আশ্বিনের আকাশে শারদোৎসবের ছোঁয়া। গাঁয়ের ঘরে ইতি উতি কাশফুল ফুটে রয়েছে। রহমত আলি বৈদ্যের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে ফিরছেন। পরিবার অসুস্থ। বেশ তাড়া আছে। ওপাশে পুজোর মন্ডপ বাঁধা হয়েছে। মন্ডপের পাশ দিয়ে একটু এগোলেই রহমত আলি-র বাড়ি। নিজেই বেশ কিছুটা চিন্তিত। বৈদ্য বলেছে এখুনি গিয়ে পরিবারকে ওষুধটা খাইয়ে দিতে হবে। হনহন করে কিছুটা রাস্তা আসার পর হঠাৎ দেখলেন একটা বাচ্চা মেয়ে ওর পিছু নিয়েছে। হে আল্লা, এ কার বাড়ির মেয়ে! এই অসময়ে ওর পিছু নিয়েছে। রহমত থমকে দাঁড়িয়ে পরলেন। কার বাড়ির মেয়ে তুই? আমার বড় তাড়া আছে মা, চল মা, তোকে ঘরে রেখে আসি। বলিহারি বাড়ির লোকগুলোকেও, এভাবে কখনও একলা ছাড়ে এই একরত্তি মেয়েকে।
ছোট মেয়েটি হাত তুলে দেখালো ওই তো সামনে। রহমত বুঝলো এখনও সেইভাবে বুলি ফোটে নি। তবে রহমত দেখলো মন্ডপের দিকেই আঙুল তুলে দেখাচ্ছে মেয়ে। চল, চল মা, আমার খুব তাড়া। বাড়ি যেতে হবে। মেয়েটিকে হাতে ধরে মন্ডপে নিয়ে যেতেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল! অবাক রহমত, চিল চিৎকার করে উঠলো। ও মা তুই কোথায় গেলি রে? রহমতের গলার আওয়াজ শুনে আশপাশ থেকে বেশ কয়েকজন ছুটে এল। কি হয়েছে রহমত? বাচ্চাটা গেল কোথায় বলো তো? কোন বাচ্চা! রহমতের চোখ চলেগেল মায়ের মূর্তির দিকে। রহমত স্পষ্ট দেখতে পেল সেই বাচ্চা মেয়েটি ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। কে ও? তাহলে কি মা দুর্গা স্বয়ং…? এই ঘটনায় হতভম্ব রহমত মন্ডপেই অজ্ঞান হয়ে পরলো।
এ ঘটনা বহুদিন আগেকার, তবু আজও বিসর্জনের দিন দুর্গা প্রতিমা রহমত আলির বাড়ীর সামনে দাঁড় করানো হয়। বাড়ির উত্তরসুরীরা প্রতিমা দেখবার পর আবার বিসর্জনের যাত্রা শুরু হয়। রহমতের বাড়ির লোক এখনো মন্ডপে আসেন, হিন্দুদের সাথে একসাথে পুজোর আনন্দে ভাসেন।
এও এক সম্প্রীতি, উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের। এই পুজো হয় বারাসত সংলগ্ন দত্তপুকুরের শিবালয়ে। কথিত আছে মহারাজা কৃঞ্চচন্দ্র রায়ের পুত্র শিবচন্দ্র সুটী নদীর উপর দিয়ে নৌকাবিহারে যেতে গিয়ে এই অঞ্চলের শোভায় মুগ্ধ হন। এখানেই তিনি একটি গ্রাম পত্তন করেন, নাম হয় শিবালয়। দুর্গা দালান বানিয়ে শুরু হয় পুজো। শোনা যায় স্থানীয় এক রমনীকে বিয়ে করে রায় বংশের নব সূচনা করেন তিনি। অঞ্চলের এই প্রাচীন পুজো এলাকার মানুষের কাছে বুড়ো মা বা বুড়ি মা’র পুজো নামে পরিচিত। মনে করা হয় রায়দের বৃদ্ধা মা এই পুজো করতেন বলেই এর নাম বুড়ি মা’র পুজো।
বুড়ি মা’র পুজো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। দেবী দশভূজা হলেও দুটো হাত দৃশ্যমান, অন্য হাতগুলি চুলের আড়ালে ঢাকা, অনেক ছোট। এ সম্পর্কেও জনশ্রুতি হল যুদ্ধের সময় মহিষাসুর দুর্গাকে বলেন, তোমার দশ হাত, আমার মাত্র দুটো হাত। দশ হাতের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে লড়াইটা অসম হয়ে যায়! মহিষাসুরের দাবি মেনে নিয়ে দুর্গা দুহাতেই যুদ্ধ করেন। এখানে দুর্গা সিংহবাহিনী নন, তিনি সিংহ ও ঘোড়ার সংমিশ্রনে অশ্বসিংহবাহিনী। অর্থাৎ দুর্গা এখানে অশ্বসিংহের পিঠে বসে আছেন।
বিসর্জনের দিন শোভাযাত্রা কিছুটা এগিয়ে কবরখোলার সামনে থেমে যায়। রহমত আলির পরিবারের লোক রাস্তায় এসে শোভাযাত্রা দেখার পর আবার যাত্রা শুরু হয়। জনশ্রুতি এভাবেই যেন ইতিহাসকে ছুঁয়ে যায়।