সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে আমাদের রুচি ও পছন্দের তালিকা। এই বদলের জোয়ার এসেছে বাঙালির ড্রয়িং রুমে। পরিবর্তনের স্লোগানে রমরমা টেলিদুনিয়ার মেগা সিরিয়ালগুলি। শুধুমাত্র নায়ক নির্ভরতা নয়, ছোট পর্দার জনপ্রিয় সিরিয়ালে নারী কেন্দ্রিক প্লটের দখলদারি। বাংলা সাহিত্য থেকে গল্প বা উপন্যাস নিয়ে টেলি সিরিয়াল করে জি বাংলা ইতিমধ্যে দর্শকমহলে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে।
জি বাংলার একটি জনপ্রিয় সিরিয়াল “সুবর্ণলতা” ২০১০ সালে জি বাংলায় সম্প্রচারিত হয়েছিল সিরিজটি। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আশাপূর্ণা দেবীর ‘সুবর্ণলতা’। লেখিকাও জানান, গল্পটি একটি মেয়ের সত্য জীবন কাহিনী। হয়তো তাই জন্যই কাহিনী প্রকাশেই সকলের পছন্দের বই হয়ে ওঠে। উপন্যাস প্রকাশের দীর্ঘ ৪৩ বছর পরে যখন জি বাংলা ধারাবাহিকটি পর্দায় নিয়ে আসেন তখন আজকের পরিবারের সকলে তার সঙ্গে একাত্মবোধ করে উঠতে পারে।
কোভিড মহামারীজনিত কারণে মার্চ ২০২০ সালে আরোপিত লক-ডাউনের সময়, সেটগুলিতে সমস্ত শুটিং বন্ধ ছিল৷ বিপুল দর্শকের অনুরোধের পর, সুবর্ণলতা পুনরায় সম্প্রচার শুরু করা হয়। সেদিনের মেয়ে সুবর্ণলতার গল্প আজো যেন প্রতিটি মেয়ের জীবনে সমান প্রাসঙ্গিক। এখানেই সুবর্নলতার সার্থকতা।
বিশেষ একটি সময়ের সাহিত্য বুঝতে গেলে অনুধাবণ করতে হবে সেই সময়ের ইতিহাস সামাজিক পরিস্থিতি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় সমাজ। তার প্রতিফলন পড়ে সাহিত্যে। তাই সাহিত্যকে সমাজের দর্পণ বলা হয়।

সুবর্ণলতা তার মা সত্যবতীর দ্বারা একটি প্রগতিশীল পরিবারে বেড়ে উঠেছিলো। তাকে বেথুন স্কুলে ভর্তি করা হয়। তার মধ্যে ছোটবেলা থেকেই মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালবাসা এবং যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধার অনুভূতি জাগিয়ে তোলা হয়েছিলো।
কিন্তু, মা সত্যবতীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাত্র ৯ বছর বয়সে কলকাতার দর্জিপাড়ায় এক রক্ষণশীল পরিবারে বিয়ে হয়ে যায় সুবর্ণর। যুক্তি, বিজ্ঞান ও শিক্ষার আলোয় বেড়ে ওঠা মেয়ের চোখে তখনও তার আরো পড়াশুনা করার, দেশ মায়ের সেবা করার স্বপ্ন।
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে সে স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়ির প্রচলিত রীতি নীতিগুলোকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। তাতে বিব্রত হন পরিবারের অন্য সদস্যরা। আজকের শিক্ষিত মেয়ের কাছে এহেন আচরণ যুক্তিসঙ্গত ও স্বাভাবিক মনে হলেও, সেকেলে শ্বাশুড়িদের কাছে তা মোটেই নয়। তবু কাহিনী আর চরিত্রের টানে শাশুড়ি বৌমারা মিস করেন না সুবর্ণলতার একটি এপিসোডও।
প্লটটি মূলত সেই করুণ পরিস্থিতির চারপাশে আবর্তিত হয়েছে এবং সেই যুগের নারীরা অর্থডক্স পরিবারে নিপীড়নের শিকার হয়েছিল, যাদের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। সুবর্ণ একটি দৃঢ় মনের সাহসী, সদয় এবং উদার মহিলা, তার স্বামী প্রবোধের সমস্ত অমানবিকতাকে অস্বীকার করেন। প্রবোধ একজন উত্তপ্ত মাথার গোঁড়া মানুষ, যিনি তার সুন্দরী স্ত্রীর প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে গ্রহণ করতে অক্ষম এবং সর্বদা তার মহৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেন।

সুবর্ণ ভালোবাসে স্বপ্ন দেখতে, নিজেকে মেলে ধরতে। অন্দরমহলে সে চেয়েছিলো জ্ঞানের আলো প্রবেশ করাতে। প্রতিদিন শ্বশুরাড়িতে খবরের কাগজ নেওয়া, বাড়িতেও গায়ে সেমিজ দেওয়া, সব বাচ্চাদের নিয়ম করে পড়তে বসানো….সব সে সম্ভব করেছে সে একার মনের জোরে।
সুবর্ণলতা আজ জি বাংলা ধারাবাহিকের শুধুমাত্র একটি মুখ্য চরিত্র নয়, একটি চেতনা। সুবর্ণ তার অধ্যবসায়, সাহস এবং বুদ্ধিমত্তার জেদে সংসারে ছোট ছোট পরিবর্তন এনেছিলো। তার ছোট ছোট জয়গুলি অনুপ্রানিত করে আজকের মেয়েদের।
আজকের সংসারে যে কোন শ্বাশুড়িকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সুবর্ণলতার মতো একজন বৌমা থাকলে কেমন হবে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চোখ বুজে বলবেন, ওটা পাশের বাড়ির সংসারেই ভালো। আর যদি জিজ্ঞেস করেন স্বামীকে, আঁতকে উঠে তিনি যা উত্তর দেবেন, তা আপনার জন্যই পাওনা থাক। অথচ জি বাংলার সুবর্ণলতার টিআরপি রেটিং হাই।
ব্রিটিশশাসিত পরাধীন বাংলার সুবর্ণলতারা সমাজের আনাচে কানাচে রয়েছে। নারীকে স্বাধীন করতে ভয় পায় আজো এই স্বাধীন দেশ। “ঘরের মেয়েদের সময়মতো বিদেয় করতে হয়” অর্থাৎ বিয়ের বয়স নয় বছরের পরিবর্তে আঠেরো করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এত বছর পরেও মানুষের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা ভাবনায় কী সত্যি পরিবর্তন এসেছে!

একেবারে ছোট বয়স থেকে মেয়েদের শেখানো হয়, নিজেদের অবমাননার বিষয়ে কোন কথা বলতে নেই। মনের অতলে তলিয়ে থাকা গ্লানি প্রশ্ন করে, “আমিই কেন?” সেই গ্লানিকেই হাতিয়ার করে আশাপূর্ণা দেবীর কলম লিখে ফেললো এক মুক্তিকামী মেয়ের প্রতিবাদের কথা। দলে দলে আরো অনেকে এসে তাঁর পাশে এসে বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ, আমিও”।
নারীর দৃষ্টিভঙ্গি নারী ছাড়া কেই বা তুলে ধরবে বারেবারে এমন সহমর্মিতার কথা। এখানেই সুবর্ণলতার সার্থকতা।
যে কোন মেয়ের সংসারে আনন্দে মেতে ওঠার, দুঃখে কেঁদে ফেলার, অভিমানে ঠোঁট ফোলানোর, রেগে চুল ছেঁড়ার একটা অধিকার থাকে। সুবর্ণলতাও চেয়েছিলো এটুকুই। কিন্ত সংসারে বোঝেনি তাকে কেউই। তাতে দমেনি সূবর্ণলতা। সংসারকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে মেনে নিয়েছিলো। যে কোন পরিস্থিতি হোক না কেন, প্রতিদিন যুদ্ধ করেছে যুক্তিবাদী পদক্ষেপগুলির মান্যতা পেতে। কখনো নরমে কখনো গরমে পরিবারের সকলের মধ্যে জাগাতে চেয়েছেন এক নতুন চেতনার আলো।
এমন দৃঢ় ও নির্দিষ্ট মনের চরিত্র তাই আজ সবার প্রিয়।
সুবর্ণলতা শুধুমাত্র জি বাংলা ধারাবাহিকের মুখ্য চরিত্র নয়, সে অনুপ্রাণিত করে চলেছে আজকের মেয়েদের ও তার পরিবারের সদস্যদের। প্রতিনিয়ত তারা সূবর্ণ-এর কাজে ঘটনায় একাত্মবোধ করছেন। এখানেই সফল সেদিনের সুবর্ণলতা, আজকের দিনে।।
তথ্যঋণ : “লকডাউনে সুবর্ণলতা প্রত্যাবর্তন টেলিপর্দায়”। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা এবং সম্পর্কিত লেখা।
বিশ্লেষণ খুবই সুন্দর লাগল।
Subornolata ra chirokal songsare kosto paay.. na paay karo bhalobasa.. na thake moner katha shonar moto manus.. bhishon priyo akta choritro ❤️.. khub bhalo laglo lekha ta
Darun presentation
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই সকলকে????????????
Aj o ghore ghore subornolotara ei vabei protiniyoto lorai kore jacche.unnoto theke unnototoro somaj ekhon o subornolota der mene uthte parlo koi??
বাহ,,, দারুন প্রেক্ষাপটে অসাধারণ লেখনী ????????????
খুব সুন্দর প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখেছেন,,, খুব ভালো লাগলো পড়ে,,,????????????
অসাধারণ বিষয়, সত্যিই সুবর্ণরা হারিয়ে গেছে, আজকাল সিরিয়ালের চরিত্রদের সঙ্গে কোনও মিল নেই, যারা সুবর্ণলতা, কাদম্বিনী র মতো সিরিয়াল প্রযোজনা করেছিল, তারাই তাদের অবমাননা করছে,সবাই তাই উপভোগ করছে, তাই খুব হতাশ লাগে।