করোনার প্রাথমিক পর্ব থেকেই গোটা বিশ্বের প্রায় ১০০ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে তাদের স্কুল-কলেজের সম্পর্ক কার্যত বন্ধ। স্কুল কলেজের সঙ্গে ছাত্র ছাত্রীদের যে দৈনন্দিন সম্পর্ক তা এখনও প্রায় বন্ধ বলা যায়। স্কুল-কলেজে যাওয়া থেকে শুরু করে ছাত্র ছাত্রীদের নিজেদের মেলামেশা, ছাত্র-শিক্ষক কথাবার্তা সবই থেমে রয়েছে। কারণ সব দেশের প্রায় সমস্ত স্কুল-কলেজগুলির দরজা বন্ধ।
করোনা প্রতিরোধে দুনিয়াজুড়ে লকডাউনের ফলে শুরু হয় অনলাইন পড়াশুনা। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সারা দুনিয়ার প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ছাত্র ছাত্রী অনলাইনে পড়াশুনো করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সবাই কি ঘরে বসে অনলাইনের সুযোগ পাচ্ছে? আমাদের দেশের বহু জায়গায় টেলি যোগাযোগ পেতে ছাত্র ছাত্রীকে উঁচু গাছের ডালে উঠতে হয়। কাউকে ঘর থেকে বেড়িয়ে উঁচু খোলা জায়গায় যেতে হয় টাওয়ার পেতে। কারও আবার ১০ মিনিটে পাঁচবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।
তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক এই অনলাইন পড়াশোনায় কি ছাত্র ছাত্রীরা আদৌ লাভবান হচ্ছে? অনলাইন পড়াশুনার শুরু থেকেই এই প্রশ্ন কিন্তু ছিল। কারণ তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দেশেগুলি যে প্রযুক্তিগত সুবিধাটুকুও কাজে লাগাতে পারবে না তা জানাই ছিল। আমাদের দেশেই বহু ছাত্র ছাত্রী সেই সুযোগ থেকে এখনও বহু দূরে রয়ে গিয়েছে। যারা অনলাইনে পড়াশুনা করাচ্ছেন এবং করছেন তারাও রয়ে গিয়েছে নানা বিভ্রান্তির মধ্যে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী অনলাইন ক্লাসের সুযোগ নিতে পারেনি এক তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী। কারণও একটাই, অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করার মতো সুযোগ অর্থাৎ ডিভাইস বা ইন্টারনেট সংযোগ তাদের নেই। জাতিসংঘের ওই হিসাব থেকেই জানা যাচ্ছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত এমন সংখ্যাটা বিশাল। বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৪৬ কোটি ৩০ লাখ ছেলে মেয়ে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না। এতগুলি মাস এত ছাত্র ছাত্রী যে পাঠক্রমের বাইরে থেকে গেল তা কি নিছক একটি সংখ্যা? এটা কেবল গোটা বিশ্বের শিক্ষা সংকট নয়, মানব সভ্যতার লজ্জা। আগামী কয়েক দশক ধরে সমাজ ও অর্থনীতিতে এর প্রতিক্রিয়া ঘটবে গভীরভাবে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোটা বিশ্বের ৪৬৩ মিলিয়ন স্কুল পড়ুয়ার অনলাইনে ক্লাস করার কোনও সুযোগ নেই। অর্থাৎ প্রায় দেড়শো কোটি পড়ুয়া অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চল যেখানে ইন্টারনেট পরিসেবা পৌঁছায়নি, সেখানকার পড়ুয়ারাও অনলাইন ক্লাস করতে পারেনি বা এখনও পারছে না।
করোনা সংক্রমণ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে স্কুল-কলেজ-সহ সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যাতে পড়ুয়াদের পড়াশোনা বন্ধ না হয়, যাতে ধারাবাহিকতা নষ্ট না হয় তার বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে অনেক দেশ অনলাইনে পড়াশোনা চালু করে। তবে সেই বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে কোটি কোটি পড়ুয়াকে।
গোটা বিশ্বের একশোর বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব থেকে বেশি সমস্যা প্রত্যন্ত অঞ্চলের পড়ুয়াদের। যাদের অধিকাংশই মা-বাবার ফোনের ওপর নির্ভরশীল। আবার সবার মা-বাবার ফোনও নেই। আর যদি তাদের একের বেশি ভাইবোন থাকে, তাহলে ফোন নিয়ে ভাইবোনদের মধ্যে ঝামেলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একই সময় অনলাইনে ক্লাস হলে সমস্যাটা বেশি। আবার সুযোগ থাকলেও কারিগরি জ্ঞানের অভাবেও অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বোঝাই যাচ্ছে গত কয়েক মাস ধরে যে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চলেছে তার একটা প্রভাব আগামী দিনেও থেকে যাবে। অনেকে সেই ব্যবস্থার সুবিধাগুলি পাবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা আগে যাদের ছিল না বা আগামীদিনও থাকবে না তারা কি করবে? জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, করোনা ঠেকাতে জারি লকডাউন ও স্কুল বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে ১৫০ কোটি ছাত্র ছাত্রীর পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব দেশের সব অঞ্চলে পরিসংখ্যানটি অবশ্য এক রকম নয়। এরপরও কি সবার কাছে আধুনিক ডিভাইস পৌঁছে দেওয়া যাবে? নাকি প্রযুক্তির ব্যবহার গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরা পাবে না?
একেই ছাত্র ছাত্রীদের স্কুল কলেজে না যেতে পারা, ছোটাছুটি করতে না পারা, অবাধ অগাধ মেলামেশা না করতে পারা, ঘরবন্দি মন আর অনলাইন কিংবা নেট দুনয়ায় বিচরণ করতে করতে তাদের মানিসিকতা যে অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে সেখান থেকে কবে কিভাবে তারা বেরতে পারবে সেটা আজ সবথেকে বড় প্রশ্ন।
তারওপর অনেক পড়ুয়া স্কুল থেকে ঝরে পড়বে। আগামী দিনে অর্থনীতি এবং সমাজে যার একটা বড় প্রভাব পড়বে। আমাদের দেশের প্রসঙ্গে জাতিসঙ্ঘের হিসাব বলছে, করোনাকালে এ দেশের ১৫ লক্ষের বেশি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেখানে ২৮ কোটি ৬০ লাখ পড়ুয়া পড়াশুনা করত। তাদের শিক্ষাজীবন যে অব্যাহত রয়েছে সেকথা জোড় দিয়ে বলা যাবে না। বরং প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে বলা যায়।
অনলাইনে ক্লাস করতে গেলে ডিভাইস, ইন্টারনেট লাগে, সবার সেই সুযোগ কি আছে? লাল নীল সবুজ হলুদ কিংবা চুতিয়া
ঘাটিয়া আল বাল কোনও সরকার কি তার ব্যবস্থা করবে? অনলাইন ক্লাস হল একটা ঢপের চপ। কয়েক কোটি পড়ুয়া ভোগে
গেছে আরও কয়েকশো কোটি ভোগে যাবে। আমারা দাঁত ক্যালাবো।
অনলাইন ক্লাস শহরের স্কুলের ছেলেমেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, গ্রামাঞ্চল বা প্রত্যন্তের ছেলেমেদের সেই সুযোগ এখনও
নাগালের বাইরে। তাছাড়া যারা অনলাইন ক্লাস করিয়েছেন তারাই বলছেন ওটা কোনও পড়াশুনা নয়। স্কুলকে মাইনে নিতে
হবে, পাড়ার টোলের মাষ্টারদের হাত পেতে টাকা নিতে একটু লজ্জা হবে তাই ওই কেতাভরা নামের বিকল্প ব্যবস্থা। আসলে
ওটা একটা জোচ্চুরি ছাড়া কিছুই নয়।
ঠিকই বলেছেনঃ ইস্কুল-কলেজ মানে পড়াশুনার পাশাপাশি মেলামেশা, ছুটোছুটি, আদানপ্রদান- বন্ধ প্রায় এক বছর। ছেলেমেয়েগুলির দমবন্ধ হয়ে গেছে। তারা কিভাবে বেঁচে আছে, আদৌ আছে কিনা আমরা জানিনা। অনলাইন এখানে স্রেফ একটা ভাওতাবাজি…
একেবারে সঠিক কথা লিখেছেন। অনলাইনে পড়াশুনার সুযোগ পায়নি বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে কারণ সেই পরিকাঠামোঢ়
সুযোগ নেই।
যথেষ্ট তথ্য দিয়ে স্পষ্টই বোঝাতে পেরেছেন কিভাবে অনলাইন ক্লাস থেকে দূরে পড়ে আছে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী। কিভাবে
লক্ষকোটি ছেলেমেয়ের ভবিষ্যত অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।
কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থাটা কি? সব বন্ধ করে ফেলে রাখা? পরিকাঠামো যে নেই সেতো পুরনো কথা, নতুন কথা হোক…
স্কুল কলেজে নিয়মিত মাইনে দিতে হচ্ছে, প্রাইভেট শিক্ষকদেরও, মাঝখান থেকে ছেলেমেয়েগুলোর পড়াশুনার বারোটা পাঁচ,
তাতে অবশ্য সরকারের কিছু আসে যায় না, শিক্ষক সমাজেরও না। অনলাইন স্রেফ একটা জোচ্চুরি, ভাঁওতা- না হলে স্কুল-
কলেজ আর শিক্ষকদের হাত পেতে টাকা নিতে একটু ইয়ে হয় তাই।