| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ধর্ষিতা বড়োগল্প লিখেছেন সমরেশ বসু (তৃতীয় পর্ব)

Reporter
সমরেশ বসু / ২৫৫ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১

২.

এরপরে যে ঘটনা লেখা হয়েছে, তার কোনও তারিখ নেই, কিন্তু দিনের একটা হিসাব থেকে বোঝ যায়, ঘটনা জুলাই মাসের মধ্যেই ঘটেছিল। হাতের লেখা অত্যন্ত দ্রুত, ফলে অক্ষর অসমান, লাইন আঁকাবাঁকা।

হায় আল্লা, কদিন ধরে আমার মনে এ ভয়টাই হচ্ছিল। মুশতাক চলে গেছে। আজ দশ দিনও হয়নি, সেই লেঃ কর্নেল এসেছিল। সেই থেকেই, এ কথাটা আমার মনে হচ্ছিল। কারণ, পরের দিন, মুশতাক আমাকে বলেছিল, সে আর এভাবে দিন কাটাতে পারছে না। কীভাবে দিন কাটালে ঠিক হয়, তাও সে বলেনি। পরশু রাত্রে মুশতাক চলে গেছে।

একলা মুশতাক না। ড্রাইভার রমজানও চলে গেছে। কাল সকালে তাকেও আর দেখা যায়নি। মুশতাক আমার জন্য একটা চিরকুট রেখে গেছে, সকালবেলা আমি যেখানে নামাজ পড়তে বসি, তার কাছেই। লিখে গেছে, আম্মা, চললাম। একজন খান সেনাও যতদিন বাংলাদেশে থাকবে, ততদিন ফিরব না।–তোমার মুশতাক। আর কিছুই সে লেখেনি। কিন্তু সে কী করতে গেছে, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। নামাজে বসব কী, আমার প্রাণটা হাহাকার করে উঠল। মুশতাককে আর কোনওদিন দেখতে পাব কি না, জানি না। তাড়াতাড়ি মোরশেদকে ঘুম থেকে তুলে, তাকে চিরকুটটা দেখালাম। সে সেটা দেখে হতভম্ব হয়ে বসে রইল। একটু পরেই, কুলসম এসে আমাকে বলল, পাশের বাড়ি থেকে হাফেজ বেগম এসেছেন। আমি নীচে নেমে গেলাম। তাঁর মুখ থেকে শুনলাম, তাঁদের দুই ছেলে আতা আর নুর চলে গেছে। বলতে বলতে তাঁর চোখে জল এসে পড়ল। বললেন, আমার দুধের বাচ্চারা কোথায় লড়াই করতে গেল?

কিন্তু খোদার শুকুর, বেলা দশটার সময় পাঞ্জাবি মিলিটারি এসে আমাদের কয়েকটা বাড়ি ঘিরে ফেলল, আর নাম বলে বলে, গালিগালাজ করে ছেলেদের খোঁজখবর করল। একদল বন্দুক বাগিয়ে বাইরে পাহারা। আর একদল বন্দুক উঁচিয়ে বাড়ির মধ্যে। মোরশেদ তখনও বাড়ি থেকে বেরোয়নি। সেই লেঃ কর্নেল ইয়াকুব এল। তার চোখা গোঁফে হাসি, কিন্তু চোখ দুটো যেন জ্বলছে। তার পাশে একটা লোক, মনে হল বাঙালি, লোকটার নজর দেখলে মনটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। ইয়াকুব বলল, আসলামওয়ালাইকোম্ শামসের সাব, আপনার ছেলের সঙ্গে আলাপ করতে এলাম, তাকে ডাকুন। মোরশেদ বলল, সে তো ঘরে নেই। কোথায় গেছে? বোধহয় কাছেই কোথাও গেছে। কখন? মোরশেদ বলল, ঘণ্টাখানেক আগে। ইয়াকুব সঙ্গে সঙ্গে বলল, কী করে সে তা গেল? বাইরে তো কারফিউ রয়েছে। তার কি পাশ আছে? মোরশেদ কোনও জবাব দিতে পারল না। ইয়াকুব সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক বাগানো দুজন খানের দিকে ফিরে বলল, বাড়ির অন্দরে যাও, খুঁজে দেখো৷ আমি ডাইনিংরুমে ছিলাম। তাড়াতাড়ি রসুইখানায় চলে গেলাম। পাঞ্জাবিরা বাড়ির মধ্যে ঢুকল, সঙ্গে সেই বাঙালিটা। তারা একতলা দোতলা, বাগান, গ্যারাজ সব ঘুরে দেখল। মুশতাক কি জানত ওদের খুঁজতে আসবে? অথবা। পাঞ্জাবিরাই কিছু জানতে পেরেছিল? তারা রসুইখানা থেকে বাথরুম, কিছুই বাদ দিল না। আবদুল আর কুলসম আমার কাছেই দাঁড়িয়েছিল। আমি পাঞ্জাবিদের মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম না। কুলসমের চৌদ্দ বছর বয়স। তার দিকে পাঞ্জাবি দুটো তাকাল, যেরকম লোভী কুকুরের মতন তাকাল, দেখে আমার গায়ের মধ্যে শিউরে উঠল।

তারা মুশতাককে পেল না। ইয়াকুব চিৎকার করে আমাকে বাইরের ঘরে তলব করল। জিজ্ঞেস করল, আপনি কি জানেন, আপনার ছেলে কোথায়? এই সেই লেঃ কর্নেল ইয়াকুব, মোরশেদ যাকে খাঁটি ভদ্রলোক মনে করেছিল। আমি বললাম, না। ইয়াকুব যেন খুবই দুঃখিত; বলল, কিছু মনে। করবেন না মিসেস শামসের, আমাকে কর্তব্য করতে হচ্ছে। আমাদের কাছে খবর আছে, আপনার ছেলে। মুক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। আপনি কিছু জানেন? আমি একই জবাব দিলাম, না।ইয়াকুবের তীক্ষ্ণ সন্দিগ্ধ চোখের সঙ্গে আমার নজর মিলল। ইয়াকুব হঠাৎ হেসে উঠল। হাসিটার কী অর্থ বুঝলাম না। সে মোরশেদের দিকে ফিরে বলল, খোদার কী মর্জি জানি না। এখন চললাম। তখন হাফেজ সাহেবের বাড়িতে চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিল, তার সঙ্গে অন্যান্য পাঞ্জাবি গালিগালাজ। আমাদের মোকাম থেকে সবাই বেরিয়ে গেল। পরে জানলাম, ওরা হাফেজ সাহেবকে মারধোর করেছে। আমাদের পিছনের বাড়ির, সামাদ সাহেবের বারো বছরের ছেলেটিকে নিয়ে চলে গেছে। এই প্রথম দেখলাম, মোরশেদ চোখ বুজে চুপ করে সোফায় বসে আছে।

কিন্তু অবাক হবার মতো আরও ঘটনা ঘটল। গতকালের ঘটনার পরে, আজ সকাল বেলা দেখছি, হাফেজ সাহেবের বাড়ি একেবারে চুপচাপ, দরজা-জানালা সব বন্ধ। কেমন যেন সন্দেহ হল। আবদুলকে দেখতে পাঠালাম। সে এসে বলল, সব বন্ধ, তালা ঝুলছে। কখন সবাই চলে গেল? নিশ্চয়ই রাত্রের অন্ধকারে, চুপিসাড়ে। কিন্তু আমাদের একটু জানাল না? আশেপাশের বাড়িগুলোতে লোক আছে কি না বুঝতে পারলাম না। সামাদ সাহেবের বাড়িতে টেলিফোন আছে। সেখানে টেলিফোন করলাম। বেশ খানিকক্ষণ বাজবার পরে জবাব পাওয়া গেল। যেন ভয় পাওয়া সন্দিগ্ধ মোটা ভাঙা গলা। জিজ্ঞেস করলাম, কে কথা বলেন? উত্তর এল, আপনি কে? আমি আমার পরিচয় দিলাম। তখন সামাদ সাহেব নিজের নাম বললেন। আমি হাফেজ পরিবারের অন্তর্ধানের কথা বললাম। জানতে চাইলাম, তাঁরাও সেরকম ভাবছেন নাকি। সামাদ সাহেব বললেন, না, এখনও সেরকম কিছু ভাবিনি। ছেলেটার কথাই কেবল ভাবছি। মনে হল সামাদ সাহেব কাঁদছেন। আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। মোরশেদকে গিয়ে সব কথা বললাম। মনে হল মোরশেদের চোখও ছলছল করছে। সে বলল, বুলবুলি, মুশতাকের সঙ্গে আমার কতদিন একটা কথাও হয়নি। শুনে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। হা খোদা! আজ মোরশেদের সে কথা মনে পড়ল। কিন্তু আমার মুশতাক শুনতে পেল না। আমি নিজেকে স্থির রেখে, মোরশেদের বুকে হাত চেপে বললাম, হবে, মুশতাক ফিরে এসে আবার আপনার সঙ্গে কথা বলবে। মোরশেদ অন্য দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল।

এখন বিকাল পাঁচটা। আসমান মেঘে ঢাকা। ঘর অন্ধকারময় লাগছে। যাই দেখি মোরশেদ কী করছে। দূর থেকে কি ট্রাকের গর্জন ভেসে আসছে?

আমি খুব দ্রুত পরের পাতা ওলটালাম। সাদা, কিছু লেখা নেই। অথচ প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে এমনভাবে এখানে শেষ হয়েছে, মনে হয়, তারপরেই কিছু ঘটেছে। পর পর বেশ কয়েকটি পাতা উলটে গেলাম, পাছে কোনও ঘটনা ছেড়ে যাই। কিন্তু হাজার হাজার মেয়ের ভাগ্যে যা ঘটেছে, এই লেখিকা মিসেস শামসেরের জীবনে এ পর্যন্ত তার কিছুই ঘটেনি দেখছি। আরও কয়েকটি সাদা পাতা উলটে, আমি যখন হতাশ হতে চলেছি, তখনই দেখতে পেলাম, একই হাতের লেখা, ভিন্ন তার রূপ। হস্তাক্ষর অনেক বড়, বড়, অথচ যেন কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা, জড়ানো। এবং প্রথম শুরুটা দেখেই বোঝা যায়, লেখিকা মোটেই কিছু লিখবে কিনা, তা স্থির করে উঠতে পারেনি। কারণ প্রথম একটু লিখে, অনেকখানি ফাঁক দিয়ে আবার লিখেছে, আর সেখানেই একটা তারিখ বসানো আছে।

এই তো আমার সেই নোটবুক। কিন্তু আর আমার কী লেখার আছে? কী ভেবে আজ আবার আমি হাতে কলম তুলে নিলাম? খোদা, আমাকে দিয়ে তোমার এই সংসারে আর কী দরকার আছে? বেঁচে থাকবার সব প্রয়োজন কি আমার ফুরিয়ে যায়নি? মোরশেদ বা মুশতাকের কোনও অসুখবিসুখ করলে আমার মন যখন খারাপ হয়ে যেত, তখন আম্মা আমাকে কাছে নিয়ে বলতেন, আমার তাবত এবাদতের বদলে, আমি ওদের হায়াত মেগে নিচ্ছি। আমি জীবনে কখনও অন্যায় করিনি। কিন্তু সারা জীবনে আমিও তো কোনও অন্যায় করিনি। আমিও তো আমার এবাদতের বদলে স্বামী-পুত্রের হায়াত চেয়েছিলাম!…

তারপরে অনেক নীচে, লেখিকা মোটামুটি মনস্থির করে তার জীবনের এক মর্মন্তুদ ঘটনা লিখেছে:

২১-১-৭২, শুক্রবার।

জুলাই মাসের সেই সর্বনাশা বিকাল, এই নোটবুকে লিখতে লিখতেই সেই যে মোরশেদের কাছে যাচ্ছিলাম, আর দূর থেকে যেন ট্রাকের আওয়াজ কানে এসেছিল, সেই আওয়াজ যেন হাজারটা বাঘের মতন গর্জন করে আমাদের গোটা পাড়াটা ঢেকে ফেলেছিল। মোরশেদ তখন তার ঘরে নামাজ পড়া শেষ করে বসে ছিল। কুলসম চা দিয়ে গেছে, পেয়ালায় ধোঁয়া উঠছে। তখনও চুমুক দেওয়া হয়নি। আমাকে দেখে সে ডাক দিল, আসো মুশতাকের আম্মা। সেই প্রথম আমাকে সে মুশতাকের আম্মা বলে ডাকল। এরকমভাবে সে কখনও ডাকেনি। দু দিন সে তার কাজে বার হয়নি। আগের দিনের ঘটনার পর থেকে তার যেন আমূল পরিবর্তন হয়েছিল। আমি তার কাছে এগিয়ে যাচ্ছি, ট্রাক আর জিপের গর্জনও যেন আমাদের ঘিরে ফেলল। তারপরেই দুমদাম আওয়াজ কানে এল। চিৎকার আর গালিগালাজের সঙ্গে হুকুম শোনা গেল, গোলি চালাও। কোথায় কী ঘটছে বোঝবার আগেই আবদুল ওপরে ছুটে এল। সে তখন কাঁপছিল। সে বলল, হাফেজ সাহেবের বাড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে ওরা তছনছ করছে। আমাদের আর আশপাশের বাড়ির দরজায় দরজায় সব বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক মিলিটারি একসঙ্গে এসেছে।

মোরশেদ তখন ঘরোয়া লেবাজ পরেছিল। সেটাকে কোমরের ওপরে একটু টেনে দিয়ে, জানালা সামান্য একটু ফাঁক করে দেখল। তার পাশেই আমি দাঁড়িয়েছিলাম। চুপিচুপি বললাম, কী দেখছেন? মোরশেদ আস্তে আস্তে জানালাটা বন্ধ করে, নিচু স্বরে বলল, ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের লোকেরা এসেছে। যমে ছাড়লেও এরা নাকি ছাড়ে না। কথাটা শুনে, আমার বুকের মধ্যেও কেঁপে উঠল। আমিও শুনেছি, এই এফ. আই. ইউ. চক্র বড় ভয়ংকর। সামরিক গুপ্তচর বাহিনী। এরা যাদের পিছনে লাগে, তাদের ছাড়ে না। কাউকে বিশ্বাস করে না, নিজেরা যে সংবাদ পায়, তা ছাড়া আর কিছু বিশ্বাস করে না। সমস্ত ঢাকা শহর নাকি এদের হাতে।

আশপাশের গোলমাল আর চিৎকারের মধ্যে, আমাদের নীচের দরজায় দুমদাম আওয়াজ হল। মোরশেদ ঘরের বাইরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আমি তার হাত ধরে বললাম, আপনি কোথায় যান? নীচে। না, আপনি যাবেন না, এদের আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। মোরশেদ বলল, আমাকে অনেকে চেনে, আমাকে ওরা মারবে না।বলে সে নীচে নেমে গেল। আমি পিছন পিছন এসে ডাইনিং রুমের পরদার পাশে উঁকি দিলাম। মোরশেদ দরজা খুলে দিতেই কয়েকজন তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। বন্দুকের নল তাগ করা। একজন, মনে হল সে একজন পাঞ্জাবি ক্যাপটেন, মোরশেদের বুকের ওপর রিভলবারের নল ঠেকিয়ে, নিজের ভাষায় বলল, কুত্তার বাচ্চা বাঙালি, তোর ছেলে কোথায় আছে বল, আর পাশের কুত্তারা কোথায় গেছে, তাও কবুল কর। আমার বুকের মধ্যে এমন করছিল, যেন ফেটে যাবে। কিন্তু মোরশেদ ক্যাপটেনের জবাবের ধারকাছ দিয়ে গেল না। আমি দেখলাম, তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। তবু সে শান্ত আর গম্ভীর স্বরে বলল, মোসলমান হয়ে তুমি মোসলমানের সঙ্গে কথা বলতে শেখনি? বলামাত্রই সেই শয়তান মোরশেদের গালে প্রচণ্ড জোরে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিল। আমি পরদার আড়াল থেকে আর্তনাদ করে উঠলাম। মোরশেদ তবু টাল সামলে দাঁড়াল। শয়তানটা বলল, বাঙালি যদি মোসলমান হয়, তবে বেইমান কে? আমি ও সব বাজে কথা শুনতে চাই না। যা পুছ করছি, তার জবাব দাও। মোরশেদ বলল, আমি জানি না। মিলিটারি ক্যাপটেন মোরশেদের দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে বলল, এখনও বলছি, কবুল কর। মোরশেদের ঠোঁটের কোণে রক্ত। সে আবার বলল, আমি জানি না। সঙ্গে সঙ্গে একটা মাত্র বাড়ি কাঁপানো আওয়াজ। মোরশেদ ঘরের মেঝেয় লুটিয়ে পড়ল, একটা আওয়াজও করল না। আমি চিৎকার করে, মোরশেদের পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে গেলাম। কিন্তু এখন আর মনে করতে পারি না, আমি কী বলে কেঁদেছিলাম, মোরশেদকে আমি স্পর্শ করতে পেরেছিলাম কি না! আমার জ্ঞান ছিল না।

এর পরে, প্রথম আমার জ্ঞান হয়, ঠোঁটের ওপর আগ্রাসী দংশনে। জ্ঞান হওয়া মাত্র মুখ ছাড়াতে গেলাম। পারলাম না। আমার শরীরের ওপরে মানুষ। সম্ভবত সেই মাত্রই আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমার শরীর যে প্রায় বিবস্ত্র, তাও টের পেয়েছিলাম। আমি যে কোথায়, তাও বুঝতে পারছিলাম না। চিৎকার করতে পারছিলাম না। নিজের গোঙানি নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম। এমন কী চোখ চেয়েও, লোকটার মুখ আমি ভাল করে দেখতে পাইনি। যতই হাত-পা ছুড়ি সেই আসুরিক শক্তির সঙ্গে আমি পেরে উঠছিলাম না। আমাকে জোর করতে দেখে, সে আমাকে পাগলা কুত্তার মতো দংশন করেছিল। আমার সারা গায়ে আঘাত, প্রচণ্ড আঘাত করেছিল। কী ভাবে পশুটা তার কামনা চরিতার্থ করেছিল, আমি জানি না। আবার জ্ঞান হারিয়েছিলাম….

তারপরে যখন আমার জ্ঞান হয়েছিল, প্রথম চোখ খুলে দেখছিলাম, মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে। প্রথমে কিছুই মনে করতে পারলাম না। আবার চোখ বুজলাম। আবার চোখ খুললাম। মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে। আবার চোখ বুজে গেল, আর তখনই মোরশেদের কথা মনে পড়ে গেল।–মোরশেদ রিভলবারের গুলি খেয়ে পড়ে গেল। তারপরেই সেই ভয়ংকর যন্ত্রণা আমার ঠোঁটে, শরীরে, আর সেই জানোয়ারের অত্যাচার। আমি তাড়াতাড়ি উঠতে গেলাম। পারলাম না। আমার সারা গায়ে, কোমরে অসম্ভব ব্যথা। চোখ চেয়েই ভাবলাম, কোথায় রয়েছি? শোবার ঘরেই খাটে শুয়ে আছি নাকি? পাশ ফিরে তাকালাম। প্রায় আমার শিয়রের কাছেই একটা সোফা। মেঝেতে বেগুনি রঙের কার্পেট পাতা। আস্তে আস্তে অন্যদিকে পাশ ফিরলাম। একটা আলো জ্বলছে, বাতাসে ঝোলানো আলো দুলছে। দেয়াল ঘেঁষে টেবিল। তার ওপরে দু-তিনটে গেলাস, পানির জাগ, হুইস্কির বোতল, ছাইদানি, সিগারেটের প্যাকেট, টেবিলের ধারে দুটো চেয়ার। টেবিলের এক পাশে একটা আলমারি। সবই আমার অচেনা। এ তো আমার ঘর না! এত ঘটনার পরেও, আমি যেন নতুন করে আতঙ্কে কেঁপে উঠলাম। তবে আমি কোথায় আছি? পশুরা আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছে? এবার শরীরের সমস্ত যন্ত্রণাকে অবজ্ঞা করে আমি বিছানায় উঠে বসলাম। বসতেই, সামনাসামনি একটা আয়নায় নিজেকে দেখতে পেলাম, আর তৎক্ষণাৎ আমার গা থেকে কিছু কোলের কাছে ঝরে পড়ল। ইয়া আল্লা! আমার জামা আর অন্তর্বাস। সবই আমার বুকের ওপর জড়ো করা ছিল। তাড়াতাড়ি সেগুলো তুলে বুকের কাছে চেপে ধরলাম। আয়নার দিকে তাকালাম। আয়নাটা একটা ড্রেসিং টেবিলের সঙ্গে জোড়া, খাট থেকে দূরে, দেয়াল ঘেঁষে। ঘরের আলো তেমন জোর না। ভাল করে কিছু দেখা যায় না। দূর থেকে আয়নায় যে মুখ দেখতে পাচ্ছি সেটা আমার নিজের মুখ বলে যেন চিনতে পারছি না। ঠোঁটের চার পাশে যেন কিছু লেগে আছে। সেখানে টনটনে ব্যথা। নিচু হয়ে নিজেকে দেখলাম। শাড়ি নেই, শুধু সায়াটা রয়েছে। নিজের এই অবস্থা দেখে, আর কিছু হল না, কেবল কান্না পেল। হা মোরশেদ, তুমি কোথায়! এই তোমার বুলবুলির হাল। মুশতাক, তুই কোথায়! এই তোর আম্মার নসিব। আর মনে পড়ল, ফরিদপুরের কোন পরিবারের মেয়ে আমি! যে পরিবারকে সারা বাংলাদেশের লোক এক ডাকে চিনত।

কিন্তু কী হবে এ সব ভেবে? এ ভাবে কেঁদে? কান্না থামল। আমার এই ছিঁড়ে খাওয়া শরীরের দিকে তাকিয়েই বা নতুন কী দেখব? জামাটা ছিঁড়ে ফেলেছে খানিকটা। অন্তর্বাসটা আস্ত। বিছানায় বসে বসেই, সেগুলো যথারীতি পরে নিলাম। তারপরে আস্তে আস্তে খাট থেকে নেমে দাঁড়ালাম। দাঁড়াতে কষ্ট, পা দুটো কাঁপছে। একটুখানি দাঁড়িয়ে থেকে, আয়নার সামনে গেলাম। ঠোঁটের চারপাশেই রক্তের দাগ। গালে নীল দাগ। জানি, জানোয়ারের আগ্রাসী শোষণের আর দংশনের চিহ্ন।

বড় পিপাসা। ইচ্ছা না থাকলেও, জানোয়ারদের পানীয় জাগ তুলে গলায় পানি ঢালোম। মনে হয়েছিল, ভিতরে যেন একটা জ্বলন্ত চুলায় কলকল করে পানি পড়ল। আগুন নিভল, ঠাণ্ডা হল না। তখন ঘরের চারদিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম। এতক্ষণ কোনও আওয়াজ কানে আসছিল না। এখন মনে হল, কোথাও যেন, অনেক দূরে মানুষের গলা এক-আধবার শোনা যাচ্ছে। আমার ভুলও হতে পারে। কিন্তু কোথায় আছি আমি? দুটো দরজা দেখতে পাচ্ছিলাম। দুটো জানালা, পরদা ঢাকা। জানালা দুটোর কাছে গিয়ে পরদা সরিয়ে দেখলাম কাগজ লাগানো কাঁচের পাল্লা। তার ফাঁক দিয়ে কিছুই দেখা যায় না, ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। মনে পড়ে গেল, বাইরে ব্ল্যাক আউট। দরজার কাছে গিয়ে, হাতল ঘুরিয়ে ঠেলতেই। দরজা খুলে গেল। অন্ধকার ঘর, বোধহয় গোসলখানা। ডান দিকে সুইচ দেখে টিপলাম। দেখলাম, তা-ই। ভিতরে গিয়ে দেখি, অপরিষ্কার, দুর্গন্ধ। একটা স্ট্যান্ডে দুটো ব্যবহৃত টাওয়েল ঝুলছে, তার পাশেই ওটা কী ঝুলছে? তাজ্জব হয়ে দেখলাম, মেয়েদের একটি অন্তর্বাস। তারপরেই চোখে পড়ল, এক কোণে লেডিজ স্লিপার। এ কার ঘর? কোথায় আছি জানি? এ সব কি আমারই মতো কোনও হতভাগির অন্তর্বাস আর স্লিপার? একদিকের দেয়ালে, উঁচুতে স্কাইলাইট, সেখানেও অন্ধকার। বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে, অন্য দরজাটার হাতল ধরে টানতে গেলাম। বাইরে থেকে বন্ধ, হাতল ঘুরল না।

তখন কত রাত্রি, জানি না। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। মোরশেদের সেই গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়া ছবি আবার আমার চোখে ভেসে উঠল। মোরশেদ কি তখন বেঁচে ছিল? বেঁচে আছে? খোদা, তাই যেন হয়। কিন্তু আমার এই মুখ যেন তাকে আর দেখতে না হয়। মুশতাককেই বা এ মুখ আর দেখাব কেমন করে? এখন খোদার কাছে একমাত্র আরজি, মুশতাক যেন তার জবান রাখতে পারে। একজন খান সেনাও যেন এ দেশের মাটিতে না থাকতে পারে।

হঠাৎ মনে হল, কোথায় যেন কারা চিৎকার করে কথা বলছে। আমি দরজায় কান পাতলাম। মনে হল, দূরে বুটের আওয়াজ, কারা যেন চলাফেরা করছে। তার মধ্যেই আচমকা স্ত্রীলোকের আর্তনাদ শুনতে পেলাম। সেই আর্তনাদে আমার হাত-পা যখন হিম হয়ে যাচ্ছে, সেই সময়েই মনে হল, ভারী বুটের আওয়াজ এদিকে এগিয়ে আসছে। আমি দরজার কাছ থেকে ছিটকে সরে এলাম। আওয়াজ আরও এগিয়ে এল, দরজায় চাবি ঘোরাবার আওয়াজ হল। আমি দৌড়ে গোসলখানায় ঢুকে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই পাঞ্জাবি ভাষার গর্জন শুনতে পেলাম, কই, ও কোথায়? কয়েক পলক পড়তে না পড়তেই, জবাব শোনা গেল, জরুর গোসলখানার মধ্যে ঢুকেছে। বলতে বলতেই, দরজায় দমাদম ধাক্কা আর বুটের লাথি পড়তে লাগল, তার সঙ্গে চিৎকার, খোল,দরজা খোল, তা না হলে গুলি করে দরজা ভেঙে ফেলব। বন্ধ দরজার ওপারে হুকুমের স্বর শুনতে পেলাম, থামো গুলি কোরো না, আমি দেখছি। গলার স্বরটা কি চেনা ঠেকল? দরজায় খট খট করে আওয়াজ হল, শুনতে পেলাম, মিসেস শামসের, আপনি কি ভিতরে আছেন? আমি লেঃ কর্নেল ইয়াকুব বলছি। সেই জন্যই গলার স্বর আমার চেনা ঠেকছিল। তা হলে লেঃ কর্নেল ইয়াকুব এখানেই আছে। আমি কোনও জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলাম।

ইয়াকুবের শান্ত গলা আবার শোনা গেল, মিসেস শামসের, আমি জানতাম না, ওরা আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছে। এই মাত্র জানতে পেরেই ছুটে এসেছি। আপনার কোনও ভয় নেই, দরজা খুলুন।

ইয়াকুবের গলার স্বরে যথেষ্ট বিশ্বাস ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা আছে। কিন্তু পাঞ্জাবিকে বিশ্বাস? এর পরেও কি সে বিশ্বাস আমি করতে পারি? ইয়াকুবের সেই নজর আর হাসি কি আমি ভুলে গেছি? দরজায় করাঘাত, ইয়াকুবের গলা আবার শোনা গেল, দরজা খুলুন, আমাকে বিশ্বাস করুন। আমি প্রায় চিৎকার করেই জবাব দিলাম, আমি বিশ্বাস করি না। ইয়াকুবের গলা শোনা গেল, আমাকে বিশ্বাস করুন। তা না হলে এরা গুলি করে দরজা ভেঙে ফেলবে। আমি আপনাকে বাঁচাতে চাই৷বাঁচা? এখন। আর আমার বাঁচা-মরার কী আছে? কিন্তু কই, তবু তো মরবার কথা যেন ভাবতে পারছি না। ইয়াকুবের কথার স্বর যেন ব্যস্ত আর উদ্বিগ্ন। একেই কি বলে, পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষের তৃণকুটা ধরে বাঁচবার আশা?

(আগামীকাল চতুর্থ পর্ব)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev