ভারতবর্ষের জাতীয় জীবনে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের আত্মপ্রকাশ এক বিস্ময়কর ঘটনা। তিনি দেশজননী এবং জগৎজননীকে সমদৃষ্টিতে দেখেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আড়ালে থেকে গেছে তাঁর জীবনের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলি। তিনি একাধারে মনীষী, দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং সর্বোপরি আধ্যাত্মিক পুরুষ। মাতৃসাধক।
কালী হলেন বিশ্বনিয়ন্ত্রী। তিনি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের কাণ্ডারি। আবার তিনি জগৎপালয়িনী। সুভাষচন্দ্র এই সর্বব্যাপিনী কালী— যিনি কখনও দুর্গা, কখনও সরস্বতী, কখনও দশমহাবিদ্যা— তাঁর একনিষ্ঠ উপাসক। জীবনের সমস্ত পরিস্থিতিতে তিনি মা কালীকে ধরে থাকতেন। কালী মহামায়া— মহামৃত্যু। বিবেকানন্দের মৃত্যুদর্শন সুভাষচন্দ্রকে প্রভাবিত করেছে। সুভাষচন্দ্র নির্দিষ্টভাবে তন্ত্রসাধনা করতেন। তিনি স্বয়ং দিলীপকুমার রায়কে একথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য স্মৃতিকথা ও আলোচনায় তাঁর কালীসাধনার কথা জানা যায়। সুভাষচন্দ্র কৈশোরে গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছেন—
‘Who dares misery, loves
And hugs the form of Death
Dances in destructions dance
To him the Mother comes’.
সুভাষচন্দ্র শক্তি চিন্তা (দুর্গা অথবা কালী) না করে কোনও বড়ো কাজে হাত দিতেন না। তিনি নিয়মিত দক্ষিণেশ্বরে যেতেন। তাঁর দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার কথা বিপ্লবী সত্যরঞ্জন বক্সী উল্লেখ করেছেন। সত্যরঞ্জন বলেছেন, ‘সুভাষচন্দ্র কখনও কখনও উমাকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে যেতেন। মা ভবতারিণীকে দর্শন করে তিনি বিমোহিত হতেন। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের সঙ্গে তাঁর অন্তরের যোগ ছিল। এই মন্দির হলো তাঁর আদর্শ শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের সাধনভূমি, লীলাভূমি। দক্ষিণেশ্বরের সঙ্গে তাঁর আন্তর্সম্পর্কের কথা পরেও আলোচিত হবে।

সুভাষচন্দ্র তন্ত্রসাধনা করতেন, তা আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি। সুভাষচন্দ্র একবার তন্ত্রাচার্য, মহাসাধক বরদাচরণ মজুমদারের কাছে গিয়েছিলেন। বরদাচরণ তাঁকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শক্তিসাধনার পথ ওপদ্ধতি সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও পরামর্শ দেন। সুভাষচন্দ্রের সুগম্ভীরভাবে টলমল অবস্থা বরদাচরণকে আনন্দ দেয়। তিনি বলেন, সুভাষচন্দ্র মহাতান্ত্রিক ও মাতৃউপাসক। তিনি একটু নাড়িয়ে দিলেন। তারাক্ষ্যাপার সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে শোনা যায়। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে অর্জিত সুভাষচন্দ্রের যোগশক্তি তারাক্ষ্যাপাকে বিস্মিত করেছিল (সূত্র : রাখাল বেণু, নেতাজি সংখ্যা)।
সুভাষচন্দ্র কারাগারের ভেতরও দুর্গাপূজার আয়োজন করেছেন। তিনি কারাগারের অন্যান্য বন্দি সাথীদের সঙ্গে নিয়ে আনন্দের সঙ্গে মাতৃ-আরাধনায়—শক্তি-আরাধনায় মগ্ন থেকেছেন। শক্তিপূজায় মগ্ন তাঁর ভাব-মাতোয়ারা রূপা সেখানে উপস্থিত অন্যন্য বন্দিদের মুগ্ধ করেছে।
দক্ষিণেশ্বরে সুভাষচন্দ্র নিয়মিত যেতেন আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মাতৃমন্দির, রাধাকৃষ্ণের মন্দির, শিবমন্দর ভ্রমণ ও বিগ্রহ দর্শন করতেন। কখনও বেশিক্ষণ থাকতেন, কখনও শীঘ্র চলে যেতেন। তিনি অদ্ভুত ভাবরাজ্যে বিচরণ করতেন এখানে এলে। পরে জীবনের নানা কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি মা ভবতারিণীর আশীর্বাদ আকাঙ্ক্ষা করতেন। ত্রিপুরি কংগ্রেসে সভাপতি পদে তাঁর জয়ের পর যখন সমগ্র কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ তাঁর বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিলেন এবং তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন, তখন তিনি দক্ষিণেশ্বরের প্রসাদি নির্মাল্যের জন্য অপেক্ষা করতেন। যখন কঠিন রোগাক্রান্ত তিনি— সামনে মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের মহান সংগ্রাম অপেক্ষা করছে— তখন তিনি প্রার্থনা করছেন মায়ের কাছে। তাঁর অনুগত স্বাধীনতা সংগ্রামীবৃন্দ (সত্যরঞ্জন বক্সী, সত্য গুপ্ত প্রমুখ) মায়ের আশীর্বাদস্বরূপ ফুল, প্রসাদ তাঁকে পাঠাতেন। ১৯৪১ সালে তাঁর মহানিষ্ক্রমণের দিনেও তিনি অপেক্ষা করেছিলেন মায়ের প্রসাদি নির্মাল্যের জন্য। ১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাসের ২১ ও ২৩ তারিখ তিনি যখন আজাদ হিন্দ সরকারের প্রতিষ্ঠা করছেন ও আমেরিকা এবং ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছেন তখন ছিল কালীপূজা ও দীপাবলির উৎসবের দিনগুলি।

নেতাজি যখন সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ সরকারের প্রধান কেন্দ্রে তখন তিনি মাঝে মাঝে সেখানকার রামকৃষ্ণ মিশনের কেন্দ্রে যেতেন। মিশনের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসতেন। বাইরে যুদ্ধের দামামা— তিনি ধ্যানে সমাসীন— অপূর্ব ধ্যান সমাহিতি। আজাদ হিন্দ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান নেতাজি তৎকালীন মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী ভাস্বরানন্দকে বলেছিলেন, ‘মহারাজ আপনার কাছে কি সেই ছবিটি আছে, যাতে মা কালীর পায়ের কাছে বসে আছেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ?’ নেতাজি ভাস্বরানন্দজির কাছে একটি ‘চণ্ডী’ বই চেয়েছিলেন। শোনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণের মানসসন্তান স্বামী ব্রহ্মানন্দজির স্পর্শধন্য একটি ‘চণ্ডী’ পুস্তক মহারাজের কাছে ছিল। তিনি সেটি নেতাজিকে উপহার দেন।
সুভাষচন্দ্র বলেছেন, তাঁর জীবনে একমাত্র মা কালীর ইচ্ছাই ফলবতী। মাতৃসাধক, জন-গণ-মন অধিনায়ক সুভাষচন্দ্রের জীবন তাই সকল সময়েই মাতৃচরণে সমর্পিত।