| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ধর্ষিতা বড়োগল্প লিখেছেন সমরেশ বসু (প্রথম পর্ব)

Reporter
সমরেশ বসু / ৩২৬ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১ এপ্রিল, ২০২১

বাংলাদেশের ব্যাপারে, ভাবাবেগ থেকে আমিও রেহাই পাইনি। কিন্তু তা ছিল খুবই সীমিত। প্রকাশ্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মতো উদ্বেলতা, কখনওই তেমন বোধ করিনি। গত একাত্তরের পঁচিশ মার্চের পর কয়েক দিন বিশেষ উদ্বেগ বোধ করেছি, পাকবাহিনীর নির্মম অত্যাচারের সংবাদে ক্রুদ্ধ হয়েছি। পরে ডিসেম্বরে ভারতীয় বাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে, জয়ে, বঙ্গবন্ধুর মুক্তিতে, খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। এমনকী রেডিয়োতে গলা কাঁপানো নাটকীয় সংবাদ-পাঠ। শুনতে আমার অরুচি হয়নি। তখন আবেগ এবং গর্ব, দুই-ই বোধ করেছি। মনে মনে একটা বিশেষ ব্যাকুলতা বোধ করেছি, বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষদের দেখবার জন্য, কাছে যাবার জন্য। অবিশ্যি অন্য একটা আকর্ষণও ছিল, জেলা ঢাকা আমার জন্মস্থান।

ভাবাবেগ আর আবেগ এক না। ভাবাবেগ অনেকটাই যুক্তি-অমানিত এবং আজ যখন বাংলাদেশের মাটিতে পা দিলাম, তখন আমার চোখ আপনা থেকেই ঝাপসা হয়ে উঠল। বিমানের সহযাত্রীদের দিকে না তাকিয়ে, মাটিতে হাত ঠেকিয়ে, কপালে স্পর্শ করলাম। এবং স্পষ্টই অনুভব করলাম, একটা আবেগের কলকলানি আমার মধ্যে ছলছল করছে।

যাই হোক, আপাতত এ সব বক্তব্যগুলো থাক। এখন আমি বিশেষ একজনের কথা বলতে চাই। যাঁর কথা আমি বলতে চাইছি, তাঁর কথাই বলি। আমি একজন মহিলার কথা বলতে চাইছি। ঢাকায় আসার সপ্তাহখানেক পরে ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। একজন বিশিষ্ট সংস্কৃতিবিদ ভদ্রলোকের বাড়িতে রাত্রের খাবারের জন্য আমাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। তাঁর গৃহেই। ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, তিনিও নিমন্ত্রিত ছিলেন। গৃহকর্তা মহিলার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেবার সময় জানালেন, তিনি আমার একজন অনুরাগিণী পাঠিকা। আমি কৃতজ্ঞ বোধ করলাম এবং মহিলার শিক্ষা এবং বিদ্যাবত্তার পরিচয় পেয়ে তাঁকে আমার শ্রদ্ধা না জানিয়ে পারলাম না। তিনি শুধু বিদুষী নন, প্রকৃতপক্ষে রসিক বলতে যা বোঝায় তিনি তা-ই। সাহিত্য, সংগীত, শিল্প সমস্ত বিষয়েই তাঁর দখলের সীমা দিগন্তবিসারী। মহিলাদের বয়স সম্পর্কে স্থির করে কিছু বলা যায় না, তবু আমার মনে হয় তাঁর বয়স চল্লিশের নীচে, সম্ভবত ত্রিশের সামান্য ঊর্ধ্বে। বিদুষী বলার পরেই মহিলাদের রূপের প্রসঙ্গটা এসে যায়। এ মহিলাকে ঠিক রূপসি বলা যায় না, কেননা, তাঁর রূপ ঠিক সেরকম হালকা না, তার অধিক কিছু। যে রূপকে ঝলকানো বলে, এ রূপ সেরকম না। এ রূপ যেন স্নিগ্ধ দীপশিখা এবং তাকে ঘিরে আছে একটি সম্ভ্রমপূর্ণ গাম্ভীর্য। তাঁর শরীর অনুদ্ধত, অথচ সেই গানটির মতোই–টলমল যৌবন সরসী নীরে। কালো চোখের তারা সকরুণ বিষণ্ণ, তথাপি মনে হয় বিদ্যুৎ চমকের মতো হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠতে পারে। অথবা আরও কিছু, বিদ্রূপ বা ঘৃণা। কেশবতী, টিকোলো নাক, বিষোষ্ঠা। কণ্ঠস্বরটি প্রায় বালিকার মতো মিষ্টি আর সুর-ঝংকৃত, তথাপি একটি বিষাদের স্পর্শ যেন রয়েছে। হালকা নীলের ওপরে সাদা ফুল ফোঁটানো শিফনের শাড়ি আর জামা তাঁর গায়ে। কানে অলংকার নেই, হাতের কবজিতে ঘড়ি। এই বাঙালি মহিলার নাম আনোয়ারা খান।

