আপনি কি জানেন যে আইকনিক টেলিভিশন সিরিজ ‘মহাভারত’-এর চিত্রনাট্য এবং সংলাপগুলি লিখেছিলেন একজন মুসলিম, ডক্টর রাহি মাসুম রাজা? বিখ্যাত এই মহাকাব্যকে সিরিয়ালের আকারে টেলিভিশনে নিয়ে আসার জন্য রয়েছে নানান ঘটনা। তারই কিছু ঝলক নিয়েই আজকের লেখা।
মহাভারতের স্ক্রীপ্ট লেখবার জন্য সতীশ ভাটনাগার এবং তার টিম হিন্দি উর্দু এবং অন্য ভাষায় মহাভারতের মান্য এমন সব বই যোগাড় করে ফেললেন। সবই তো হল কিন্তু মনের মতো স্ক্রিপ্ট রাইটার বি আর চোপড়া খুঁজে পাচ্ছেন না। এমন সময় তার সামনে এলো এক বিশেষ ব্যক্তির নাম ড. রাহি মাসুম রাজা। কে ছিলেন এই ড. রাহি?
ড. রাহি মাসুম রাজা মূলত একজন উর্দু এবং হিন্দি কবি, সংলাপ ও স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং বলিউডের বিখ্যাত গীতিকার। ম্যাঁয় তুলসী তেরে আঙ্গন কি, ডিসকো ড্যান্সার এবং লামহে, নাচ ময়ূরী, জুদাই এর মতো বিখ্যাত সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার। মহাভারতের মতো ধারাবাহিকের চিত্রনাট্যকার হিসেবে তার নাম চির অমর হয়ে রয়েছে। তিনি ‘ম্যায় তুলসি তেরে আঙ্গন কি’ ফিল্মের জন্য ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিতেছিলেন।

এই সংলাপ লেখকের জন্ম ১৯২৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশের গাজীপুরে। রাজা গাজীপুরে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং তারপর উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। তিনি হিন্দুস্তানি সাহিত্যে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন এবং সাহিত্যে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি বোম্বে চলে যান এবং একজন সফল চিত্রনাট্য লেখক হয়ে ওঠেন। এবং একটি টিভি সিরিয়াল মহাভারত সহ ৩০০ টিরও বেশি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন। রাজার বেশ কিছু কাজ ভারত বিভক্তির পরিণতির যন্ত্রণা ও অশান্তিকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করে। তাঁর লেখায় সামন্ততান্ত্রিক ভারতে জীবন এবং সাধারণ মানুষের সুখ, ভালবাসা, বেদনা এবং দুঃখকেও চিত্রিত করে। তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে আধা গাঁও (উপন্যাস), টপি শুক্লা (উপন্যাস), ওস কি বুন্দ (উপন্যাস), নিম কা পেড় (উপন্যাস এবং টিভি সিরিয়াল) ইত্যাদি।

টেলিভিশনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা যখন বি আর চোপড়া করছিলেন সেই সময় রাহি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় কিন্তু শুরুর দিকে রাহি সাহেব মোটেও রাজি হননি। এর কিছুদিন পরেই মহাভারত নিয়ে একটি প্রেসমিট হয়। সেখানে বি আর চোপড়া হঠাৎ করে ঘোষণা করলেন ড. রাহি মাসুম রাজার নাম চিত্রনাট্যকার হিসেবে। দেশে সেই সময় শুরু হয় আর এক সমস্যা। কিছু হিন্দু মৌলবাদী সংস্থা প্রবল বিরোধিতা শুরু করে। এক কথায় এই সংস্থায় মূল বক্তব্য ছিল, মহাভারতের মতো মহাকাব্যের চিত্রনাট্য লেখার মত কি আর একজনও হিন্দু বেঁচে নেই!! যদি থাকে তবে একজন মুসলিমকে দিয়ে এ কাজ করানো হচ্ছে কেন?
শুধু তাই নয়, একাধিক চিঠিও আসতে থাকে বি আর চোপড়ার দপ্তরে। এবার চোপড়া সাহেব এক কান্ড করলেন। সেইসব চিঠি তিনি রাহী সাহেবকে পাঠিয়ে দিলেন, আর তাতেই কাজ ম্যাজিকের মত। ভারতীয় সংস্কৃতিতে লালিত এই উর্দু কবি পরের দিনই চোপড়া সাহেবকে ফোন করেন। বললেন, ‘চোপড়া সাহেব আমি আপনার মহাভারত সিরিয়ালের চিত্রনাট্য লিখব। আমি গঙ্গার সন্তান, আমার থেকে ভালো ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে কে জানে?’

মহাভারতের জন্য বি আর চোপড়া একজন কথকের চরিত্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন যিনি গল্পের সুতোটাকে একটু একটু করে খুলতে থাকবেন। এই চরিত্রের জন্য তিনি কিংবদন্তি শিল্পী দিলীপকুমার বা এন টি রামারাওযের কথা ভাবেন। কিন্তু এ বিষয়ে সিরিয়ালের চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা রাহি সাহেবের মাথায় ছিল অন্য ভাবনা। তিনি বললেন এই সিরিয়ালের কথক হবে ‘সময়’। সময় এখানে সময়ের কথা বলবে। জন্ম হয় অসাধারণ একটি মুখ্য সংলাপের। দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে বেজে ওঠে সেই অসাধারণ সংলাপ — ম্যায় সময় হু…
শুটিং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কঠিন সময় ছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দৃশ্যায়ন। রাজস্থানের জয়পুর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে মারাত্মক গরমের মধ্যে ভারী ধাতব বর্ম পড়ে শুটিং করতে হয়েছিল অভিনেতাদের। সেই সময় আলাদা করে মেকআপ ভ্যান, টয়লেটের ব্যবস্থা থাকত না। সারাদিন সকলকে কাটাতে হতে তাঁবুতে।
শুটিং চলাকালীন হঠাৎ করে একদিন একদল জনতা শুটিং স্পটে এসে ‘কৃষ্ণকে দেখতে চাই’ বলে হামলে পড়েন। ভিড় এতটাই বেড়ে যায় পরিস্থিতি সামলাতে বি আর চোপড়াকে নামতে হয় ময়দানে। অথচ সেদিনকে কৃষ্ণের অর্থাৎ নীতিশ ভরদ্বাজের কোন শুটিং ছিল না। অবশেষে নীতিশ ভরদ্বাজকে কৃষ্ণের মেকআপ করিয়ে হাজির করতে হয় জনতার মাঝে।

অর্জুনের চরিত্রের জন্য প্রথমে পঙ্কজ ধীর কে নির্বাচিত করা হয়। অডিশন প্যানেলে ছিলেন রাহি মাসুম রাজা, অভ্রিং টুপকারি সাহেব এবং পন্ডিত নরেন্দ্র শর্মাজি। বৃহন্নলা (অর্জুনের নপুংসক রূপ) চরিত্রের জন্য তাকে গোঁফ কামানোর কথা বলা হয় কিন্তু গোঁফ কামিয়ে দিতে অস্বীকার করলে তাকে শো ছেড়ে যেতে বলা হয়েছিল। এই ঘটনা চার মাস পরে কর্ণ চরিত্রের জন্য তাকে ডাকা হয়। গোঁফ নিয়েই তিনি অভিনয় করেন। একেই বলে, ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি গোঁফ দিয়ে যায় চেনা।’
দ্রৌপদী চরিত্রের জন্য জুহি চাওলাকে প্রথমে সিলেক্ট করা হয়েছিল। কিন্তু জুহি চাওলার তখন “কেয়ামত সে কেয়ামত তক” ছবির অভিনয় করার পর দ্রৌপদী চরিত্রে অভিনয় করতে চাননি। পরে চোপড়া সাহেব রুপা গাঙ্গুলিকে এই চরিত্রের জন্য নির্বাচন করেন।
কৃষ্ণের চরিত্রের জন্য প্রায় ৫৫ জন অডিশন দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রথমে গজেন্দ্র চৌহান (যুধিষ্ঠির) ও ঋষভ শুক্লা (শান্তনু) কে কৃষ্ণ হিসেবে ভাবা হয়েছিল কিন্তু পরে চোপড়া সাহেব নীতিশ ভরদ্বাজকে সিলেক্ট করেন কারণ তার মনে হয়েছিল কৃষ্ণের হাসিটি ওই চরিত্রের প্রধান আকর্ষণ।
অবশেষে পন্ডিত নরেন্দ্র শর্মা এবং ড. রাহি মাসুম রাজার লেখা স্ক্রিপ্টে ২রা অক্টোবর ১৯৮৮ থেকে ২৪ শে জুন ১৯৯০ পর্যন্ত দূরদর্শনে সম্প্রচার করা হলো মহাভারতের ৯৪টি পর্ব। প্রযোজনা করলেন বি আর চোপড়া আর তার ছেলে রবি চোপড়া।

ড. রাহি মাসুম রাজা
মহাভারতকে টিভি সিরিয়াল হিসেবে নিয়ে আসার জন্য সেই আমলে খরচা হয়েছিল ন’ কোটি টাকা। বি আর চোপড়ার টিম মহাভারতের ফাইনাল স্টোরি লাইন যখন দূরদর্শনের কাছে ১৯৮৬ সালে জমা দেয় সেই স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী ১০৪টি এপিসোড ছিল। কিন্তু কাটছাট করে পরে সেটি ৯৪ তে নেমে আসে।
পরে একটি স্মৃতিচারণায় রাহী সাহেব বলেছিলেন: “একজন মুসলমানের স্ক্রিপ্ট লেখা নিয়ে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমি আহত এবং বিস্মিত। আমি কি ভারতীয় নই?” ঘটনাক্রমে, রাহী সাহেব নিজেকে “গঙ্গাপুত্র” বা “গঙ্গা কিনারেওয়ালা” হিসাবে পরিচয় দেন।
আজ থেকে প্রায় ৩৬ বছর আগে দূরদর্শনে সম্প্রচার করা হতো এই টিভি সিরিয়াল এবং এই সিরিয়ালটি জনপ্রিয়তার শিখরে সেই সময় পৌঁছে দিয়েছিলেন বি আর চোপড়া। ভারতীয় টেলিভিশনে ইতিহাসে যা অন্যতম জনপ্রিয় সিরিয়াল হিসেবে তকমা দিয়েছিল ফিল্ম বা টেলিভিশন রেটিং সংস্থা আইএমডিবি। এই সংস্থার মতে ১০ মধ্যে ৮.৯ তে সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল হিসেবে গণ্য হয়েছিল মহাভারত। কালজয়ী এই সিরিয়াল আজও সমানভাবে জনপ্রিয় দর্শকদের কাছে।
অজানা তথ্য জেনে ভীষণ ভালো লাগলো ❤????
থ্যাঙ্ক ইউ
কিছু অজানা তথ্য জানলাম।
Dhonyobad