আমি হোটেলে ফিরে বাইরের পোশাক বদলে একটু ঝাড়া হাত পা হয়ে নিলাম। কিন্তু আমার মন এবং চোখ টেনে রেখেছে নোটবুকটি। যে নিপীড়িতা মেয়ে লিখতে জানে, সে নিশ্চয়ই অনেক কিছু ব্যক্ত ও ব্যাখ্যা করতে পারে। তীব্র একটা কৌতূহল আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বেড সুইচ জ্বালিয়ে আমি নোটবুকের পাতা উলটালাম।
সামনের দিকে কয়েকটি পাতায় কিছুই লেখা নেই। পাতায় পাতায় মাস এবং দিনাঙ্ক ইংরেজিতে ছাপা। প্রথম লেখা পাতাটিতে রবীন্দ্রনাথের ইতস্তত কয়েকটি কবিতার লাইন লেখা, নজরুলের দু-একটি গানের কলি। এক পাশে ছোট একটি গোলাপ আঁকা, যেন রুমালের কোণে ফুল তোলা। যদিও কলমের কালিতে আঁকা। হাতের লেখা গোটা গোটা, স্পষ্ট, পরিচ্ছন্ন।
পরের পাতা ওলটালাম। বিশেষ কিছু লেখা নেই। মাঝখানে লেখা রয়েছে, আশায় রইলাম। তার নীচেই ছোট একটি পালতোলা নৌকা আঁকা। তার নীচে কিছু লিখে আবার ভাল করে কেটে দেওয়া হয়েছে। পড়া যায় না। বাঁ পাশের নীচের দিকে লেখা রয়েছে, পেট্রল-১৯ গ্যালন। রমজন–৪ টাকা। একেবারে নীচে, কলম বুলিয়ে বুলিয়ে মোটা করে লেখা আছে, মুশতাক। গোটা পাতায় আর কিছুই নেই। তারপরে দু পাতায় কিছুই লেখা নেই। আবার পরের পাতায় লেখা রয়েছে-খোদা। আমার মন বড় খারাপ লাগছে। কী ঘটবে কিছুই বুঝতে পারছি না। বাইরে অশান্তি, ঘরেও অশান্তি। হাসিনা আর মজিদ ভাইও আজ ইন্ডিয়াতে চলে গেল। রোজিকে আগেই আগরতলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে নাকি এখন কলকাতায় আছে। মুশতাক এত গম্ভীর হয়ে গেল কেন। দুদিন ধরে সে আমার সঙ্গে প্রায় একটা কথাও বলেনি। তার আব্বাজানের সঙ্গে কথাবার্তা তো অনেক দিন ধরেই বন্ধ। দেখেশুনে আমার মনের অবস্থা এমন হয়েছে যে, নামাজে বসলেও আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি। শহরটা যেন কবরখানার মতো নিঝুম আর নিশ্চুপ। মোরশেদ বাড়িতে না থাকলে, একটা সামান্য আওয়াজেও ভীষণ চমকে উঠি। বুকের মধ্যে ধ ধ করতে থাকে। বিশেষ করে দূর থেকে যখন কোনও ভারী ট্রাক বা জিপের আওয়াজ আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে, আর বাড়িতে আমি, আবদুল আর কুলসম এবং আম্মা ছাড়া কেউ থাকে না, তখন মনে হয় সেই ভয়ংকর আওয়াজ যেন আমার বুকে চেপে আসছে। আবদুল নিরীহ ভিতু প্রকৃতির চাকর। কুলসম ছেলেমানুষ, গ্রাম্য মেয়ে। আম্মা বুড়ি মানুষ। তাদের উপর আমার কোনও ভরসা নেই। রাস্তায় একটি লোক নেই। জানালার পরদা ফাঁক করে যেদিকেই তাকাই একটা মানুষও দেখতে পাই না।
খোদার শুকুর, আজ পর্যন্ত কোনও মিলিটারি গাড়ি আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়ায়নি। কিন্তু মন মানে না। কিছু কিছু খবর যা পাই, ভরসা বলে কিছু করার নেই। একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলেই হল। তবে আমাদের কি ওরা কিছু করবে? পাশের বাড়ির হাফেজ সাহেব সাইকেল রিকশায় চেপে অফিসে যান, ভয়ে গ্যারাজ থেকে গাড়ি বের করেন না। মোরশেদ তো রোজই গাড়ি নিয়ে বেরোয়, গাড়িতেই ফিরে আসে৷ সেটাও কেমন খারাপ লাগে। তার যেন কোনও দুশ্চিন্তা নেই, ভয় ভাবনা নেই। দেশে এখন যা। চলছে সে বিষয়ে তার মতামত একেবারে অন্যরকম। আমার ভাল লাগে না। মুশতাকের সঙ্গে তা নিয়ে। তো প্রায়ই কথা কাটাকাটি হত। এখন মুশতাক মুখ বন্ধ করেছে। সেটা আরও খারাপ। যখন কথা কাটাকাটি করত, তখন তবু তাকে বোঝা যেত। এখন কিছুই বলে না। সে তার আব্বাজানের সামনে পর্যন্ত আসে না। মোরশেদ জিজ্ঞাসাবাদ করে, ছেলেটা কোথায় কী করছে। কিন্তু সে যতই জিজ্ঞাসাবাদ করুক, আমি জানি, সেও মুশতাক সম্পর্কে মনে মনে শক্ত হয়ে থাকে। বুঝি, কিছু বলি না। আমি মনে মনে মুশতাকেরই পক্ষে। ও আমার ছেলে বলে নয়। মোরশেদকে ছাড়া আমি দ্বিতীয় পুরুষকে জানি না। তার মতো স্বামী কজনের হয়? তাকে নিয়ে আমি সুখী, গর্বিত। কিন্তু একমাত্র মোসলমান বলেই, পাঞ্জাবিদের অন্যায় অত্যাচার মেনে নিতে পারি না। তাদের সঙ্গে বোঝাঁপড়ার আর কিছু নেই। তাদের বুঝতে আর বাকি কিছু নেই। তারা বিশ্বাসঘাতক, তাদের প্রত্যেকটি কাজ তাই প্রমাণ করেছে। অথচ মোরশেদ এখনও আশা রাখে, পশ্চিমের সঙ্গে একটা মিটমাট করে নেওয়া যায়, করে নিতে হবে। এটাই মোরশেদের বক্তব্য, তবু ইন্ডিয়ার সঙ্গে কিছুতেই হাত মেলানো চলবে না। আমি জানি, মোরশেদ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। কিন্তু দিনের পর দিন যা ঘটছে, তারপরে আমি আর তার মতামতের উপর আস্থা রাখতে পারছি না। এটাও জানি, তার সঙ্গে তর্ক করেও লাভ নেই। সেও মোটামুটি আমার মনোভাব বোঝে, তর্ক করতে চায় না। আমিও চাই না। আমার ভয় অন্যখানে। এখন মোটামুটি যা পরিস্থিতি, মোরশেদকে লোকে হয়তো দেশের শক্ত ভাবছে। পাশের বাড়ির হাফেজ সাহেব আর তেমন। আসেন না। তাঁর সেই সরল হাসি আর নেই। বুঝতে পারি, আমাদের যেন কেমন এড়িয়ে চলেন। বেগম। হাফেজও তাই। আমাদের এদিকে জানালা খোলা থাকে না। অথচ মুশতাকের সঙ্গে তাদের খুব ভাব। হাফেজ সাহেবের ছেলের সঙ্গে মুশতাক বেশি সময় কাটায়। এখন ইস্কুল কলেজ বলে কিছু নেই, লেখাপড়ারও কথা নেই। কিন্তু মুশতাক, হাফেজ সাহেবের ছেলে আতাউর আর নুরুল, আরও কয়েকটি ছেলে, যারা আমাকে চাচি বা খালু বলে ডাকে, তাদের হাবভাব চলাফেরাও যেন কেমন। ছেলেগুলি যেন কী একটা করছে! সামনাসামনি কিছু দেখতে বা শুনতে পাই না। মনে মনে ভয় পাই। পল্টনের সৈয়দ আলি সাহেবের ছেলে তো নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দিয়েছে। আরও অনেকেই চলে গেছে। জোয়ান ছেলেদের পাঞ্জবিরা বিশ্বাস করে না। নিয়মিত খোঁজখবর রাখে। প্রত্যেককে নিয়মিত থানায় হাজিরা দিতে হয়। মুশতাককেও দিতে হয়। মোরশেদকে হয় না। মোরশেদের সঙ্গে তাদের এখনও বন্ধুত্ব আছে। সে যে পাঞ্জাবিদের সঙ্গে মেলামেশা করে, তার কথা থেকে বুঝতে পারি। মোরশেদ যথেষ্ট বুদ্ধিমান, তাকে আমার বলার কিছু নেই। তবু এক-আধবার না বলে পারি না। সে গায়ে মাখে না। বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার বিশ্বাস হয় না। আমার মনে হয়…
লেখা এখানে শেষ হয়েছে। দেখেই বোঝা যায়, হঠাৎ শেষ হয়েছে। হয়তো কেউ এসে পড়েছিল অথবা যে কোনও কারণেই হোক, লেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এবং লক্ষণীয়, ন মাসের কোন সময়ে কবে এ কথাগুলো লেখা হয়েছে তার কোনও তারিখ নেই। কিন্তু পড়লেই বোঝা যায়, সেই অভিশপ্ত ন মাসের কোনও একদিন লেখিকা এ সব কথা লিখেছিল। এ লেখা থেকে মোটামুটি তার পরিবারের একটা ছবি এবং মনোভাব সম্পর্কে কিছু জানা যায়। অবস্থাটা জটিল, ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না।
তারপরের লেখায়, তারিখ দিনক্ষণ স্পষ্ট করে লেখা।
১৪ই জুন–সোমবার।
গত শুক্রবার দিন আম্মা ইন্তেকাল করলেন। অসুখ-বিসুখ কিছু করেনি। মোটা মানুষ, চলাফেরা বিশেষ করতে পারতেন না। দোতলার সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে হঠাৎ হার্টফেল করেছে। কোনও শব্দই পাওয়া যায়নি। কুলসম দেখতে পেয়ে চিৎকার করেছিল। আমি টেলিফোন করে মোরশেদকে অফিসে খবর দিয়েছিলাম। মোরশেদকে আমি কখনও কাঁদতে দেখিনি, শুক্রবার দিন দেখেছি। তার চোখে জল। ছিল। মুশতাক আম্মার চোখের মণি ছিল। সে তার দাদির বুকের ওপর পড়ে শিশুর মতো কেঁদেছিল। আমি তাঁর আদর করে ডাকা দুলহীন বিবি ডাক বারে বারে শুনতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি, তিনি যেন জায়নামাজে বসে মোটা কাঁচের চশমা চোখে তসবিহ পড়ছেন।
আম্মার বয়স হলেও তিনি সংসারে এতদিন বর্তমান থাকায় আমি যেন অনেক নিশ্চিন্ত ছিলাম। তাঁর অভাব আমি কোনওদিন মেটাতে পারব না। দেশের এখন দুঃসময়। আত্মীয়স্বজনরা অনেকেই শহরে নেই। যারা আছে, তারাও কেউ প্রায় আসতে পারেনি। নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ বাড়ির বাইরে বেরোয় না। লোকের কথা শোনা যায় না। পাঞ্জাবি আর পাঠানদের হাতে শহর মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ। করে। মুশতাক আর তার বন্ধুদের কাছে খবর পাই, দেশের ভিতরে ও ইন্ডিয়ার সীমান্তে রীতিমতো যুদ্ধ হচ্ছে। যে সময়ে আরও বেশি মানুষ কাছে থাকলে ভরসা পাওয়া যায়, সেই সময়েই আম্মা আমাদের ছেড়ে গেলেন। আমাদের বড় বসি।
৩রা জুলাই–শনিবার।
গতকাল অভাবিত ব্যাপার হয়ে গেল। আমাদের সন্ধেবেলাগুলো, বলতে গেলে অন্ধকার ঘরে, চুপচাপ কাটে। জানালার মোটা পরদা টেনে, আমি আর মোরশেদ বসে থাকি। গাড়ির শব্দ পেলে ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে দম বন্ধ করে থাকি। মোরশেদ অবশ্য অনেক কথা বলে। সত্যি বলতে কী, আমি সবসময়ে তার সব কথা শুনি না। মুশতাক তার আব্বার সামনে এসে বসে না। সে দোতলায় দরজা-জানালা বন্ধ করে রেডিয়োতে ইন্ডিয়া আর স্বাধীন বাংলাদেশ বেতারের সংবাদ শোনে। মোরশেদ সেটা পছন্দ করে না। বরং সে স্পষ্ট জানিয়েই দিয়েছে, ও সব মিথ্যা আর ভিত্তিহীন সংবাদ শোনা চলবে না। এ হুকুম আমিও মানতে পারি না। আমিও সুযোগ পেলে লুকিয়ে শুনি। এমনিতেই তো লুকিয়ে শুনতে হয়। মোরশেদের জন্যও লুকোতে হয়।
যাই হোক, গতকাল মোরশেদ অফিস থেকে ফিরতে দেরি করেছিল। সন্ধ্যার পরে সে ফিরেছিল। তার সঙ্গে ছিল তিনজন পাঞ্জাবি সশস্ত্র মিলিটারি। আমি তো প্রথমে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছলাম। একটা চরম দুর্ঘটনার আশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু গাড়ি বারান্দায়, মোরশেদের এবং সকলের হাসি শুনে, অবাক। হয়ে গেলাম। আমি বসবার ঘর থেকে উঠে পাশের ঘরের পরদার পাশ থেকে সব দেখছিলাম। দেখলাম, দুজন বন্দুক বাগিয়ে ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। আর একজন কোমরে ঝোলানো রিভলবার, মোরশেদের পাশে পাশে ঘরে এসে ঢুকল। মোরশেদ তাকে উর্দুতে খাতির করে বসতে বলল। দুজনেই মদ্য পান করেছে, বুঝতে পারলাম। দুজনেরই মেজাজ বেশ হাসিখুশি। পাঞ্জাবিকে অফিসার বলে মনে হল। মোরশেদ তাকে বসতে বলে, ডাইনিং রুমের দিকে গেল। অফিসার কোমর থেকে রিভলবারটা বের করে সামনের টেবিলের উপর রাখল। আমার পিছনে আবদুল আর কুলসম দাঁড়িয়েছিল। তাদের চোখে ভয়। আমি পা টিপে টিপে, অন্য দিক দিয়ে, ডাইনিং রুমের দরজায় গিয়ে দেখলাম, মোরশেদ। রেফ্রিজারেটর খুলে হুইস্কির বোতল বের করছে। বোতল নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে, সে আমাকে দেখতে পেল। একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল, বুলবুলি (সে আমাকে আদর করে এই নামে ডাকে) এসো। আমি তাকে হাতের ইশারা করে, ভিতরের ঘরে চলে গেলাম। মোরশেদ আমার পিছনে পিছনে এল। গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কাকে নিয়ে এসেছেন? মোরশেদ বলল, এ একজন লেফটানেন্ট কর্নেল, ইয়াকুব। লোকটা ভাল, আমার সঙ্গে পুরনো আলাপ। সিক্সটিসেভেনে রাওলপিণ্ডিতে আমাকে খুব খাতির করেছিল। এখানেও মাঝে মাঝে দেখা হয়। আজ হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় বলল, আমার মোকামে আসবে। আমিই বরং ভয় পাচ্ছিলাম, ওর কোনও বিপদ হলে, আমার আর রক্ষা থাকবে না। আমি অবাক হয়ে বললাম, তবু নিয়ে এলেন? মোরশেদ গায়ে না মেখে হেসে বলল, কী করব বুলবুলি, ছোকরা কিছুতেই ছাড়ল