খাবার আগে, খেতে বসে এবং পরেও আনোয়ারা খানের সঙ্গে বাংলাদেশের বিষয়ে অনেক কথা হল। পশ্চিম বাংলার সাহিত্য শিল্প বিষয়ে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন, বললেন এবং আমার লেখার বিষয়েও কিছু কিছু কথা বললেন। তাতে বুঝলাম, তিনি আমার অনুরাগিণী পাঠিকা বটে, কিন্তু তাঁর কাছে আমি সমালোচনার ঊর্ধ্বে না। আমি ওঁর কথাবার্তা আচরণে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

কথায় কথায় তিনি জানতে চাইলেন, বাংলাদেশে আমার আগমনের হেতু কী। নিশ্চয়ই লেখার রসদ সংগ্রহের জন্য? সেটা আমি স্পষ্টভাবে বলতে পারলাম না, কারণ সত্যি আমি লিখব বলেই বাংলাদেশে আসিনি। তবে আমি লেখক, সেরকম যদি কোনও বিষয় আমাকে উদ্বুদ্ধ করে আমি নিশ্চয়ই লিখব। কিন্তু আপাতত বাংলাদেশ নিয়ে ভাবাবেগে চিৎকৃত যা সব লেখা হচ্ছে, সেরকম কিছু লেখবার ইচ্ছা আমার নেই।

আনোয়ারা খানের কালো ডাগর চোখে একটু হাসি দেখা দিল। বললেন, ভাল লাগল আপনার কথা শুনে। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই গত ন মাসে কী ঘটেছে তার কিছু চিহ্ন দেখতে চাইবেন?

বললাম, নিশ্চয়ই। ইতিমধ্যেই কিছু কিছু দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আমার কথা বলার খুব ইচ্ছা, আর যাঁরা নানাভাবে পাক শিবিরে বন্দি ছিলেন এবং সেই সঙ্গেই নিপীড়িত মেয়েদের বিষয়েও জানতে চাই, সম্ভব হলে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।

এবার গৃহকর্তা বলে উঠলেন, তা হলে আপনাকে মিসেস খান সাহায্য করতে পারবেন। উনি একজন সমাজসেবিকাও বটে। নিপীড়িত মেয়েদের নিয়ে উনি কাজ করছেন, কয়েকটি চিন্তাশীল প্রবন্ধও ঢাকার কাগজে লিখেছেন।

আনোয়ারা খান একটু বিব্রত হলেন, হাসলেন এবং কয়েক মুহূর্ত কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে রইলেন। তারপরে বললেন, নিপীড়িত মেয়েদের আপনি দেখতে পাবেন। কিন্তু আমার মনে হয়, ওরা আপনার কথার জবাব দিতে পারবে না, কিংবা মুখ ফুটে কিছু বলতেই চাইবে না। অবিশ্যি সেরকম মেয়েও আছে, যে আপনার কথা বুঝতে পারবে, তবু হয়তো জবাব দিতে পারবে না।

কথাটা একদিক থেকে ঠিকই। প্রথম বাধা, আমি পুরুষ। দ্বিতীয়ত, পাক শিবিরের সেই সব নারকীয় অত্যাচারের কথা মুখ ফুটে বলাটা সহজ না। বিশেষত একজন অপরিচিত পুরুষকে। সবথেকে ভয় যেটা, তা হল, যদি সেই সব মেয়েরা তাদের অত্যাচারিত, বিড়ম্বিত জীবনের প্রতি আমার কৌতূহল ও উৎসাহকে কোনওরকম সন্দেহ বা বিদ্বেষের চোখে দেখে! তাদের দিক থেকে সেটা খুব অসম্ভব নাও হতে পারে।

তথাপি আনোয়ারা খান বললেন, আমি কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে আপনাকে দেখা করিয়ে দেবার চেষ্টা করব। অবিশ্যি, অধিকাংশই শারীরিক বা মানসিকভাবে এখনও অসুস্থ।

আহারের পর মিসেস খান তাঁর গাড়িতে আমাকে আমার হোটেলে পৌঁছে দিলেন। যাবার সময় পরের দিন তাঁর গৃহে আমাকে দাওয়াত দিলেন। জানালেন, তিনি সন্ধেবেলা গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। আমি সানন্দেই সম্মত হলাম।

পরের দিন, সন্ধে সাতটায় আনোয়ারা খানের টেলিফোন পেলাম। বললেন, তৈরি থাকুন, গাড়ি যাচ্ছে।

বললাম, তৈরি আছি।

আনোয়ারা খান একটু হাসলেন। বললেন, ধন্যবাদ, খুশি হলাম।

পনেরো মিনিট পরেই গাড়ি এল। ধানমণ্ডির বেশ অভিজাত নিরিবিলি পাড়াতে ওঁর বাড়ি। বাগান লন, সবই আছে এবং এক সময় নিশ্চয় যথেষ্ট সাজানো-গোছানো সুন্দর ছিল। এখন যেন একটু শ্রীহীন দেখাচ্ছে। বসবার ঘরটি সুন্দর সাজানো। পিয়ানো রেডিয়োগ্রাম দু পাশে। মেঝেতে মোটা কার্পেট পাতা। ডাইনিং রুমের কিছু অংশ, কাঠের পার্টিশনের পাশ থেকে দেখা যায়। দেখলাম, আমি ছাড়াও একটি দম্পতি এবং একজন মহিলা নিমন্ত্রিত। আনোয়ারা খান পরিচয় করিয়ে দিলেন–বেগম ও সাহেব মজিদ। আর একজন নীলা ইদ্রিস। জানালেন, সকলেই তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আমার লেখার অনুরাগী, যে কারণে বিশেষ করে আজ সন্ধ্যায় এঁদেরও নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অনুরাগী পাঠক-পাঠিকা শুনলেই, কেমন একটা সংকোচ বোধ করি, যদিও একটা খুশির কৃতজ্ঞতাও নিশ্চয়ই থাকে। কথা প্রসঙ্গেই জানা গেল, মজিদ সাহেব মূলত ব্যবসায়ী। ন মাসের যুদ্ধে ব্যবসার অধিকাংশই প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপরে ওঁর কয়েকটি বই আছে। বেগম মজিদ একটি কলেজের অধ্যাপিকা। আর নীলা ইদ্রিসের পরিচয় একমাত্র–আমার সহেলি নীলা ইদ্রিস।

বুঝতে পারলাম না, শ্রীমতী ইদ্রিস বিবাহিতা কি না। বাঙালি হিন্দু বিবাহিতাদের অধিকাংশের মতো ওঁরা সিঁদুর ব্যবহার করেন না। অধিকাংশ বললাম, কারণ সব হিন্দু বিবাহিতারাই আজকাল বোধহয় সিঁদুর স্পর্শ করেন না। যাই হোক, বেগম মজিদ আর নীলা ইদ্রিস, দুজনেই সামান্য কম-বেশি আনোয়ারা খানেরই বয়সি হবেন, তাঁরা নিজেদের তুমি সম্বোধন করছিলেন। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, সবদিক থেকেই আনোয়ারা খান অনেক বেশি উজ্জ্বল। আজ ওঁকে আরও সুন্দর লাগছে, অথচ কোনও অলংকারেই সাজেননি, কেবল বিনুনিহীন জড়িয়ে বাঁধা খোঁপাটি বেশ বড়।

পরস্পরের পরিচয় ইত্যাদির পরে স্বভাবতই সাহিত্যের কথা উঠল। এক এক করে নানা প্রসঙ্গ। উঠছিল, অথচ আনোয়ারা খানের নিজের কথা কিছুই বিশেষ শোনা হল না। আমার মনে নানা কৌতূহল এবং জিজ্ঞাসা, কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারছি না। বয়স অনুযায়ী, তিনি বিবাহিতা বলেই বিবেচনা করা উচিত। অথচ তাঁর স্বামীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি, বা তাঁর কথাও কেউ তোলেনি। নতুন পরিচিত একজন মহিলাকে জিজ্ঞেস করতেও বাধে, তাঁর আর কে আছে, কারওকেই দেখতে পাচ্ছি না কেন। কিংবা এমনও হতে পারে, তিনি কুমারী। যাই হোক, নিজের থেকে কোনও কৌতূহল প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। যা দেখছি এবং শুনছি তাতেই আমার জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি হোক।

বাংলাদেশের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক মর্মন্তুদ ঘটনা আমাদের আলোচনাভুক্ত হল।

কথায় কথায় গতকালের সেই কথা উঠল, নিপীড়িতা মেয়েদের বিষয়ে আমার কৌতূহল এবং ঔৎসুক্য। আনোয়ারা খানের মতো মোটামুটি সকলের একই মন্তব্য, মেয়েরা কেউই মুখ খুলবে না। বিশেষ করে একজন সাহিত্যিকের সব প্রশ্নের সুবিচার করাও হয়তো তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। প্রসঙ্গক্রমে এঁরা নিজেরাই কোনও কোনও মেয়ের নাম করে, তাদের বিষয় আলোচনা করতে লাগলেন, যাদের আমি চিনি না, দেখিনি। তার মধ্যে কিছু কিছু বীভৎস ঘটনার উল্লেখ ছিল এবং মেয়েদের শারীরিক ক্ষতির ভয়ংকর বিবরণ। মানসিক ক্ষতির চিহ্নও বাইরে থেকে স্পষ্ট। কারোর কারোর আচরণ উন্মাদসদৃশ, প্রলাপ বকে, কেউ একেবারেই মৌন। কেউ কেউ এমনকী স্বৈরিণীর মতো কথা বলে। তার থেকেই বোঝা যায়, কেবল শারীরিক অত্যাচারের আঘাতই না, কেবল মানসিক আঘাত না, ভবিষ্যতে সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠার অনিশ্চয়তা ও ভয়ও অত্যন্ত তীব্র।

আনোয়ারা খান তথাপি বললেন, তিনি আমাকে নিপীড়িত মেয়েদের বিষয়ে জানতে সাহায্য করবেন। কারণ, ওঁর ভাষায়, আপনার জানা দরকার। ওঁর এই বিশ্বাসের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু ক্ষমতার বিষয়ে, আমার মন সংশয়াবৃত।

তারপরেই কী কথায়, গানের কথা উঠল। আনোয়ারা নীলা ইদ্রিসকে দেখিয়ে বললেন, আমার এই বন্ধু ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীত করতে পারেন।

নীলা ইদ্রিসের ফরসা মুখে একটু লালের ছটা লেগে গেল। চকিত লজ্জিত দৃষ্টিপাতে, একবার আমাকে দেখে নিয়ে বললেন, ছি ছি রুণি, (আনোয়ারার ডাকনাম) কার সামনে কী বলছ?

আনোয়ারাও যেন ওঁর বন্ধুর কথায় একটু অপ্রস্তুত বোধ করলেন। আমার দিকে চেয়ে বললেন, আমি সেরকম কিছু ভেবে বলিনি। নীলার গান আমাদের খুব ভাল লাগে, তাই বলেছি। তাতে কী হয়েছে?

বলতে বলতে উনি আবার নীলা ইদ্রিসের দিকে তাকালেন, এবং তারপরে মজিদ দম্পতির দিকে। আমি অবাক হয়ে বললাম, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। মনে হচ্ছে আমি কোনও অপরাধ করেছি। যেন আপনাদের যা ভাল লাগে আমার তা লাগতে নেই।

সকলেই হেসে উঠলেন। নীলা বললেন, না না, তা না, কলকাতায় আপনারা কত ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনেন, সেই তুলনায় বলতে গেলে আমি তো কিছুই জানি না!

আমি বললাম, সেই কিছু না জানাটাই কিছু দিন না, দেখি স্বাদ নিতে পারি কিনা।

বেগম মজিদ বললেন, ঠিক ঠিক। নীলা, তুমি গাও।

নীলা ইদ্রিসের সংকোচ ও লজ্জা তথাপি যেন কাটতে চায় না। একবার আনোয়ারার দিকে তাকিয়ে ঈষৎ কুটি করে বললেন, কী যে করো!

আনোয়ারা আমার দিকে একবার দেখে ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, ঠিকই করেছি।

অগত্যা, নীলা ইদ্রিস কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সামনের দিকে তাকিয়ে গান ধরলেন: সুখে আমায় রাখবে কেন, রাখো তোমার কোলে–যাক না গো সুখ জ্বলে!…

গান শুরু হতেই মনে হল ঘরের পরিবেশ বদলে গেল এবং সেই সঙ্গে সকলের মুখের চেহারাও। কেউ কারও দিকে তাকিয়ে নেই, সকলেই যেন নিজেদের মধ্যে ডুবে গিয়েছেন। আনোয়ারার নত মুখ দেখতে পাচ্ছি না, মজিদ দম্পতি ভিন্ন ভিন্ন দিকে তাকিয়ে আছেন, আর নীলা ইদ্রিস আমাকে যে কেবল অবাক করলেন তা নয়, তাঁর গভীর সুর ঝংকৃত গানে আমার বুক টনটনিয়ে দিলেন। এখন তিনি চোখ বুজে আছেন এবং জাকুটিযুত ব্যথার অভিব্যক্তি ফুটেছে অন্তরাতে, যাক না পায়ের তলার মাটি, তুমি তখন ধরবে আঁটি…

গান শেষ হবার আগেই আনোয়ারা হঠাৎ উঠলেন। তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে চলে যাবার আগে, অস্ফুটে হয়তো কিছু বললেন। আমি ছাড়া, মজিদ সাহেব সেদিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন। আবার একভাবেই চুপ করে রইলেন। আমি ব্যাপারটা সহজভাবে নিতে পারলাম না, মনে হল, কী একটা যেন ঘটে গেল!

গান শেষ হল। নীলা ইদ্রিস চোখ মেললেন। স্পষ্টতই তাঁর চোখে একটি সকরুণ বিষাদের ছায়া। আনোয়ারা ফিরে এলেন। মনে হল, ওঁর চোখ আরক্ত ভেজা ভেজা, মুখেও রক্তোচ্ছাসের আভা। অনুভব করলাম, এখানে শুধু গান গাওয়া হয়নি, তার চেয়ে বেশি কিছু হয়েছে যা কথার ব্যাখ্যা থেকে দূরে–অনির্বচনীয়। কেউ যখন কিছু বলছেন না, তখন আমিই মুখ খুললাম, নীলা ইদ্রিসের দিকে চেয়ে বললাম, কিছু না জানাতেই যদি এমন বুক ভরে ওঠে, তা হলে কিছু জানার দরকার নেই। আর একটা শোনাবেন?

নীলা ইদ্রিসের বিষাদ-আচ্ছন্ন মুখে একটু সলজ্জ হাসি দেখা দিল। আনোয়ারা যেন কৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকালেন। মজিদ দম্পতির দৃষ্টি নীলার দিকে, আমারই প্রার্থনা তাঁদের চোখে। নীলা আনোয়ারার দিকে একবার দেখে, টপ্পা আঙ্গিকে গাইলেন, আজি যে রজনী যায় ফিরাইব তায় কেমনে, নয়নের জল বহিয়া নয়নে।.

সকলের অভিব্যক্তি সেই একই এবং এবারও গান, গানের থেকে কিছু বেশি। আনোয়ারা এবার উঠে গেলেন না, কিন্তু মুখ তোলেননি একবারও। নীলা গান করে যেন নিজের কথাই বলছেন। গান শেষে আনোয়ারার মুখে সেই রক্তোচ্ছ্বাসেরই আভা দেখলাম। চোখ ভেজা না, সজল মেঘের মতো ছায়াভরা।

নীলা ইদ্রিসের দিকে চেয়ে বললাম, বাংলাদেশে এসে এটা একটা বড় পাওয়ানা পেলাম।

নীলা লজ্জা পেয়ে হেসে বললেন, কী যে বলেন!

আনোয়ারা মুখের ছায়ায় হাসি ফুটিয়ে বললেন, কিন্তু ধন্যবাদটা আমারই পাওয়ানা।

বললাম, হাজার বার।

সকলের হাসির মধ্যেই আনোয়ারা বললেন, এবার খেতে যাওয়া যাক।

রাত্রিও হয়েছে প্রায় দশটা। অতএব খাবার টেবিলে গেলাম সবাই। আয়োজন প্রচুর সুপ্রচুর বলা উচিত। মাছের আয়োজনই বেশি। একটি বয়স্ক লোক এবং অল্পবয়সি একটি মেয়ে খাবারদাবার এগিয়ে দিল, জল ঢেলে দিল। আর কারওকেই দেখতে পেলাম না। বাড়িটা ছোটখাটো না, দোতলা বড় বাড়ি। মনে হয় সবই খালি আর নিঝুম। খেতে খেতে নানা কথা উঠল এবং আনন্দের বিষয়, মজিদ দম্পতি এবং নীলা ইদ্রিস তাঁদের গৃহে আমাকে নিমন্ত্রণ জানালেন।

পরিশেষে মজিদ দম্পতির সঙ্গে নীলা ইদ্রিসও বিদায় নিলেন। নীলাকে তাঁরাই পৌঁছে দেবেন। আমার বিদায়ের প্রাক মুহূর্তে, আনোয়ারা বললেন, এক মিনিট বসুন, আসছি।

বলে বাড়ির ভিতরে অদৃশ্য হলেন। প্রায় তিন-চার মিনিট পরে ফিরে এলেন। বললেন, আমি আপনাকে নিপীড়িতা মেয়েদের সঙ্গে দেখা করাব। তবু আপনার অনেক কৌতূহল, তাই জন্য এটা আপনাকে দিচ্ছি, পড়ে দেখবেন। একরকম ডায়েরি বলতে পারেন, একটি নিপীড়িত মেয়েরই।

আমার দিকে মলাটবিহীন একটি নোটবুক বাড়িয়ে দিলেন। দেখে মনে হল, শিথিলবন্ধন নোটবুকটি নতুন না। সামনে পিছনে অনেকগুলো পাতাই নেই। পাতা উলটে মনে হল, ভিতরের কিছু পাতায় বাংলায় কিছু লেখা রয়েছে। আনোয়ারা আবার বললেন, এটা ঠিক রোজনামচা না। যে লিখেছে, যেদিন যখন যা মনে এসেছে তা-ই লিখেছে। এটা এখন আমার সংগ্রহে আছে। আপনাকে পড়তে দিলাম, পড়ে ফেরত দেবেন। কেবল একটা আরজি, কারওকে দেখাবেন না, বলবেন না।

আমি কৃতজ্ঞতা এবং উৎসাহের সঙ্গে বললাম, নিশ্চয়ই আপনার কথা থাকবে, আমাকে বিশ্বাস করবেন।

আনোয়ারা বললেন, করছি বলেই তো দিলাম।

আমি ওঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। উনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ওঁর কালো চোখের গভীরে বহু দুরে যেন কিছু চিকচিক করছে। যেন আমাকে কিছু বলছেন বা প্রশ্ন করছেন, কিন্তু তা অনুচ্চারিত। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আগামীকালই এটা আপনাকে আমি ফেরত দেব।

আনোয়ারা বললেন, আপনার পড়া হয়ে গেলে দেবেন।

আমার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত এলেন। গাড়ি প্রস্তুত ছিল, ড্রাইভার সামনেই দাঁড়িয়ে। আনোয়ারা আবার বললেন, আমি কি যাব আপনার সঙ্গে?

আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, না না, এত রাত্রে আপনি আর আসবেন না। আজ চলি, আদাব।

আনোয়ারা বললেন, খোদা হাফেজ।

গাড়িতে উঠে আর একবার ওঁর গভীর চিকচিক চোখের সঙ্গে চোখাচোখি হল। হাসলেন, চিবুকের কাছে হাত তুললেন। গাড়ি এগিয়ে গেল।

(আগামীকাল দ্বিতীয় পর্ব)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev