জলবায়ু : গল্প বদলের গল্প
জলবায়ু বদলের গল্পটাই বেবাক বদলে গেছে গত পঞ্চাশ বছরে। আজকের দিনের বিচারে সেটা এক উলট পুরান। গল্পটা শুরু হয়েছিল গত শতকের সত্তর দশকের গোড়ায়। সেই গল্প যখন ধীরে ধীরে নতুন একটি আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থার রাজনৈতিক আখ্যান হয়ে উঠছে, তার পটভূমিতে ১৯৭৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, একটি দারুণ চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল নিউজ উইক পত্রিকায়। তার শিরোনাম ছিল “পৃথিবী শীতল হচ্ছে”। [1]
প্রতিবেদনের শুরুতেই ছিল চমকে দেবার মতো সতর্ক বাণী — “সারা পৃথিবীর আবহাওয়ার ছবিটা এত দ্রুত এবং নাটকীয়ভাবে বদলাচ্ছে যে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাবার অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে। দুনিয়ার কোন দেশ ই এর রাজনৈতিক কুপ্রভাব থেকে রেহাই পাবে না। বিপদ খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই খাদ্যশস্যে টান পড়বে। যেসব দেশ প্রবল ক্ষতির সম্মুখীন হবে তাদের মধ্যে যেমন রয়েছে সবচেয়ে বেশি গম উৎপাদনকারী উত্তর আমেরিকা এবং কানাডা, সেই সঙ্গে রয়েছে খাদ্যশস্যে নামমাত্র স্বনির্ভর-ভারত, পাকিস্তান বাংলাদেশ, ইন্দোচীন এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো ক্রান্তীয় দেশ যেখানে চাষবাস মূলত মৌসুমী বায়ু নির্ভর”।[1]

কিন্তু কোন্ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এমন ত্রাস সৃষ্টিকারী ভবিষ্যৎ বাণী? অত্যন্ত স্বাভাবিক কিন্তু কার্যত বিধ্বংসী এই প্রশ্নটা প্রত্যাশিত ছিল। সম্ভবত সেটা অনুমান করেই প্রতিবেদক পিটার গোয়াইনের ব্যাখ্যা ছিল এইরকম — “এই ভবিষ্যৎ বাণীর স্বপক্ষে এত বেশী জোরালো তথ্য প্রমাণের পাহাড় জমছে যে সেগুলোকে একত্রিত করাটাই এখন জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের কাছে বিরাট দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।… ইংল্যান্ডে লক্ষ লক্ষ টন শস্যের উৎপাদন কমে যাওয়া, নিরক্ষরেখার তাপমাত্রা ভগ্নাংশ ডিগ্রির হেরফের হওয়ায় খরা র ঘটনা বেড়ে চলা, টর্নেডো এবং টুইস্টার এর মত বিধ্বংসী ঝড়ের সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া, আপাতদৃষ্টিতে এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলি আসলে পৃথিবীর আবহাওয়ায় মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসল ব্যাপারটা হল — এই শতকের শেষার্ধে পৃথিবী ক্রমশ শীতল হচ্ছে। “[1]

কিন্তু সেই পাহাড় প্রমাণ তথ্যের জঞ্জালে এমন কি মণিমুক্ত লুকিয়ে ছিল যার ভিত্তিতে এই কালান্তক ঘটনা শুধু বিজ্ঞানী কুলের কাছেই প্রকট হচ্ছিল না, মিডিয়ার বিজ্ঞান-রসিকদের কাছেও সহজেই মালুম হচ্ছিল? সেগুলো ছিল এই রকম — ” মার্কিন সরকারের জাতীয় সামুদ্রিক এবং আবহাওয়া সংক্রান্ত প্রশাসন (NOAA) জানিয়ে দিয়েছে গত কয়েক বছরে উত্তর গোলার্ধে হঠাৎই বরফের আচ্ছাদন বেড়ে চলেছে এবং গত ৮ বছরে শুধু আমেরিকা মহাদেশেই সূর্যকিরণের মাত্রা ১.৩ শতাংশ কমে গেছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা যে হারে কমছে সেটা যদি বর্তমানের তুলনায় ছয় গুণ বেড়ে যায় তাহলে আমরা ক্ষুদ্রাকার বরফ যুগে পৌঁছে যাব।” [1]এই পর্যন্ত শুনে, আজকের উষ্ণায়নের গল্পে প্রবল বিশ্বাসীরা নিশ্চয়ই আঁতকে উঠছেন এবং ভাবছেন কেমন করে শীতলতর পৃথিবীতে ধেয়ে আসতো উপর্যুপরি ঝড় এবং খরা ও শস্য নষ্ট করার মতো পরিস্থিতি। সেক্ষেত্রে প্রতিবেদকের ব্যাখ্যা ছিল, “বায়ুমণ্ডলের উচ্চতম স্তরে যেভাবে সামগ্রিক তাপমাত্রার অবনমন ঘটছে তাতে অসংখ্য উচ্চচাপ কেন্দ্র সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলো পৃথিবীর উষ্ণ অঞ্চল গুলোর ধীরগতির পশ্চিমা বায়ুকে খন্ড খন্ড করে দিচ্ছে। এরফলে যে অবরুদ্ধ বায়ুস্তর তৈরি হচ্ছে সেটাই স্থানীয়ভাবে যেসব চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করছে সেগুলো হচ্ছে তীব্র খরা, বন্যা, দীর্ঘকালীন শুখা, বিলম্বিত বর্ষা এমনকি দীর্ঘতর শীতকাল”।[1]

মজার বিষয় হল, বরফ যুগ কেন আগত প্রায় এই কষ্ট কল্পনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রতিবেদক একটি জায়গায় স্বীকার করেছিলেন যে আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির জনৈক নামকরা বিজ্ঞানী পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে “জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে রহস্যটা যে আসলে কি সে ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান আমাদের সংগৃহীত তথ্যের মতই ভীষণ বিক্ষিপ্ত এবং অপ্রতুল।”[1]
তা সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রতি এই প্রতিবেদকের এবং তার সমসাময়িক জলবায়ুর গল্পকারদের দায় যে খুব সামান্যই ছিল এবং পরিবর্তে একটি কৃষি-পণ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্য নীতির প্রতি তার/তাদের কলমের দায় যে অনেক বেশি ছিল সেটা তিনি গোপন করেন নি। তিনি বলেছিলেন, “পৃথিবী কিভাবে এবং কতটা শীতল হচ্ছে সে ব্যাপারে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতান্তর থাকলেও একটি বিষয়ে তাদের অবিসংবাদিত অবস্থান হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি হিসেবে দুর্ভিক্ষের চেহারা ভয়ানক হতে পারে। যেহেতু বর্তমান শতকের খাদ্য উৎপাদন এবং জনসংখ্যা ভীষণভাবে জলবায়ুর উপর নির্ভরশীল সেই কারণেই এই বিপুল জলবায়ুর পরিবর্তন গোটা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোগত সংস্কার ঘটাতে বাধ্য করবে।” [1]
আজকের অনেক পরিবেশপ্রেমী এবং পরিবেশ-তাত্ত্বিক আছেন, যারা একই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং ভবিষ্যতের ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাকে ব্যাখ্যা করছেন ঠিক উল্টো অর্থাৎ উষ্ণায়নের তত্ত্ব দিয়ে। তারা হয়ত চরম বিড়ম্বনার মুখে পড়ে এই প্রতিবেদকের মুন্ডপাত করতে পারেন। সম্ভবত এটা অনুমান করেই প্রায় ৪০ বছর পর লেখক পিটার গোয়াইন (Peter Gwynne) কিছুদিন আগেই নিজের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন “পৃথিবী শীতল হবার তথ্যগুলো অসম্পূর্ণ ছিল”। [2]
তথ্যগুলো যতই অসম্পূর্ণ থাক, প্রচারের ঢক্কানিনাদ এবং ত্রাসের নির্মাণের মধ্য দিয়ে গণ-হিষ্টিরিয়া তৈরী করার প্রচেষ্টায় কোন অসম্পূর্ণতা ছিলনা। সে সময়কার বহুল প্রচারিত সাময়িকী এবং দৈনিকগুলোতে একের পর এক প্রকাশিত হচ্ছিল শীতার্ত পৃথিবীর ভয়ানক সব ভবিষ্যতের গল্প।সেসবের কয়েকটি দৃষ্টান্ত এইরকম : ‘পৃথিবীকে শীতল করার জলবায়ু’, সাইন্স নিউজ (১৫/১১/১৯৬৯), ‘তীব্রতর শীতে নতুন বরফ যুগের উদয়’, ওয়াশিংটন পোস্ট(১১/০১/১৯৭০) ‘বিজ্ঞান : আরেকটি বরফ যুগ?’, টাইম ম্যাগাজিন (২৪/০৬/১৯৭৪)’ বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন পৃথিবীর জলবায়ু কেন বদলাচ্ছে; অপেক্ষা করছে তীব্রতর ঠান্ডার দিন, নিউ ইয়র্ক টাইমস (২১/০৫/১৯৭৫) পরিবর্তনশীল পৃথিবীর কক্ষপথ হবে বরফ যুগের চালিকাশক্তি, সাইন্স ম্যাগাজিন (১০/১২/১৯৭৬) [3]

সুতরাং, জলবায়ুর গল্পকার গোয়াইন কি সাফাই দিচ্ছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে কষ্ট কল্পনার বরফ যুগ আসেনি। বন্দনা শিবা (Vandana Shiva) তার বিখ্যাত একটি বইতে (সবুজ বিপ্লবের হিংস্রতা) [4] যুক্তিপূর্ণ ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেই সময় অর্থাৎ ৭০ দশকের প্রারম্ভে পৃথিবীর কোন উন্নয়নশীল দেশে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি ছিল না। তবু দুর্ভিক্ষের আখ্যানকে সামনে রেখে এইসব দেশগুলোকে বিশ্ব ব্যাংকের মাধ্যমে খাদ্যশস্যের জন্য ঋণ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই ঋণের অন্যতম শর্ত ছিল সবুজ বিপ্লবের প্রযুক্তি অর্থাৎ রাসায়নিক সার, সংকর প্রজাতির বীজ এবং যন্ত্রাংশ কেনার চুক্তিতে মুচলেকা দেওয়া।
বলাই বাহুল্য যে পৃথিবী শীতল হবার মতো ভয়ানক জলবায়ু পরিবর্তনের গল্পটিকে সামনে রেখে ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল এসোসিয়েশন (Food and Agricultural Association) সংক্ষেপে ফাও বিভিন্ন হিসেবের ফিরিস্তি দিয়ে দেখালো যে আমেরিকা এবং কানাডা থেকে খাদ্যশস্য অবিলম্বে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে বন্টন না করলে দুর্ভিক্ষের বিপদ দোরগোড়ায় অপেক্ষা করছে। ফোর্ড ফাউন্ডেশন (Ford Foundation) এবং রকি ফেলার ফাউন্ডেশন (Rocky Feller Foundation) যে সমস্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান চালাত তারাই নির্মাণ করেছিল পৃথিবী শীতল হবার আখ্যান। এইসব ফাউন্ডেশন এর টাকায় পরিচালিত ফাও সেই আখ্যান কে বৈধতা দিয়ে আন্তর্জাতিক কৃষি পণ্য ব্যবসার পক্ষে সওয়াল করত। [5] এভাবেই সেইসময় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির মদতে জলবায়ুর গল্প ফেঁদে মনসান্তো এবং কারগিল এর মত বহুজাতিক কোম্পানিগুলির বাণিজ্যের রাস্তা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে নিষ্কণ্টক করা হয়েছিল। (চলবে)
সাংঘাতিক!!!!
বিল গেটস কি পৃথিবীর অধীশ্বর,তা তিনি যা বলবেন সবাই শুনতে বাধ্য?
Yes…we r liable to lesson his concept…
অসাধারণ লেখা
বিশ্বে স্বাস্থ্য মাফিয়াদের সম্পর্কে কিছু বলুন