না। কিছুক্ষণ থেকেই চলে যাবে। ঘরে কি একটু খাবার-টাবারের জোগাড় আছে? আমি বললাম, আছে। কিন্তু কাজটা কি আপনি ভাল করলেন? পাকিস্তানি মিলিটারির সঙ্গে। মেলামেশা কি ঠিক হচ্ছে! মোরশেদের ভুরু কুঁচকে উঠল। কিন্তু হেসে বলল, ভুলে যেও না, আমিও পাকিস্তানি, তবে হ্যাঁ, বাঙালি আমি। সেটা আমাদের নিজেদের বোঝাঁপড়ার ব্যাপার। থাক, ও সব কথা পরে হবে, কাবাব নিয়ে তুমি নিজেই এসো৷ আমার মনটা বিরূপ হয়ে উঠল। আমি পর্দানশিন নই। সকলের সঙ্গে বসে কথা বলতে পারি। মোরশেদ আর তার বন্ধুদের মদ্যপানের আসরে আমিও কথা বলি, গল্প করি। বন্ধুদের বিবিরাও থাকে। কিন্তু পাঞ্জাবি মিলিটারি অফিসারের সামনে যেতে আমার মন চাইল না। বললাম, আমাকে যেতে বলবেন না, আমি আবদুলকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। মোরশেদ মানতে চাইল না, সে সকাতর আদরের গলায় বলল, আমার বুলবুলি, তোমার বেইজ্জত হবে বুঝলে, আমি তোমাকে আসতে বলতাম না। লেঃ কর্নেল ইয়াকুবের সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারবে, সে কী রকম খাঁটি ইমানদার মোসলমান। বাঙালিদের সে কত পেয়ার করে। কাবাব নিয়ে তুমি পাঁচ মিনিটের জন্য এসো।
মোরশেদ এভাবে বললে, আমি তার কথা ঠেলতে পারি না। আমি চুপ করে রইলাম। মোরশেদ আবদুলকে গেলাস আর পানি দিতে বলে, ড্রয়িং রুমে চলে গেল। আমি কুলসমকে ডেকে নিয়ে রেফ্রিজারেটার থেকে কাঁচা গোস্ত বের করে দিলাম। রসুই ঘরের দিকে যেতে গিয়ে, দরজার পাশে মুশতাককে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। মুশতাকের এরকম চোখের নজর, মুখের ভাব কখনও দেখিনি। তার চোখ বিস্ময়ে ভরা, কিন্তু ঘৃণায় জ্বলজ্বল করছে। আমি নিজেই যেন লজ্জায় গুটিয়ে গেলাম। নিজের ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। নজর ফিরিয়ে রসুই ঘরে চলে গেলাম। সেখান থেকে মোরশেদ আর পাঞ্জাবি লেঃ কর্নেলের হাসি আর কথা শুনতে পাচ্ছিলাম, অস্পষ্টভাবে। কুলসম ছুরি দিয়ে কাবাবের সাইজে গোস্ত কাটছে। আমি জানালার কাছে গিয়ে, হাফেজ সাহেবের বাড়ির দিকে তাকালাম। অন্ধকার চুপচাপ, কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। তবু আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, দোতলার একটা জানালায়, অস্পষ্ট ছায়া ছায়া দুটি মুখ। বোধ হয় হাফেজ সাহেব আর তাঁর বিবি। আমি আস্তে আস্তে জানালার কাছ থেকে সরে এলাম। কাবাব বানাতে গেলাম। কিন্তু আমার মন অশান্তিতে, অস্বস্তিতে, ভয়ে ভরে উঠছে। কেবলই মন বলছে, মোরশেদ এটা ঠিক করেনি। শহরের সব জায়গা থেকেই পাঞ্জাবিদের নানান অত্যাচারের সংবাদ পাই। বিভিন্ন জায়গায় তারা বধ্যভূমি তৈরি করেছে, সেখানে রোজ অনেক বাঙালিকে নিয়ে গিয়ে খুন করছে। মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের ওপর বীভৎস অত্যাচার করছে। যত দিন যাচ্ছে, পাঞ্জাবিদের খুন আর অত্যাচারের মাত্রা বাড়ছে। আর এদিকে আমি এক পাঞ্জাবির জন্য কাবাব বানাচ্ছি! মুশতাকের ঘৃণা ঝলকানো চোখ দুটি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। মোরশেদের এখনও কীসের আশা? এ তো অন্ধ ইন্ডিয়া-বিরোধিতা ছাড়া আর কিছুই না। উঃ খোদা, মোরশেদকে তুমি সুমতি দাও। সে দুর্বুদ্ধিপরায়ণ নয়, তাকে বিবেচনার শক্তি দাও।
কাবাব বানিয়ে, বসবার ঘরে যাবার আগে একবার থমকালাম। বাইরের লোকের সামনে এভাবে যাব? কখনও যাইনি। কিন্তু প্রসাধন তো ক মাস ধরেই ভুলেছি। এখন আর আমার প্রবৃত্তি হল না, শাড়ি বদলাই, মুখ ধুই, সুর্মা মাখি, পাউডার বুলাই। আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে, আবদুলের হাতে কাবাবের প্লেট দিয়ে তাকে আমার পিছনে পিছনে আসতে বললাম। মুশতাক কোথায় কে জানে। আমি ডাইনিং রুমের ভিতর দিয়ে বসবার ঘরে গেলাম। আমাকে দেখেই মোরশেদ বলে উঠল, এসো। এসো লেঃ কর্নেল ইয়াকুব দাঁড়িয়ে উঠল। মোরশেদ আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। আমি একটু হেসে, লেঃ কর্নেলকে বসতে বলে, আবদুলের হাত থেকে প্লেট নিয়ে টেবিলে রাখলাম, চামচ ন্যাপকিন এগিয়ে দিলাম। মোরশেদ আমাকে বসতে বলল। আমি একটা সোফায় বসলাম। সেই সময়েই গাড়িবারান্দার দিকে আমার চোখ পড়ল। লাইট মেশিনগান বাগিয়ে ধরে দুজন পাঞ্জাবি বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার রমজান গাড়িবারান্দার সিঁড়ির কাছে বসে আছে।
লেঃ কর্নেল ইয়াকুব আমাকে উর্দুতে বলল, শামসের (মোরশেদ) সাহেবের কাছে শুনলাম, আপনি বাংলাতে এম এ পাশ করেছেন।আমি একটু লজ্জিত হয়ে বললাম, সে কিছু না। ইয়াকুব কাবাব মুখে দিল। মোরশেদ জিজ্ঞেস করল, কাবাব কেমন হয়েছে? ইয়াকুব বলল, ডিলিসিয়াস। মোরশেদ বলল, যাই হোক, আমরা যে বিষয়ে কথা বলছিলাম তাই হোক। আপনি আমার বিবিকে বলুন, মুক্তিযুদ্ধ-টুদ্ধ ব্যাপারটা আসলে কী। আমরা কী রকম মিথ্যা প্রচারের শিকার হয়ে পড়েছি।
মোরশেদ কেন এ সব প্রসঙ্গ তুলছে? আমি মনে মনে খুব অস্বস্তি বোধ করলাম। মুশতাক নিশ্চয়ই কোথাও থেকে এ সব কথা শুনছে। আমি লেঃ কর্নেল ইয়াকুবকে দেখছিলাম। টকটকে ফরসা, হুইস্কির। নেশায় মুখচোখ লাল, কালো কুচকুচে চুল। মোরশাদের থেকে সে বয়সে কিছু কমই হবে। হাসতে হাসতে বলল, এ আর বলবার কথা কী আছে। ইন্ডিয়ান আর্মির কুত্তারা উনিফর্ম ছেড়ে বাঙালি। মুক্তিযোদ্ধা সেজে আমাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। প্রচার করছে, মুক্তিযোদ্ধারা লড়ছে। হয়তো আওয়ামী লীগের কিছু বিপথগামী ছোকরা পালিয়ে গিয়ে তাদের সাহায্য করছে। কেউ বলতে পারবে না, ইস্ট পাকিস্তানের ভিতরে কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে। ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে লড়াই হচ্ছে বলেই, যা হচ্ছে সবই সীমান্তে। এটাকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইন্ডিয়ার একটা অঘোষিত যুদ্ধ বলতে হবে। ইন্ডিয়া পাকিস্তানকে টুকরা করতে চাইছে, আফসোসের কথা, কিছু বাঙালি সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে। তারা জানে না, ইন্ডিয়া আগুন নিয়ে খেলা করছে। ইয়াকুব হুইস্কির গেলাসে চুমুক দিল, কাবাব চিবোতে চিবোতে আমার দিকে তাকাল। তার আরক্ত চোখের নজর আমার শরীরে ঘুরে বেড়াল। আমি মোরশেদের দিকে তাকালাম। আমার গায়ের মধ্যে ঘিন ঘিন করে উঠল। ঘৃণায় মনটা জ্বলে গেল। কিন্তু মোরশেদও হুইস্কির গেলাস নিয়ে ব্যস্ত, সে আমার দিকে তাকাল না। মোরশেদের উপর আমার বিরক্ত লাগছে। ইয়াকুবের এতগুলো কথার অনেক জবাব আমার দিতে ইচ্ছা করছিল। প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। মোরশেদের মতো আমি তার মিথ্যাগুলো বিশ্বাস করিনি। ইয়াকুব নিজেকে খুব চালাক মনে করছিল, তাই ইন্ডিয়াকে গালিগালাজ করছিল। কিন্তু তারা যে বাঙালিদের রোজ খুন করছে, মেয়েদের লুট করছে, বেইজ্জত করছে, সে কথা একবারও উচ্চারণ করল না। জানি, আমি সে কথা বলতে গেলে, পাঞ্জাবি লেঃ কর্নেলের মেজাজ খারাপ হয়ে যেত। হয়তো মোরশেদেরও। কারণ মোরশেদ এখনও কেমন অন্ধ।
ইয়াকুব হেসে আমাকে বলল, মিসেস শামসের, আশা করি আপনি সেরকম বেকুফ বাঙালি মহিলা না, যারা ইন্ডিয়ার কথায় বিশ্বাস করছে। কোনও খাঁটি মোসলমান তা করতে পারে না। আমার হয়ে মোরশেদ জবাব দিল, লেঃ কর্নেল সাহেব, আমরা খাঁটি মোসলমান। পাকিস্তান আমরা আদায় করেছি, তাকে ছাড়তে পারি না। কিন্তু বাঙালিকে তার মর্যাদা দিতে হবে, আর সেটা আমরা, পুব আর পশ্চিম, নিজেদের মধ্যেই মিটমাট করে নিতে চাই। তার মধ্যে আমরা কাউকে নাক গলাতে দেব না। মোরশেদ এখনও এ সব কথা বলে। সে কি গত মার্চ মাসের সেই সব দিনগুলোর কথা ভুলে গেছে। সে আওয়ামী লীগের সমর্থক না হতে পারে, কিন্তু বাস্তব ঘটনাকে অস্বীকার করে কেমন করে। আমার আর এ সব শুনতে ইচ্ছা করছিল না। মোরশেদ যখন কথা বলছিল, ইয়াকুব তখন তার চোখের দিকে অপলক তাকিয়েছিল। তার চোয়াল শক্ত দেখাচ্ছিল। মোরশেদের কথা শুনে, সে জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, জরুর জরুর, নিজেদের মধ্যে একটা মিটমাট তো করতেই হবে। তার আগে আমরা ইন্ডিয়ার লড়াইয়ের খোয়াবটা মিটিয়ে নিই। বাঙালি বেয়াদপদের শায়েস্তা করতে হবে। আপনাদের সামনে। বলতে আমার বাধা নেই, রেগুলার ফোর্স, ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স আর মুজাহিদ মিলিয়ে সামান্য কম এক লাখ ফোর্স আমাদের এখানে আছে। আর আর্মসের তো কথাই নেই।..
আমার আর এ সব শুনতে ভাল লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, ইয়াকুব যেন আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে। আমি ইংরেজিতে বললাম, কিছু মনে করবেন না, আমি একটু কাজে যাচ্ছি। ইয়াকুব আবার উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড় কাত করল। তার চোখের দিকে তাকাবার আমার আর দরকার ছিল না। তার চোখ। কী খুঁজছে জানি। কিন্তু মে মাস থেকে এই জুলাইয়ে পড়েছে, পাঞ্জাবিরা যে এর মধ্যে রাজাকার। আর আলবদর বাহিনী তৈরি করছে, মুশতাকের কাছে সে খবরও আমি পেয়েছি। ডাইনিং রুম দিয়ে পাশের ঘরে যেতে মুশতাককে আমি দেখতে পেলাম। বসবার ঘরের দিকে, বন্ধ দরজার কাছে সে চুপ। করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে এগিয়ে এল। তার মুখ শক্ত, চোখে সেই জ্বলন্ত ঘৃণা। সে কিছু বলতে গেল, আমি তার মুখে হাত চাপা দিলাম। ফিসফিস করে বললাম, এখন না, লোকটা চলে যাক, তারপর।মুশতাক তার মুখের ওপর থেকে আমার হাত সরিয়ে নিচু গলায় বলল, আব্বাকে আমি কিছুই বলব না, ওনার সঙ্গে আমার আর কোনও কথা নেই। উনি নিজের বিপদ নিজেই ডেকে এনেছেন। দেখবেন, এর কী রেজাল্ট হয়। আমি কিছু বলবার আগেই ইয়াকুবের গলা শুনতে পেলাম, আপনার ছেলে আছে, তা তো বলেননি। তার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিন। আমরা মা ও ছেলে চোখাচোখি করলাম। মোরশেদ কী বলল, শুনতে পেলাম না, গেটের কাছে একটা ভারী গাড়ির গর্জন শোনা গেল। তারপরেই কিছু বুটের আওয়াজ আমাদের বসবার ঘরের দরজার কাছে এগিয়ে এল। ইয়াকুবের গলা শোনা গেল, কী খবর শাহজাদা, তোমাদের কাজ হয়ে গেছে? জবাব শোনা গেল, জি। আপনাকে নিতে এলাম। ইয়াকুবের গলা শোনা গেল, চলো। গুডনাইট মিঃ শামসের, আবার দেখা হবে। সকলের বেরিয়ে যাবার পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। গাড়ির গর্জন দূরে চলে গেল। শুনতে পেলাম, মোরশেদ ড্রাইভারকে বলছে, রমজান, তুমি গাড়িটা গ্যারাজে তুলে দাও। আবদুল, দরজা বন্ধ করে দে। মুশতাক তাড়াতাড়ি আমার কাছ থেকে সরে গেল। আমি ভয় পেলাম, সে হয়তো মোরশেদের সঙ্গে ঝগড়া করতে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তার পিছনে পিছনে গেলাম। কিন্তু মুশতাক সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় চলে গেল। আমি বাইরের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই মোরশেদ এগিয়ে এল। আমি পরিষ্কার বললাম, আপনি আর কোনওদিন পাঞ্জাবি মিলিটারিকে নিয়ে বাড়িতে আসবেন না। এর পরিণতি মোটেই ভাল হবে না। খোদার কাছে হাজার শুকুর, যেন এ কথা রাষ্ট্র না হয়। আমি বেশ উত্তেজিত ছিলাম। মোরশেদ একটু অবাক হল, বলল, এ সব কে বলল, মুশতাক বুঝি? আমি বললাম, না, মুশতাক বলবে কেন, আমিই বলছি। আপনার চিন্তা আপনি মনে মনে রাখুন। মোরশেদ যেন কেমন চিন্তিত হয়ে পড়ল। অথচ আমি ভাবছিলাম, সে হয়তো রেগে উঠবে। বিশেষ করে, তার পেটে তখন যথেষ্ট হুইস্কি ছিল। বলল, কিন্তু বুলবুলি, লোকটা আমাদের বিশ্বাস করে, তা না হলে সামরিক শক্তির কথা এভাবে বলত না। আমি বললাম, আমার মনে হয়, সে আমাদের মনে ভয় ধরিয়ে দেবার জন্য ও সব বলছিল। তা ছাড়া লোকটাকে আমার একটুও ভাল লাগেনি, নজর খুব নোংরা। আমি বুঝতে পারি, আপনি এখনও কী করে এদের বিশ্বাস করেন। আপনি কি কোনও খবরই জানেন না, ওরা কী করছে? মোরশেদ বলল, শত হলেও এরা মিলিটারি, পাকিস্তান ভাঙবার চক্রান্ত যদি হয়। আমি মোরশেদকে বাধা দিয়ে বললাম, আপনি কি চান, বাঙালির কবরের ওপরে ইস্ট পাকিস্তান থাকবে? মোরশেদ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। একটু পরে বলল, খোদা জানেন কী ঘটছে।বলে সে গোসল করতে চলে গেল। মোরশেদকে চিন্তিত দেখে আমি যেন একটু শান্তি পেলাম।….
(আগামীকাল তৃতীয় পর্ব)