“অপছন্দের বই বলে পার্টি আঁতুড়ঘরে নুন দিয়ে মারল। ক্ষমতায় না থেকেই এই” — লিখেছিলেন পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ‘চিঠির দর্পণে’ নামক গ্রন্থে। ১৯৫৪ সালে এক স্বল্পখ্যাত প্রকাশনী থেকে তাঁর ‘ভূতের বেগার’ নামে একটি বই প্রকাশ পায়। এই বইটি ছিল কার্ল মার্কস এর লেখা ‘ওয়েজ লেবার অ্যান্ড ক্যাপিটাল’ এর বাংলা। তবে হুবুহু অনুবাদ নয়। প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছিলেন — ‘অর্থনীতির কথাগুলো সহজ বাংলায় বলবার’ জন্যই তাঁর এই প্রয়াস। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, — ‘কম লেখাপড়া জানা মানুষদের কাছে খানিকটা জ্ঞন পৌঁছে দেওয়ার কারণেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন। মনে রাখতে হবে এই সময় সুভাষ মুখোপাধ্যায় বজবজে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজ করছিলেন। তিনি হয়ত মনে করেছিলেন বিপ্লবের ভ্যানগার্ড হওয়ার মত শক্ত তাত্বিক ভীত শ্রমিকদের নেই।
ঠিক এখানেই শুরু বিরোধের। তিনি প্রশ্ন উস্কে দিচ্ছেন, নেতৃত্বের মধ্যবিত্ত চলন কে জিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করাচ্ছেন। তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি তাঁর এই অবস্থানকে পছন্দ করেনি। পদাতিক কবির জীবনে বিড়ম্বনা চূড়ান্ত আকার নিল ভূতের বেগার প্রকাশিত হলে। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৪-র মার্চ মাসে। ওই বছরের জুলাই মাসের ৭ তারিখ পার্টির রাজ্য কমিটির সম্পাদক জ্যোতি বসু তাঁকে এক চিঠিতে জানান ‘ভূতের বেগার-এর ব্যাপার, দুঃখের বিষয়, এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছুনো যায়নি। তবে এ মাসের শেষাশেষি সেক্রেটারিয়েটের মতামত বোধহয় ধার্য করা যাবে’। এই চিঠির বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় বইটির প্রকাশ কে কেন্দ্র করে পার্টি নেতৃত্বের সঙ্গে কবির তখন জোর কাজিয়া চলছে। পার্টির বুদ্ধিজীবী অংশের থেকেই আক্রমণ নামে বেশী। সঙ্গে থাকেন মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের একটি বড় অংশ।
পার্টির বাংলা কমিটির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ তে ১৯৫৫-র জানুয়ারি মাসে পুস্তক পরিচয় নামে এই বইটির আলোচনা আসে। সেখানে বইটির নামকরণ থেকে শুরু করে আদ্যোপান্ত সমালোচনা করা হয় যা প্রথাসিদ্ধ সমালোচনার গন্ডী অতিক্রম করে। মার্কসবাদ বিজ্ঞান, ভূতের নামে লেখক কুসংস্কারকেই মান্যতা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়। শ্রমিকের শ্রম কে ভূতের বেগার বললে সমাজের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশকেই অস্বীকার করা হয়। পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলীর এই অভিমতের বিরুদ্ধে তখন কলম ধরেন অধ্যাপক সতীন্দ্র চক্রবর্তী। তিনি নানা উদাহরণ টেনে স্বাধীনতার সমালোচনার জবাব দেন। ওনার জবাবের উত্তরে ১৯৫৫-র ১৮ ও ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখে স্বাধীনতা পত্রিকায় আরো দুটি লেখা বেরোয় “ভূতের বেগার প্রসঙ্গে” শিরোনামে। ভূত ও বেগার — এই দুটি অতি পরিচিত শব্দ এবং তার ব্যাখ্যা নিয়ে তাত্বিক কচকচি সে সময় বেশ কৌতূহলের কারণ হয়েছিল বইকি!
স্বাধীনতা পত্রিকার সমালোচনা অনেকের কাছেই উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং কুরুচিকর মনে হয়েছিল। তাছাড়া বইটিকে বাজারে বিক্রি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পার্টির দোকান থেকেও বই বিক্রি বন্ধ করা হয় সে কথা সুভাষ মুখোপাধ্যায় ‘চিঠির দর্পণে’ উল্লেখ করেছেন। সেদিন লেখকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন চিন্মোহন সেহানবীশ, দেবীপ্রসাদ চট্রোপাধ্যায়, জগদীশ দাশগুপ্ত এবং আরো অনেকে। এঁরা নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করলে জানিয়ে দেওয়া হয় বইটি নিষিদ্ধ করা সঠিক কাজ হয়েছে।
হতভম্ব পদাতিক কবি এ কারণেই বলেছিলেন ‘ক্ষমতায় না থেকেই এই’। তিনি হয়ত উপলব্ধি করেছিলেন ভবিষ্যৎ-এর ভূতের দাপটের কথা! ক্ষমতার বিকল্প অনুশীলনে ক্রিয়াশীল থাকে অসংখ্য ছোট ছোট ক্ষমতা কেন্দ্র যা বড় ক্ষমতার দাপটে ম্রিয়মান থাকলেও নিজ সঙ্কীর্ণ বৃত্তে সুযোগ পেলে ছোবল মারতে দ্বিধা করেনা। লেখক ছিলেন সেই ছোবলের চাঁদমারি। বন্ধুরা ভালবেসে তাঁর বিয়ের খবর স্বাধীনতা পত্রিকায় ছাপতে দিলে মেশিনম্যান সেই খবর তুলে নিতে বলে। যখন দেখা যায় ম্যাটার তুলে নিয়ে নতুন ম্যাটার বসাতে গেলে পরের দিন কাগজ বের করাই অসম্ভব হবে তখন বিয়ের খবরের অংশটুকু হাতুড়ি মেরে ভোঁতা করে দেওয়া হয়!
ক্ষমতাকে তিনি সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁর জন্মদিনে উল্লেখ থাক পদাতিক কবির জীবনের এই অংশটুকু। কারণ পথকেই তিনি ধ্রুব বলে জেনেছিলেন।
এসব পার্টি কখনও বুর্জোয়া মানসিকতাকে বর্জন করতে পারে নাই। সংসদীয় রাজনীতির বাইরে কিছু চিন্তা করতেও পারেনি। সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত।