| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ অতীত-বর্তমান (প্রথম পর্ব) : মিল্টন বিশ্বাস

Reporter
ড. মিল্টন বিশ্বাস / ৯৮১ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৩

সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠীর ইতিহাস গবেষণার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। ২০১২ সালে এ গোষ্ঠীর প্রকাশনা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ আর বের হবে না। তিন দশক ধরে কাজ করার পর এ গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেওয়া উচিত মনে করেছেন প্রধান তাত্ত্বিকরা। প্রত্যেকে এখন তাঁদের নিজের মতো করে কাজ করছেন। নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চায় সাহিত্য, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, ধর্ম, বর্ণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ নিম্নবর্গের ইতিহাস কোনো একক অথবা পৃথক জ্ঞানকাণ্ড নয়। বিশ্বব্যাপী এ জ্ঞানকাণ্ডের প্রভাব এখনো বহাল। ল্যাটিন আমেরিকাতে সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। সেখানে সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত। জাপানেও বেশ কিছু আলোচনা হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় বেশিরভাগ গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়াতে এ গোষ্ঠীর লেখকদের নাম প্রায়ই উচ্চারিত হয়ে থাকে। মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসতত্ত্ব বিশ্বজয় করেছে ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার এই গবেষণা-প্রকাশনার ইতিহাস বলার আগে এ গোষ্ঠী কর্তৃক ব্যবহূত ‘সাব-অল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গ শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে।

এক.

‘সাব-অল্টার্ন’ শব্দের বাংলা পরিভাষা ‘নিম্নবর্গ’। এটি একটি সাপেক্ষ শব্দ। একে আলাদা করে খোঁজার চেয়ে উচ্চবর্গের সঙ্গে তার সম্পর্কের সূত্রে খোঁজা দরকার। এই সম্পর্ক ক্ষমতার সম্পর্ক। আর এই ক্ষমতার সম্পর্কের জন্য ‘পদমর্যাদার ক্রমোচ্চবিন্যাসে পার্থক্যের স্তর পরম্পরায় সমাজের একেবারে পাদদেশে অবস্থান করেও প্রত্যেক নিম্নবর্গ তার চেয়ে নিচুস্তরের যে কারো তুলনায় উচ্চবর্গ।’ এ গোষ্ঠীর অন্যতম লেখক ডেভিড আর্নল্ড এর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন ‘এলিট শ্রেণীর জমিদারের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রে ধনী কৃষক নিম্নবর্গ আবার আধিপত্যের দিক থেকে এই ধনী কৃষক গ্রামীণ দরিদ্র ভূমিহীন মজুর, কারিগর ও অন্ত্যজ শ্রেণীর তুলনায় উচ্চবর্গ।’ এ কারণে এটি একটি অবিরাম প্রক্রিয়ার প্রত্যয়। যেকোনো সমাজে আধিপত্য ও অধীনতার স্বরূপ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে নিম্নবর্গকে চিহ্নিত করা সম্ভব।

Subaltern Studies গোষ্ঠীর প্রধান উদ্যোক্তা রণজিত্ গুহ সর্বপ্রথম ‘নিম্নবর্গ’ শব্দটি ইংরেজি Subaltern শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বাংলা ভাষায় গ্রহণ করেন। নব্বইয়ের দশকব্যাপী তাঁর সম্পাদিত ছয় খণ্ড Subaltern Studies (1982-1989) সিরিজ প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানজগতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। Subaltern Studies প্রথম খণ্ডের Preface-এ তিনি বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নবর্গ বিষয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও তথ্যবহুল আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তিনি নিম্নবর্গের অর্থ নির্ণয়ে Concise Oxford Dictionary-এর আশ্রয় নিয়েছেন : The word ‘Subaltern’ in the title stands for the meaning as given in the Concise Oxford Dictionary, that is, ‘of inferior rank’. It will be used in these pages as a name for the general attribute of subordination in South Asian Society whether this is expressed in terms of class, caste, age, gender and office or in any other way. তবে সাব-অল্টার্ন বা নিম্নবর্গ ধারণাটি সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠীর লেখকরা আন্তোনিও গ্রামশির Selections from the Prison Notebooks গ্রন্থ থেকে পেয়েছেন। এ গ্রন্থে ইতালীয় ‘সুবলতের্নো’ শব্দটির ইংরেজি করা হয় ‘সাব-অল্টার্ন’। ইংরেজি ভাষায় এ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ক্যাপ্টেনের অধস্তন কর্মকর্তা। সাব-অল্টার্নের সমার্থক শব্দ ‘সাবর্ডিনেট’। মুসোলিনির কারাগারে বন্দি নব্য মার্কসবাদী (প্রাক্সিসের দর্শন) গ্রামশির রচনায় শব্দটির নতুন তাত্পর্য অভিব্যক্ত হয়েছে। গ্রামশির রচনার ইঙ্গিতসমূহ অনুসরণ করেই ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’-এর তাত্ত্বিকরা ‘নিম্নবর্গ’ ধারণাটি গ্রহণ করেছেন। আন্তোনিও গ্রামশির প্রিজন নোটবুকসের Notes on Italian History অধ্যায়ের History of the subaltern classes : Methodological criteria অংশে বর্ণিত ছয়টি দিকনির্দেশে নিম্নবর্গ শ্রেণীর জীবনযাত্রা, আচার-আচরণ, ভাবাদর্শ গভীরভাবে পাঠ করার যে প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে সংলগ্নতার কথা বলেছেন রণজিৎ গুহ। অর্থাৎ গ্রামশি এই তত্ত্বের ভ্রূণ।

