| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সুভাষ সুবাসিত আপনার গুণে (শেষ পর্ব) : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ৫৩১ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২২

আসলে সুভাষচন্দ্র তাঁর জীবনের লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য অবিচল ভাবে নিজেই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। মায়াময় জগৎ ছেড়ে সন্ন্যাস নেওয়া কঠিন, তার চেয়েও কঠিন মায়ামোহের মধ্যে থেকে সাধনা করে চলা। কেননা তার পরতে পরতে মোহের হাতছানি, পদে পদে বিপথের আমন্ত্রণ। সেখানে সুভাষচন্দ্র স্নেহ-ভালোবাসা বা শ্রদ্ধার দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন শুধু নিজের মুক্তির জন্য নয়, দেশের মুক্তির জন্য নিজেকে যুক্ত করার লক্ষ্যেও। যা কিছু করেছেন, সবেতেই তার উত্তরণের প্রয়াস। সেখানে প্রত্যক্ষ কারো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নয়, একান্তই নিজের মতো করে পথচলার প্রয়াস। এজন্য গুরুর সন্ধানে ব্যর্থ হয়েও তাঁর পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েনি। আপাত অদৃশ্য স্বামী বিবেকানন্দই তাঁর পথের দিশারি হয়ে ওঠেন। রাম তো রামায়ণে, বিবেকানন্দ তাঁর রচনাবলিতে। বহুজনহিতায় ও বহুজনসুখায়ের আদর্শের স্বামীজিকেই সুভাষ আরও নিবিড় ভাবে আপন করে যাপন করেছেন বাকি জীবন। তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ, কেশবচন্দ্র বা রামকৃষ্ণের মতো সংসারে থেকে ধর্মসাধনার কথা বলেও তাঁকে বিরত করতে পারেনি। তিনি যে তাঁর অন্য আদর্শের প্রতিভূ খুঁজে পেয়েছেন। সেকথা সুভাষচন্দ্র বাবাকে অকপটে জানিয়েও দেন, ‘বিবেকানন্দের ideal হচ্ছে আমার ideal।’ কেননা কর্মবিহীন সন্ন্যাস বা পুরুষকারহীন অদৃষ্টবাদে স্বামীজির বিশ্বাস ছিল না। অন্যদিকে সুভাষও গান্ধীর সবরমতী আশ্রম বা অরবিন্দের পণ্ডিচেরির আশ্রমের পথকে স্বাধীনতার সহায়ক তো নয়ই, বরং প্রকট প্রতিবন্ধক মনে করতেন। সেদিক থেকে তাঁর দেশের কাজে নিজেকে সঁপে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মানসিক প্রস্তুতি ও অধ্যাবসায়ের সুগভীর পরিকল্পনাই তাঁকে নেতা থেকে নেতাজিতে পৌঁছে দিয়েছে।

১৯২১-এ রাজনীতিতে আসার পূর্বে যেমন গুরুর সন্ধানে সক্রিয় ছিলেন, তেমনই সমাজসেবাতেও আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রীতিমতো সমাজসেবক। কলেজে পড়ার সময় দক্ষিণ কলকাতায় বাড়ি বাড়ি ভিক্ষে করে অনাথ ভান্ডারে চাল সংগ্রহ করেছেন, শহরে নৈশ বিদ্যালয় খুলেছেন, কলেজছাত্রদের নিয়ে দলবেঁধে বন্যা ও দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সাহায্যের ভাণ্ডার গড়েছেন। আবার কলেজের ছুটিতে কটকে ফিরে গিয়ে পুরনো বন্ধুদের নিয়ে কলেরায় আক্রান্তদের সেবা করেছেন। অন্যদিকে তিনি রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শে একটি বন্ধুগোষ্ঠী তৈরি করে বাড়ির বাইরে আধ্যাত্মিক আলোচনা, যোগাভ্যাসেও মেতে থাকতেন। এজন্য অবশ্য তাঁর পড়াশোনায় গুরুত্ব কমে যায়। এজন্য তাঁর বাবা-মা যতই তাঁকে বাগে আনার সচেষ্ট হয়েছেন, ততই তিনি বিদ্রোহ করেছেন। মায়ের জাতপাতের নিষেধাজ্ঞাও দ্বিধাহীন চিত্তে অস্বীকার করেছেন। তাঁর এই বেপরোয়া প্রকৃতি অঙ্কুর থেকে ক্রমশ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।

আসলে বৃক্ষের বীজটিও যে সুভাষ বিবেকানন্দের মধ্যে পেয়েছিলেন, ‘আত্মবিকাশের জন্য বিদ্রোহ প্রয়োজন।’ অবশ্য সেই মুক্তমনা ‘বিদ্রোহ’ই সুভাষচন্দ্রকে বিদ্রোহী বা বিপ্লবী করেনি, করেছে সংগ্রামী বীরযোদ্ধা। এজন্য অচিরেই তিনি সমাজসেবা থেকে দেশসেবায় ব্রতী হন যার মধ্যে মানবসেবায় দাসত্বমুক্তির শ্রেষ্ঠ পথটি স্বাগত জানায়। সুভাষচন্দ্রের রাজনীতির মূলেই ছিল দেশের স্বাধীনতা। আর সেই দেশপ্রেমের শিক্ষাই পেয়েছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু স্বামী বিবেকানন্দের কাছে। স্বামীজিই দেশবাসীর কাছে ‘আগামী পঞ্চাশ বৎসর’ ‘গরীয়সী ভারতমাতাকে’ আরাধ্য দেবতা’ করার কথা উদাত্ত কণ্ঠে জানিয়েছিলেন। তাঁর সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার জন্যই যেন সুভাষচন্দ্রের আবির্ভাব। উচ্চশিক্ষার সোপানে যখন বিলেতে গিয়ে(প্রেসিডেন্সি কলেজের পড়ার পর স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে ১৯১৮-তে দর্শনে অনার্স-সহ বিএ পাশ করেন এবং ১৯১৯-এর সেপ্টেম্বরে বিলেতে পৌঁছান।) কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আট মাসের অধ্যাবসায়েই আই সি এস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান লাভ করে জীবনের এলাহি সুখভোগের আয়োজন করে ফেলেছেন, তখনও সুভাষ আত্মসুখে আনন্দ উপভোগ করতে পারেননি। তিনি তা প্রখর আত্মসচেতনভাবেই ভাবে অকাতরে পরিত্যাগ করেছিলেন।

অজান্তে আঘাত লাগে কম, জেনেশুনে তার মাত্রা আপনাতেই শুধু বেড়ে যায় না, আজীবন মনে পড়ে। অথচ তিনি কোনো মোহে ছিলেন না, আবার তা নিয়ে পরে কোনোদিন আপসোসও করেননি। আত্মজীবনীতেও তা নিয়ে ফলাও করে প্রচারেও ব্রতী হননি। অথচ তাঁর সচেতন মনের পরশ আই সি এস থেকে পদত্যাগের দিনেই বন্ধু চারুচন্দ্র গাঙ্গুলিকে লেখা চিঠিতে উঠে এসেছে : ‘তুমি জান কর্তব্যের আহ্বানে একবার জীবন তরী ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। সেই তরী এখন রম্যকাননে উপনীত হয়েছে, যেখানে Power, Property, Wealth করতলগত। কিন্তু হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে সাড়া আসছে : “ তোমার এতে আনন্দ নাই। তোমার একমাত্র আনন্দ—সাগরের ঊর্মিমালার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে বেড়ানো।” সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে জীবন ভাসিয়ে দিলাম।’  শুধু তাই নয়, বিলেতে থাকতেই ( সেখানে ১৯২১-এর মার্চ পর্যন্ত তাঁর ছাত্রজীবন কাটে। এরপর সেই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে ট্রাইপস্‌ পাশ করেন। ) সুভাষচন্দ্র বিদেশিদের দাসত্বে সুখভোগ না করে স্বদেশের মুক্তিতে জীবনপণে ব্রতী হয়েছিলেন। এজন্য অসহযোগ আন্দোলনের সময় বাংলার সর্বত্যাগী সংগ্রামী মহৎপ্রাণ দেশবন্ধুকে তাঁর মনোবাঞ্ছার কথা দীনহীনভাবে তীব্র আকুতি জানিয়ে যেভাবে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, তার মধ্যেই দেশের প্রকৃত বীরের আত্মবলিদানের সদিচ্ছাই উঠে এসেছে : ‘আপনি আজ বাংলা দেশের স্বদেশ-সেবা যজ্ঞের প্রধান ঋত্বিক। আপনারা যে আন্দোলনের বন্যা তুলিয়াছেন তাহার তরঙ্গ চিঠিপত্র ও খবরকাগজের ভিতর দিয়া এখানে পৌঁছায়াছে। আমার যৎসামান্য বিদ্যা, বুদ্ধি, শক্তি ও উৎসাহ লইয়া আমি নিজেকে মাতৃভূমির চরণে উৎসর্গ করিতে চাই।’ অথচ সুভাষের সেই ‘উৎসর্গ’-এ যে আত্মনিবেদন বা দাসত্বের আনুগত্য ছিল না, বরং আত্মপ্রতিষ্ঠা বা রাজত্বের স্বপ্ন ছিল, তা অচিরেই তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে বেরিয়ে পড়ে।

আবেদন-নিবেদনের পথে নয়, অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পথেই তা অর্জন করতে হবে, সেবিষয়ে তিনি পরিকল্পনা করেই অগ্রসর হয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে প্রাথমিক ভাবে দেশবন্ধুর পথই তাঁর শ্রেয় মনে হয়েছিল। প্রকৃত বীর স্বকীয় বীরত্বেই এগিয়ে চলে। সেখানে শক্তিমান শাসক কখনও অনুনয়বিনয় করে শাসনক্ষমতা ছেড়ে দেবে না, তার শক্তির সঙ্গে লড়াই করতে গেলে বেপরোয়া হতেই হবে। শক্তিমানকে তার শক্তির ভাষাতেই তাঁকে  বোঝাতে হবে। সুভাষচন্দ্র সেই ভাষা অর্জনের পথে ক্রমশ এগিয়ে গিয়েছেন। তাঁর মধ্যে যে বীরত্বের তেজ ছিল, তা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই বেরিয়ে আসে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই তাঁর প্রখর কর্মতৎপরতা সকলের সমীহ আদায় করে নেয়। ১৯২৮-এ কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনটি তাঁর নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর বিস্তারেই ঐতিহাসিক অধিবেশন হয়ে উঠেছিল। মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে সেই বাহিনীর সর্বাধিনায়কই নয়, সেবারই কংগ্রেসে তাঁর গুরুত্ব বেড়ে যায় এবং পরের বছরের (১৯২৯) অধিবেশনে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন। সে দাবি নাকচ হয়ে গেলেও তাঁকে দমিয়ে রাখা যায়নি। যত সময় এগিয়েছে, ততই তাঁর বেপরোয়া প্রকৃতি সজীবতা লাভ করেছে। এজন্য রাজনৈতিক পথে যখন বুঝেছেন, তা তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না, তিনি সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়েছেন।

১৯৩৮-এ মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে সেই জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন সুভাষ। পরের বছরে সভাপতি হয়েও গান্ধীজির বিরুদ্ধতায় শেষে দল থেকে বেরিয়ে আসেন এবং ‘অল ইন্ডিয়া ফরোয়ার্ড ব্লক’ নামে নতুন দল গড়ে তুললেও পরিস্থিতি অনুকূল না থাকায় তাঁকে আরও ভয়ঙ্কর বিপদসঙ্কুল পথে সক্রিয় হতে হয়েছে যা তাঁর বীরত্বের পরিচয়ে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকেই নবরূপ প্রদান করে। দেশের বাইরে থেকে দেশীয় বাহিনীকে গড়ে তুলে সরাসরি ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামিল হওয়ার ইতিহাস একান্তভাবেই সুভাষচন্দ্রের স্বকীয় রচনা। স্বামীজির কথায় দেশের আপামর শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে থেকেই নতুন ভারত বেরিয়ে আসবে। সেই শ্রমজীবী সাধারণ মানুষকেই নিয়েই সুভাষের বাহিনী গড়ে উঠেছিল। ১৯১৭-র রাশিয়ায় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দল বলশেভিকদের জয়েই তাঁর প্রমাণ পেয়েছিলেন সুভাষ। সেই জনশক্তি নিয়েই দেশোদ্ধারে সামিল হয়েছিলেন, ভাবা যায় ! এজন্য তাঁর লড়াই প্রত্যক্ষভাবে বীরের লড়াই, গুপ্ত সমিতির ষড়যন্ত্রের পথে বৈপ্লবিক ছিল না। এজন্য তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশের মিত্রশক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেই যুদ্ধে সক্রিয় হয়েছিলেন। জার্মানের চান্সেসল হিটলার থেকে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর তোজো’র মতো কুখ্যাত একনায়কতন্ত্রের নায়কদের সমীহ আদায় করেছিলেন যা ছিল অভূতপূর্ব অসীম সাহসের পরিচায়ক। অন্যদিকে এভাবে তাঁদের সমর্থন নেওয়ার প্রয়াসে তাঁর সমালোচনাও কম হয়নি বা হয় না।

আসলে পশু বললে লোকে রাগে, অথচ সিংহ বা বাঘ বললে খুশি হয়। আসলে সুভাষের বেপরোয়ার মধ্যে সেই সিংহ বা বাঘকেই খুঁজে পেয়ে লোকে খুশিই হয়েছিল বা হয়ে থাকে। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রতীক বাঘ। দেশের স্বাধীনতার স্বার্থে তারও যে প্রয়োজন ছিল। ক্ষুধার্থকে প্রাণ বাঁচানোই যেখানে লক্ষ্য, সেখানে আহারদাতার চরিত্রবিচার সমীচীন নয়। আর তা করতে গিয়ে ক্ষুধার্তের প্রাণ চলে যেতে পারে, আবার তা পরেও সম্ভব। সুভাষকে তাই ব্রিটিশের মিত্রশক্তির বিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলাতে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, হিটলারের প্রত্যাশিত সাহায্য না পেয়েও তিনি জাপানের সহায়তাতেই যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন। ১৯২৮-এর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সর্বাধিনায়কই ১৯৪১-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি গৃহবন্দি অবস্থায় মৌলভীর ছদ্মবেশে দেশের বাইরে আজাদ হিন্দ বাহিনী অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪৩-এর ২১ অক্টোবর আজাদ হিন্দ সরকার গঠিত হলে সুভাষচন্দ্র ঘোষণা করেন : ‘আমি–সুভাষচন্দ্র বসু–আজ এই শপথ করছি যে, আমার জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমি আজাদ হিন্দ সরকারের সেবা করব এবং ভারতের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা যতক্ষণ না আসবে ততক্ষণ আমি সংগ্রামরত থাকব। ঈশ্বর, স্বদেশ ও স্বজাতির নামে আমি এই শপথ গ্রহণ করলাম।’ সেই থেকে সুভাষচন্দ্র বসু ‘নেতাজী’ হয়ে ওঠেন। প্রকৃত বীর সংসপ্তক অর্থাৎ যুদ্ধে সামনেই এগিয়ে যায়, ভয় পেয়ে পিছনে ফেরে না। সেই অসম যুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করেও ১৯৪৫-এর আগস্টে মিত্রশক্তির পরমাণু বোমায় জাপানের পরাজয়ে নেতাজির স্বাধীনতার পথ দিল্লী পৌঁছানো ব্যর্থ হয়ে যায়।

১৭ আগস্ট তিনিও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে পড়েন। তাঁর প্রতিশ্রুতি অসফল হয়, স্বপ্ন অসমাপ্ত থাকে, কিন্তু দেশের জয় সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে। সুভাষের সেই ‘জয় হিন্দ’(ভারতের জয় হোক) জয়ধ্বনি তাঁর কথামতো দুবছরের মধ্যেই দেশের স্বাধীনতা লাভের মধ্যে দিয়ে অক্ষয় হয়ে যায়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশের ভোগ ও আত্মসেবার বিপরীতে অসংখ্য দেশপ্রেমিকের কথা উঠে আসে ঠিকই, কিন্তু বীরত্বের অপার মহিমায় দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠায় সুভাষচন্দ্র বসু নিঃসঙ্গ একাকী। লুইস ফিসারের কাছে গান্ধীজি তাঁকে ‘a patriot of patriots’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি যে আসলে ভারতমাতার অপরাজেয় বীর সন্তান। সেই মায়ের যেকোনো দুর্বল মুহূর্তেই যে সন্তানের কথা মনে আসে, অহঙ্কারেও জেগে ওঠে তাঁর মুখ, অস্তিত্বের আধারেও যে তাঁরই সৌরভ। বাঙালির চারিত্রিক শূন্যতায় তিনি পূর্ণ, দেশবাসীর স্বাধীনতাবোধের পূর্ণতায় তিনি সম্পূর্ণ। দেশের স্বাধীনতার সম্পূর্ণ রূপ তো তিনি নিজের জীবনেই মূর্তি থেকেই প্রতিমায় পরিণত করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ দেশকে আরাধ্য দেবী ভেবে পূজা করতে বলেছিলেন। সেই পূজা সম্পূর্ণ করেছিলেন তাঁরই সুযোগ্যতম উত্তরসূরি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

তথ্যঋণ : ১। জীবনীশতক, মণি বাগচী, শৈবা পুস্তকালয়, ১৯৮১, ২। কোরক সাহিত্য পত্রিকা, বইমেলা ১৪১৩

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : গোকুল সরকার, দিনহাটা।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev