ছোটবেলায় যখনই আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করতো—‘বড় হয়ে কি হতে চাও’, তখন আমার বাঁধাধরা জবাব ছিলো—‘হয় ডাক্তার নয় পাইলট’।
জবাবটা যে খুব ভেবেচিন্তে দেওয়া তা নয়! আসলে সেই আমলে সব বাচ্চারাই এই একই উত্তর দিত— ছেলে হলে ডাক্তার বা পাইলট, আর মেয়ে হলে ইস্কুলের দিদিমণি।
ছেলেদের এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষার পিছনে কি কারণ ছিল সেটা আজ আর মনে নেই, তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে দিদিমণি হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে! দিদিমণি মানেই কড়া শাসন, তর্জন-গর্জন, চোখ পাকানো আর অবশ্যই চটাচট স্কেলের বাড়ি। ছোট থেকেই মেয়েদের মধ্যে শাসক হওয়ার স্বভাবজাত প্রবণতা থাকে, অতএব তারা যে বড় হয়ে ‘স্কুলের মিস’ হতে চাইবে তাতে আর আশ্চর্য কি?
এখন শুনেছি বটে ইস্কুলে নাকি বাচ্চাদের গায়ে হাত-ফাত আর তোলা যায় না, তবে আমাদের সময়ে সেসবের বালাই ছিল না। ইস্কুলে স্যার বা মিসের কাছে মার খেয়ে হয়তো হাতে কালশিটে নিয়ে ফিরলাম, তার উপরেই মা আবার ঘা কতক বসিয়ে দিল! কেন মার খেয়েছি জানতেই চাইলো না!
আমরাও দিব্যি মার খেয়েই দুটো নাকেমুখে গুঁজে খেলার মাঠে ছুটতাম। পিটুনি-ফিটুনি গায়েই মাখতাম না।
সবচেয়ে বড় শাস্তি ছিল খেতে না দেওয়া। সেটাও কোনো সমস্যা নয়! মা খেতে দেয়নি তো কি হয়েছে, আশপাশের বাড়ি তো আছে! যে কোনো একটায় সটান ঢুকে পড়লেই হলো, ঠিক খাওয়া দাওয়া জুটে যাবে।
তখনকার দিনে মানুষের আয় তুলনামূলক ভাবে অনেক কম ছিল, তার উপর এখনকার মত অত ‘রোজগেরে গিন্নীও’ ছিল না। বাড়ির পুরুষরাই ছিল সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। সে সব সংসারও ‘স্বামী স্ত্রী আর অ্যালসেশিয়ান’ টাইপের নয়, রীতিমতো আলিশান সংসার! বাপ-মা, দু-চারটে ছেলেপুলে, কোনো এক বিধবা পিসি, দাদু দিদিমা বেঁচে থাকলে তাঁরা, তার সঙ্গে গ্রামের আত্মীয়দের আনাগোনা তো লেগেই আছে! কেউ আসতো শহরে চিকিৎসা করাতে, কেউ হপ্তাখানেক থেকে মনুমেন্ট-জাদুঘর-চিড়িয়াখানা দেখতে, আবার কেউ বা এমনিই হঠাৎ করে একটা চালকুমড়ো, সের পাঁচেক চাল, একগাদা কলমিশাক আর একটা মাটির হাঁড়িতে গোটা দশেক কইমাছ নিয়ে হাজির হতো। ‘কই গো বৌমা, কোথায় গেলে, মাছটা একটু রেখে দাও তো মা। একদম জ্যান্ত কই এনিচি, বাচ্চারা খেয়ে মজা পাবে। শহরবাজারে তো আর জ্যান্ত মাছ খেতে পায় না! এসব মাছের সোয়াদই আলাদা!’
যিনি এসেছেন তিনি হয়তো রক্তের সম্পর্কের কোনও আত্মীয়ই নন, স্রেফ গ্রামতুতো খুড়ো…. কিন্তু তাতে কি? নিজের লোক তো রে বাবা!
এরকমই ছিল তখনকার এক একটা সংসার। কমসে কম আট দশজন মানুষ, অথচ রোজগেরে লোক একটাই! সেই রোজগারও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো মারকাটারি রোজগার নয়, বড়জোর ভদ্রস্থ একটা চাকরি। কিন্তু কোনও এক জাদুবলে কোনো বাড়িতেই কখনো খাওয়ার অভাব হতো না! যে কোনো সময় দু-তিনজন এক্সট্রা মানুষকে খাওয়ানোর মতো উদ্বৃত্ত আহার থাকতো। তবে দুঃখের কথা হচ্ছে বাড়ির মহিলারা খুব কম সময়ই টাটকা খাবার খাওয়ার সুযোগ পেতেন। দুপুরের বেঁচে থাকা খাবার রাত্তিরে খেতেন, আবার রাত্রে রাঁধা টাটকা ভাত-তরকারি বাসি হয়ে পরদিন দুপুরে তাঁদের উদরে সেঁধাতো। অবশ্য এই নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ ছিল না, কারণ ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে ঘরে ঘরে তখন এটাই ছিল প্রথা।
আমরা এরকমই একটা সময়ে বড় হয়েছি। তখন বাড়িতে বাড়িতে সিঁড়ির তলায় স্কুটি বা মোটরসাইকেল থাকতো না, থাকতো ঘুঁটে, কয়লা আর শুকনো কাঠের ডাঁই। সঙ্গে একটা হাতুড়ি, যে হাতুড়ি দিয়ে কয়লা ভেঙে যুৎসই সাইজের করা হতো। রান্নাবান্না হতো উনুনে, আর রান্নাঘরটাও থাকতো মূল ঘরগুলো থেকে একটু দূরে অথবা ঘরের শেষপ্রান্তে। পায়খানা বাথরুমের ব্যবস্থা উঠোনের ওপাশে। কেউ মূল বাড়ির লাগোয়া বাথরুমের কথা ভাবতেই পারতো না, অ্যাটাচড্ বাথ তো অনেক দূরের কথা! মা-ঠাকুমাদের জ্বালায় আমাদের মতো বাচ্চা ছেলেদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার যোগাড়।
‘অ্যাই হারামজাদা, আবার পেচ্ছাপ করে জল না দিয়ে চলে এসেছিস? গন্ধে টেঁকা যাচ্ছে না!’
যাকে বলা হলো সে মুখ কাঁচুমাচু করে বললো—‘আমি তো সেই কখন পেচ্ছাপ করেছি! একটু আগে মিনু ঢুকেছিল, ওকে বলো।’
ভবি ভোলবার নয়! মা হয়তো খুন্তি হাতে তেড়ে এসে বলবে—‘চোপ, আবার মুখে মুখে কথা! যা শিগগির জল দিয়ে আয়, যা বলছি!’
অগত্যা মুখ বেজার করে টিউকল টিপে জল ভরে বাথরুমে দিতে হতো।
শীতকালের রাতে বড় বাইরে পাওয়া মানে এক বিভীষিকা! ওই ঠান্ডাতেও সমস্ত জামাকাপড় ছেড়ে উদোম গায়ে স্রেফ একটা গামছা জড়িয়ে বাথরুমে যেতে হতো। কাজ শেষ করে হাতমুখ ধোওয়ার পর আবার সেই গামছাটা জলকাচা করে তবে রেহাই। বাচ্চা বলে কোনো ছাড়ছুড় ছিল না! তার উপর আমাদের বাড়ির পিছনেই দুটো তালগাছ ছিল, সেখানে একটা মামদো ভূত আর একটা শাঁকচুন্নি থাকতো। মাঝে মাঝেই তাদের ঝগড়ার আওয়াজ পেতুম। রাত্তিরে বাথরুমে গেলেই বারবার উপরের জানলাটার দিকে তাকাতাম, এই বুঝি একটা কালো লিকলিকে হাত জানলা গলে ভিতরে ঢুকে পড়লো!
এইরকম রহস্যময় ছিলো আমাদের শৈশব। এমন রহস্যময় শৈশব যাদের তাদের বড় হয়ে ডাক্তার বা পাইলট হতে চাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমারো ছিল না! বরং আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সুবলকাকুর মতো দোকানদার হবো, যে দোকানে থরে থরে কাঁচের বয়ামে সাজানো থাকবে হজমিগুলি, খোসাওলা বাদাম, টক-ঝাল-মিষ্টি চানাচুর, আমের আচার, ছোট ছোট লাল কুল, খাস্তা বিস্কুট, খাজা বিস্কুট, আরও কত কি!
ছোট হজমি পাঁচ পয়সা, আর বড়টা দশ পয়সা। আমার ছোট হজমিগুলোই বেশি ভাল্লাগতো। শুধু দাম কম বলে নয়, খেতেও সাঙ্ঘাতিক! হজমি বা আচারের সঙ্গে সুবলকাকু আলাদা করে একটু নুন দিতো। এমনি নুন নয়, বিটনুনও নয়, যাকে বলে ‘কারেন্ট নুন!’ কালো কুচকুচে রঙ, জিভে একটু ঠেকালেই মারমার-কাটকাট ব্যাপার! মনে হতো গোটা শরীরে যেন বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। আমি এখনও বিশ্বাস করি, কারেন্ট নুনের আবিষ্কর্তাকে অবশ্যই নোবেল প্রাইজ দেওয়া উচিত ছিল। নোবেল না দেওয়াটা বিরাট অন্যায় হয়েছে!
এরকম থরে থরে লোভনীয় বস্তু যার চারপাশে দিনরাত তান্ডব করছে তার মত ভাগ্যবান কে আছে? শুধু আমি নই, আমার মতো অনেক ছেলেই বড় হয়ে সুবলকাকু হওয়ার স্বপ্ন দেখতো।
জীবনের বেশিরভাগ স্বপ্নের মতো এই স্বপ্নটাও অপূর্ণ থেকে গেছে, তবু আজও সুবলকাকুর সেই ছোট্ট খুপরি দোকানঘরটা মাঝেমধ্যে স্বপ্নে দেখি।
কিছুদিন আগে স্বপ্নটা আবার দেখলাম। স্বপ্নে দেখলাম সুবলকাকুর দোকান থেকে খাজা বিস্কুট কিনে চা দিয়ে খাচ্ছি। লাল চা নয়, দুধ চা! চায়ে এলাচ আর আদা মেশানো গন্ধটাও পরিষ্কার পাচ্ছিলুম। আমি একটা খাজা বিস্কুট নিয়ে প্রথমে তার ঘ্রাণ নিলাম, তারপর হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলাম। আহা, কি অপূর্ব দেখতে! পাতলা ফিনফিনে কয়েকটা থাক, একটার সাথে আরেকটা জোড়া। আমি আস্তে আস্তে একটা থাক ভাঙলুম, তারপর চোখ বুজে মুখে ফেলে দিলুম। কামড়াকামড়ি করলে হবে না! এ জিনিস জিভ দিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করতে হবে, তবেই আনন্দ। আমিও একবার বিস্কুটের টুকরোটা মুখের এদিক করছি, আবার ওদিক করছি। টং করে জিভে একটা কালোজিরের দানা পড়লো। দানাটা আমি দাঁতের ফাঁকে এনে কুটুস করে একটা কামড় দিলুম। আহহহ্! এরপর এক ঢোক চা। আরামে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, এই সময়ে ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল।
স্বপ্নটা এতই জীবন্ত ছিল যে তার কিছুদিন পর আমি সুবলকাকুর সেই দোকানের জায়গাটায় সশরীরে উপস্থিত হলাম। গিয়ে দেখলাম সুবলকাকুর দোকানটা এখনও আছে, তবে আগের জায়গা ছেড়ে একটু দূরে একটা ফ্ল্যাটের নীচে হয়েছে। সেই খুপরি দোকান আর নেই, এখন এক বড়সড় স্টেশনারি দোকান, তাতে রমরমা বিকিকিনি চলছে। হরেক রকম জিনিস, কোল্ড ড্রিঙ্কস্ থেকে শিশিতে ভরা কড়াইশুঁটি—কি নেই! দোকান চালাচ্ছে সুবলকাকুর ছেলে লিটন। লিটন ছোটবেলায় রোগা ডিগডিগে ছিল, এখন বিরাট মোটাসোটা চেহারা হয়ে গেছে। সুবলকাকু এক কোনে জবুথবু হয়ে বসা। বয়স ভালোই হয়েছে। মুখের চামড়া ঝুলে গেছে, চোখে ঘষা কাঁচের চশমা। বুঝলুম ছানি কাটিয়েছে।
আমি সুবলকাকুকে গিয়ে বললাম—‘কি গো, আমায় চিনতে পারছো? আমি বুবু গো, বুবু!’
সুবলকাকু ধীরে ধীরে আমার দিকে মাথা ফিরিয়ে বললো—‘কোন বুবু? তারকের ভাগ্নে?’
‘হ্যাঁ গো হ্যাঁ, সেই বুবু।’
সুবলকাকুর মুখে একগাল হাসি ফুটে উঠলো। শীর্ণ হাতটা বাড়িয়ে আমার হাত ধরে বললো—‘তুই তো এখন নাকি ডাক্তার হয়ে গেছিস, গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়াস!’
‘হ্যাঁ, তা হয়েছি! তবে তোমাকে একটা গোপন কথা বলবো বলেই অত দূর থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে এলুম।’
সুবলকাকু একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললো—‘কি কথা?’
আমি ততোধিক নিচু গলায় বললাম—‘আমি কিন্তু ডাক্তার হতে চাইনি সুবলকাকু! শুধু চেয়েছিলাম তোমার মতো দোকানদার হতে’।
সুবলকাকু শ্লেষ্মাজড়িত গলায় খুব একচোট হাসলো, তারপর কাশি সামলাতে সামলাতে বললো—‘তোকে দেখে বড্ড ভালো লাগছে রে বুবু! কি খাবি বল।’
আমি গাঢ়স্বরে বললাম—‘সেই পাঁচ পয়সার হজমিগুলি দুটো খাওয়াতে পারবে? সঙ্গে একটু কারেন্ট নুন?’
সুবলকাকু স্থিরদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ধরা গলায় বললো—‘পাঁচ পাঁচ দশ পয়সা এনিচিস? আমি কিন্তু ধারের কারবার করি না!’
আমি হো হো করে হাসতে হাসতে সুবলকাকুকে জড়িয়ে ধরলাম। সুবলকাকুও হাসছে। সবাই কেনাকাটা ছেড়ে আমাদের দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে।
হাসির মতো ঢাল আর নেই! এই হাসি দিয়ে কত অসহায়তা ঢেকে দেওয়া যায়, তাই না?
সত্যঘটনা অবলম্বনে লেখা এই গল্পটি ভ্রাতৃস্থানীয় এক প্রখ্যাত চিকিৎসকের কাছ থেকে পাওয়া