পূণ্যা কাকীমার বিয়ে হয়েছিল বিলাসকাকার সঙ্গে। পূণ্যা কাকীমা হাঠখোলা দত্ত বাড়ির মেয়ে। বনেদি পরিবার। শোনা কথা, এই বাড়িতেই সরকারের কাজ করতেন ছাতুবাবু, লাটুবাবু। বিলাসকাকা আমাদের পাশের বাড়ি থাকতেন। লজেন্সের মাধ্যমে বিলাসকাকার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তখন আমি ক্লাস টু। তখন অবশ্যি বিলাসকাকার বিয়ে হয় নি। পূণ্যা কাকীমা যেদিন বিয়ে হয়ে এলো আমাদের পাড়ায় তখন আমি দশ পেরিয়ে এগারক্লাসে পা দিয়েছি। কাকীমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। বারো পাশ করার পর কাকীমা বললো, কোথায় ভর্তি হবি? বললাম জানি না। রবিবাবু যেখানে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করাবেন সেখানে ভর্তি হবো। কে রবিবাবু? আমাদের স্কুলের বাংলা শিক্ষক।
আমার শিক্ষার আকাশে দু-টো ধ্রুবতারা এক রবিবাবু দুই অলোকবাবু। একজন কৈশোরের কারিগর একজন যৌবনের। তা রবিবাবু আমাকে হাতে ধরে নিয়ে গেলেন নিজে যে কলেজে পড়তেন সেই কলেজে। সে কলেজ বাড়ি দেখে আমি প্রথমে ভিরমি খেয়েছিলাম। কি সুন্দর মেয়েরা-ছেলেরা পাশাপাশি বসে হাসি-ঠাট্টা-মস্করা করছে। তা স্যার আমার প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে বলেছিলেন, এই কলেজের নাম স্কটিশচার্চ কলেজ। আমি এখান থেকে ৫৯ সালে পাশ করে বেরিয়েছি। ঠিক ২০ বছর পর তোমাকে ভর্তি করাতে এলাম। বাংলা নিয়ে ভর্তি হলাম। তা স্যারই টাকা দিলেন। আমার ভর্তি হবার পয়সা ছিল না। পারিবারিক পরিস্থিতি এমনই ছিল যেখানে পড়াশুনোটা ছিল বিলাসিতা।
আমি তখন দুটো টিউসনি করে ৩০ টাকা পাই। স্যারকে বলেছিলাম, স্যার পাশ কোর্সে ভর্তি হই, বই কেনার পয়সা লাগবে না। স্যার বলেছিলেন নম্বর যখন আছে ভর্তি হয়ে যাও। স্যারের কথা বেদ বাক্য। বাড়ি ফিরে এসে পূণ্যাকাকীমাকে সব বললাম। বললো, তাই! আমিও ওই কলেজে পড়তাম। ওই কলেজে একজন প্রফেসার আছে অলোক রায়। তা আমরা আমাদের ছাত্রাবস্থায় অলোকদা অলোকদা করতাম। অলোকদা তখন বাচ্চা ছেলে।
তুমি কোন ইয়ার?
আমি ১৯৬২।
আমি তখন আদো আদো কথা বলতে শিখেছি।
কাকীমা খিল খিল করে হেসেছিল।
বলেছিল, অলোকদা ভীষন ভালো মানুষ, দারুন পড়ায়, কখনো অলোকদার ক্লাস মিশ করবি না।
সত্যি কথা বলতে কি কলেজে যাওয়ার আগেই পূণ্যা কাকীমা আমার মগজে অলোকবাবুর নামটা খোদাই করে দিয়েছিল। কলেজ শুরু হলো, অলোকবাবুকে দেখলাম। গুরুগম্ভীর স্বরে বঙ্কিমের ‘রজনী’ পড়াতেন। প্রথম প্রথম কপালে খুব কমই ধাক্কা খেত। সবই মাথার ওপর দিয়ে বেড়িয়ে যেত। উনি প্রত্যেকটা ছাত্র-ছাত্রীর চোখ দেখে এটা বুঝতেন। থিতু হওয়ার আগেই একদিন প্রশ্ন করলেন রজনীর চরিত্র নিয়ে। কিছুই বলতে পারলাম না। কো-এড কলেজ মেয়েরা একটু মুচকি হাসলো। স্যার বললেন ‘বসো’। এই ‘বসো’ শব্দটাই আমার আত্ম-অহঙ্কারে আঘাত করলো। আমি জীবনে প্রথম অপমানিত বোধ করলাম। সেদিন স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর লাইব্রেরিতে গিয়ে ‘রজনী’ উপন্যাসটার খোঁজ করলাম। লাইব্রেরীয়ান আরতিদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, তুমি ফার্স্ট ইয়ার। মাথা দুলিয়ে বলেছিলাম। হ্যাঁ। রীডিং রুমের কার্ড করেছো? আমি বোকার মতো তাকিয়ে ছিলাম। আরতিদি আমাকে সেদিন লাইব্রেরির সমস্ত কিছু বুঝিয়েছিলেন।
বেশ মনে আছে, সেইদিন বেলা দু-টোর পর প্রফেসর রুমের কাছে গিয়ে বিজয়দাকে বলেছিলাম অলোকবাবু স্যারের সঙ্গে একটু দেখা করবো। বিজয়দা বলেছিল একটু অপেক্ষা করো। তারপর স্যার প্রফেসরস রুম থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। স্যারের কাছে আমার পারিবারিক অবস্থা নিঃসঙ্কোচে জানিয়েছিলাম। স্যার গম্ভীর হয়ে আমার কথা শুনেছিলেন। বললেন, পর্শুদিন স্বরস্বতী পুজো সেরকম কাজ না থাকলে বিকেলের দিকে ৫টার পর আমার বাড়িতে এসো। স্যারের মুখের দিকে তাকালাম। ও তুমি তো কোনওদিন আসোনি। শ্যামাজার ট্রাম ডিপোর ঠিক পেছনে, ১/৩ কৃষ্ণরাম বসু স্ট্রীট, কলকাতা-৭০০ ০০৪।

সরস্বতী পুজোর দিন স্যারের কাছে আমার প্রথম যাওয়া। পুরনো বাড়ি। তার পরতে পরতে ইতিহাসের গন্ধ। ঢুকেই ডানদিকে এক ঘর বই-এর মধ্যে স্যার বসে আছেন। কলেজের ক্লাসে ডায়াসে স্যারকে দেখা, আর মুখোমুখি স্যারের সামনে বসা, দুটোর মধ্যে যে অনেক দূরত্ব রয়েছে সেদিন সেটা অনুভব করলাম। সেই শুরু। তারপর হঠাৎ একদিন আমি আবিষ্কার করলাম, আমি স্যারের পরিবারের একজন ঘনিষ্ঠ সদস্য হয়েগেছি। আজ জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার ৮০ ভাগ কৃতিত্ব ড. অলোক রায়-এর। স্যার নেই কিন্তু স্যার আমার মনের আকাশে এখনও উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। স্যারকে নিয়ে লিখতে গেলে একটা গোটা উপন্যাস লেখা হয়ে যাবে।
এখানে তিনটি চিঠির উল্লখ করছি। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক যে শুধু গুরু-শিষ্য নয় দু-জনেই যে দু-জনের পরমবন্ধু তারই নিদর্শন শব্দের মধ্যে ছবি আঁকা হয়ে আছে।
একবার আমি অসুস্থ হয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। তা স্যারকে চিঠি দিয়ে সমস্ত ব্যাপারটা জানালাম। স্যার আমার চিঠির উত্তর দিলেন—
প্রফেসর অলোক রায়, এম.এ., পিএইচ.ডি
১/৩ কৃষ্ণরাম বোস স্ট্রীট, কলকাতা-৭০০ ০০৪,
ফোন-৫৫৬১০৭
১০-০২-১৯৮০
স্নহভাজনেষু,
তোমার চিঠি পেয়েছি। তোমার অসুস্থতার খবর জেনে দুশ্চিন্তা বোধ করছি। আশাকরি দ্রুত আরোগ্যলাভ করবে। তবে মনে হয় তোমাকে এখন বেশ কিছুদিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশ মতো চলবে। দু-এক সপ্তাহ কলেজে ক্লাস করতে না পারলে এমন কিছু ক্ষতি নেই। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠাটাই আগে দরকার।
কলেজ খুলেছে, অর্থাৎ নিয়মিত ক্লাস শুরু হচ্ছে ১২ই ফব্রুয়ারি থেকে। ২৩শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যথারীতি ক্লাস হবে (১৫ই কলেজ ছুটি আছে)। তারপর ২৪শে থেকে আবার কলেজ বন্ধ, অর্থাৎ তোমাদের ক্লাস হবে না — নিয়মিত ক্লাস শুর হবে ১২ই মার্চ থেকে। কাজেই মাঝখানে দিন দশেক কলেজে না এসে একেবারে ১২ই মার্চ থেকে কলেজ আসতে পারো।
তোমার লেখাটি আমি দেখেছি। সামান্য সংশোধন/পরিবর্তন করলেই চলবে। তুমি একটু সুস্থ হলে এইভাবে অন্যান্য চরিত্রগুলি লিখে ফেলতে পারো। লেখবার সময় চওড়া মার্জিন রাখবে। আর মোহিতলাল মজুমদারের বই সাধ্যমতো পরিহার করবে।
শুভাকাঙ্ক্ষী
অলোক রায়।
শিক্ষা-জীবন শেষ হওয়ার পর জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। তখন স্যারের বাড়িতে মাসে দু-তিন বার যাতায়াত ছিল। স্যার খাতা দেখতেন আমি যোগ করতাম। সেই সময় আমি একটা চাকরি পেয়ে এলাহাবাদ যাব। তা স্যারকে বললাম, স্যার এখন ক্যালকুলেটর বেড়িয়েছে আপনি একটা ক্যালকুলেটর কিনে নিন। তাহলে এই সব কাজ করতে আপনার সুবিধে হবে। স্যার টাকা দিয়ে বললেন, যাও কিনে নিয়ে এসো। স্যারকে একটা ক্যালকুলেটর কিনে এনে দিলাম। তারপরতো আমি এলাহাবাদ চলেগেলাম। এলাহাবাদে গিয়ে স্যারকে পৌঁছনোর সংবাদ জানালাম। স্যার উত্তর দিলেন—
কলকাতা
প্রীতিভাজনেষু,
নিরাপদে এলাহাবাদ পৌঁছেছ এবং নতুন কর্মস্থলে মোটের উপর খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছ জেনে নিশ্চিন্ত হলুম। আশাকরি এতদিনে হোটেল ছেড়ে হোস্টেল বা মেস্-জাতীয় বাসস্থানে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। অভ্যস্থ জীবন থেকে বেরিয়ে আসা কোনো সময়েই সহজ নয়। আমি জন্মাবধি গৃহবদ্ধ জীব — কখন একা কোথাও যাই নি — তারপর প্রথম যখন চাকরি নিয়ে মাস ছয়েক বাইরে থাকতে হয় তখনকার কথা মনে পড়ছে। বাড়ির জন্য মন-কেমন বাদ দিলেও ছোটখাট অসুবিধা বাইরে থাকলে প্রবল হয়ে ওঠে। তবে তুমি পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে — আমার বিশ্বাস। শরীর যাতে সুস্থ থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে। বাড়িতে থাকর সময় সামান্য অসুখবিসুখ সহজেই অগ্রাহ্য করা যায় — কিন্তু বিদেশে অসুস্থ হলে শুধু নিজের দুর্ভোগ নয়, আত্মীয় স্বজনকেও দুশ্চিন্তিত হতে হয়।
মাঝে মাঝে চিঠিতে তমার খবর দিয়ো। আমার শরীর প্রায়ই অসুস্থ থাকে কর্মব্যস্ততা তো আছেই। কাজেই আমি চিঠি না দিলেও তুমি লিখো।
স্নেহার্শীবাদ জেন।
শুভাকাঙ্ক্ষী
অলোক রায়
কিন্তু এলাহাবাদে বেশিদিন মন টিকলো না। মাস ছয়েক পর ফিরে এলাম। কলকাতায় এসে একটা অডিট ফার্মে কাজ করতাম আর স্বাধীন সাংবাদিকতা। অডিটফার্মের কাজের সুবিধার্থে স্যারের কাছ থেকে ক্যালকুলেটরটা চেয়ে নিয়ে এসেছিলাম। সেই সময় স্যারের বাড়িতে যাওয়ার গ্যাপটা একটু বেড়ে গেছিল। তবে চিঠিপত্র থেমে থাকে নি। তা একদিন স্যার আমাকে চিঠি দিলেন—
Flat 102, DB31, Sector-1
Bidhannagar, Calcutta-64
১৭ মে ১৯৮৬
প্রীতিভাজনেষু,
অনেকদিন তোমার সঙ্গে দেখা নেই। এর মধ্যে দুটো খবর —
বুড়ো বয়সে বিয়ে করেছি,
সল্টলেকের ফ্ল্যাটে স্থানান্তরিত হয়েছি।
তোমার কি খবর জানি না। আমি এবছর আবার ট্যাবুলেশনের কাজ সুরু করেছি। ক্যালকুলেটরটি তোমার দরকার না থাকলে দিয়ে যেয়ো। অবশ্য তানাহলেও আসতে পারো। রাত্রির দিকে এলে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
আশাকরি তোমার সর্বাঙ্গীন কুশল। তুমি আমার স্নেহাশীর্বাদ জেন।
শুভাকাঙ্ক্ষী
অলোক রায়
সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার স্যারের ছাত্র। আমার সিনিয়র। আমি সমরেশদা একই গুরুর শিষ্য—সতীর্থ। অলোকবাবু চলে যাবার পর সমরেশদা কোথায় যেন লিখেছিলেন, আমার ফোন থেকে আর একজনের নম্বরটা এবার বাদ দেওয়ার সময় হয়েছে। তিনি হচ্ছেন আমার পরম পূজ্য মাস্টারমশাই ড. অলোক রায়। হয়তো সমরেশদা তাঁর ফোন বুক থেকে স্যারের নম্বরটা বাদ দিয়ে থাকতে পারেন। আমি এখনো দিইনি।
খুব ভালো লাগল
চমৎকার লেখা স্যার।
তবে আপনার ❝কাজলদিঘী❞ উপন্যাসটা মিস করি অনেক।