দুই.
‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ ছিল একটা প্রকল্প। তার ১৩টি ভল্যুম বেরিয়েছে, তাতে কিছু ঐতিহাসিক তাদের গবেষণার ফল লিখেছেন। সেই ভল্যুম এখন বন্ধ। কাজ গুটিয়ে গেছে। সাব-অল্টার্নিজম বা নিম্নবর্গীয়ত্ব একটা ধারণা। আগেই বলা হয়েছে নিম্নবর্গ বলতে শ্রেণী বা গোষ্ঠী বোঝায় না। নিম্নবর্গ একটা সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের নানা রূপ থাকে। গৌতম ভদ্রের মতে, সেই রূপ আজকে তিনটি আন্দোলনে তিন প্রকারে আসতে পারে। তিনটে আধুনিক আন্দোলন নিম্নবর্গের ইতিহাসের তত্ত্বকে, ক্ষমতার সম্পর্কের সহজ-সরল সমীকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ ও অনেক বেশি জটিল করেছে।
প্রথমত পরিবেশবাদী বিতর্ক। পরিবেশবাদীরা ধনতন্ত্রবাদকে আক্রমণ করেছে, গোটা পরিবেশের প্রশ্নটি তুলে বিজ্ঞানের প্রগতির প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আজকের বিশ্বায়নের বিতর্ক, সাম্রাজ্যবাদী পরিবেশের প্রকল্প, বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশে তো বটেই, পাহাড়, স্থল মাইন ইত্যাদি নিয়ে বহুজাতিক সমস্যা, সরকারি-বেসরকারি লাভ-ক্ষতি, ম্যাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির লোভ, সমস্ত জনসত্তার অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
২০১৩ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের বিশাল বন্যা, ঝড়, সারা উত্তরাখণ্ডে Tourism Industry-র লাভ ইত্যাদি দিয়ে হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকাটা শারীরিকভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। আমরা জানি ব্রাজিলের আমাজনের বন কেটে ফেলার ফলে ব্রাজিলের জনগণ কিভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিল। এখন Human Species হিসেবে থাকাটা সংকটজনক। এখানে বৈজ্ঞানিকরা বলতে শুরু করেছেন আসলে সমস্যাটা অনেক বড়। তত্ত্বের সমস্যা ও সময়ের সমস্যা। যদি আমরা মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে বড়ভাবে দেখি পৃথিবীর বিবর্তনের সঙ্গে, প্রাণের জন্মের সঙ্গে, তাহলে দেখব Industrial Revolution-এর সময় থেকে Geologist-রা বলছে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। প্রগতি মানে প্রযুক্তির জয়। মানুষ প্রকৃতিকে জয় করবে আগুন থেকে তেল, জ্বালানি সমস্ত নিয়ে। এ প্রযুক্তির জয় যেটা মার্কসবাদে আছে কমপ্লিট প্রডাক্টিভিটি ফোর্স। সারা প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে। প্রকৃতি ও মানুষকে ধ্বংস করছে। সেদিক থেকে শিল্পবিপ্লব প্রথম ধ্বংসের ঘণ্টা বাজিয়েছে। অন্যদিকে ইতিহাস থেকে আমরা জানি ক্যাপিটালিজমের বিজয়বার্তা হচ্ছে Industrial Revolution। আধুনিক মানুষের জন্মের পিছনে Industrial Revolution-এর বিখ্যাত ভূমিকা। ইতিহাসের চিন্তায় যেটা প্রগতির Geologist-এর চিন্তায় সেটা ধ্বংসের। Geologist-এর কালের টাইমের ধারণার সঙ্গে ইতিহাসের টাইমের সংঘর্ষ অনিবার্য। সাম্প্রতিককালে দীপেশ চক্রবর্তীর সাড়া জাগানো প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সাব-অল্টার্নিটির প্রশ্নটাই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। স্পষ্টত environment-এর সঙ্গে ছোট ছোট গোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অধিকার জড়িত। এখানে নিম্নবর্গের অস্তিত্ব আবার গোষ্ঠীর মধ্য দিয়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী বিতর্ক। অর্থাৎ জেন্ডার বা লিঙ্গ বা লৈঙ্গিক রাজনীতি বিতর্ক। এক্ষেত্রে সমকামী, উভকামীরাও এগিয়ে এসেছে। সেখানে সাব-অল্টার্নিটির ভূমিকা কী? এটাও ঠিক Patriarchal নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে পুরুষতন্ত্র দিয়ে। আবার এটাও তো ঠিক পুরুষতন্ত্রের পুরুষ যতটা নিষ্পেষণ করে নিজেও ততটাই নিষ্পেষিত হয়। পুরুষতন্ত্রের অত্যাচারী পুরুষ নিজেও তো মুক্ত মানুষ নয়। নারীর মুক্তি তো কখনোই সম্ভব নয়, যদি পুরুষের মুক্তি না হয়। ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রকৃতি লৈঙ্গিক রাজনীতির লড়াইয়ের প্রকৃতি সমশর্তে প্রকৃতস্থ নয়। সেখানে সাব-অল্টার্নিটির ভূমিকা কী, সেটাই ভাবার প্রশ্ন।
তৃতীয়ত, ভারত-বাংলাদেশের অনেক দলিত তাদের কথা লেখার ভাষায় বলছে। আশীষ নন্দীর কাজ লক্ষ করলে তার প্রমাণ মেলে। দলিতদের রাজনীতি আজকে খুবই বিতর্কিত। দলিতদের রাজনীতি কি দুর্নীতিগ্রস্ত? দলিতদের গোষ্ঠী হিসেবে উত্থান, দলিতদের চেতনার স্বরূপ কী? তারা হঠাৎ ব্রাহ্মণদের লেখা পড়বে কেন? আজ ভারতজুড়ে দলিতদের দাবি— বাংলা হঠাও, হিন্দি হঠাও, ইংরেজি আনো। এই যে আঞ্চলিক ভাষায় লেখাপড়া, এতে দলিতদের আগ্রহ নেই। তাদের মতে এটা উচ্চবর্গের একটা চাল। নিজেরা অর্থাৎ উচ্চবর্গের সন্তানেরা ইংরেজি শিখবে এবং দলিতদের আঞ্চলিক ক্ষমতায় ফেলে রাখবে। আজকে সর্বভারতীয় স্থান পেতে হলে অম্বেদকারের মতো ইংরেজি শিখতে হবে। দলিত গ্রামে ইংরেজি দেবীর পূজা শুরু হয়েছে। সারা ভারতে দলিতকে এক্কাট্টা হতে গেলে ইংরেজি ভাষা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। এখানে ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজে’র ভূমিকা কী? ভাষার সঙ্গে সাব-অল্টার্নিটির ক্ষমতার সম্পর্কটাই নতুনভাবে উন্মোচন করা হয়েছে। এসব জায়গায় নিশ্চয় নতুন করে ভাবার, লড়াই করার, যাচাই করার দরকার।
তিন.
মূলত, সাম্রাজ্যবাদী আর জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের বিরোধিতার পথ ধরেই নিম্নবর্গের ইতিহাসের অগ্রযাত্রা। উচ্চবর্গ থেকে নিম্নবর্গের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আর পদ্ধতির স্বাতন্ত্র্য এবং নিম্নবর্গের চেতনার নিজস্বতা অন্বেষণই সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের প্রাথমিক কাজ ছিল। এছাড়া এ গোষ্ঠী নিম্নবর্গের ইতিহাস নির্মাণে নিুোক্ত কাজ করেছে—
ক. ঔপনিবেশিক ভারতের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা এবং আধুনিক সমাজ প্রতিষ্ঠান গড়ার জটিল ইতিহাসের দলিলসমূহ অন্যদৃষ্টিতে পাঠ।
খ. ব্রিটিশ শাসনযন্ত্রের প্রসার, ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার, নবজাগরণের উদ্ভব, সর্বোপরি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ প্রভৃতির ইতিহাস অন্বেষণ ও পুনর্বিবেচনা।
গ. কেবল নিম্নবর্গের স্বতন্ত্র ক্রিয়াকলাপের বিবরণে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র সমাজ প্রতিষ্ঠান, ভাবাদর্শের জগেকই নিম্নবর্গের দৃষ্টিতে দেখা। ঔপনিবেশিক আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রে ও স্বাধীন ভারতে যেসব প্রতিষ্ঠান নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান সঞ্চারিত করতে সচেষ্ট হয়েছিল সেসব প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে স্কুল-কলেজ, সংবাদপত্র, প্রকাশনা সংস্থা, হাসপাতাল ডাক্তার, চিকিত্সাব্যবস্থা, জনসংখ্যাগণনা, রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্স, আধুনিক শিল্প উত্পাদনে দৈনন্দিন শ্রম সংগঠন, বিজ্ঞান সংস্থা, গবেষণাগার প্রভৃতির বিশদ ইতিহাস অন্বেষণ।
ঘ. প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সামাজিক রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ক্রিয়াকলাপ বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করা। অর্থাৎ যেকোনো প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠায় অভিলাষী ক্ষমতাতন্ত্রের সমালোচনা এ গোষ্ঠীর আলোচনায় সম্ভব হলো।
ঙ. প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদ ও বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীদের পারস্পরিক বিতর্কে নিম্নবর্গের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ প্রযুক্ত।
চ. আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গীভূত এবং রাষ্ট্রক্ষমতা বিস্তারের কৌশলে সেক্যুলার/ কমিউনাল বিবাদ/ বিতর্ক এবং শোষিত, দরিদ্র হলেই সামপ্রদায়িকতাবিরোধী ও সেক্যুলার রাজনীতির সমর্থক হবে — এ ধারণার ভুল ভেঙে দিয়ে আলোচনা।
ছ. জাতিভেদপ্রথা বিশ্লেষণে এ গোষ্ঠী দেখিয়েছে কিভাবে ধর্মীয় ভিত্তি লুপ্ত হয়ে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর অবস্থান গুরুত্ব পাচ্ছে। নিম্নবর্গ সামাজিক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্নভাবে এই ক্ষমতাতন্ত্রের একদিকে বিরোধিতা করছে অন্যদিকে আবার সুযোগ নিচ্ছে। উচ্চবর্গের আধিপত্য বিস্তারের কৌশল এই জাতিগত পরিচয়ে নিহিত।
জ. পুরুষ চালিত সমাজে নারী নিম্নবর্গ। এ সমাজে নারীর অধীনতা বা ক্ষমতার সম্পর্কের ভিত্তিতে নারীর নির্মাণ এবং নিম্নবর্গের নারীর অধীনতাকে পৃথক করে চিহ্নিতকরণ।
ঞ. ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিংশ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চর্চিত উচ্চবর্গের রাজনীতির বিরোধিতা করা।
বস্তুত ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ গোষ্ঠীর লেখকরা নিম্নবর্গের নিজস্ব ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। ইতিহাস অবশ্য ব্যক্তিগত কারো নয়। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইতিহাসও হয় না, এ জন্য নিম্নবর্গের ইতিহাস অসম্পূর্ণ, পরিবর্তনশীল। তবে এই ইতিহাস ‘অবদ্ধ ও সচল’। নিম্নবর্গের সংগ্রামের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার জন্য এখনো এ ইতিহাসচর্চা চলছে। প্রকৃত ইতিহাস উচ্চ/নিম্নবর্গের মিলিত জীবন ও সংগ্রাম; একে অপরের সম্পর্কে নির্মিত হয়। এ কারণে রণজিত্ গুহ উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গের রাজনীতির বেণিবন্ধনের কথা বলেছেন — ‘…ঔপনিবেশিক যুগের রাজনীতির ক্ষেত্রটি দ্বিধাবিভক্ত। কিংবা অন্য উপমায় বলা যায় যে, উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের চৈতন্য ও কর্মের বাহন দুটি স্বতন্ত্র ধারা বয়ে চলেছে ওই রাজনীতির মধ্যে। তবে সেই সঙ্গে এ কথাও বেশ জোর দিয়েই বলা দরকার যে স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও ওই ধারা দুটি পরস্পর নিরপেক্ষ নয়। নিরপেক্ষ নয় তাদের বৈপরীত্যের জন্যেই। বিপরীত বলেই যেকোনো দ্ব্যণুক সম্বন্ধের রাশি দুটির মতো তাদের একটি অপরটির অস্তিত্ব সূচনা করে, ঘোষণা করে।’ উচ্চবর্গের উদ্যোগ থেকে নিম্নবর্গের উদ্যোগ স্বতন্ত্র, মতাদর্শের বাইরে তার কর্মকাণ্ড। অথচ এই উভয় বর্গ একত্রিত সমাবেশে মিলতে চেয়েছে। উচ্চবর্গের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের উপলক্ষে বিরাট সমাবেশে হাতিয়ার হিসেবে নিম্নবর্গ কাজ করেছে। কিন্তু নেতাদের আপসের মনোবৃত্তি, প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা, জঙ্গি গণ-আন্দোলন ভীতি এবং সর্বোপরি নিম্নবর্গের চৈতন্যের নানা সীমাবদ্ধতা এই সম্মিলিত আন্দোলনকে স্থায়ী হতে দেয়নি। আন্দোলনে স্থবিরতা আসলে বেণিবন্ধ শিথিল হয়ে পড়েছে। ফলে আবার রাজনীতির স্বতন্ত্র ধারা অব্যাহত থেকেছে। এ জন্যই উচ্চবর্গ ইতিহাসকাঠামো থেকে বের হয়ে আসার প্রস্তাব দেয় ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’। উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গের মধ্যেকার বৈপরীত্য ও সম্পৃক্তি যথাযথভাবে বর্ণনা করতে হবে এবং একারণেই ইতিহাসে নিম্নবর্গের ভূমিকাকে যথার্থ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে বলেন এ গোষ্ঠীর লেখকরা। আর এখানেই ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ গোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য; বিশ্ব জ্ঞানকাণ্ডের একটি বিশিষ্ট সংযোজনাও।
সহায়ক গ্রন্থ. :
গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় (সম্পাদক), নিম্নবর্গের ইতিহাস, কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. ১৯৯৯
মিল্টন বিশ্বাস, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে নিম্নবর্গের মানুষ, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, ২০০৯
Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks (1971), edited and trans. : Quintin Hoare
Geoffrey Nowel Smith, India, Orient Longman, 1996
Ranajit Guha, Subaltern Studies (I-VI), Delhi, Oxford University Press, 1982-1989
প্রথম প্রকাশ বাংলা লাইব্রেরী রিসার্চ অর্গানাইজেশন, আগস্ট ২০১৪
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-writermiltonbiswas@gmail.com
খুব ভাল লাগল। আমার আন্তরিক নমস্কার গ্রহণ করবেন