| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সুভাষ সুবাসিত আপনার গুণে (প্রথম পর্ব) : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ৮৯৫ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২২

শূন্যতাই পূর্ণতার আধার। যত শূন্যতার হাহাকার, ততই পূর্ণতার গরিমা। নাম-যশ-খ্যাতি সবেতেই তার বিস্তার। অন্যদিকে সাফল্যের মাত্রায় স্মরণের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে, ব্যর্থতায় তার বিস্মরণ ঘটে। আপাতভাবে দেশবরেণ্য সুভাষচন্দ্র বসুর(১৮৯৭-?) প্রতি বাঙালিমানসের আবেগ ও শ্রদ্ধার বিষয়টি স্বাধীনতা সংগ্রামে সমরসঙ্গীতের আবহে যেভাবে ভেসে ওঠে, সেভাবে জেগে থাকে না। শূন্যতায় তাঁর পূর্ণ রূপ নেই, সাফল্যেও নেই ঐতিহ্যের গরিমা। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেকে সঁপে দিয়ে তিনি নেতা থেকে নেতাজি হয়েছেন, তাঁর আহ্বান মুখরিত হয়েছে। অথচ সে-সব শরতের মেঘের মতো আশ্বাস জাগিয়েই মিলিয়ে গেছে। ১৯৪৪-এর ৪ জুলাই বার্মার এক র‍্যালিতে ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’ বলেও সেই প্রত্যাশিত স্বাধীনতা দিতে পারেননি, ‘চলো দিল্লী’ বলেও দিল্লী যাওয়াও সম্ভব হয়নি। ফরোয়ার্ড ব্লক নামে রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, আজাদ হিন্দ বাহিনী নতুন করে গড়ে তুলে পরাধীন দেশকে উদ্ধারে নেমেছিলেন। কোনোটাই সফলতার সূর্য হয়ে ওঠেনি। শূন্যতায় তা অপূর্ণ থেকেছে, শুধু সাফল্যের ব্যর্থতায় জেগেছে বিচ্ছেদবিরহ।

অথচ তার পরেও নেতাজির আবির্ভাবে সুভাষচন্দ্রের জীবনদীপ শুধু বাঙালির কাছেই নয়, আপামর দেশবাসীর কাছে দেশপ্রেমের মশাল হয়ে উঠেছে। তাঁর আকস্মিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরুদ্দেশ যাত্রা তাঁকে বিস্মৃত তো করতেই পারেনি, উল্টে জনমানসের তীব্র শ্রদ্ধাবোধই সুদীর্ঘকাল পরেও তাঁকে জীবিত করে রেখেছে। সুভাষচন্দ্রের অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের প্রতি জনমানসের অচল বিশ্বাসের পরম পরশের মধ্যেই তাঁর অবিসংবাদিত গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে অবিস্মরণীয় করে তুলেছে। যেখানে বেঁচে থাকতেই অনেক কৃতী অদৃশ্য হয়ে পড়েন, সেখানে অদৃশ্য নেতাজিকে নিয়ে তাঁর ফিরে আসার রহস্যময় গল্পের বৈচিত্র শুধু তাঁর প্রতি শুধু শ্রদ্ধাই নয়, তীব্র আকর্ষণই বালক ব্রহ্মচারী থেকে গুমনামী বাবাকে রহস্য দানা বাঁধে। শুধু তাই নয়, নেতাজির এই বিরল দৃষ্টান্তই শিল্প-সাহিত্যের আধার হয়ে উঠেছে, ইতিহাসের বর্ণহীন পরিসরকেও করেছে বর্ণরঙিন। সুভাষচন্দ্রের অপূর্ণ জীবনই সেখানে অমূল্য রহস্যরোমাঞ্চমুখর জীবনকাহিনি হয়ে ওঠে, তাঁর সংগ্রাম শুধু দেশের স্বাধীনতার নয়, নতুন দেশের পথ দেখায়। এজন্য তাঁকে নিয়ে যত বিতর্ক তৈরি হয়েছে, ততই তাঁর গৌরব বিস্তার লাভ করেছে। আসলে সুভাষ সুবাসিত হয়েছে আপনার গুণে। সেই গুণের পরিচয় চন্দনের সুবাসের মতো, ঘর্ষণেই সৌরভ ছড়ায়।

আসলে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যে বাঙালি তার বীরত্বের পরিচয় প্রথম খুঁজে পেয়েছেন। বাঙালির মনীষার অভাব নেই, বরং তার বৈচিত্রমুখর প্রকৃতি পৃথিবীর যেকোনো জাতির সমীহ আদায়ে সবুজ হয়ে ওঠে। উনিশ শতকেই বাঙালি মনীষার প্রাচুর্যই তার নবজাগরণের আধারের আলো হয়ে উঠেছে। পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোতে ধর্ম-সমাজের সংস্কার বা  শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতেই নয়, সেইসঙ্গে মানুষের কল্যাণকামী চেতনাতেও বহুমুখী বাঙালি মনীষার পরিচয় উঠে এসেছে। নীরবে কর্মসাধকের ভূমিকায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের পরিচয় যেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তেমনই সরবে বিশ্বজয়ী স্বামী বিবেকানন্দের অপ্রতিরোধ্য প্রভাবও ছড়িয়ে পড়ে। ত্যাগ ও সেবার ব্রতে দুজনেই সামিল হলেও দুজনের প্রকৃতি ভিন্ন। দুজনেই আবার বীরত্বের মহিমায় বাঙালি বন্দিত। বীরসিংহের সিংহশিশুটি অপরাজেয় শক্তিতে আজীবন মানুষের সেবায় আত্মনিবেদিত মহাপ্রাণ। অন্যদিকে বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ শুদু বিশ্বকে জয় করেননি, বাঙালির মননবিশ্বে অকুতোভয়ের জাগরণ সৃষ্টি করে গিয়েছেন। তাঁর ‘মাভৈঃ, চরৈবেতি’মন্ত্রে অর্থাৎ ‘ভয় নেই, এগিয়ে চলো’র বার্তা দেশোদ্ধারে মুক্তির সোপান হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে দুজনেই বাঙালি বীরের প্রতীকে সমীহ আদায় করে নিয়েছেন। অথচ তখনও সশরীরে বাঙালির বীরের পরিচয় ছিল না।

বাঙালির জাতীয়তাবোধের জাগরণে মারাঠা-রাজপুতদের মতো বাংলার ইতিহাসের আশ্রয়ে বীরদের তুলেধরার আয়োজন চলেছিল, তার মধ্যে সেই বীরের চেয়ে বীরত্বের কিছু নির্দশন উঠে এসেছে। এজন্য আধুনিকমনস্ক বাঙালির কাছে প্রকৃত বীরের প্রত্যাশা থাকলেও প্রতীক্ষা ছিল না। আসলে মননবিলাসী বাঙালির কাছে মনোবল যেভাবে প্রাধান্য পেয়েছে, বাহুবল সেভাবেই উপেক্ষিত হয়েছে। সেই মনোবল ও বাহুবলে বলীয়ান বীরের পরিচয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অপূর্ব মূর্তিই স্বাভাবিক ভাবে সময়ান্তরে বাঙালিমানসে প্রতিমায় পরিণত হয়েছে। সেই বীরের আগমন অচিরেই স্বাধীনতা আন্দোলনে আবির্ভাব হয়ে ওঠে। অথচ বিষয়টি তত সহজসাধ্য ছিল না। সেই কঠিনের সাধনায় সুভাষের পথের দিশারি ছিলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। সেক্ষেত্রে স্বামীজির আদর্শকে পাথেয় করে সুভাষের অভিযান যে সফল হয়েছিল, তা সারাদেশে তাঁর নেতাজির পরিচয় বিস্তারেই প্রতীয়মান। অন্যদিকে বীর সুভাষের রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘দেশনায়ক’(‘তাসের দেশ’ নাটকের উৎসর্গপত্রে) হয়ে ওঠার জন্এ)আদর্শ বা মত স্বামীজির হলেও পথটি ছিল একান্ত নিজস্ব। শুধু তাই নয়, প্রথম থেকেই পরিকল্পনা করে তিনি যেভাবে জীবনকে গড়ে তুলেছিলেন, তা শুধু সাধনাসাপেক্ষই নয়, বিস্ময়কর। অধিক সময় ব্যয় না করে সময়ের সদ্‌ব্যবহারের প্রতি প্রথমাবধি প্রখর আত্মসচেতন ছিলেন তিনি।

