দেশনেতা হিসাবে বাঙ্গালীর হৃদয়ে মনে যাঁর আসন চিরস্থায়ী, তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু।
নেতাজী বিশ্বাস করতেন যে, ভারতবর্ষ তার ভাষা এবং সংস্কৃতির দিক থেকে বহু বিচিত্র ভাগে বিভক্ত হলেও মোটের উপর একটি সত্তা। যেকোনো মূল্যে এই সত্তাকে রক্ষা করতে হবে।
সমস্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে বৃটিশ শক্তির বিরুদ্ধে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে একটি সংগঠিত আন্দোলনের রূপ দেবার চেষ্টা করেছিলেন এই বিশ্ববরেণ্য নতা। আজাদ হিন্দ ফৌজ তার সব থেকে বড় প্রমাণ। দেশ নেতা হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন একটি শক্তপোক্ত কেন্দ্রীয় সরকার এবং পরিকল্পিত অর্থনীতি। স্বাধীন ভারতে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প থাকতে পারে না বলেই তিনি মনে করতেন। মহিলাদের শক্তিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের ঝাঁসিরানি ব্রিগেডের কথা আমরা সকলেই জানি। অনেক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনেক বিরোধিতা থাকলেও তিনি যে আমাদের সকলেরই মনের প্রাণের মানুষ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যেভাবেই আমরা তাঁর কথা ভাবি না কেন, একথা স্বীকার করতেই হবে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ এই দুটি বছর, দক্ষিণ এশিয়াতে ভারতের জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতা বিষয়ে তাঁর সমস্ত স্বপ্ন ও পরিকল্পনাকে নিরঙ্কুশভাবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। সেই নেতৃত্বের সাফল্য অপরিসীম।

সকলেই নেতা নয়, একজনই নেতাজী। ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এই মানুষটি এখন আর তন্ত্রীতে সে কাঁপন তোলেন না, নতুন প্রজন্ম সেভাবে উদ্বেলিত হয় না যখন মৃত্যুর সঠিক সংবাদ না থাকলেও হারিয়ে যাওয়া মানুষটির ফিরে আসা আশাহীন প্রায়। যে সত্যবোধকে নির্দ্বিধায় জড়িয়ে অগণিত মানুষের দীপশিখা ছিলেন তিনি, সেই তিনিই ছিলেন অপরিসীম ঈর্ষার কেন্দ্র তারই কিছু সতীর্থের। দুঃখের কথা সমসাময়িক রাজনীতি, তাঁর বর্তমান উত্তরসূরি যাঁরা রয়েছেন তাঁরাও এ বিষয়ে নিজেদের মুক্ত করতে পারছেন না। নেতাজী সুভাষ এর স্বপ্নের ভারত বাস্তব হয় নি এ কথা অনস্বীকার্য কিন্তু সেই ফাঁক বোজানোর জন্য অসত্যের ভিত তোলা কতটা যুক্তিযুক্ত? পরদেশে কিছু হলে যেমন মাও সে তুং এর লং মার্চ, সেটা হতেই পারে, কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজের মণিপুরের মৈরাং পর্যন্ত চলে আসা, সে সময়ের অনেক নেতার কাছেই যেন শিরে সংক্রান্তি। আখের গুছিয়ে নেওয়া আর অহং এর পর্দানশীন কিছু দালাল তখন নেতাজীকে আসন্ন বিপদ হিসেবেই দেখেছিল, আর তাই স্বাধীনতার সময়ে ওয়ার ভিক্টিম হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন ফৌজের সেনানীরা। নেতাজী একটা বড় আপদ, স্বার্থপর জননেতাদের কাছে, তাই ধূপের ধোঁয়া, দীপের আলোয় তাঁকে ভুলিয়ে দেওয়ার অবিরল আয়োজন। পিছনপানেও যেন নেতাজীকে এক বিভ্রমের চাদরে মুড়ে রাখা যায়। সত্যদ্রষ্টাকে মূর্তির আড়ালে লুকিয়ে রাখাই এখন সমবেত বিনোদন।
২৩শে জানুয়ারি কাছাকাছি এলেই আপামর বাঙ্গালীর মনের ভিতরে শুরু হয়ে যায় এক রুদ্ধ আবেগের আসা যাওয়া। যে আবেগ বাঙ্গালীকে তার ঘরের ছেলে সুভাষের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। সারাবছর যে একটা না বলা বেদনা রয়ে যায় মনের ভিতরে, সুভাষের জন্যে, তা যেন হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসতে চায়। পরাধীন ভারতবর্ষে রাজনৈতিক দলগুলির মূল লক্ষ্যই ছিল পরাধীনতার বন্ধন থেকে দেশ কে মুক্ত করা। সে সব দিনের ইতিহাস সকলের জানা। কিন্তু দেশপ্রেম যখন রাজনৈতিক নেতারা অন্ধ এবং উগ্রভাবে ব্যক্ত করে, তখন তা জাতির জীবনে অসহ্য হয়ে ওঠে। একজন মানুষ দেখাতে পারবেন সুভাষের মত? যার নামের সঙ্গে দেশপ্রেম ছাড়া অন্য কোনো ভাবনা যায় না। বহু দেশপ্রেমিক, স্বদেশী, আত্মত্যাগীর জন্ম ভারতবর্ষে, কিন্তু সুভাষের নাম শুনলে ছোট বড়ো সকলের গায়ে কাঁটা দেয় আজও। তাঁর শৌর্য, বীরত্ব, সাহস সবকিছু অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বলেই তিনি নেতাজী।

সারা ভারতে যত গুলি রাজ্য আছে, এই উৎসবের দিনে তাদের সকলের স্থান হওয়া উচিৎ। সময়ের হিসাব যাদের করার দরকার তারা করুক, কিন্তু কাউকে বাদ দেবার অধিকার কারো নেই। কালের বিচার কাউকে ছাড়ে না। সমাজ এবং ইতিহাস কিন্তু প্রত্যেককে তার নিজের জায়গায় ধরে রাখে। তাই সুভাষের উজ্জ্বল উপস্থিতি আজও আমাদের অন্তরে। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে আমরা এতটাই উন্নত, যে, স্বাধীনতার সেনাপতি কে ভুলে গিয়েছি কখন? যখন স্বাধীনতার ৭৫ বছর উদযাপন চলছে এবং বীর সুভাষের ১২৫ বছরের জন্মজয়ন্তী। সত্যিই তো, আমার দেশের সব থেকে বড় গণতান্ত্রিক উৎসবের দিনে এমন মানুষটিকে ভুলে না গেলে কি চলে?
সুভাষকে মনে রেখে, তাঁর আদর্শ কে মনে রেখে, বহু বাবা মা সন্তানের নাম রেখেছেন সুভাষ, আজও রাখেন। সুভাষ আমাদের ঘরের ছেলে। তাঁর চরিত্র, তাঁর চিন্তাভাবনা, তাঁর মতামত, তাঁর দেশভক্তি আজও, তাঁর জন্মের ১২৫ বছর পরেও আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। অবমাননা তার হয়, যে মান দিতে পারে না। যিনি আমাদের ঘরের ছেলে, তাঁর জন্যে আমরা প্রতিদিন প্রদীপ জ্বালিয়ে, আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করি, জানি, সুভাষ একদিন ঘরে ফিরবেই।

তাঁর দেশপ্রেম আমাদের মনে যে অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছে, তার মধ্যে নিজেদের আজও আমরা আহুতি দিয়ে থাকি, দেশের স্বার্থকে যেদিন নিজের স্বার্থ বলে মনে করবে দেশবাসী, সেদিন আমরা সুভাষকে যথার্থ সম্মানের আসন দিতে পারবো। বাঙ্গালীর স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন, একথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তাঁর ফিরে আসার পথ চেয়ে এই যে বসে থাকা, সে তো আর এমনি নয়। এই রকম একটি সন্তান, একজন পথপ্রদর্শক, একজন দেশ নেতা চায় না, এমন জাতি, এমন দেশ কোথায় আছে?