দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্মের প্রাণপুরুষ হলেও তাঁর পুত্র রবীন্দ্রনাথের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল খুলনা অঞ্চলের হিন্দু বিবাহ রীতি অনুসারে। দুটি কারণে এমনটি হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়ে থাকে। ঠাকুর পরিবারের আদি নিবাস ছিল খুলনা অঞ্চলে। ঠাকুর পরিবারের অধিকাংশ বধূরা খুলনা-যশোর অঞ্চলের মেয়ে ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বর সেজে বিয়ে করতে খুলনার দক্ষিণডিহিতে যাননি। কণে মৃণালিনীকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে আগেই নিয়ে আসা হয়েছিল।
বিয়ের আগে গায়ে হলুদ ও আইবুড়ো ভাতের স্ত্রী-আচার যথানিয়মে পালিত হয়েছিল।
অবনীন্দ্রনাথ এ সম্পর্কে লিখেছেন, — ‘গায়ে হলুদ হয়ে গেল। আইবুড়ো ভাত হবে। তখনকার দিনেও বাড়ির কোনো ছেলের গায়ে হলুদ হয়ে গেলেই এ বাড়িতে তাকে নিমন্ত্রণ করে প্রথম আইবুড়ো ভাত খাওয়ানো হতো। তারপর এ বাড়ি ও বাড়ি চলত কয়েকদিন ধরে আইবুড়ো ভাতের নেমন্তন্ন। মা গায়ে হলুদের পরে রবি কাকাকে আইবুড়ো ভাতের নিমন্ত্রণ করলেন। মা খুব খুশি, একে যশোরের মেয়ে, তায় রবির মা তার সম্পর্কের বোন। খুব ধুমধামে খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। রবিকাকা খেতে বসেছেন উপরে, আমার বড় পিসিমা কাদম্বিনী দেবীর ঘরে, সামনে আইবুড়ো ভাত সাজানো হয়েছে- বিরাট আয়োজন। পিসিমারা রবিকাকাকে ঘিরে বসেছেন, এ আমাদের নিজের চোখে দেখা। রবিকাকা চৌড়দার শাল গায়ে, লাল কী সবুজ রঙের মনে নেই, তবে খুব জমকালো রঙচঙের। বুঝে দেখো, একে রবিকাকা তায়, ওই সাজ, দেখাচ্ছে যেন দিল্লির বাদশা! তখনই তার কবি বলে খ্যাতি, পিসিমারা জিজ্ঞেস করছেন, কী রে বউকে দেখেছিস, পছন্দ হয়েছে? কেমন হবে বউ ইত্যাদি সব। রবিকাকা ঘাড় হেঁট করে বসে একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছেন। আর লজ্জায় মুখে কথাটি নেই।’
রবীন্দ্রনাথের বিয়ের সময় তাঁর মা সারদা দেবী পরলোকে। বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ মুসৌরী পাহাড়ে অবস্থান করছিলেন। বিয়ের অনুষ্ঠান খুব জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছিল কিনা জানা যায় না। রবীন্দ্র-মৃণালিনী বিয়ের পৌরোহিত্য করেছিলেন হেরম্বনাথ তর্করত্ন, তাকে দক্ষিণা দেওয়া হয় আট টাকা। বিবাহ বাসরে উপস্থিত ছিলেন শুম্ভুনাথ গড়গড়ি, তাকেও পাথেয় হিসেবে দেওয়া হয়েছিল আড়াই টাকা।
রবীন্দ্রনাথের বিয়েতে সর্বমোট খরচ হয়েছিল তিন হাজার দুশ তিরাশি টাকা তিন পাই। এই টাকার মধ্যে থেকে সতেরশ বারো টাকা এক আনা দিয়ে ক্রয় করা হয়েছিল হীরে। রবীন্দ্রনাথের মায়ের পৌনে একুশ ভরির দুটি বালা তিনশ আটষট্টি টাকা সাত আনায় বিক্রি করে তা থেকে তৈরি করা হয় আংটি, তাগা ইত্যাদি। এরকম আরো তথ্য রবীন্দ্র কৌতুহলীদের জন্য জানিয়েছেন ড. নিতাই বসু তাঁর ‘অনন্য রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে।
রবীন্দ্রনাথের বিয়ের অনুষ্ঠানের একটি বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে হেমলতা দেবীর ভাষ্যে। তিনি লিখেছেন, — ‘ঘরের ছেলে, নিতান্ত সাধারণ ঘরোয়াভাবে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিল। ধুমধামের সম্পর্ক ছিল না তার মধ্যে। পারিবারিক বেনারসি-শাল ছিল একখানি, যার যখন বিয়ে হতো সেইখানি ছিল বরসজ্জার উপকরণ। নিজেরই বাড়িতে পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে এলেন অন্দর মহলে। স্ত্রী আচারের সরঞ্জাম সেখানে সাজানো। বরসজ্জার শালখানি গায়ে জড়ানো। রবীন্দ্রনাথ এসে দাঁড়ালেন পিঁড়ির ওপর। নতুন কাকিমার (কাদম্বরী দেবী) আত্মীয়া যাকে সবাই ডাকতেন ‘বড়ো গাঙ্গুলীর স্ত্রী’ বলে, রবীন্দ্রনাথকে বরণ করলেন তিনি। তার পরনে ছিল একখানি কালো রঙের বেনারসি জরির ডুরে।
কনে এনে সাতপাক ঘোরানো হলো। শেষে বর-কনে দালানে চললেন সম্প্রদান স্থলে। সম্প্রদানের পর বর-কনে এসে বাসরে বসলেন। রবীন্দ্রনাথের বৌ এলে তার থাকবার জন্য একটা ঘর নির্দিষ্ট করা ছিল আগে থেকেই। বাসর বসল সেই ঘরেই। বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টুমি আরম্ভ করলেন। ভাঁড়, কুলো খেলা আরম্ভ হলো। রবীন্দ্রনাথ ভাঁড় খেলার বদলে ভাঁড়গুলো উপুর করে দিতে লাগলেন ধরে ধরে। তাঁর ছোট কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী বললেন, ও কি করিস রবি, ভাঁড়গুলো সব উল্টেপাল্টে দিচ্ছিস কেন? রবীন্দ্রনাথ বললেন, জান না কাকিমা- সব যে উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে- কাকিমা আবার বললেন, ‘তুই একটা গান কর, তোর বাসরে আর কে গান করবে, তুই এমন গাইয়ে থাকতে?’ রবীন্দ্রনাথ বাসরে গান জুড়ে দিলেন :
আ মরি লাবণ্যময়ী কে ও স্থির সৌদামিনী
পূর্ণিমা-জোছনা দিয়ে মার্জিত বদনখানি!
দুষ্টুমি করে গাইতে লাগলেন কাকিমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বেচারি কাকিমা রবীন্দ্রনাথের কাণ্ড দেখে জড়োসড়ো। ওড়নায় মুখ ঢেকে মাথা হেঁট করে বসে আছেন।’
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।