বিল গেটসের বই : ধনকুবেরের দৈববাণী?
গত তিন দশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে বিশেষত কৃষি ক্ষেত্রে এমন কিছু প্রকৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যকে নানা নামের পেটেন্টের মোড়কে বেঁধে ফেলা হয়েছে যে চাষবাস থেকে কৃষি পণ্য বিপণন- সমস্তটাই চলে যাচ্ছে বড় পুঁজির নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বব্যাপী এই নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় সবার আগে রয়েছেন বিল গেটস মহাশয়।[6] জি্ন এডিটিং প্রযুক্তি ক্রিস্পার-এস থেকে ওয়েদার রেসিলিয়ান্ট ক্রপ অর্থাৎ কোন জলবায়ু এবং কোন পরিবেশে কোন ধরনের শস্যের বীজ বপন করতে হবে এবং তার জন্য কোন ধরনের সার বা কীটনাশক প্রয়োজন হবে এসবের তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন তিনি। সেই সঙ্গে, ২০১০ সালে, ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে তিনি গড়ে তুলেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অসরকারি সংগঠন বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। এদের অ্যাডভোকেসি এবং পলিসি ডিভিশনের মূল কাজই হল বিভিন্ন দেশের সরকার ও মিডিয়াকে এমন ভাবে প্রভাবিত করা যার ফলে তাঁদের ব্যবসার ঘোষিত এজেন্ডাই, ওইসব দেশগুলির জাতীয় নীতিতে দিক-নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃত হয়। [7] ঠিক এই কৌশলেই তিনি যখন আফ্রিকার দেশগুলোতে সবুজ বিপ্লবের বর্জিত এবং ক্ষতিকারক প্রযুক্তিকে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করছিলেন তখন নিন্দার ঝড় উঠেছিল। [8] তাকে লাগাতার আক্রমণে বিদ্ধ করতো লন্ডনের বামঘেঁষা পত্রিকা দ্যা গার্ডিয়ান। প্রমাদ গণেছিলেন বিল গেটস মহাশয়। তার বিপুল বিত্ত সম্পদের সামান্য কিছু তাবড় তাবড় মিডিয়া সংগঠনগুলির জন্য খরচা করলেন।[9] অচিরেই ফল মিলেছিল। ২০১৭ সালের পর থেকে তার ফিলানথ্রপিক বাণিজ্য মানব সেবা হিসেবে আখ্যায়িত হতে থাকলো। তার পোষিত বিশেষজ্ঞরা লিখে দিতেন নিবন্ধ কিংবা উত্তর সম্পাদকীয়। বোঝা দায় হয়ে গেল কোনটা খবর আর কোনটা গেটস সাম্রাজ্যের প্রচারিত এজেন্ডা। পিছিয়ে থাকলো না গার্ডিয়ান পত্রিকা। উপঢৌকনের বিনিময়ে তারাও চাষবাস এবং পরিবেশ এই নতুন নামে কাগজের দুটি ফিচার চালু করে গেটস বন্দনা শুরু করে দিল।[10] [11] গণৎকার হিসেবে বিল গেটস পরিচিতি লাভ করেছিলেন ২০১৫ সালে কোভিড মহামারীর ভবিষ্যৎবাণী করে। তবে গেটস সাম্রাজ্যের বদান্যতায় মুগ্ধ কোন মিডিয়াই আজ পর্যন্ত প্রশ্ন করেনি, তার এই ভবিষ্যৎ বাণীর ভিত্তি কি ছিল? বিজ্ঞান না জ্যোতিষ শাস্ত্র? গত বছর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মহারথীরা আবেগঘন নানা প্রবন্ধ, সম্পাদকীয় এবং সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আমাদের জানিয়ে দিলেন, এবারে জলবায়ু ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি আস্ত বই লিখে ফেলেছেন মহামতি বিল গেটস। বইয়ের নাম, ‘কিভাবে জলবায়ুর বিপর্যয় এড়াতে হবে’।

বেশ, তাহলে খুব সংক্ষেপে যদি জানতেই হয় কি মহাকাব্যিক বিপর্যয়ের কথা বিল গেটস বলেছেন, সেটা তবে শুনে নেওয়া যাক তাঁরই বদান্যতায় পুষ্ট গ্লোবাল সিটিজেন এর একটি প্রচার পত্র থেকে। “বিল গেটস বিশ্বাস করেন যে সারা পৃথিবীর এখন জোর দেওয়া উচিত শূন্য গ্রিন গ্যাস নির্গমনের লক্ষ্যে। … জলবায়ু পরিবর্তনের ভয় আগের থেকে অনেক বেশি করে প্রতিভাত হচ্ছে বলে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেট ফাউন্ডেশন নানান প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে যার মাধ্যমে গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে”। [12]
“জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে বিল গেটস এর নতুন বই থেকে পাঁচটি সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বিষয়”, এই শিরোনামে তারা লিখেছেঃ [12]
১। দরিদ্রতম দেশগুলির ওপর অভিঘাত হবে সবচেয়ে বেশি :—
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলি ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং অভূতপূর্ব বন্যা, খরা এবং তাপপ্রবাহের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর চাষের জমি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, লোকের জীবিকার সংকট দেখা যাচ্ছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত হয়ে যাচ্ছে।… জলবায়ু এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে যে সেটা হয়তো আমেরিকায় এবং ইউরোপের সম্পন্ন চাষীদের জন্য সমস্যা তৈরি করবে। তবে সেটা সবচেয়ে বিপদজনক হবে আফ্রিকা এবং এশিয়ার দরিদ্রতম দেশগুলির ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন সমুদ্রের জলস্তর এমন ভাবে বাড়ছে যে সারা দেশের ৩০ শতাংশই জলের নিচে থাকার ফলে শস্যের ক্ষতি এবং প্রাণহানি ঘটছে।
একেবারে বামপন্থী বাগ্মিতায় বিল গেটস বলেছেন, — “ধনী দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়বে আর সেই কারণে গরিব দেশগুলো আরো গরীব হয়ে থাকবে- এটা আমরা চলতে দিতে পারি না। আমরা বরং জলবায়ুর পরিবর্তন আটকে দিয়ে তাদের জন্য উন্নতির সোপান খুঁজে আনবো।”[12]
কিভাবে আমরা সেটা করতে পারি- এই প্রশ্নে গেটস মহাশয় একটি ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন আমরা গ্রিন প্রিমিয়াম চালু করতে পারি। এর অর্থ হচ্ছে গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনের বদলে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি কার্যকর করতে যে অতিরিক্ত খরচ হবে আমরা সেটাকে তাদের জন্য সহনীয় করতে পারি।” [12]
২। বিপুল বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি আমাদের সহায়ক হবে :—
জলবায়ুর পরিবর্তন প্রতিরোধ করাটা খুবই কঠিন ব্যাপার। এর কারণ হচ্ছে শূন্য কার্বন নির্গমণ আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। “যেসব দেশ শূন্য কার্বন প্রযুক্তির কোম্পানি এবং শিল্প গড়ে তুলবে তারাই আগামী দশক গুলোতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবে”, বিল গেটস এটাও বলেছেন যে, “যারা বিশ্বব্যাপী এ নতুন শক্তির প্রযুক্তিকে সুলভে বাজারে আনতে পারবে তারাই উদীয়মান অর্থনীতিতে নতুন নতুন ক্রেতা-রাষ্ট্র খুঁজে পাবে।” শূন্য কার্বন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অপ্রচলিত শক্তি ছাড়াও পারমাণবিক শক্তির উপরেও জোর দিয়েছেন বিল গেটস এবং বলেছেন এভাবেই আমাদের পরিচ্ছন্ন শক্তির দিকে এগোতে হবে।[12]
৩। গ্রিন লিভিং বা সবুজ দুনিয়ায় বসবাসের জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং নীতি প্রণয়ন করতে হবে :—
“শূন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের লক্ষ্য ছুঁতে হলে বেসরকারি কোম্পানির পাশাপাশি সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। চলতি নিয়মকানুন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে নতুন নিয়ম লাগু করতে হবে। নতুন অর্থনৈতিক সুবিধার কথা বলতে হবে, যার ফলে জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল গ্রামাঞ্চলের মানুষরা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ না করেই বেঁচে থাকার শিক্ষা পায়।” [12]
অপরিণত রাজনীতিবিদরা যাতে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট করে বুঝতে পারে সেই জন্য বিল গেটস আরো খোলসা করে বলেছেন, — “ জলবায়ু পরিবর্তন কে নীতি নির্ধারণের বিচার্য বিষয় হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং পরিবেশকে বাঁচাতে হলে ইলেকট্রিক যানবাহনের বিক্রি বাড়াতে হবে”। বলাই বাহুল্য যে ইলেকট্রিক যানবাহন তৈরি এবং বিপণনের ক্ষেত্রে বিল গেটস এর মত ধনকুবেরদের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে।
অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যে জেনে গেছেন আমেরিকায় কৃষিজমির (২৬৯,০০০ একর) সবচেয়ে বড় মালিকের নাম বিল গেটস। [13] অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় কিভাবে চাষী ছাড়াই চাষ করা যায় এবং পশুপালন না করেই ল্যাব মিট বা কৃত্রিম উপায়ে পশুর মাংস তৈরি করা যায় এইরকম সব বিচিত্র উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে তিনি যে বিরাট অংকের বিনিয়োগ করেছেন, সেটা তিনি এবং তার বাজনদাররা প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে বলছেন।
কেন তিনি কিংবদন্তি গণৎকার এবং একজন ধুরন্ধর মানবসেবী ধনকুবের, এ ব্যাপারে যদি কারো কোন বিন্দুমাত্র সংশয় থাকে তবে তাকে অবশ্যই পড়তে হবে বিল গেটস এর এই ভবিষ্যৎবাণী — “শুধু ইউরোপেই পশু খামার থেকে প্রতি বছর ৫০২ মিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। মোট নির্গত গ্রীনহাউস গ্যাস গুলোর এক তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী বর্তমান খাদ্য ব্যবস্থা। আমাদের হাতে এমন প্রযুক্তি আছে যার মাধ্যমে আমরা খাবারের অবশেষ স্মার্ট বিনে ফেলতে পারি এবং হিসেব করে নিতে পারি আমাদের বর্জিত খাদ্যে কতটা কার্বন পদচিহ্ন রয়ে গেল। খাবারে মাংসের পরিমান কমিয়ে দিলে এবং নিরামিষ খাবার ও উদ্ভিদজাত মাংসে খাদ্যাভাস বদলে নিলেই গ্রীন হাউস গ্যাসের মাত্রা দারুন ভাবে কমে যাবে। এভাবেই আমরা যদি ‘ভ্রমণের জন্য ভ্যাকসিন’ থেকে খাদ্য অপচয় কমিয়ে ফেলার অভ্যাস রপ্ত করতে পারি, তাহলেই আমরা পরিচ্ছন্ন জলবায়ুর লক্ষ্যে অনেক দূর এগিয়ে যাব।”[12]
৫। “বিপদ আরো এগিয়ে আসার আগেই আমাদের কেন আওয়াজ তুলতে হবে” :— এই প্রসঙ্গে গেটস সাহেব সতর্ক করে বলেছেন “পৃথিবীটা গরম হচ্ছে এবং এই গরম হবার পিছনে রয়েছে মানুষের কার্যকলাপ। চরম বিপর্যয় যে ঘনিয়ে আসছে সে ব্যাপারে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে ৩০ বছর পরে না ৫০ বছর পরে কবে সেই চরম মুহূর্তে উপস্থিত হবে সেটা ঠিক জানা নেই। এমনকি বিপর্যয় যদি অর্ধশতক পরেও আসে, তবু আমাদের সক্রিয় হতে হবে এখনই”।[12] (চলবে)