দুই.
পার্থ চট্টোপাধ্যায়, দীপেশ চক্রবর্তী, গৌতম ভদ্র এবং অন্যরা বিস্তৃত পরিসরে নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার পরিপ্রেক্ষিত বর্ণনা করেছেন। সত্তরের দশকজুড়ে ভারতবর্ষে মার্কসবাদী রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাস সংক্রান্ত বিভিন্ন বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজে’র শিকড় খুঁজে পাওয়া যায়। এ সময় একদিকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একদলের বক্তব্য ছিল— ১. ঔপনিবেশিক আমলের শেষ পর্বে পুঁজিবাদী উত্পাদন রীতির উদ্ভব অর্থাৎ কৃষি উত্পাদনে আমূল পরিবর্তন সূচনা হয়। অপরপক্ষের— ২. ব্রিটিশ শাসন আমলে কিছু এলাকায় সীমিতভাবে পরিবর্তন সত্ত্বেও ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলে আধা-সামন্ততান্ত্রিক কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থা বজায় ছিল। আবার ঐতিহাসিকরা উনিশ শতকের নবজাগরণ নিয়ে মৌলিক কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেন। পরবর্তী সময় সাব-অল্টার্ন গোষ্ঠীর উদ্যোক্তা রণজিত্ গুহ এবং তাঁর সঙ্গে সুমিত সরকার ও অশোক সেন এই ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রধান ছিলেন। তাঁরা রামমোহন, বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষীর বিভিন্ন সংস্কার কার্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কারণ এসব মনীষী ঔপনিবেশিক ভারতের ক্ষমতা বিন্যাস নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তুলে সেই ক্ষমতাবিন্যাসের কাঠামোকে অবলম্বন করেই সামাজিক প্রগতির কথা বলেছেন। তাঁদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া অনিবার্য। ভারতের বামপন্থী রাজনীতির আরেকটি বিতর্ক ছিল ১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ী কৃষক সংগ্রাম ও আন্দোলন নিয়ে। ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষ হলেও তার প্রভাব অনেক দিন ধরে সমাজ, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে লক্ষ করা যায় এবং অনেক দিন ‘নকশাল আন্দোলন’ নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকে। এই আন্দোলন ‘স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতাবিন্যাসের প্রশ্নটি জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে এমনই নাটকীয়ভাবে উপস্থিত করতে পেরেছিল যে সেই প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করা ছিল অসম্ভব।’ ভারতের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ইতিহাস নিয়ে এই সব অসম্পূর্ণ বিতর্কের পটভূমিতে ওই ক্ষমতাবিন্যাসের প্রশ্নটিকে নতুনভাবে তুলে ধরলেন সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠী। এই পরিপ্রেক্ষিতের সূত্র ধরে ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ গোষ্ঠীর ইতিহাস সম্পর্কে গৌতম ভদ্রের বক্তব্য হলো — কোনো আদিকল্পের বিবর্তনে অর্থাৎ ভারতের সত্তরের দশকে কৃষক বিদ্রোহ, সিপিআইএমএল, নকশাল আন্দোলন ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা নিয়ে অনেকেই নতুন করে ভেবেছেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে কলকাতার একদল তরুণ গবেষক, যার মধ্যে অজিত চৌধুরী ছিলেন, তাছাড়া সুমেন্দু দাশগুপ্ত, পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং গৌতম ভদ্র ছিলেন — এঁরা সবাই মিলে একটা পত্রিকা বের করেন, তার নাম ‘অন্যঅর্থ’। ‘অন্যঅর্থ’-এর একটা সংকলনও গত ৪-৫ বছর আগে বের হয়েছে। পুরো ‘অন্যঅর্থ’ ছাপা হয়েছে। তখন তাঁরা সকলে তরুণ গবেষক। গৌতম ভদ্র তখন ইউজিসি ফেলো। তাতে তিনি ‘মুঘল যুগের কৃষি অর্থনীতি ও কৃষক বিদ্রোহ’-এর প্রথম খসড়াটা দেন। বন্যা নিয়ে, পানি নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। অজিত চৌধুরী বুর্জোয়াজি অর্থনীতির একটা ধারাবাহিক সমালোচনা করেন। পার্থ চট্টোপাধ্যায় বুর্জোয়াজি পলিটিক্সের পলিটিক্যাল থিয়োরির একটা লেখা দেন। এগুলো প্রাথমিক কাজ; অন্য ধাঁচের একটা গবেষণার কাজ। এছাড়া ‘অন্যঅর্থে’র সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতপন্থী কিছু লোকও যুক্ত ছিলেন। তবে ‘অন্যঅর্থে’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো হিতেশরঞ্জন সান্যালের। তিনি অকালে প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর ‘স্বরাজের পথে’ একটি অসাধারণ বই। যেখানে গ্রাম-গঞ্জের মানুষরা স্বরাজ বলতে কী বুঝেছিল তার প্রাথমিক বিবরণ পাওয়া যায়, যা আজও অতুলনীয়। সে বইটারও ধারাবাহিক কিছু অংশ ‘অন্যঅর্থে’ প্রকাশিত হয়। কাজ এভাবে শুরু হয়। ইতোমধ্যে কিছু তরুণ গবেষক যারা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাদের অনেকেই বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে যান। অন্যদিকে পঁচিশ বছর বাদে গান্ধীর ওপর কাজ করতে ভারতে আসেন রণজিৎ গুহ এবং ঐ তরুণ গবেষকরা ব্রিটিশ প্রয়োগবাদী ইতিহাসের ধারণাতে বিশেষ বিরক্ত হন। রণজিত্ গুহ তখন ইংল্যান্ডে। তাঁর পুরনো লেখার অনেকেই ভক্ত ছিলেন। তারা গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করেন। তিনি তাঁদের সাথে আলোচনায় বসেন। বিদেশে থাকলেও রণজিত্ গুহ দেশজ ভাষায় কী ধরনের লেখা হচ্ছে তার খবর রাখতেন। ‘অন্যঅর্থ’ প্রসঙ্গে তাঁর আগ্রহ ছিল। ইতোমধ্যে ফ্রন্টিয়ারে তাঁর দুটো খুব বিখ্যাত লেখা বের হয়। ‘On structure, on culture’, `Neel-Darpon:The image of a Peasant Revolt in a Liberal Mirrow’।
রণজিৎ গুহ ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ পরিকল্পনা নিয়ে ভারতে আসেন। পার্থ চট্টোপাধ্যায়, দীপেশ চক্রবর্তী, গৌতম ভদ্রের সাথে কথা বলেন। দেশজ অনুসন্ধান আর বিদেশি গবেষণা — এ দুটো মিলিয়ে নিম্নবর্গের ইতিহাসের ধারা। লক্ষণীয়, তখন যাঁরা এতে আসেন তখন একমাত্র পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও ডেভিড আর্নল্ড ছাড়া আর কারো প্রায় ডক্টরেট ডিগ্রি হয়নি। রণজিত্ গুহ ও তাঁদের পার্থক্য তিনটি প্রজন্মের। রণজিত্ গুহ তিনটি প্রজন্মকে ডিঙিয়ে তরুণ গবেষকদের নিয়ে ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ প্রকল্প তৈরি করেন। পরে কিছুদিনের জন্য সুমিত সরকার যোগ দেন। এই হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ের সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ তৈরি হবার আলোচনা।
উল্লেখ্য, প্রথম থেকেই এ গোষ্ঠীর তাত্ত্বিকের সংখ্যা কম। Vivek Chibber ২০১২ সালে ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজে’র আদিপর্ব এবং তার গবেষণার মূল প্রকল্প নিয়ে আক্রমণ করে একটা বই লেখেন। তাতে তিনি মূলত যে তিনজনকে অধ্যায় ধরে ধরে আক্রমণ করেছেন তারা হলেন রণজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও দীপেশ চক্রবর্তী। গৌতম ভদ্র, শাহিদ আমিনের নামোল্লেখ মাত্র সেখানে নেই। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক মাঝে মাঝে উল্লেখিত হয়েছেন। সুতরাং মূল তত্ত্ব প্রসঙ্গে তাঁরা সবাই সচেতন, তবে তত্ত্বীয় কাঠামোর দিক থেকে রণজিত্ গুহ, পার্থ, দীপেশ, গায়ত্রীর অবদান সবচেয়ে বেশি। সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ আর এখন নেই। প্রত্যেক লেখকের নিজস্ব আলাদা বক্তব্য আছে। যেমন পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিককালে যে তত্ত্বটা খুব আলোচিত সেটি হলো — ‘সিভিল সোসাইটি’ ও ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’। কী করে যারা গণতন্ত্রে নিধিরাম, যাদের নামে গণতান্ত্রিক অধিকার আছে কিন্তু আসলে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রকরণগুলো যাদের অধিকারে নেই; তারা এই সিভিল সোসাইটি বা পৌর সমাজের বাইরে গিয়ে ক্ষমতার কী কী ব্যবহার করতে পারে। দলিত রাজনীতি ও নারীবাদী রাজনীতি যেটা পুরোপুরি সিভিল সোসাইটির প্রকরণ মানে না, আবার সিভিল সোসাইটির প্রকরণকে তাদের মতো করে ব্যবহার করে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে— এ সম্পর্কে নতুন চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে। এটা কিন্তু পুরোপুরি কৃষক বিদ্রোহ বা শ্রমিক বিদ্রোহ নয়। অবস্থার হঠাৎ হঠাৎ গণবিক্ষোভ। সেগুলোকে পার্থ চট্টোপাধ্যায় ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’ নাম দিয়েছেন তাঁর The Black Hole of Empire: History of a Global Practice of Power, The Politics of the Governed: Reflections on Popular Politics in most of the world political society প্রভৃতি বিখ্যাত বইয়ের মধ্য দিয়ে। দীপেশ চক্রবর্তীর সম্প্রতি বাংলা বই যেটা বহুল প্রচারিত ‘ইতিহাসের জনজীবন ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ পাঠ করলে দেখতে পাওয়া যায়, তিনি কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের ইতিহাস লিখছেন। পপুলার ইতিহাস, পিপল হিস্টোরি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করছেন এবং এনভায়রনমেন্ট হিস্টোরি, গ্লোবাল হিস্টোরির পরিপ্রেক্ষিতে বড় সময়, ছোট সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন এবং আরেকটা বিশেষ আলোচনা হচ্ছে সাব-অল্টার্ন কালচার- নিম্নবর্গের সংস্কৃতির সঙ্গে গ্লোকায়নের পরিপ্রেক্ষিতে mass কালচার ও জনপ্রিয় কালচারের সম্পর্ক। কালচারাল স্টাডিজ সাব-অল্টার্ন কালচারের একটা বড় অংশ। এছাড়া গণতন্ত্রের চরিত্র, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নানা দিকও সাব-অল্টার্ন স্টাডিজে এসেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে নতুন কাজ হচ্ছে।
আগে যে রকম সাব-অল্টার্ন কালচার মূলত ছাপা টেক্সটের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, এখন নতুন নতুন গবেষকরা ভিজ্যুয়াল টেক্সট, প্রচ্ছদ, অলংকরণ, ক্যালেন্ডার — এসব নিয়ে আলোচনা করছেন। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্ক কী? পারস্পরিক সম্পর্ক কী? প্রতিবাদের-প্রতিরোধের — এইগুলো আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে এ গোষ্ঠীর তত্ত্বের আলোকে সাহিত্য বিশ্লেষণের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা মনে করি সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভাষা চরম গুরুত্বপূর্ণ — যিনি লিখছেন তাঁরও ভাষা, যে বিষয় লেখা হচ্ছে তারও ভাষা। ভর্তৃহরি, পাণিনি, শিবাজি, সোসুর বারংবার মূল ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজে’র লেখকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ভাষা প্রসঙ্গে কেবল গায়ত্রী স্পিভাক নন, অনেকেই অত্যন্ত সচেতন। ভাষার নানা রূপ নিয়ে ভাবা দরকার। শব্দের অর্থ নিয়ে। প্রত্যেকটা শব্দের পেছনে অনেক সামাজিক বিনিয়োগ থাকে। সেটা মুক্তবুদ্ধিও হতে পারে, যুক্তিও হতে পারে আবার মৌলবাদও হতে পারে। মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই বলাটাই যথেষ্ট নয়। মৌলবাদ শব্দটা কী? মৌলবাদের প্রকৃতি কী? মৌলবাদ কি ধর্মীয়? সেকুলার জাতীয়তাবাদেরও মধ্যে মৌলবাদ থাকতে পারে। ভারতীয় সেকুলার জাতীয়তাবাদে যেমন আছে। কমিউনিস্ট মৌলবাদরাও কী নৃশংস হতে পারে আমরা তা দেখেছি। যুক্তিতেও একটা মৌলবাদ থাকতে পারে। এগুলো অভিজ্ঞতায় আমরা বুঝেছি। আর এগুলো নিয়ে গত ২-৩ বছর কাগজে, পত্রপত্রিকায় সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের ঐতিহাসিকদের লিখতে হয়েছে। আশীষ নন্দী তাঁর রচনায় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। সেখানে অনেক তরুণ যাঁরা সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের বন্ধুস্থানীয় তাঁরা নতুন প্রশ্ন তুলেছেন। তাই শব্দ, তার দৈনন্দিন ব্যবহার, দৈনন্দিন ব্যবহার থেকে নতুন অর্থে উত্তরণ এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে আমরা নিজেরাই নিজেদের শব্দের জালে বন্দি করে ফেলব। শব্দের জীর্ণতায় দাসত্ব করব। তত্ত্বগতভাবে এটাই আমাদের মেনে চলতে হবে। (চলবে)