আহার, নিদ্রা ও মৈথুনের জীবন থেকে উত্তরণের প্রয়াসে তাঁর কঠোর সংযমী জীবনযাপন পালনের কথা সুভাষচন্দ্র নিজেই অকপটে ব্যক্ত করেছেন তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ‘An Indian Pilgrim’(১৯৩৭)-এ। লক্ষণীয়, পুণ্যকামী একজন ভারতীয় তীর্থযাত্রীর মাধ্যমে সুভাষচন্দ্র তাঁর জীবনকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর মাত্রাতিরিক্ত আত্মসচেতনতাই তাঁকে যে ‘বালবৃদ্ধ’ ও ‘অকালপক্ক’ করে তুলেছিল, তা নিয়েও রসিকতা করেছেন সেখানে। প্রথমটির ক্ষেত্রে তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাসের ‘একটা অস্পষ্ট নৈতিক মূল্যবোধ’ সক্রিয় ছিল। প্রধান শিক্ষকের কাছেই তিনি সৌন্দর্যবোধ ও প্রকৃতিপ্রেমের দীক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু পার্থিব ব্যবহারিক জীবনের প্রতি আকর্ষণই তাঁকে উন্নততর জীবনের পরিপন্থী মনে হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, বয়ঃসন্ধিকালের স্বাভাবিক যৌনচেতনাও তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। শুধু তাই নয়, তাতে চারিত্রিক দুর্বলতা খুঁজে পেয়ে তার দমনে সক্রিয় হয়েছিলেন সুভাষ। এজন্য অবশ্য তিনি পরবর্তীতে আফশোস করেও বিরূপতা প্রকাশ করেননি, বরং নদীর সাগরে মেলার আনন্দ প্রকাশ করেছেন। ততদিনে অস্থির মন নিয়ে পার্থিব কামনাবাসনাময় জীবন থেকে উত্তরণের দিশায় অজ্ঞাতে খুঁজে চলা থেকে পাশের আত্মীয়ের বাড়িতে বই দেখতে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের রচনাবলির মধ্যে তার হদিশ মেলা সবই ঘটে গেছে সুভাষচন্দ্রের। তিনি সেই প্রাণসঞ্জীবনী বিশল্যকরণী প্রাপ্তির কথা দ্বিধাহীন চিত্তে জানিয়েছেন : ‘প্রধান শিক্ষক মহাশয় আমার মধ্যে সৌন্দর্য ও নীতিবোধ জাগ্রত করেছিলেন, আমার জীবনে নতুন এক শক্তি এনে দিয়েছিলেন, কিন্তু এমন কোনও আদর্শ তাঁর কাছ থেকে লাভ করিনি, যার জন্য সমগ্র সত্তাকে আমি উৎসর্গ করতে পারি। বিবেকানন্দ আমাকে তাই এনে দিলেন।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বামীজির দেহত্যাগের সময় সুভাষচন্দ্রের বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। সদ্য পনেরোতে এসে কৈশোরোত্তীর্ণ সুভাষচন্দ্র স্বামীজির রচনাবলির মধ্যে তাঁকে খুঁজে পেয়েছেন। সেই স্বামীজিই হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যানজ্ঞান। অচিরেই তিনি বিবেকানন্দ থেকে রামকৃষ্ণে পৌঁছে যান। তাতে তাঁর সংযমী জীবনের লড়াই আরও তীব্র হয়। তাঁর কথায় : ‘রামকৃষ্ণের ত্যাগ ও শুদ্ধতার দৃষ্টান্তের ফল হয়েছিল এই যে, আমার সমস্ত কুপ্রবৃত্তির (যৌনপ্ররৃতি) সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।আর বিবেকানন্দের আদর্শ প্রচলিত পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে আমার সংঘর্ষ ডেকে এনেছিল।’ যৌনচেতনা দমনে তাঁর অতিসক্রিয়তা নিয়ে সুভাষচন্দ্র স্বাভাবিক ভাবেই আত্মসচেতনতা ফিরে পেয়েছিলেন। এজন্য তা নিয়ে বাড়াবাড়ি মনে হলে তার প্রয়োজনকেও অস্বীকার করেননি। তাঁর কথায় : ‘নতুন করে আবার যদি আমার জীবন শুরু করতে পারতাম তা হলে খুব সম্ভবতঃ আমি যৌন বিষয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করতাম না, বাল্যে ও যৌবনে যা করেছি। এর অর্থ এই নয় যে যা করেছি তার জন্য অনুতাপ করেছি। যৌন-সংযমকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে যদি কোনও ভুল করে থাকি, সে ভুলে সম্ভবতঃ আমার ভালই হয়েছে, কেননা এর ফলে ঘটনাচক্রে হলেও আমি উপকৃত হয়েছিলাম। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলতে পারি, এর ফলে নিজেকে এমন একটা জীবনের জন্য তৈরি করে তুলেছিলাম যা চিরাচরিত পথ ধরে চলবে না এবং যাতে স্বাচ্ছন্দ্য, সুখ ও নিজের বৈষয়িক উন্নতির কোনও স্থান নেই।’ সুভাষচন্দ্রের এরূপ ধারণার মধ্যেই তাঁর পরিকল্পিত জীবনের ছায়া কায়া বিস্তার করে।

স্কুলে পড়ার কালেই সুভাষচন্দ্রের সংযমী জীবন প্রেসিডেন্সি কলেজে আসার পর আরও তীব্রতা লাভ করে। ১৯১৩-এ ম্যাট্রিক পরীক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর বাবা জানকীনাথ বসুর সুযোগ্য হয়ে দেশসেবার কথা তাঁর মনে ধরেছিল। এজন্য পড়াশোনাতেও তাঁর ফাঁকি ছিল না। শুধু তাই নয়, উচ্চশিক্ষা যাতে তাঁর জীবনের উত্তরণকে সহজ করে তোলে, সেদিকেও সুভাষের পরিকল্পনামাফিক চিন্তাভাবনা সক্রিয় ছিল। তাঁর সেই লক্ষ্যভেদী জীবনকে তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, যা তাঁর গভীর অধ্যাবসায় ও নিবিড় সাধনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর কথায় :‘যখন স্কুল ছাড়লাম তখন যদিও দারুণ এক পরিবর্তনের ঝড় আমার মধ্যে বইছিল, তবুও ইতিমধ্যেই নিজের সম্বন্ধে আমি কতকগুলি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত করে ফেলেছিলাম। যাই হোক না কেন, গতানুগতিক পথে আমি চলব না, আমার জীবনের ধারা হবে এরকম যা আমার আধ্যাত্মিক কল্যাণ ও মানব সমাজের উন্নতির সহায়ক হবে। আমি দর্শন নিয়ে গভীরতর পড়াশোনা করব যাতে জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারি ; বাস্তব জীবনে যতটা সম্ভব অনুসরণ করব রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দকে এবং কোনও মতেই ব্যবহারিক জীবনের দিকে আমি যাব না।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বামীজিও দর্শন নিয়ে কলেজে পড়েছেন। অন্যদিকে এভাবে সুভাষচন্দ্র ‘ব্যবহারিক জীবন’বিমুখ হয়ে যেভাবে দৃঢ় সঙ্কল্পের মাধ্যমে স্বীয় লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন, তার মধ্যে তাঁর মানসিক প্রস্তুতিই শুধু নয়, স্বামীজির আদর্শের পূর্ণ রূপায়ণও নিজের জীবনেই প্রতিফলিত করায় মনস্থির করেছিলেন।

আসলে তিনি স্বামীজির মধ্যেই তাঁর আদর্শ খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিবেকানন্দের রচনাবলিতে অন্য জীবনের দিশা পেলেও সুভাষচন্দ্র কলেজে পড়ার সময়েও যথারীতি গুরু খুঁজে ফিরেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯১৪-তে গরমের ছুটিতে বাড়ির কাউকে না জানিয়েই বন্ধুর সঙ্গে তিনি তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন এবং সাধুসন্ন্যাসীদের শুচিবায়ুগ্রস্ত মনের পরিচয়ে ও ভণ্ডামির মুখোশ দেখে মোহভঙ্গ হলে ঘরে ফিরে আসেন। সেক্ষেত্রে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই তাঁর অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিয়েছিল। তাঁর কথায় : ‘অধিকতর জ্ঞান লাভ করে আমি বাড়ি ফিরেছিলাম এবং সন্ন্যাসী ও সংসারত্যাগীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেকখানিই হ্রাস পেয়েছিল। ভালই হয়েছিল যে নিজের কর্মের দ্বারাই আমি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম, কেননা এমন অনেক কিছুই আছে যা আমাদের শিখতে হয়।’ এই শেখার ক্ষেত্রেই শুধু নয়, পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও সুভাষের সুযোগ্য হয়ে ওঠার মধ্যে তাঁর বিস্ময়কর নিষ্ঠা ও অমানুষিক আত্মত্যাগের পরিচয়ই তাঁকে অতুলনীয় মাহাত্ম্য দান করেছে। এজন্য তিনি যেভাবে নিজের মতো করে জীবনকে ত্যাগ ও সেবার আদর্শে গড়ে তুলেছিলেন, তা যে অসাধ্যসাধন ছিল, তাঁর ব্যক্তিজীবনের উত্তরণের পথই তা বলে দেয়। (চলবে)

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev