পুরীর জগন্নাথমন্দিরের প্রধান ফটক অরুণ স্তম্ভের থেকে দু-পা এগোলেই রঘুনন্দন লাইব্রেরি। এখানে রক্ষিত আছে এমন কিছু প্রাচীন পুঁথিচিত্র এবং পুঁথির চিত্রিত কাঠের মলাট যা ওড়িশী শিল্প ইতিহাসের অমূল্য উপাদান। এমনই এক প্রাচীন তালপাতার পুঁথি — ‘উষা পরিণয়’, যা স্মরণীয় প্রাচীন সাহিত্যকীর্তি বলেই নয়, পুঁথিটির কয়টি পাতায় আছে ওই কাহিনীরই চিত্রমালা। শিল্প-ঐতিহাসিক চার্লস ফাবরির অনুমান যে অষ্টাদশ বা উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে কোন এক সময়ে পুঁথিটি রচিত। রুদ্ধকক্ষে একাকিনী এক কাতরা নারী লুটিয়ে পড়েছে পালঙ্কে, অন্যদিকে সারিবদ্ধ নারীমূর্তি। ডোরাকাটা চাপা কুর্তা ও পায়জামা জাতীয় পোশাক পরিহিত সেনা; সুসজ্জিত হস্তীবাহিনী, অরণ্যে নানা পশুপাখি এবং নকশাদার অলঙ্করণ। পাঁচটি পরপর তালপাতায় এসব চিত্রিত রয়েছে।
অলঙ্কৃত সব পুঁথির পাতা প্রায় সমান চওড়া, পাশাপাশি লাগানো এবং একসঙ্গে জোড়া থাকতো সুতোর বাঁধনে। তালপাতার ওপর নরুন বা ওই ধরনের কোনো ছুঁচলো ধাতব ফলা দিয়ে আঁচড় কেটে প্রতিটি ছবি রেখাচিত্রের আদল পেত। পরে আঁচড়টানা তালপাতায় ভুসোকালি বা কোনো গাঢ় কষ ঘষে দিলেই পাতার সব ছবি পরিষ্কার ফুটে উঠত। ‘উষা পরিণয়’ পুঁথিতে কাহিনীর কুশীলবদের পোশাক মুঘল, উত্তরভারতীয় বা পশ্চিমভারতীয়দের মতো। পরনে আচকান ও চুড়িদার পায়জামা। কেবল মেয়েদের বুকে কাঁচুলি বা বক্ষ আবরণীর পরিবর্তে পরনের শাড়িটিই উর্ধ্বাঙ্গে জড়ানো।

দ্বিতীয় পুঁথিচিত্রটিতে আছে মোট সাতটি তালপাতা। সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি। মধ্যে বংশীধারী কৃষ্ণের ত্রিভঙ্গ মূর্তি এবং তার দুপাশে তিন জন করে সেবাদাসী দাঁড়িয়ে। দেবদাসীদের কারো হাতে চামর, পাখা, শিঙা, দর্পণ ইত্যাদি মাঙ্গলিক সামগ্রী। কৃষ্ণ এবং দু-পাশে দুই ব্যজনধারী নারীর ওপরে খিলানের কাজ ক্রমশ শিল্পসম্মত দেবদেউলের আকৃতি নিয়েছে। দেউলের পুরোটাই জুড়ে আছে ওড়িয়া লিপি। পরপর পংক্তিগুলি শৈল্পিকভাবে সাজানো। লিপিগুলি সব মিলে নিয়েছে মন্দিরের আকার। এমনকি দুপাশের দুটো থামও ওড়িয়া লিপি সাজিয়ে তৈরী। মন্দিরের সিংহাসনে সামান্য অলঙ্করণ রয়েছে। এছাড়া চূড়ার দু-দিকে দু-জোড়া ময়ূরের মধ্যে উপরের জোড়াটির ছবি অসম্পূর্ণ। এই পুঁথিচিত্রের বিশেষত্ব এতে দুটি রঙের প্রয়োগ আছে। গাঢ় নীল ছাড়া জায়গাবিশেষে লালের টান পড়েছে। এ পুঁথির ইতিহাস বা কাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে চিত্রে নারীদের বেশভূষায় আছে ঘাঘরা কিংবা শাড়ি, উর্ধ্বাঙ্গে আবরণ পুরোদস্তুর রয়েছে। মাথায় সবার ঘোমটা টানা কিংবা ওড়না জড়ানো। চুলে লম্বা বিনুনী, প্রত্যেকেরই নাকে বড় নোলক। সব মিলিয়ে মনে হয় এ ছবি প্রাচীন ওড়িষার রমনীদেরই প্রতিরূপ।

রঘুনন্দন লাইব্রেরির আর এক পুঁথিচিত্রে আচে পাঁচটি পাতা। বয়সের ভারে তা জীর্ণ। ছবিতে আগের মতো একই প্রথায় সারিসারি ওড়শী লিপি সাজিয়ে গড়া চূড়াযুক্ত দেউল ও থাম। মধ্যে বংশীধারী কৃষ্ণের মুখোমুখি রাধা। অপরদিকে এক সখী, হাতে তার আরশি ধরা। পট পুরোপুরি একরঙা এবং এটি ওড়িশী কলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই পটে রাধার পোশাক ঢোলা ঘাঘরা বা শাড়ি, উধ্বাঙ্গ ঢাকা। কিন্তু পাশে সখীটির পোশাকে রয়েছে একমাত্র একটি শাড়ি, যা পেঁচিয়ে উঠে এসেছে অনাবৃত বুকের কাছে। একই সংগ্রহশালায় রাখা আছে হাতে তৈরি কাগজে নবনারীকুঞ্জ বা নয়টি নারী মিলে হাতীর আকৃতি নিয়েছে এমন এক পট। পটটি অবার্চীনকালে বৃথা রঙের প্রলেপ দিয়ে নষ্ট করা হয়েছে।
ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিচিত্রের কিছু সংগ্রহ রয়েছে ভুবনেশ্বর যাদুঘরেও। প্রাচীন দেবদাসীদের নৃত্যপদ্ধতি, যা একসময় জগন্নাথমন্দির এবং পুরীর অন্যান্য মন্দিরেও দেবদাসীদের নিয়মিত নাচের তালিম দিতে লেখা হয়েছিল তার পুঁথি আছে ওই যাদুঘরে। পুঁথিটি ওড়িয়া লিপিতে। সঙ্গে আছে নারীপুরুষের বিভিন্ন নৃত্যভঙ্গিমা, মুদ্রা এবং অভিনয়কলার সচিত্র বিবরণ বেশ কিছু পাতা জুড়ে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজা রঘুনাথ সিংহের রচনা সংস্কৃত অভিনয় দর্পণ পুঁথিটিতেও একই ধরনের ছবি রয়েছে, যা শিল্পের নান্দনিক দিক থেকে এবং ওড়িষী পটের শিল্প-ইতিহাস ধারার বিচারে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পুরীর মন্দির-গবেষক পণ্ডিত সদাশিব রথশর্মার সংগ্রহে অষ্টাদশ শতাব্দীর এক ওড়িয়া চিত্রিত রামায়ণের পুঁথি ছিল। এ পুঁথিও তালপাতার ওপর, ছবি ওড়িশী শিল্পীর। কিন্তু পাত্রপাত্রীর পোশাকের মধ্যে ওড়িশী প্রভাব নেই বললেই চলে।
ওড়িশী প্রাচীন চিত্রকলায় এ ধরনের পোশাক পরিচ্ছদ দেখে পশ্চিম বা উত্তর ভারতীয় এবং মুঘল বা জৈন শিল্পের প্রভাবের সম্ভাবনা অমূলক নয়। ওড়িশায় গজপতি রাজবংশের সমাপ্তিকাল এবং মারাঠা আক্রমণের সময়ে বহিরাগত সংস্কৃতির বিনিময় হওয়া সম্ভব। অন্যভাবেও বিশ্লেষণ করা যায় যে পৌরাণিক বা মহাকাব্যের কিছু চরিত্রকে ক্রমশ উত্তর বা পশ্চিম ভারতীয় বলে একদা চিহ্নিত ও চিত্রিত করাটাই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওড়িশার শিল্পীসমাজে।
পুরীর অধিপতি চোড়গঙ্গা বাজবংশের দরবারে মুঘল প্রভাব যে পড়েছিল তার একটি সাংস্কৃতিক নমুনা তাশখেলা। ‘আইন-ই আকবরী’-তে রয়েছে যে মুঘল সম্রাটের দরবারে এক ধরনের তাশখেলার প্রচলন ছিল যাতে একশো চুয়াল্লিশ তাশের দরকার হতো। প্রতিটি তাশ শিল্পীদের দিয়ে চিত্রিত করা হতো। যার ফলে মুঘল মিনিয়েচার চিত্রকলার আর এক অনুপম নিদর্শন এই তাশ। মুঘল তাশে থাকত বারোটি সুট এবং প্রতিটি সুটে তাশের সংখ্যা বারো। প্রত্যেক সুটের সর্বোচ্চ মানের তাশ হলো রাজা আর তারপরে স্থান উজিরের। বাকি দশটা তাশে দশ থেকে ক্রমশ একমানের বা টেক্কা তাশ পর্যন্ত প্রতিটি তার নির্দিষ্ট সমসংখ্যক প্রতীকযুক্ত। মুঘল তাশে বাদশা আকবরের প্রতীকযুক্ত সবচেয়ে বেশি মানের তাশ হলো অশ্বপতি। এর পর মান অনুসারে দ্বিতীয়স্থানে থাকে গজপতি, যা উড়িষ্যার রাজাকে বোঝাতো। তৃতীয়টি নরপতি। এভাবে বাকিগুলি ক্রমানুসারে হলো — গড়পতি, অসুরপতি, বনপতি এবং সবশেষে অহিপতি বা ড্রাগন প্রতীকযুক্ত মঙ্গোলীয় রাজাকে বোঝাতো।

আকবরের পরবর্তী সময়ে পুরীর গজপতি রাজাদের দরবারেও মুঘল তাশের মত অথচ সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে এক খেলা চালু হয়েছিল। এই তাশের অলঙ্করণ সম্ভবত স্থানীয় শিল্পীদের দিয়েই করানো হতো। পুরী দরবারের তাশ বিভিন্ন যুগে একাধিক রীতিতে খেলা হতো। তবে এর প্রধান খেলাটি ছিল দশাবতার তাশের। ভগবান বিষ্ণুর দশটি রূপ বা দশাবতারের কাহিনী নির্ভর এই তাশের প্রতিটিতে প্রতিটি অবতারের রঙীন ছবি বা তার প্রতীকযুক্ত খেলার নিয়ম যুগে যুগে বদলেছে, কিন্তু তাশের বুকে শিল্পকর্ম প্রতিক্ষেত্রেই সুনিপুণ।
পুরীশৈলীর তাশশিল্পীদের তৈরি আর এক ধরনের তাশের চাহিদাও দেশেবিদেশে যথেষ্ট। এর নাম — বন্ধতাশ। বন্ধতাশের খেলা দেশীয় পদ্ধতিতেই চলে, তবে এক্ষেত্রে তাশের ছবি সবই নরনারীর সঙ্গমচিত্র। শিল্পীরা বলেন — তাশে মিথুনমূর্তি বা কামকলার চিত্র সংযোজন নতুন নয়। বংশপরম্পরা তাঁরা এই বদ্ধচিত্র শিখে এসেছেন। বন্ধ কথাটি এসেছে কৃষ্ণের লীলা থেকে। শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের সঙ্গে চৌষট্টি বন্ধতে ক্রীড়া করেছিলেন। এই চিত্রও সেই ক্রীড়া অনুসারে বিভিন্ন মিলনের ভঙ্গীতে থাকে। বন্ধচিত্র প্রাচীন শিল্পপুঁথির কঠোর নির্দেশ মেনেই চিত্রিত করা হয় আজও।