।
এই বছর দোলযাত্রা পড়েছে ২৫ মার্চ (বাংলায় ১০ চৈত্র)। দোল পূর্ণিমার সময় ২৪ মার্চ সকাল ৯টা ৫৬ মিনিটে শুরু হয়ে সমাপ্ত হবে পরের দিন ২৫ মার্চ দুপুর ১২টা ২৯ মিনিটে। হোলিকা দহনের সবচেয়ে শুভ তিথি ২৪ মার্চ রাত ১১টা ১৩ মিনিট থেকে ১২টা ২৭ মিনিট পর্যন্ত।
শীত পেরলেই আসে বসন্ত। আর বসন্তের আবির্ভাবে কাটে শীতের জড়তা। দেহে মনের লাগা জড়তা থেকে মুক্তির দোলা। মানুষ তখন স্বাভাবিকভাবেই আনন্দে মেতে ওঠে। প্রকৃতির এই পরিবর্তন মনকে রাঙিয়ে দেয়, ঝুলিয়ে দেয় ঝুলনে। বসন্তের যে উৎসবে বছর বছর নিয়মমাফিক এই রং-ঝালমলে আনন্দের প্রতিফলন ঘটে–তারই নাম ‘দোল’। সেই দোলের তরঙ্গ শরীর-মন ছুঁয়ে আকাশে প্রতিধ্বনিত করে ‘হোলি হ্যায়’।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বসন্ত উৎসবকে মনে করতেন ঘর থেকে বাইরে আসার উৎসব, মানুষে মানুষে মিলনের উৎসব। ফাগুনের রং আমাদের জীবনকে রঙিন করে, সংযমের দীক্ষা দেয়। সঙ্ঘ নিষ্ঠার মাহাত্ম্যকে বোঝায়, সমাজে বাসা বেধে আছে যে সমস্ত অসৎ বৃত্তিগুলি তাদের ভস্ম করার উপদেশও দেয়। তাই এই উৎসব দোলের উৎসব, হোলির উৎসব।
অনেক অনেক কিছু জানতে পারলাম। ভীষণ আনন্দ পেলাম তাতে।
খুব খুশি হলাম তোমার কমেন্ট পেয়ে।