শ্রেণী, জাতি-বর্ণ, সম্প্রদায়, বয়স, লিঙ্গ অথবা কর্মস্থল যেখানে বর্তমান থাকুক না কেন, দক্ষিণ এশীয় সমাজব্যবস্থায় অধীনতার সাধারণ রূপগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছেন সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ ঘরানার লেখকরা। অধীনতার জটিল শাখা-প্রশাখাগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকার কারণে সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠী সাব-অল্টার্নিটির দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজনীতি আর অগ্রন্থিত আচরণ, আদর্শ ও বিশ্বাসের পরিচয় যে সংস্কৃতি ধারণ করে তার সামগ্রিক রূপটি তুলে ধরেছেন গবেষণায়। নিম্নবর্গতার ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি এবং একই সঙ্গে তার আচার-আচরণ, ভাবনাচিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুই এককথায় সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত। এঁদের রচনায় কেবল ঔপনিবেশিক ভারত নয়, ঔপনিবেশিক-উত্তর অনুষঙ্গও আলোচিত হয়েছে। এ গোষ্ঠী ঔপনিবেশিক ভারতের বৃহত্তর গ্রামীণ রূপান্তরের ওপর বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন। গুরুত্ব দিয়েছেন সামাজিক অধীনতাকে। প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বিকল্প ইতিহাস অন্বেষণে গ্রামীণ নিচুশ্রেণীর স্বর এবং ঔপনিবেশিক কালে সংঘটিত তৃণমূল কৃষকশ্রেণীর প্রতিরোধ-উদ্যোগ সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করতে চেয়েছেন এ গোষ্ঠী। ঔপনিবেশিক কালে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষকদের রাজনৈতিক চেতনাহীনতা বা নিষ্ক্রিয়তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বাতিল করে যথার্থ উত্তর-আধুনিক বা উত্তর-উপনিবেশ অনুচিন্তনে কৃষকের চেতনা, সক্রিয়তা ও ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছে। এ কারণে এ জ্ঞানকাণ্ডের নিম্নবর্গতার পদ্ধতিতে নিম্নবর্গের সংগুপ্ত বিশুদ্ধ নির্মিতি উদ্ঘাটন করার জন্য কৃষকের প্রতিবাদ প্রকাশকৌশল, এখন পর্যন্ত তার অধীনতার স্বরূপ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আলোচিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস প্রক্রিয়ার ভেতর কৃষকশ্রেণীকে পুনর্বহাল করেছেন এ গোষ্ঠীর লেখকরা। মূলত সাব-অল্টার্ন গোষ্ঠী ইতিহাসতত্ত্বের দিক থেকে ঔপনিবেশিক ভারতের কৃষক এবং কৃষক বিদ্রোহকে নিম্নদেশ থেকে (from below) যেমন দেখেছেন তেমনি ভেতর থেকে নতুন দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেছেন।

রণজিৎ গুহ অধীনতাকে বোঝার জন্য গ্রামশির মতোই বিপরীত যুগ্মপদ (আধিপত্য-অধীনতা) গ্রহণ করেছেন। কারণ নিম্নবর্গ সব সময় শাসকগোষ্ঠীর অধীন থাকে এমনকি বিদ্রোহ ও জেগে ওঠার মুহূর্তেও তারা শাসকবর্গের কর্মকাণ্ডের অধীন। তাঁর ব্যবহূত dominance ও subordination শব্দ দুটির অর্থ যথাক্রমে আধিপত্য ও অধীনতা। আধিপত্য মূলত এলিট বা উচ্চবর্গের প্রভুত্ব, প্রতাপ বা শাসনকে বোঝায় আর অধীনতা নিম্নবর্গের শাসিত হবার রূপটি উন্মোচিত করে। গ্রামশি প্রিজন নোটবুকসে একাধিক বার dominant classes, dominant groups, hegemony শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন। এরই বিপরীতে রয়েছে সাব-অল্টার্ন গোষ্ঠী। প্রভুত্ব, কর্তৃত্ব, শাসন বা প্রতাপের বিপরীতে অধীন, দলিত, শোষিত, নিপীড়িত এই দ্বিমাত্রিক অনুষঙ্গ বিজড়িত। ‘নিম্নবর্গ’ শব্দটা কার্যত বাইনারি বৈপরীত্যের আদলে গড়া। কেননা, আমাদের মননবিশ্বে বা ব্যক্তিক চেতনার সঙ্গে সঙ্গেই হাজির হয়ে বসে ‘উচ্চবর্গ’ চেতনাটা। সুতরাং ওই অবস্থানটা অবশ্যগ্রাহ্য মেনে নিয়েই ‘নিম্নবর্গ’ ক্লাস। সে সরকারি, বেসরকারি, বা সরকার মদতপুষ্টর দল হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। অর্থাৎ ঠিক বিপরীত অবস্থান। সুতরাং বাইনারি বৈপরীত্য বজায় থাকছেই। জীবনযাপনের অবস্থানগত লক্ষণ এবং হেজিমনির সাহায্যে অর্থাৎ প্রতাপ ও আধিপত্যের ফলে নিম্নবর্গ ডমিন্যান্ট-এর বিপরীত। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সকল অভিব্যক্তি উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গ এই বিপরীত যুগ্মপদ দিয়ে বোঝা সম্ভব। ‘ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সমাজে এমন কোনো অভিব্যক্তি নেই যা এই দ্ব্যণুক সম্বন্ধ দিয়ে বোঝা বা বোঝানো যায় না। জাত শ্রেণী সম্প্রদায় ও অন্যান্য সমূহের নানা অংশের মধ্যে, রাজাপ্রজা স্ত্রীপুরুষ জ্যেষ্ঠকনিষ্ঠ প্রভৃতির মধ্যে, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের সর্বত্র ক্ষমতাবৈষম্য সেই বৈপরীত্যের বিশেষ বিশেষ প্রকাশ। এবং তা যেমন সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে প্রকট, আঞ্চলিক ক্ষেত্রেও তেমনি।’

অর্থাৎ ‘সাব-অল্টার্ন’ বলতে আমরা বুঝি শ্রেণী, জাতিবর্ণ, পদমর্যাদা, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক ও পেশাগত অবস্থানের দিক থেকে প্রাধান্যভোগী জনগোষ্ঠীকে। নিম্নবর্গ শিক্ষায়, অর্থনৈতিকভাবে এবং সামাজিক মর্যাদায় অনগ্রসর, অনুন্নত। সর্বোপরি শারীরিক শ্রমে নিযুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীও নিম্নবর্গ। উচ্চবর্গের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক সূত্রে নিম্নবর্গ হচ্ছে প্রান্তিক, প্রাকৃতজন, উপেক্ষিত। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠী। ভারতবর্ষ কিংবা বাংলাভাষী ভূখণ্ডে তপশিলি জাতি (SC/Scheduled Castes), তপশিলি আদিবাসী (ST/Scheduled Tribes) এবং অন্যান্য হিন্দু ও অ-হিন্দু (OBC/Other Backward Class) শ্রেণী সামাজিক বা বর্ণগত, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে অনুন্নত কিংবা অনগ্রসর এবং সর্বোপরি উচ্চবর্গের অধীন হলে তাদের আমরা নিম্নবর্গ হিসেবে চিহ্নিত করব। ভারতবর্ষের সমাজে প্রাচীন কাল থেকেই অর্থনৈতিক শ্রেণী ছিল। সামাজিক সম্পদের উত্পাদন ও বণ্টন অনুযায়ী এই শ্রেণী হলো কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট। শ্রেণীর ধারণাটি অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। যথা, সামন্ত সমাজে ভূস্বামী ও ভূমিদাস, বুর্জোয়া সমাজে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত। অন্যদিকে ‘সাব-অল্টার্নে অর্থনীতির সঙ্গে ইতিহাস এবং সংস্কৃতির যোগাযোগের বিবেচনাটাও এসে যায়।’ অর্থাৎ অর্থনীতির ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট শ্রেণী বিভাজন নয়; নিম্নবর্গ-উচ্চবর্গ প্রত্যয় ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। যেমন ক্ষেতমজুর হিসেবে স্বামী-স্ত্রী একই শ্রেণী কিন্তু পরিবারে আধিপত্যের দিক থেকে স্বামী উচ্চবর্গের, স্ত্রী নিম্নবর্গের। এভাবে শিক্ষক-ছাত্র একই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত কিন্তু আধিপত্যের দিক থেকে শিক্ষক উচ্চবর্গ, ছাত্র নিম্নবর্গ। মূলত ব্যাপক অর্থে ক্ষমতার সম্পর্ক দিয়ে উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গ বিচার করতে হবে। আসলে ‘নিম্নবর্গ’ একটি সম্পর্কের নাম। ক্ষমতাবিন্যাসের নানা ধরন উচ্চ এবং নিম্ন উভয় বর্গকে নির্ধারণ করে। অবস্থান ভেদে বর্গের ধরনও পাল্টায়।

‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা বা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কথাই বলে না, রাষ্ট্রবহির্ভূত ক্ষমতার প্রসঙ্গ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার সার্বভৌমিক বা ব্যক্তিগত রূপের বাইরে যে ‘অদৃশ্য বিকীর্ণ’ অবয়ব সে সম্পর্কে বিশিষ্ট গবেষক ও নিম্নবর্গের ওপর বহু গ্রন্থের রচয়িতা গৌতম ভদ্রের মত, ‘কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাই একমাত্র ক্ষমতা নয়। কিন্তু ‘বিকীর্ণ ক্ষমতা’ প্রতিনিয়ত আমাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে জন্ম হচ্ছে। আমরা শুধু কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কথা বললে, আমরা শুধু তার স্ট্র্যাটেজির কথা ভাবি। তার সঙ্গে কিভাবে লড়াই করতে হবে। কিন্তু আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কে যে বিকীর্ণ ক্ষমতা তৈরি হয়, ছাত্র-শিক্ষক, বাড়িতে-রাস্তায়, সাধারণ-স্বাভাবিক আদান-প্রদানে, সেই ক্ষমতার আমরা কোনো তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। যার ফলে ক্ষমতার সম্পর্ক চলতেই থাকে…।’ গৌতম ভদ্রের এই কথার সঙ্গে মিশেল ফুকোর প্রতাপতত্ত্বের সাধর্ম্য আবিষ্কার করা যায়। সমাজের সর্বত্র ক্ষমতা ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ ‘ক্ষমতা সব জায়গা থেকে আসে, এবং সামাজিক বিন্যাসের মধ্য দিয়ে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতা স্থির নয়, সদাচঞ্চল, মুহূর্তে সে তৈরি হচ্ছে।’ যেখানে ক্ষমতা আছে সেখানেই প্রতিরোধ প্রয়োজন। সমাজে অবিরাম বলপ্রয়োগ চলছে। এ কারণেই ক্ষমতার বিস্তার সর্বত্র। ক্ষমতার সর্বত্র বিস্তারের জন্য প্রতিরোধও সবখানে হবে। তবে সেই প্রতিরোধ সংঘবদ্ধভাবে বলপ্রয়োগকে উত্পাটিত করবে না, বরং তা হবে ব্যক্তিক পর্যায়ে। সার্বিক প্রতিবাদের বদলে আপেক্ষিক প্রতিবাদের কথা বলেছেন ফুকো। পারিবারিক সম্পর্কে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানে, প্রশাসনে, শাসক ও শাসিত শ্রেণীর সম্বন্ধবিন্যাসে ক্ষমতার সক্রিয়তা লক্ষ করা যায় ফুকোর তত্ত্বে। অর্থাৎ ক্ষমতার দ্বারা গ্রস্ত হওয়া আবার অন্যের ওপর ক্ষমতা প্রসারিত করাও ব্যক্তির কাজ। মূলত ক্ষমতা ও প্রতিরোধের মিথস্ক্রিয়ার কথাই মিশেল ফুকো বলেছেন। সর্বত্র ছড়ানো প্রভুত্ব ও শোষণের ধারণা থেকেই নিম্নবর্গের তাত্ত্বিকরা উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গ সম্পর্ককে যাচাই করে দেখতে চান। প্রত্যেক মানুষ ক্ষমতা ব্যবহার করে, আবার একই সঙ্গে সে ক্ষমতার দ্বারা অধীন হয়। রাষ্ট্র নয়, সমাজের ভেতর ক্ষমতার এই পারস্পরিক আদান-প্রদান ও গতিবিধি নিম্নবর্গ প্রত্যয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ। ‘নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদেরা যা করেছেন তা হলো গ্রামশির কাছ থেকে নিয়েছেন নিম্নবর্গ ও আধিপত্যের ধারণা; আর ফুকোর কাছ থেকে নিয়েছেন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকৃত অবস্থান ও আপেক্ষিকতার প্রত্যয়।’ (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev