কথায় বলে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না তখন বিশ্বাসই হয় মেনে নেওয়ার একমাত্র পথ। মন মানতে না চাইলেও যুক্তিতে তার সঠিক ব্যাখ্যা না পেলেও, কোনো কোনো সময় বিশ্বাস করতে হয়। তাদের দর্শনে অতি বড়ো সাহসী নাস্তিক সেলিব্রিটিও কেঁপে উঠছেন। সেই তালিকায় রয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্যারীচাঁদ মিত্র… থেকে সুচিত্রা মিত্রের মতো ব্যক্তিত্বও।
ভূতে বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক, ভূতের গল্প পড়তে ভালোবাসে কম বেশি সকলেই। আজ সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও নিগমানন্দ পরমহংস একবার ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন, তারই গল্প বলবো। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্পটি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীযুত শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় রচিত বঙ্কিম জীবনীতে বিবৃত করেছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র তখন ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট। কাজের সূত্রে জেলার বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে তাঁকে যেতে হতো। একবার এক জরুরি প্রয়োজনে তাঁকে কাঁথি থেকে সাত-আট ক্রোশ দূরে যেতে হলো। কাজ শেষ করতে বেশ রাত হয়ে গেলো। সেদিন ছিলো অমাবস্যা। উপরন্তু সেইসময় বাংলায় রাতের জনহীন প্রান্তর ছিলো ডাকাতদের মুক্তাঞ্চল। পালকিতে চড়ে লোক লস্কর নিয়ে সেই রাতটা স্থানীয় জমিদারের বাগানবাড়িতে হাকিম সাহেবের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।
সাহিত্য সম্রাটকে একাকী বাড়ীর বাইরে না বেরোতে পরামর্শ দেওয়া হলো। তিনমহলা বাগানবাড়িতে প্রচুর গাছ ছিলো। বাগান ঘিরে রেখেছে উঁচু পাঁচিল। বাড়ি থেকে ফটকের দূরত্বও বেশ খানিকটা। চারিদিক নিকষ কালো অন্ধকার নিঝুম গা ছমছমে পরিবেশ। কেবল গাছের পাতার সোঁ সোঁ শন্দ।
বঙ্কিমের খানসামা মুরলী আর বাকি চাকররা রইল তার পাশেই একটা ঘরে। বাড়ীর একটি ঘরে বিশাল এক পালঙ্কের সাদা টানটান বিছানায় বঙ্কিম বাবুর শোওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। মুরলী সেজবাতি জ্বালিয়ে দিলেন বাবুর জন্য। সবেমাত্র আতিথিয়তা সেরে হাকিম সাহেব দরজায় খিল দিয়ে তামাক টানতে টানতে তাঁর দু চোখ বুজে এসেছে ঘুমে, ঠিক তখনই দরজায় জোরে আওয়াজ।
কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলো সেই আওয়াজে। ঘুম চোখে দরজা খুলে একটি কুকুর ছাড়া কাউকেই দেখতে পেলেন না। সারাদিনের কাজের নানান ঝামেলা, পথশ্রম… বিরক্ত হয়ে সেজবাতি কমিয়ে শুয়ে পরলেন। কিছুক্ষণ বাদে আবার দরজায় সেই দুমদাম আওয়াজ। উঠে গিয়ে দুহাট করে দরজা খুললেন। কিন্তু কি আশ্চর্যের ব্যাপার, কুকুর ছাড়া এবারও নতুন কিছু দেখতে পেলেন না। হঠাৎ করে মনে হলো কে যেন ছুটে পালিয়ে গেলো। দরজা বন্ধ করে শুয়ে পরলেন।
বিভিন্ন রকমের সম্ভাবনার কথা মনের মধ্যে উঠতে লাগলো। সেইসময় বেশ ভালো রকমের চোর ডাকাতদের উপদ্রব লেগেই থাকতো তাই নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে হাকিম সাহেব নিজের কাছে একটি ভোজালি সঙ্গে রাখতেন। খানিক বাদেই আবার সেই আওয়াজ। এবার দুমদাম নয়, ঠকঠক শব্দ। বঙ্কিমবাবু এবার হাতে ভেজালি নিয়ে দরজা খুললেন। দেখলেন
খর্বাকৃতি এক সুন্দরী বধূ দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে।
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সেই মহিলাটি ছুটে পালাল। এত রাতে এখানে কে এই মহিলা!! জমিদার মহাশয়ের সঙ্গে কি তবে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত কেউ! কিম্বা এখানেই হয়তো পরপুরুষের সঙ্গে অভিসারে মাতেন প্রতি রাতে। আজ অন্য কাউকে দেখে পালিয়ে যাচ্ছেন।
অকুতোভয় বঙ্কিম পিছু নিলেন মহিলার। তাঁর পিছু নিতে বারণ করলেন বধূ। নিষেধ না শুনে বঙ্কিমচন্দ্র তাকে গ্রেপ্তারের কথা বললেন। বহু চেষ্টা করেও মহিলাটিকে ধরতে পারলেন না বরং দেওয়ালে আঘাত পেলেন। মহিলাটি বলে উঠলো, ‘আপনি আমাকে ধরতে পারবেন না। আমি এই জমিদারের মেজ বউ। আমার নাম “বিরহ”। আপনি যে বিছানায় শুয়ে আছেন, সেইখানে প্রতি রাতে আমি শুই। কেন রোজ আসি জানতে চাইবেন না। আপনি আমার পিছু নেওয়া ছাড়ুন। এখন আমার ফিরে যাবার সময় হয়েছে।’
মহিলার পিছু পিছু ধাওয়া করতে করতে বাড়ীর সীমানা ছাড়িয়ে একেবারে সদর রাস্তায় একটি চাঁপা ফুলের গাছের সামনে এসে থামলেন। অবাক হয়ে দেখলেন হাকিম সাহেব, মেয়েটি গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
হাকিম সাহেব এবার বুঝতে পারলেন, তিনি এতক্ষন যে মহিলার পেছনে ছুটেছেন, সে আসলে ছায়া মূর্তি। ভয় পেয়ে গেলেন সাহেব এবং তল্পিতল্পা গুছিয়ে ভোর রাতেই রওনা হয়ে গেলেন শহরের দিকে। পরে তাঁর কাছে আসা জমিদারি এস্টেটের এক কর্মীর কাছে জানতে পারেন, বহুদিন আগে জমিদার বাড়ীর মেজ ছেলের বউ ওই বাগানবাড়ির পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ডুবে মারা গেছেন। বঙ্কিচন্দ্রের বুঝতে আর বাকি রইলো না যে তিনি একটি ভুতুড়ে বাড়িতে রাত কাটিয়েছেন এবং তারই ফলস্বরূপ সাক্ষাৎ হয়েছিলো এক সুন্দরী ভূতের সঙ্গে।।
পরের গল্পটি বলি —
নিজের জীবনে এমনি এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন নিগমানন্দ পরমহংস। তখনও তিনি পুরোপুরিভাবে আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ করেননি। তাঁর স্ত্রী থাকতেন দেশের বাড়িতে আর তিনি থাকতেন কর্মস্থলে একা। নিগমানন্দ একদিন নিজের কর্মস্থলের ঘরের দরজায় স্ত্রী কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। কোন কথা বলছেন না কেবল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছেন স্বামীকে। অচেনা যায়গায় হঠাৎ স্ত্রীর এমন উপস্থিতি ও কিছুক্ষণ পর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায়, অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে নিগমানন্দর হৃদয়।
ছুটে যান দেশের বাড়িতে এবং জানতে পারেন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের কিছু পূর্বেই স্ত্রী প্রয়াত হয়েছেন। এই ঘটনার পর নিগমানন্দ প্রেত চর্চায় আসক্ত হন এবং পরে আধ্যাত্মচর্চায় মন দেন।
গা শিউরে উঠলো। উফ্।
থ্যাংক ইউ গো।
পড়তে পড়তে মাথার চুল খাড়া হয়ে গিয়েছিল। উপথ্যাপনা কিন্তু তারিফ করার মতো।
খুব ভালো। নার্ভে নাড়া দেয়ার মতো।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এত সুন্দর একটি মতামতের জন্য ❤️
ভালো লাগল