তিনি ছিলেন এক দরদী কবি। বাংলার মাটি, গান, খেত আর মানুষের কবি। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, হাহাকার আর স্বপ্ন তাঁর কলমে জীবন্ত হয়ে উঠতো। কোনওদিন চাকরি করেননি। লিখে গেছেন ধারালো কলমে মনজাগানো পদ্য-গদ্য। বাংলা ভাষায় এনে দিয়েছেন ফসলের সুর, মাটির সুর, একসঙ্গে জীবন গড়ার কথকতা। তিনি সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩)। বাংলা ভাষায় তিনিই হয়তো একমাত্র কবি যিনি এমন এক অন্তিম স্বপ্নবিশ্বাসের ঘোষণা করতে পারেন—
আমি যেন আমার কলমটা
ট্র্যাক্টরের পাশে
নামিয়ে রেখে বলতে পারি—
এই আমার ছুটি—
ভাই, আমাকে একটু আগুন দাও। (আমার কাজ)
কবি মানেই যে গজদন্ত মিনারে বসা ভাবালুতাচর্চা নয়, সে কথা সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রথম থেকেই প্রমাণ করে গেছেন। পথেঘাটে, ভিড়ে-মিছিলে, গ্রামে-গঞ্জে মিশে থেকে তিনি অনর্গল লিখে গেছেন সংগ্রামের কবিতা, প্রতিবাদের কবিতা। সেই স্ফুলিঙ্গ তরুণমনে জ্বালিয়েছে অগ্নিশিখা। কবি হিসেবে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অবিস্মরণীয়। পাশাপাশি বাংলার পথেপ্রান্তরে ঘুরে ঘুরে লিখেছেন রিপোর্টাজ, ভ্রমণকাহিনিমূলক গদ্য। সে-ও অত্যাশ্চর্য কীর্তি। যেমন তাঁর মৃত্তিকালগ্ন ভাষা, তেমন চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার সম্ভার। শুধু বিবরণ নয়, আঞ্চলিক ইতিহাস, আঞ্চলিক ভূগোল, জনপদের চরিত্র, বহমান রাজনীতি, মুখে-মুখে ফেরা গান, সংস্কৃতি এমনকী অর্থনীতি, সমাজতত্ত্বও সহজ মনকাড়া গদ্যে অসামান্য পরিবেশন করেছেন। সেগুলি ইতিহাসের দলিল, সময়ের অবিনশ্বর দর্পণ। ‘আমরা বাংলা’-য় আছে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বাংলার মর্মস্পর্শী চিত্র। আবার ‘ক্ষমা নেই’ লেখা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। তখনো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। উত্তাল সেই দিনগুলিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় গিয়েছিলেন সীমান্ত পেরিয়ে, ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন পাকসেনাদের বীভৎস অত্যাচার আর বাংলাদেশের অক্লান্ত লড়াইয়ের কথা ও কাহিনি। এছাড়াও ‘নারদের ডায়েরি’, ‘টো টো কোম্পানি’, বা অভিনব আঙ্গিকে লেখা ‘চিঠির দর্পণে’, যে কোনো পাঠককে আলোড়িত করবে।
অনুবাদ? সেক্ষেত্রেও তিনি অপ্রতিরোধ্য। তাঁর ‘নাজিম হিকমতের কবিতা’ কিংবা ‘পাবলো নেরুদার কবিতা’ বাংলা কবিতায় স্বমহিমায় ছায়া ফেলেছিল, মনেই হয়নি কোন্ সাগরপারে এদের উৎসভূমি! অনবদ্য জাদুতে সেইসব কাব্য উচ্চারণ কখন যেন বাংলার জলহাওয়ায় রূপান্তর খুঁজে পেয়েছিল। তাঁর ‘হাফিজের কবিতা’ বা ‘অমরুশতক’ একেবারে ভিন্ন মেজাজের কবিতা। কিন্তু, সেগুলির আকর্ষণও কম ছিল না পাঠকমহলে। গদ্যও অনুবাদ করেছেন অঢেল। তার মধ্যে ‘রোজেনবার্গ পত্রগুচ্ছ’ কিংবা ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরী’ বাংলার পাঠকের কাছে স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত।
লিখেছেন ছোটোদের জন্যও। কী দুর্দান্ত সেইসব লেখাপত্র। ‘মিউ-এর জন্য ছড়ানো ছিটোনো’ বা ‘সাতসকালের ছড়া’ শুধু ছোটোদের নয়, বয়স্ক পাঠককেও মুগ্ধ করবে। সেই মণিমুক্তোর মতো লেখার একটি-দুটি শোনাই—
ঝোপের গায়ে ঝকমক করে
রুপো কিংবা সোনা কি?
সোনাও নয় রুপোও নয়—
আঁধার মানিক জোনাকি।
অথবা
বড়দিনে কেক চাই
ঈদে চাই সিমুই
পৌষেতে পিঠে খাই
রোদে বসে ঝিমুই।
মনে রাখতে হবে পাশাপাশি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে নবপর্যায় ‘সন্দেশ’ তিনি সম্পাদনা করেন ১৯৬১-১৯৬৩।
অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির লড়াকু আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৪৩ সাল থেকেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্রপাত। পার্টি সদস্য হিসেবে ১৯৪৮ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। দমদম জেলে সমবেত হাঙ্গার স্ট্রাইকে তিনি অংশ নেন। পরে বন্দি হিসেবে তাঁকে পাঠানো হয় বক্সায়। ১৯৫০ সালে মুক্তি পান। ১৯৫১ সালে প্রখ্যাত পত্রিকা ‘পরিচয়’-এর সম্পাদকপদে বৃত হন। ১৯৫২ সালে চটকল মজুর সংগঠনের কাজে স্ত্রী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে চলে যান বজবজ। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও ছিলেন সুলেখিকা। দুজনে ব্যঞ্জনহেড়িয়া গ্রামে মজুর বস্তিতে মাটির ঘরে থেকে শ্রমিক সংগঠন চালিয়েছিলেন। ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করেন পরবর্তীকালে কলকাতার পোর্ট অঞ্চলে। ৬৭ সালে আবার কারারুদ্ধ হন। ওদিকে ততদিনে বাংলা কবিতায় তাঁর হাত ধরে ঘটে চলেছে অবিস্মরণীয় এক তোলপাড়। পদাতিক (১৯৪০), চিরকুট (১৯৪৬), অগ্নিকোণ (১৯৪৮), ফুল ফুটুক (১৯৫৭), সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা (১৯৫৭) কাব্যপ্রেমিক এবং কাব্য সমালোচকদের বিমুগ্ধ করেছে। মুখে-মুখে ফিরছে তাঁর অনবদ্য কাব্যপঙ্ক্তি। তাঁর বছর কুড়ি বয়সে লেখা কবিতা ‘অতঃপর’ নিয়ে তৎকালীন কাব্যমহারথীদের তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। বিমুগ্ধ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বুদ্ধদেব বসু-কে বলেছিলেন, ‘My God, this boy is going to beat us’. অথচ বামপন্থী আদর্শে টইটুম্বুর তাঁর তৎকালীন কবিতা একেবারে আগ্নেয় সুরে গাঁথা। গরিব, আধপেটা খাওয়া মানুষের সমস্যা আর সংগ্রাম তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য ছিল। শ্রমজীবী আর কৃষিজীবী মানুষের হাসিকান্নাকে রূপময় কাব্যে রূপান্তরিত করে তুলেছিলেন তিনি। কবিতার সূত্রেই ‘অ্যাফ্রো এশিয়ান রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়, পরবর্তীকালে। বিভিন্ন দেশে ঐ সংস্থার কাজে সফর করেন, আলাপ-বন্ধুত্ব হয় বিশ্বসাহিত্যের অগ্রগণ্য লেখকদের সঙ্গে।
১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘ছেলে গেছে বনে’। নকশালবাড়ি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা তাঁর ঐ গ্রন্থের নামকবিতাটি আজ কিংবদন্তির মতো অনশ্বর। সে বছরেই প্রকাশিত হয় জেলজীবনের হাঙ্গার স্ট্রাইকের স্মৃতিসূত্রে লেখা উপন্যাস ‘হাংরাস’। পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস লিখেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘অন্তরীপ বা হ্যানসেনের অসুখ’ এবং ‘কমরেড, কথা কও’।
বাংলাভাষাচর্চা এবং সেইসূত্রে বাংলা ভাষার মহিমাময় প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর স্বপ্ন। পাঁচের দশকের গোড়ায় ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বা ‘কথার কথা’ বইয়ে তার আদিস্বাক্ষর। এ প্রসঙ্গে প্রবীণ বয়সে লেখা ‘ফকিরের আলখাল্লা’ বা ‘কথার গুণে তরি কথার দোষে মরি’ প্রবন্ধ সংকলন দুটি বিশেষভাবে স্মর্তব্য। মূল্যবান বেশ কিছু দিকনির্দেশ এবং মীমাংসা সেখানে প্রোজ্জ্বল।
দুই.
সুভাষ মুখোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন ১৯৩৯ সালে। সেই সম্পর্কসূত্রটি দীর্ঘকাল তাঁর কবিতার বিকাশে জলহাওয়া জুগিয়েছে। জনমানুষের সান্নিধ্যে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের লড়াই বিক্ষোভে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা প্রাণ পেয়েছে। তিনি সেই জাদুবিদ্যা জানতেন যার ফলে সমকালীন ঘটনা বা সমসময়ের কোনো রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক চর্চা শাশ্বত মাত্রাকে স্পর্শ করতো। ফলে শুধু স্মরণীয়ই নয়, কবিতাগুলি হয়ে থাকতো বাংলা কবিতার স্থায়ী স্বম্পদ। তাঁর দৃপ্তলেখনী, তাঁর অনবদ্য চিত্রকল্প, তাঁর কল্পনার ডানা, সারবস্তু সংগ্রহ করতো এই সমবেত যাপন থেকে, সম্মিলিত সংকল্প থেকে।
তবে, অভ্যন্তরে বয়ে চলে ভিন্ন এক প্রবাহ। কোনো সন্দেহ নেই, সুভাষ মুখোপাধ্যায় পার্টির সূত্রেই বহু এমন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পেরেছেন যা সচরাচার বাবু-সাহিত্যিকদের কপালে জোটে না। তাঁর সেই গণপরিসর, তাঁর সেই যূথবদ্ধ মিছিলের মুখ যেমন সত্য, সেই অ্যাঁচে তাঁর রক্তিমাভ উজ্জ্বল সাহিত্য সৃষ্টি, সে-ও নিশ্চয়ই অসত্য নয়, তবে, তার অভ্যন্তরে, গোপনে বা প্রকাশ্যে বহমান থাকে দীর্ঘতর অপমানতরঙ্গ। থাকে অসূয়াজনিত আক্রমণ, দ্বেষ, স্বাধীনচেতার প্রতি ‘দরবারি’ বামপন্থীদের অপরিসীম তাচ্ছিল্য আর ঘৃণা। পার্টিনেতা থেকে পার্টিদাস বা ক্যাডার সর্বত্র ছড়ানো থাকে এমন মাতব্বরির চিহ্ন। এ ঘটনা অবশ্য সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর কবিতার ক্ষেত্রে প্রথম যে ঘটলো, এমন নয়। স্বদেশে-বিদেশে বহুস্রষ্টার ক্ষেত্রেই এমন বন্ধুত্ব-দূরত্ব সম্পর্ক অন্তত কমিউনিস্ট পার্টির প্রসঙ্গে বারংবার ঘটেছে বা ঘটে। আসলে স্রষ্টার মন কোনো রাজনীতিকের বাঁধা ছকে আটকায় না। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সনাতন ঐতিহ্যে একধরণের স্বৈরতন্ত্র আছে। তাঁরা ক্রমাগত পার্টিসিদ্ধান্তের ‘ক্রীতদাস’ হিসেবে শিল্পী-সাহিত্যিককে বেঁধে ফলতে চান। এই দাসত্বশৃঙ্খল প্রকৃত শিল্পীর কাছে অচিরেই অসহ্য হয়ে ওঠে। এর প্রধান কারণ হলো, মোটের ওপর ঐসব রাজনৈতিক নেতাদের শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে রুচি বা ধারণা নিতান্ত একপেশে এবং নিম্নমানের। প্রকৃত শিল্পী বা সাহিত্যিকের পক্ষে ঐ মাতব্বরির আবহ ক্রমেই অসহনীয় হয়ে ওঠে। ফলে, কমিউনিস্ট পার্টির ঐসব নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। আদ্রেঁ ব্রেতঁ বা পাবলো পিকাসো, মায়ারহোল্ড থেকে চিত্তপ্রসাদ, ভারতীয় সাহিত্যে প্রখ্যাত মারাঠি কবি নামদেও ধসাল—সবার ক্ষেত্রেই এ ধরণের পার্টি থেকে নিষ্ক্রমণ ঐতিহাসিক সত্য। এঁরা কেউই কমিউনিস্ট পার্টির আগ্রাসী একঢালা শিল্প-সাহিত্য-খবরদারি মেনে নিতে পারেননি। অডেনের মতো কবি তো পুরোনো যুগে নিজেরই লেখা লেনিন বন্দনা বা অন্যান্য বামপন্থা-প্রশস্তি পাইকারি হারে কেটেকুটে ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বীতরাগ তথা বীতস্পৃহা তথা অপ্রসন্নতা কোন পর্যায়ে গেছিল, বোঝা যায়। শিল্পী বা সাহিত্যিক যদি পার্টির পোষ ঠিকমতো না মানেন তাহলে উল্টোদিকে পার্টিও নখদন্ত বার করে শিল্পী-স্রষ্টার বিরুদ্ধে। সে আক্রমণ কবি-শিল্পীদের রক্তাক্ত করে। বাড়তে থাকে পারস্পরিক আক্রমণ।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। সাহিত্য প্রতিভায় তাঁর চেয়ে ঢের খাটো ব্যক্তিবর্গ ‘রাজনৈতিক’ ক্ষমতায় বলশালী হয়ে তাঁর কলমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। ‘পার্টিলাইন’ নামক দানবাকার খাঁচায় ভরতে চেয়েছে ওঁর সৃষ্টিবৈচিত্র্যকে। পার্টিলাইন মান্য না-করায় বহুবার কবি সুভাষ ভর্ৎসিত হয়েছেন, অপমানের সম্মুখীন হয়েছেন। কমিউনিস্ট পার্টি আর তার নেতা-ক্যাডাররা প্রতাপদম্ভে কবি-সাহিত্যিকের স্বাধীন, স্পষ্ট, প্রতিবাদী মনটিকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনতে চায় না।
কার্ল মার্কসের উৎপাদন সংক্রান্ত তত্ত্বকে সহজ ভাষায়, সর্বজন বোধগম্য আকারে প্রকাশ করেন। বইটির নাম ‘ভূতের বেগার’ (১৯৫৪)। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবর্গ বইটিকে নিষিদ্ধ করার অনুশাসন জারি করেন। বইটি ‘মার্কসবাদ বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত হলো এবং ‘বিচ্যুতি’-র দায়ে লেখক সুভাষ মুখোপাধ্যায় অপমানিত হলেন। অথচ বইটি ছিল মূলানুগ এবং অভিনব। কেউই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য শোনার সৌজন্যটুকুও দেখান নি। আরও পরবর্তীকালে সলঝেনিৎসিন অনুবাদ করার ‘অপরাধে’ সুভাষ কঠোরভাবে নিন্দিত হন, ঐ বামপন্থী নেতা-কর্মী বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা। সুভাষ দমে যাননি। কিন্তু, অন্তরের ক্ষয়, রক্তক্ষরণ এবং অসম্মানজনিত যন্ত্রণা নিশ্চয়ই তাঁকে পীড়িত করেছিল। তাঁর কাব্য বিষয়, জীবনযাপন এবং নন্দনভাবনা সম্পর্কে নানা অকথা-কুকথা রটিয়ে দেয়া হতে থাকে। হিংস্র নানা কটূক্তির পাশাপাশি চেষ্টা হয়েছিল তাঁকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে বিলুপ্ত করে দেয়ার। তিনি যে স্বমহিমায় ভাস্বর থেকেছেন তার প্রধান কারণ অগণিত সাধারণ, অনুভবী পাঠক সমাজের সুগভীর সমর্থন এবং ভালোবাসা।
১৯৮০ সালে হয়তো এসবের তিক্ত অভিজ্ঞতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো একনিষ্ঠ বামপন্থী, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। তখন সেই পার্টিরই সরকার। যে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সবসময় কমিউনিস্ট পার্টিকে ‘আমাদের পার্টি’ বলে উল্লেখ করতেন, তিনি শেষপর্বে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি কমিউনিস্ট পার্টিতে বিশ্বাস করি না। আমি কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হওয়ায় বিশ্বাস করি না। সুতরাং, আমি কমিউনিস্ট নই।’ প্রত্যাখ্যান কতদূর তীব্র হলে, এমন কথা বলা যায়, কতদূর অপমনিত হলে তাঁর মতো একজন মানুষ এত রুক্ষস্বরে কথা বলেন, সেটা সহজেই অনুমেয়।
রাজনীতি অর্থে যদি হয় ভুখা মানুষ, দরিদ্র মানুষ, অন্যায়-অত্যাচারে ছিন্নভিন্ন মানুষের জন্য লড়াই, পাশে থাকার অঙ্গীকার—তাহলে তিনি সে পথ ছাড়েননি। অশক্ত শরীরে, অসীম প্রাণশক্তিতে ছুটে বেড়িয়েছেন অন্যায়ের প্রতিকারে, বঞ্চনার প্রতিবাদে। এই পর্বেই শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। নানা প্রতিবাদমঞ্চে এঁরা যৌথভাবে আন্দোলন সংগঠিত করেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘ঢোলগোবিন্দর মনে ছিল এই’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। আত্মজৈবনিক সেই গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে লেখা আছে ‘কন্যাপ্রতিম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সস্নেহে সুভাষদা’। আরও পরবর্তীকালে যখন অর্থনৈতিক সংকটে তিনি বিদীর্ণ, অসুখে-ব্যাধিতে অসহায়, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াকু আন্দোলন আর নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতায় অগাধ আস্থা ছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। বাংলা কবিতার সমুজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, মহাপ্রতিভাধর এই কবি সম্পর্কে তখনও বিষোদ্গার অব্যাহত রেখেছিল তাঁর ‘কমিউনিস্ট’ অনুজেরা। তাঁর অবদান স্বীকার করার সামান্য সৌজন্য বা মানবিকতা দেখা যায়নি। কেউ তাঁর খবরটুকু নেবার প্রয়োজন বোধ করতেন না।
প্রসঙ্গত, তাঁর প্রতি উপেক্ষা এবং অসম্মানের আর একটি চিহ্নও জাজ্বল্যমান। তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, আন্তর্জাতিক লোটাস পুরস্কার, কুমারন আসান পুরস্কার, কবীর পুরস্কারে ভূষিত হন। পেয়েছেন বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’ সম্মান। পেয়েছেন ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার’। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার পরিচালিত ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ তিনি কোনোদিন পাননি। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার মানচিত্রে তিনি এত বড়ো, এত শ্রদ্ধেয় ভূখণ্ড হওয়া সত্ত্বেও এ ঘটনা সত্য। আজ পর্যন্ত কেউ এ বিষয়ে প্রতিবাদও জ্ঞাপন করেছেন বলে জানি না। রাজনৈতিক মতভেদ কি ‘দরবারি’, ‘সনাতন’ বামপন্থীদের এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিল? নাকি, এই ‘প্রতিহিংসা’ শ্রেণিসংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছে?
তিন.
শারীরিক এবং অর্থনৈতিক সংকটেও কবিতা থেকে কোনোদিন সরে দাঁড়াননি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ছড়ানো ঘুঁটি’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০১ সালে। (প্রয়াণ-পরবর্তী কাব্যসংকলন আপাতত বাইরে রাখছি।) সেই কাব্যগ্রন্থেও বারবার ঝলমল করে ওঠে অত্যাশ্চর্য দীপ্তিভাস্বর পঙ্ক্তি—
নয়কো নুন
জলে কেবলি
জাগে নতুন
পলি!
নেই গলায়
কোনো ঘোষণা,
ক্ষেতে ফলায়
সোনা।’
অথবা,
দুঃখিনীর পোড়া কপালে
লাল টিপ
আমাকে অন্ধকারে
পথ দেখায়
আশ্চর্য মায়ায় ভরা তাঁর লেখনী। বাস্তবের রূঢ়কঠিন অভিব্যক্তিকে ভুলিয়ে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। ইশারা আনে উজ্জ্বল, সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের।
মনে পড়ে, কবিতা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে এই যুগন্ধর কবি একদিন বলেছিলেন, ‘কথায় চিঁড়ে ভেজে না, কিন্তু মন ভেজে। অন্যের মনকে নড়ানো যায়। তাতে কাজ হয়। কথা আর কাজের মধ্যস্থ হলো মন। মনকে নাড়াতে পারলেই হাত চলে।
আমি চাই কবিতা দিয়ে মানুষের হাতগুলোকে এমনভাবে কাজে লাগাতে যাতে দুনিয়াটা মনের মতো করে আমরা বদলে নিতে পারি।’
আজ সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে খুব বেশি করে মনে পড়ে। আমাদের রাজ্যের নাম পরিবর্তনের উপক্রম হয়েছে। আর ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নয়, নাম হবে ‘বাংলা’। কত যুগ আগে ঠিক এমনই এক স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সংস্কৃতে ‘কবি’ শব্দের প্রতিশব্দ হলো ‘দ্রষ্টা’। ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। ‘পারাপার’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন,
দুয়ারে খিল।
টান দিয়ে তাই
খুলে দিলাম জান্লা।
ওপারে যে বাংলাদেশ
এপারেও সেই বাংলা।