এখানে নাগরিকদের কর্তব্য কি হবে? মহামতি গেটস বলেছেন, “তাদের কাজ হবে সরকারের কাছ থেকে সেই সমস্ত পদক্ষেপ দাবি করা যার ফলে পরিচ্ছন্ন শক্তির ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিনিয়োগ হয় এবং যে সব উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গ্রীন হাউজ গ্যাসের নির্গমন সেইসব পণ্যের দাম অনেক বেশি বেড়ে যায়।”[12]
বেশ ভালো কথা। বিল গেটসদের আসল মতলবটি ধরবার জন্য খুব উচ্চ মেধার প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে গেটসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নাগরিকরা যদি আত্মঘাতী গণ উন্মাদনায় মেতে ওঠে সেক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ কি করবেন? এ ব্যাপারেও গেটস ভীষণ স্পষ্টবাদী। তিনি বলেছেন, ” এখন থেকে আমজনতা কে তাদের বন্ধু বান্ধব আত্মীয় পরিজন সকলের কাছেই জলবায়ুর প্রসঙ্গটি তুলতে হবে। যখন অনেক অনেক লোক জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সুশিক্ষিত হয়ে উঠবে এবং আমরা সেই পরিবর্তন মোকাবিলায় পদক্ষেপ করব তখনই সঠিক অর্থে পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠবে।”[12] [*বাঁকা হরফের বাক্য গুলো লেখকের]
বাজনদার মিডিয়ার গেট ভক্তি ও পরিবেশ প্রেম
গেটস সাহেবকে অতিমানব বললেও কম বলা হয়। মহামারী কবে আসবে এবং কত কোটি লোক মারা যাবে সেসব তিনি আগে থেকেই গণনা করতে পারেন, প্যান্ডেমিক বাণিজ্যে বিপুল বিনিয়োগ করতে জানেন, ভ্যাকসিনের জন্য সওয়াল করতে পারেন এবং প্যান্ডেমিক এর মধ্য দিয়েই কুড়ি বিলিয়ন ডলার কামিয়ে নিতে পারেন। [14] সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠান যেমন বিবিসি, আল জাজিরা, সিবিএস, এল-পাই, সকলেই তার অকৃপণ বদান্যতায় পুষ্ট। [9] সেই কারণেই জলবায়ু নিয়ে তার বিচিত্র আখ্যান দেশি-বিদেশি সমস্ত বৃহৎ মিডিয়ার কাছে অমোঘ দৈব বাণীর মতো শোনাবে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এদেশের এক প্রথিতযশা সাংবাদিক যিনি সম্প্রতি তার নিঊজ চ্যানেল থেকে পদত্যাগ করেছেন, তিনি যখন এই বইটির প্রসঙ্গে বিল গেটস এর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, সাংবাদিকতার বদলে স্তাবকতার এক নতুন নজির সৃষ্টি করছিলেন তিনি। বলেছিলেন এমন তথ্যপূর্ণ এবং বিদগ্ধ বই নাকি তিনি কখনো পড়েননি। [15] ব্রিটেনের বামঘেঁষা দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকা, যারা ২০১৭ সালের আগে পর্যন্ত গেটসের প্রবল সমালোচক ছিল, তারাই গেটস ফাউন্ডেশন থেকে প্রায় সাড়ে তিন মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ সাহায্য পাবার পরেই গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের প্রচারে শরিক হওয়ার নাম করে বিল গেটসের নির্লজ্জ বাজনদার হয়ে উঠেছে।[10] [11]

জলবায়ু বদলের গল্পের আড়ালে বিপুল বিনিয়োগ এবং মুনাফা ঘরে তোলার বাণিজ্য বুদ্ধির যে অসামান্য আখ্যান লিখেছেন গেটস, তার বিরুদ্ধে উড়ে আসছিল চোখাচোখা আক্রমণ। সেসবের পাল্টা হিসেবে বিল গেটস্ কে বিনয়ের অবতার এবং প্রধানত একজন মানবদরদী এবং বলিয়ে-কইয়ে টেকনোফাইল বা প্রযুক্তি-প্রেমী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে এই গার্ডিয়ান পত্রিকা একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিল। [16] টাইম ম্যাগাজিনে গেটসের নিজের নামেই একটি নিবন্ধ বেরিয়েছিল। [17] সেখানে বেশ মোটাদাগেই তিনি বলে দিয়েছেন- কার্বন ব্যবসা বলতে তিনি কি বোঝেন, কেন এই ব্যবসা একইসঙ্গে গ্রিনহাউস-গ্যাস-মুক্ত পৃথিবী নির্মাণ এবং তার পরিকল্পিত কার্বন প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের জন্য একটি মহত্বম সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। চলতি প্রথার চাষবাস থেকে শিল্প-বাণিজ্য এমনকি জীবনধারণের উপায়- সবকিছুই শূন্য কার্বন নিঃসরণ নীতি ও বিধি নিয়মের ফাঁসে বেঁধে ফেলতে হবে। যদি গেটসের প্রস্তাবিত বিকল্প শক্তি এবং বিকল্প সমাজের শরিক না হতে চান তাহলে কার্বন পদচিহ্ন ধরে আপনার অসামাজিকতা বা রাষ্ট্রবিরোধিতার হিসেব নেওয়া হবে। এমনকি কার্বন অপরাধ লঘু করার জন্য আপনাকে যে গুনাগার দিতে হবে তার নাম হবে কার্বন প্রিমিয়াম। সেই প্রিমিয়াম মিটিয়ে আপনার পক্ষে সুস্থ এবং সভ্য জীবন যাপন করা সম্ভব হবে কিনা সেটা ভবিষ্যৎ বলতে পারবে তবে গেট সাহেব কিভাবে সেই প্রিমিয়ামের মূল্য মেটাবেন সেটা তিনি বাতলে দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “পৃথিবীকে কার্বন কলঙ্ক থেকে এবং মানব সমাজকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্য গ্রীন হাউজ গ্যাসের নির্গমন শূন্য করতে হবে। পৃথিবীর জলবায়ুটা অনেকটা চৌবাচ্চায় জল ভর্তি হওয়ার মত। জল ঢালা বন্ধ না হলে সেটা একদিন উপচে পড়বেই। এই উপচে পড়া আটকাতে আমাদের কি করতে হবে সেটা বোঝার জন্য এইভাবে ভাবুন। আপনি কি সকালে দাঁতের ব্রাশ ব্যবহার করেন? ওটা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এবং প্লাস্টিক তৈরি হয় পেট্রোলিয়াম মানে কার্বন জাত একটি জ্বালানি থেকে। যদি ব্রেকফাস্ট খান, তাহলে সেটাও এমন সব খাদ্যশস্য দিয়ে তৈরি যার জন্য প্রয়োজন হয়েছে সার এবং সার এর উৎপাদনের জন্য নির্গত হয়েছে প্রচুর গ্রীনহাউস গ্যাস। সেই সব শস্য কাটার সময় যেসব ট্রাক্টর ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলো যে স্টিল দিয়ে তৈরি ছিল, সেটার উৎপাদনে বিপুল মাত্রায় কার্বন নির্গত হয়েছে। যদি দুপুরে বার্গার খান, সেই মাংসের জন্য যে গবাদি পশু পালন করা হয়েছে তার ফলে নির্গত হয়েছে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস। গরু মোষ যখন দেহ থেকে বর্জ্য ত্যাগ করে তখনো বেরিয়ে আসে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস।” [17]

অক্টোপাসের কার্বন পদ-চিহ্ন
এই পর্যন্ত পড়ে বিশ্ব উষ্ণায়নের অতি বড় প্রচারক এবং বিজ্ঞান-তপস্বী দের কোন ভাবান্তর না হলেও কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন যে কোন মানুষের মনে প্রশ্ন আসবে, যে কার্বন সমস্ত জীবজগতের প্রাণের আধার এবং যে মৌলটি ছাড়া পৃথিবীর বুকে কোন জীবন চক্রই সম্ভব নয় তাকে মূল অপরাধী হিসেবে গণ্য করলে, বেঁচে থাকার সমস্ত জৈবিক প্রক্রিয়া কি একটি সীমাহীন পাপাচার হিসেবে চিহ্নিত হয় না? যদি তাই হয়, তবে এ পাপের মূল্য কিভাবে চোকাতে হবে? গেট সাহেব বলেছেন, “শক্তি উৎপাদনের পুরো অর্থনীতিকেই, এই নোংরা কার্বন নিঃসরণকারী সস্তার প্রযুক্তিকে হঠিয়ে দিয়ে, নিয়ে আসতে হবে বিকল্প শক্তির প্রযুক্তি। তবে এর জন্য কিছু অতিরিক্ত মূল্য দিতে হবে। আমি সেটাকে বলি গ্রীন প্রিমিয়াম। বর্তমানে জেট বিমান চলে যেসব জ্বালানিতে তাকে বদলে দিতে হবে বায়ো ফুয়েলে। তাতে দাম বাড়বে ১৪০ শতাংশ। সিমেন্ট প্রস্তুতির পদ্ধতি পাল্টে দিয়ে সবুজ সিমেন্ট বানাতে হবে। এর মানে হচ্ছে সিমেন্ট বানাতে যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় সেই কার্বন-ডাই-অক্সাইড আবার নয়াপ্রযুক্তিতে প্রস্তুত হওয়া সিমেন্টের মধ্যে চালান করে দিতে হবে। ইস্পাত যেখানে তৈরি হবে সেখানে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হবে তার একটি বড় অংশ শুষে নেবার যন্ত্র বসাতে হবে। যে সস্তার বিদ্যুৎ আমরা ব্যবহার করি তার পরিবর্তে বায়ু এবং সৌর বিদ্যুৎ ছাড়াও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। সবমিলিয়ে সারা মাসে হয়তো ১৮ ডলারের বেশি গ্রিন প্রিমিয়াম দিতে হবে।” [17] তা বেশ এই গুনাগার দিয়ে না হয় কার্বন পাপ থেকে মুক্ত হওয়া গেল কিন্তু এই প্রিমিয়ামের টাকা মুনাফা হয়ে কার পকেটে ঢুকবে? সে কিভাবে পাপ মুক্ত হবে? উষ্ণায়নের ফেরিওয়ালাদের মত ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলার লোক নন বিল গেটস। সোজাসাপটা তিনি বলেছেন,
“হ্যাঁ, এই গ্রহের মধ্যে আমি-ই সবচেয়ে বেশি কার্বন পদচিহ্ন বহন করছি। প্রাইভেট জেটে আমার যাতায়াতের হিসাবটা আন্দাজ করা প্রায় অসম্ভব। তবে এখন আমি কিছুটা হলেও গাছ-গাছড়া থেকে প্রস্তুত জৈব জ্বালানি ব্যবহার করছি। আমি সৌর প্যানেল ব্যবহার করি। আমি নিয়মিত একটি কোম্পানিকে বিপুল পরিমাণ টাকা দিই শুধুমাত্র বেশ খানিকটা কার্বন-ডাই-অক্সাইড বায়ু থেকে শুষে নিয়ে ভূগর্ভে চালান করার জন্য। সব মিলিয়ে বছরে আমার ৭ মিলিয়ন ডলার খরচ হয় কার্বন ঋণ শোধ করার জন্য। এটাকেই আমি বলি কার্বন অফসেট”। [18]

ওই সাক্ষাৎকারে [18] বিল গেট জানিয়েছেন পৃথিবীকে কার্বন মুক্ত করার অঙ্গীকার হিসেবে তিনি এযাবত দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। বায়ু থেকে কার্বন শুষে নেবার প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে যে কোম্পানি তার নাম কার্বন কিওর। সেখানে যেমন তার বিনিয়োগ রয়েছে তেমনি রয়েছে সবুজ ইস্পাত প্রযুক্তিতে। যে কোম্পানি পারমাণবিক চুল্লি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে তার নাম টেরা পাওয়ার। এটাও বিল গেটস এর কোম্পানি। গবাদি পশু পালনে যেহেতু গ্রীনহাউস গ্যাস “চার শতাংশ বৃদ্ধি পায়”, তাই কৃত্রিম উপায়ে মাংস তৈরি করার জন্য নতুন প্রযুক্তির দুটি কোম্পানি তিনি খুলেছেন। তাদের নাম ইম্পসিবল ফুড (Impossible Food) এবং বিয়ন্ড মিট (Beyond Meat)। ফাঙ্গাস থেকে খাদ্যদ্রব্য তৈরি করার জন্য চালু করেছেন নেচারস ফাইন্ড কোম্পানি। দুধের পরিবর্ত হিসেবে খাবার জন্য তিনি কৃত্রিম দুধ- বায়ো মিল্ক প্রযুক্তিতে টাকা ঢেলেছেন। এর সঙ্গে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও জিন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে “চাষী ছাড়াই চাষবাস” প্রকল্প এবং এশিয়া ও আফ্রিকার ছোট চাষীদের জন্য “এ-জি-ওয়ান” ব্যবস্থায় বিশাল অংকের বিনিয়োগ। (চলবে)